সৌদি আরব থেকে ঢাকার হজরত শাহজালাল আন্তর্জাতিক বিমানবন্দরে এসে পৌঁছেছে দশটি কফিন। এর একটিতে আছে আবদুল জলিল শেখের মরদেহ (৩৫)। তার মরদেহ বুঝে নিতে বিমানবন্দরে এসেছেন স্ত্রী খাদিজা বেগমসহ স্বজনেরা। পরিবারে সচ্ছলতা ফেরাতে গত বছরের শুরুতে সৌদি যান জলিল শেখ। পাঁচ লাখ টাকা ঋণ করে দেশটিতে যান তিনি। কিন্তু বছর ঘুরতে না ঘুরতেই দেশে ফেরে তার প্রাণহীন দেহ।
কীভাবে জলিল শেখের মৃত্যু হয়েছে, সে বিষয়ে মৃত্যু সনদে উল্লেখ করা তথ্যের বাইরে আর কিছু জানেন না তার স্বজনেরা। জলিল শেখের কফিনের সঙ্গে ছিল একটা ছোট কাগজের টুকরা। তাতে লেখা হয়েছে, মৃত্যুর কারণ: স্বাভাবিক। ময়নাতদন্ত: করতে চাওয়া হয়নি। ক্ষতিপূরণ: নেই।
জলিল শেখের স্ত্রী খাদিজা সৌদি আরবে থাকা স্বামীর সহকর্মীদের কাছ থেকে জানতে পেরেছেন, স্ট্রোক করে মারা গেছেন তার জীবনসঙ্গী। কিন্তু ময়নাতদন্ত না হলে তারা জানতে পারবেন না, তরুণ বয়সে হঠাৎ করে তার মৃত্যুর কারণ কী। সৌদি থেকে কোনো ক্ষতিপূরণও পাবেন না তারা। খাদিজা কী করবেন বুঝে উঠতে পারছেন না। একদিকে দুই সন্তানের ভবিষ্যৎ, অন্যদিকে স্বামীর পাঁচ লাখ টাকা ঋণের দায়ভার তার কাঁধে।
২০২৩ সালে বাংলাদেশ থেকে সৌদিতে যাওয়া প্রায় ৫০ হাজার কর্মীদের একজন জলিল শেখ। এসব কর্মীদের মধ্যে অনেকেই তরুণ ও স্বাস্থ্যবান। বাংলাদেশ সরকারের তথ্য অনুযায়ী, ২০০৮ থেকে ২০২২— এই ১৪ বছরে সৌদিতে কমপক্ষে ১৩ হাজার ৬৮৫ বাংলাদেশি কর্মী মারা গেছে। এর মধ্যে ২০২২ সালেই মৃত্যু হয় এক হাজার ৫০২ জনের। মানে প্রতিদিন গড়ে চারজনের বেশি বাংলাদেশি কর্মীর মৃত্যু হয়েছে।
বাংলাদেশে পুরুষের গড় আয়ু ৭১ বছর। যদিও ২০২২ সালে সৌদিতে যে কর্মীদের মৃত্যু ‘স্বাভাবিক’ নথিবদ্ধ করা হয়েছে, তাদের গড় বয়স ৪৪ বছর। সৌদি কর্তৃপক্ষের দেওয়া নথির ভিত্তিতে বাংলাদেশ কর্তৃপক্ষ ২০২২ সালের জানুয়ারি থেকে অক্টোবর পর্যন্ত মারা যাওয়া বাংলাদেশিদের ৭৬ শতাংশের ‘স্বাভাবিক’ মৃত্যু হয়েছে বলে উল্লেখ করেছে।
দ্য গার্ডিয়ানের অনুসন্ধানে দেখা যায়, বেশিরভাগ ক্ষেত্রে মৃত্যুর কারণ ব্যাখ্যা করা হয়নি। মৃত্যু সনদে কখনো স্বাভাবিক কারণ, কখনো হৃদযন্ত্রের সমস্যা আবার কখনো শ্বাসতন্ত্রজনিত সমস্যার কথা উল্লেখ করা হয়েছে। ফলে মৃত্যুর কারণ বের করতে ময়নাতদন্তের উদ্যোগ নেওয়া হয় না।
