ডুমুরিয়া উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সের চিকিৎসা নিতে আসেন শোভনা ইউনিয়নের নারী সুচিত্রা মল্লিক। ডাক্তার তাকে আলট্রাসনোগ্রাম পরীক্ষা করাতে বলেন। কিন্তু হাসপাতালে পরীক্ষাটি বন্ধ থাকায় বাধ্য হয়ে বেসরকারি ডায়াগনস্টিক সেন্টার থেকে করাতে হয়েছে। গত সোমবার পরীক্ষার রিপোর্ট নিয়ে আবারও ডাক্তারের কাছে আসেন তিনি। এতে সময় ও অর্থ নষ্ট হয়েছে। পোহাতে হয়েছে চরম ভোগান্তিও।
শুধুই ডুমুরিয়া উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সেই নয়, খুলনার ৯টি উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সেই চিকিৎসার হালচিত্র এমনই। তীব্র জনবল সংকট ও বেশিরভাগ পরীক্ষার যন্ত্রপাতি অকেজো হয়ে যাওয়ায় সাধারণ মানুষ চিকিৎসাসেবা থেকে বঞ্চিত হচ্ছে। ফলে বাধ্য হয়ে ছুটছেন বেসরকারি প্রতিষ্ঠানে।
খুলনা সিভিল সার্জন কার্যালয় সূত্রে গেছে, খুলনার ৯ উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সে অনুমোদিত ১ হাজার ৭৪৩ পদের বিপরীতে শূন্য রয়েছে ৬২৩টি পদ। এর মধ্যে দাকোপ উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সে ২০৮ পদের ৬৮টি, বটিয়াঘাটা উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সে ১৭১ পদের ৫১টি, রূপসা উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সে ১৮০ পদের ৬০টি, তেরখাদা উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সে ১৭৪ পদের ৭৫টি, দিঘলিয়া উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সে ১৬৮ পদের ৬১টি, ফুলতলা উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সে ১৭১ পদের ৩৮টি, ডুমুরিয়া উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সে ২৬৯ পদের ৯৪টি, পাইকগাছা উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সে ১৯৬ পদের ৯৪টি এবং কয়রা উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সে ২০৬ পদের বিপরীতে ৮২টি পদ শূন্য রয়েছে। দাকোপ উপজেলার বাসিন্দা বিধান ঘোষ দেশ রূপান্তরকে বলেন, দাকোপ উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সে দীর্ঘদিন আলট্রাসনো ও এক্সরে মেশিন চালানোর টেকনিশিয়ান নেই। ফলে এসব পরীক্ষা-নিরীক্ষা করতে একমাত্র বেসরকারিতেই ভরসা। তিনি বলেন, হাসপাতালে ডাক্তার দেখিয়ে বেসরকারি ডায়াগনস্টিকে গিয়ে পরীক্ষা করিয়ে ফের ডাক্তার দেখাতে তিন থেকে চার দিন পার হয়ে যায়। এ ছাড়া গ্রামের দরিদ্র মানুষের বাড়তি টাকাও খরচ হচ্ছে। তাই দ্রুত উপজেলা পর্যায়ের সরকারি হাসপাতালে পরীক্ষা-নিরীক্ষার এসব যন্ত্র চালু করা প্রয়োজন।
সিভিল সার্জন কার্যালয় সূত্রে আরও জানা যায়, জনবল সংকটের পাশাপাশি ৯ উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সে রয়েছে তীব্র যন্ত্রপাতি সংকট। এর মধ্যে বেশি সংকট রয়েছে দাকোপ উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সে। কমপ্লেক্সটিতে অকেজোর তালিকায় রয়েছে ৪৮টি যন্ত্র। সেগুলো হলো ছয়টি নেবুলাইজার মেশিন, তিনটি সাকার মেশিন, দুটি আলট্রাসনোগ্রাম মেশিন, অক্সিজেন ফ্লোমিটার ও অক্সিজেন কনসেন্ট্রেটর মেশিন, তিনটি ওটি লাইট, তিনটি অটোক্লেভ, দুটি অ্যানেসথেশিয়া মেশিন, তিনটি মাইক্রোস্কোপ, বায়োকেমিস্ট্রি অ্যানালাইজার, দুটি ওয়াটার বাথ, হট এয়ার ওভেন, তিনটি ভোল্টেজ স্টেরিলাইজার, চারটি সেন্ট্রিফিউজ মেশিন, ইউপিএস, রেফ্রিজারেটর, দুটি সেলিস হিমোগেলাবিনেটর, দুটি মাইক্রোপিপেট, ইউরিন অ্যানালাইজার, দুটি হেমোমিটার, ডেন্টার ইউনিট, ডেন্টার এক্সরে ও স্পট লাইট। বটিয়াঘাটা উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সে দুটি ইসিজি, সাকার মেশিন ও মাইক্রোস্কোপি মেশিন অকেজো রয়েছে।
