অভিযানে রাজি নয় মালিকপক্ষ, নাবিকদের জীবন বিপন্নের শঙ্কা

তিন দফায় স্থান পরিবর্তন করে সোমালিয়া উপকূলের চার নটিক্যাল মাইলের ভেতরে জিম্মি বাংলাদেশি জাহাজ এমভি আবদুল্লাহকে নিয়ে গেছে জলদস্যুরা। সমুদ্র পরিবহন খাতের বিশেষজ্ঞরা বলছেন, উপকূলের এত কাছাকাছি চলে যাওয়ার পেছনে অন্যতম কারণ হলো আন্তর্জাতিক বাহিনী যেন জাহাজটি উদ্ধারে অভিযান চালাতে না পারে। কারণ আন্তর্জাতিক আইন অনুযায়ী, উপকূলের ১২ নটিক্যাল মাইলের ভেতরে আন্তর্জাতিক কোনো বাহিনী আক্রমণ চালাতে হলে সে দেশের অনুমোদনের প্রয়োজন হয়।

তবে যাদের জাহাজ সেই কেএসআরএম গ্রুপ নিজেরাই চায় না জাহাজ ও নাবিক উদ্ধারে সহিংস অভিযান পরিচালিত হোক। এ বিষয়ে কেএসআরএমের মিডিয়া উপদেষ্টা মিজানুল ইসলাম গতকাল বিকেলে দেশ রূপান্তরকে বলেন, ‘সরকারেরও একই বার্তা।’

কেন আপনারা চান না এমন প্রশ্নের জবাবে তিনি বলেন, ‘এতে আমাদের নাবিকদের জীবন বিপন্নের শঙ্কা রয়েছে। যেকোনো অঘটন ঘটতে পারে।’

তাহলে আপনারা কীভাবে নাবিকদের উদ্ধার করবেন এই প্রশ্নের জবাবে মিজানুল ইসলাম বলেন, ‘নেগোসিয়েশনের (সমঝোতা) জন্য আমরা শিগগিরই একটি মাধ্যম পেয়ে যাব বলে আশাবাদী। আর তা পাওয়া গেলে সমঝোতার ভিত্তিতে মুক্তিপণ দিয়েই নাবিকদের উদ্ধার করা হবে।’

সোমালিয়ার দস্যুদের হাতে জিম্মি কোনো জাহাজ ও নাবিককে এর আগে মুক্তিপণ ছাড়া উদ্ধার করা যায়নি জানিয়ে বাংলাদেশ মার্চেন্ট মেরিন অফিসার্স অ্যাসোসিয়েশনের সভাপতি ক্যাপ্টেন আনাম চৌধুরী বলেন, ‘সোমালিয়ান জলদস্যুদের প্রধান কাজই হলো মুক্তিপণ আদায় করা। তাই মুক্তিপণ ছাড়া কোনোভাবেই তারা জাহাজ ও নাবিককে দেবে না।’

তাহলে মাল্টার পতাকাবাহী রুয়েন কীভাবে উদ্ধার করল ভারতীয় নৌবাহিনী এমন প্রশ্নের জবাবে ক্যাপ্টেন আনাম বলেন, ‘রুয়েন ছিল ভারত মহাসাগরের মধ্যে। তাই ভারত মহাসাগরের মধ্যে অভিযান চালিয়ে উদ্ধার করা সম্ভব হয়েছে। আন্তর্জাতিক জলসীমা আইন অনুযায়ী, কোনো দেশের ১২ নটিক্যাল মাইলের ভেতরে প্রবেশ করতে হলে সে দেশের সরকারের অনুমোদন ও যে দেশের জাহাজ বা নাবিক উদ্ধারে অভিযান চালাবে, সে দেশের সম্মতি লাগবে। এখানে বাংলাদেশ ও সোমালিয়ার সরকার এই অভিযানের কোনো অনুমোদন দেয়নি। তাই কোনোভাবেই বাংলাদেশি জাহাজ আবদুল্লাহ ও এর নাবিকদের উদ্ধারে অভিযান পরিচালনা করা যাবে না।’

