খালিদ স্থিরতা খুঁজে ফিরত

আমি খবর পেয়ে যখন কমফোর্ট হাসপাতালের সামনে যাই, তখন অনেক শিল্পীই চলে এসেছে। না কারও চোখে-মুখে শোক নয়, একধরনের কঠিন ব্যাপার রয়েছে। যেন তারা বিস্মিত। মুখের এই কঠিন রূপ বলে দিচ্ছে এটা এক ধরনের এমন বিষয়, যা ভাষায় প্রকাশ করা যাচ্ছে না, ক্রমেই একা হয়ে যাওয়ার আতঙ্ক। আমরা ক্রমেই একা হয়ে পড়ছি। হাসপাতালের সামনে অনেকেই বলছিল, শহীদ মিনারে খালিদকে নিয়ে যাওয়ার জন্য। কিন্তু খালিদের বড় বোন আমাকে স্ট্রেইট বলে দিয়েছেন, একদম সোজা গোপালগঞ্জে নিয়ে যেতে। শহীদ মিনারে নিয়ে গিয়ে কী হবে? এই প্রশ্ন আমিও তাদের করি। আসলেই কী হবে! কেউ কেউ বলছিল, খালিদ ভাই একটা পুরস্কার পেল না। আমি বললাম, শিল্পীরা পুরস্কারের আশা করে না। হ্যাঁ, হয়তো পুরস্কারের জন্য কারও কারও অভিমান জমতে পারে, কিন্তু সেটা বড় বিষয় নয়। সবচেয়ে বড় বিষয় হলো অবমূল্যায়ন। কাল পঞ্চম এসেছিল। আমি নির্দ্বিধায় বলতে পারি আমার ভাই পঞ্চমের মতো বড় মিউজিশয়ান এ দেশে খুবই কম আছে। কিন্তু এ নিয়ে পঞ্চমের কোনো আক্ষেপ নেই। আমার বাবা মাহমুদুন্নবীর একুশে পদক পাওয়ার কথা ছিল, তার নাম ঘোষণাও হয় ১৯৯০ সালে। ১৯৯১ সালে তার একুশে পদক পাওয়ার কথা ছিল। কিন্তু তাকে দেওয়া হলো না। তিনি একুশে পদক পাননি। এ নিয়ে আমাদের কোনো কথা নেই। আমাদের কাছে আনন্দের কথা হলো, এখনো আমাদের দুই বোনকে অনেকেই বাবার পরিচয়েই ডাকেন। এটাই আমাদের জন্য গর্বের।

আমাদের দুই বোনকে অনেক রাজনীতির মধ্যে পড়তে হয়েছে। দুজনকে আলাদা করার চেষ্টা করা হয়েছে। কই কিছুই তো হলো না। খালিদের মূল্যায়ন হয়নি, আমি এটাকে স্বাভাবিকভাবেই ধরে নিয়েছি। অথচ ২০০৫ থেকে ২০১৩ সাল পর্যন্ত ক্লোজআপ ওয়ান : তোমাকেই খুঁজছে বাংলাদেশ বিচারকের দায়িত্ব পালন করেছি। আমি তখন দেখেছি পাঁচটা আসরের প্রতিটি আসরে অজস্র প্রতিযোগীর কণ্ঠে খালিদের গান। আমি সত্যিই অবাক হয়েছি, এত এত প্রতিযোগী খালিদকে কীভাবে ধারণ করেছে। তো সেই খালিদের পুরস্কার নিয়ে কোনো আক্ষেপ ছিল না। সাদি মহম্মদ যখন মারা গেল, তখনো পুরস্কারের কথা উঠেছে। আমি বলেছি, শিল্পীরা পুরস্কারের আশায় থাকে না। শিল্পীরা নিজেরা নানা কারণে অভিমানে অন্তরালে চলে যায়। অবমূল্যায়নের ব্যথা তাদের কুরে কুরে খায়। অভিমানে চলে গেলেন সাদি। আমি খালিদকে জানতাম সে ঠিক স্থির না, কিন্তু স্থিরতা খুঁজে বেড়াত। কোথাও স্থির হতে পারত না। এটাও একধরনের সময়কে হারিয়ে ফেলা। আসলে গানের সোনালি দিন চলে গেছে। চলে গেছেও রুপালি দিনও। এখন চলছে তাম্র সময়। অনেকে ভাবছে রুপালি দিন রয়েছে, আমি বলব, না। সে সময় চলে গেছে। এখন যে গান হচ্ছে তা করপোরেট বাণিজ্যের গান। গানের জায়গাটাকে দখল করে নিয়ে করপোরেট দুনিয়া। ফলে সোনালি দিনের শিল্পীরা মুখ আড়াল করছে।

আমি শিল্পীদের বলব, অবমূল্যায়ন কথাটা ভুলে যান। মূল্যায়ন আর হবে না। নিজেকে সে বিষয়ে প্রস্তুত করে ফেলুন। যেটুকু কাজ হয়েছে তা নিয়ে যথেষ্ট মনে করে অন্য কিছু ভাবুন, কাজ করুন কিন্তু হতাশাগ্রস্ত হবেন না। গানের জন্য ভালোবাসা, ভাবনা, সুর, কথার গভীরতা লাগে।

অনুলিখন মাহতাব হোসেন