রূপসা উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সে অকেজো রয়েছে ৩টি ৬ চ্যানেলের ও ২টি ১২ চ্যানেলের ইসিজি মেশিন, মাইক্রোস্কোপ, অ্যানেসথেশিয়া মেশিন, আলট্রাসনো মেশিন ও ডেন্টাল ইউনিট যন্ত্রপাতি। তেরখাদা উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সে সেন্ট্রিফিউজ মেশিন, মাইক্রোস্কোপ ও মাইক্রোস্কোপ জেডএন, তিনটি অটোক্লেভ, তিনটি সাকার মেশিন, দুটি নেবুলাইজার মেশিন, দুটি ইসিজি, চারটি অক্সিজেন ফ্লোমিটার ও স্পট লাইট। দিঘলিয়া উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সে অকেজো রয়েছে দুটি মাইক্রোস্কোপ ও ইসিজি। ফুলতলা উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সে দুটি ডেন্টাল চেয়ার, দুটি এক্সরে মেশিন, দুটি জেনারেটর, অ্যানেসথেশিয়া মেশিন, অটোক্লেভ, তিনটি ইসিজি ও চারটি মাইক্রোস্কোপ অকেজো রয়েছে। ডুমুরিয়া উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সে ডেন্টাল চেয়ার, দুটি অটোক্লেভ, দুটি ইসিজি, অ্যানেসথেশিয়া মেশিন, এক্স-রে মেশিন, চারটি মাইক্রোস্কোপ, দুটি সেন্ট্রিফিউজ মেশিন, নেবুলাইজার মেশিন, দুটি আলট্রাসনোগ্রাম মেশিন, ওটি লাইট, সিএবি রোটাটোর ও সেমিঅটো বায়োকেমিস্ট্রি ও অ্যানালাইজার অকেজো আছে। পাইকগাছা উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সে এক্স-রে মেশিন, তিনটি আলট্রাসনোগ্রাম মেশিন, ডেন্টাল চেয়ার, দুটি জেনারেটর ও অটোক্লেভ নষ্ট রয়েছে। কয়রা উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সে নষ্ট রয়েছে সাকার মেশিন, দুটি মাইক্রোস্কোপ, ১০টি অক্সিজেন ফ্লোমিটার, এসি, এক্সরে মেশিন ও দুটি ডায়াথার্মী মেশিন।
আটলিয়া ইউনিয়নের বরাতিয়ার বাসিন্দা বিউটি বেগম দেশ রূপান্তরকে বলেন, তার শরীরে রক্তরস রয়েছে ৭ দশমিক ৯। জরুরি ভিত্তিতে রক্ত দেওয়া দরকার। কিন্তু ডুমুরিয়া উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সে ব্লাড ব্যাংকই নেই। হাসপাতাল কর্তৃপক্ষ বলছে, বাইরে থেকে রক্ত সংগ্রহ করে আনলেই শুধু তারা রোগীর শরীরে দিতে পারে। অন্যথায় সম্ভব না।
ডুমুরিয়া উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সের স্বাস্থ্য ও পরিবার পরিকল্পনা কর্মকর্তা ডা. কাজল জানান, আলট্রাসনো ও এক্সরে মেশিন চাওয়া হয়েছে। পেলে সমস্যার সমাধান হবে। এ ছাড়া মহাসড়কের পাশেই হাসপাতালটি অবস্থিত। সেহেতু অনেক বেশি সড়ক দুর্ঘটনার রোগী আসে। এসব বিবেচনায় দ্রুত ব্লাড ব্যাংক চালুর উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে।
খুলনা সিভিল সার্জন ডা. মো. সবিজুর রহমান বলেন, জনবল নিয়োগে চেষ্টা চলছে। এ ছাড়া হাসপাতাল প্রতিষ্ঠিত হওয়ার পর থেকেই যন্ত্রপাতি নষ্ট হচ্ছে। কিন্তু যন্ত্রপাতি ক্রয়ে নানা জটিলতায় কেনা সম্ভব হয় না। তবে ইতিমধ্যে মন্ত্রণালয়ে চাহিদাপত্র পাঠানো হয়েছে।