যুক্তরাজ্যভিত্তিক মানবাধিকার সংগঠন ফেয়ারস্কয়ার বলছে, ৫০ শতাংশেরও বেশি ক্ষেত্রে উপসাগরীয় দেশগুলোতে মারা যাওয়া প্রবাসী কর্মীদের মৃত্যুর কারণ ব্যাখ্যা করা হয় না। যদিও মানবাধিকার সংগঠনগুলোর মতে, কঠোর পরিশ্রম ও জীবনযাত্রার পরিস্থিতি, শোষণ, চাপ এবং হিটস্ট্রোকও মৃত্যুর হার বেড়ে যাওয়ার কারণ হতে পারে।
অ্যামনেস্টি ইন্টারন্যাশনাল জানিয়েছে, সৌদিতে অভিবাসী কর্মীদের প্রতি নৃশংস আচরণ করা হয়। স্পনসরশিপ ব্যবস্থার কারণেই তারা শোষণ ও নির্যাতনের শিকার হয়। কখনো কখনো তাদের জোর করে অমানবিক পরিবেশে আটকে রাখা হয় কিংবা দেশে ফেরত পাঠানো হয়।
মানবাধিকার সংগঠনগুলো বলছে, কাতার বিশ্বকাপে (২০২২) অবকাঠামো নির্মাণের সঙ্গে জড়িত অভিবাসী শ্রমিকদের মৃত্যু ও নির্যাতনের ঘটনায় ব্যাপক চাপে পড়েছিল ফুটবলের নিয়ন্ত্রক সংস্থা ফিফা। ফলে ২০৩৪ বিশ্বকাপ আয়োজনের আগে সংস্থাটিকে শ্রমিক অধিকারের বিষয়ে আন্তর্জাতিক মান বজায় রাখতে সৌদি কর্তৃপক্ষের প্রতিশ্রুতি নিশ্চিত করতে হবে।
সৌদির মানবসম্পদ ও সামাজিক উন্নয়ন বিষয়ক মন্ত্রণালয় উল্লেখ করেছে, দেশটির উন্নয়নে অভিবাসী কর্মীদের অবদান মূল্যায়ন করে কর্তৃপক্ষ। ২৫ লাখের বেশি বাংলাদেশি কর্মীসহ সব অভিবাসী কর্মীর নিরাপদ কর্মপরিবেশ নিশ্চিত করতে দেশটি প্রতিশ্রুতিবদ্ধ। তারা মানসম্মত নীতিমালা অনুসরণ করে এবং যে ক্ষেত্রে অভিবাসী কর্মীর মরদেহের ময়নাতদন্ত প্রয়োজন হয়, সে ক্ষেত্রে তা করা হয়; পাশাপাশি স্বচ্ছতার সঙ্গে মৃত্যু সনদ দেওয়া হয় বলে দাবি করেছে। এ বিষয়ে বাংলাদেশ কর্তৃপক্ষ ও ফিফার সঙ্গে গার্ডিয়ানের পক্ষ থেকে যোগাযোগ করা হলেও কোনো মন্তব্য পাওয়া যায়নি।
ব্র্যাকের অভিবাসন কর্মসূচির সহযোগী পরিচালক শরিফুল হাসান মনে করেন, ২০৩৪ সালের বিশ্বকাপ ফুটবল সৌদিতে হলে সেখানে বাংলাদেশ থেকে যাওয়া কর্মীর সংখ্যা বেড়ে যাবে। তিনি বলেন, সৌদিতে এখনই বাংলাদেশি কর্মীদের মৃত্যুর হার উদ্বেগজনক। এরপর এটা আশঙ্কাজনক হারে বেড়ে যেতে পারে। তার ভাষ্য, সৌদি কর্তৃপক্ষের নির্দিষ্ট করা স্বাস্থ্যকেন্দ্রে স্বাস্থ্য পরীক্ষার পরই বাংলাদেশি কর্মীরা সেদেশে যেতে পারেন। তাহলে বাংলাদেশি কর্মীরা সেখানে গিয়ে কেন মারা যাচ্ছেন?