জিম্মি জাহাজটি বর্তমানে সোমালিয়া উপকূলের চার নটিক্যাল মাইলের মধ্যে নোঙর করে রাখা হয়েছে বলে জানান নৌবাণিজ্য অধিদপ্তরের প্রিন্সিপাল অফিসার ক্যাপ্টেন সাব্বির আহমেদ। তিনি বলেন, ‘আন্তর্জাতিক বাহিনী থেকে নিজেদের নিরাপদ রাখতে তারা উপকূলের খুব কাছাকাছি অবস্থান করছে। আর কয়েক দফা জায়গা পরিবর্তনের পেছনে অন্যতম কারণ হতে পারে উপকূলের কাছে গভীরতা রয়েছে। এই জাহাজটির জন্য প্রায় ১২ মিটার ড্রাফট (পানির গভীরতা) প্রয়োজন।’

তিনি আরও বলেন, উপকূলের কাছাকাছি যাওয়ায় দস্যুদের আরও সুবিধা হয়েছে। উপকূল থেকে সহজে খাদ্যসহ অন্যান্য প্রয়োজনীয় উপকরণ প্রাপ্তি সহজতর হবে।

তাহলে জিম্মি জাহাজের নাবিকদের কীভাবে উদ্ধার করা সম্ভব হবে এমন প্রশ্নের জবাবে ক্যাপ্টেন আনাম চৌধুরী বলেন, ‘সহিংসতা ছাড়া সমঝোতার মাধ্যমেই নাবিকদের উদ্ধার করতে হবে। আর কোনো বিকল্প পথ নেই।’

নাবিকদের সঙ্গে প্রতিদিন যোগাযোগ হয় মালিকপক্ষের : জাহাজের নাবিকদের সঙ্গে মালিকপক্ষের দিনে একবার করে যোগাযোগ হয় বলে জানিয়েছেন কেএসআরএম গ্রুপের মিডিয়া উপদেষ্টা মিজানুল ইসলাম। তিনি বলেন, ‘জাহাজের ওয়্যারলেস সিস্টেমে নাবিকরা আমাদের সঙ্গে কথা বলেন। তারা সবাই ভালো আছেন।’

নাবিকদের সঙ্গে কথা বলার সময় তাদের মুক্তির বিষয়ে দস্যুরা কিছু বলে কি না জানতে চাইলে মিজানুল ইসলাম বলেন, ‘অস্ত্র হাতে যারা রয়েছে তারা তো পাহারাদার। এদের পেছনে যে চক্রটি রয়েছে, সেটি আরেকটি গ্রুপ। আমরা তাদের সঙ্গে যোগাযোগের চেষ্টা চালিয়ে যাচ্ছি।’

গত ১২ মার্চ দুপুর দেড়টার দিকে সোমালিয়ার রাজধানী মোগাদিসু থেকে প্রায় ৬০০ নটিক্যাল মাইল দূরে ভারত মহাসাগর থেকে জিম্মি করা হয় এমভি আবদুল্লাহকে। জাহাজটি মোজাম্বিক থেকে ৫৫ হাজার টন কয়লা নিয়ে সংযুক্ত আরব আমিরাতের দুবাই যাচ্ছিল। জাহাজটি ছিনতাইয়ের পর সোমালিয়ার উত্তর-পূর্ব উপকূলের গ্যারাকাদে নোঙর করে। গত শুক্রবার বিকেলে সেখান থেকে উত্তর দিকে আরও সাড়ে সাত কিলোমিটার সরিয়ে নেওয়া হয়। গত সোমবার আবারও সরিয়ে নেওয়া হয় উপকূলের কাছাকাছি। একই মালিক গ্রুপের এমভি জাহান মনিকে ২০১০ সালে জিম্মি করেছিল জলদস্যুরা। ধারণা করা হচ্ছে, এমভি আবদুল্লাহকেও জলদস্যুদের ওই একই গ্রুপ জিম্মি করেছে। সেবারও মুক্তিপণ দিয়ে তাদের উদ্ধার করা হয়। সোমালিয়ার জলদস্যুরা ২০১৬ থেকে ২০২৩ সালের মধ্যে ৮টি জাহাজ জিম্মি করেছিল। এর আগে ২০০৯ থেকে ২০১৫ সালের মধ্যে জিম্মি করেছিল ৩৫৮টি জাহাজ।