ঢাকার লক্কর-ঝক্কর বাস ঠিক করার দায়িত্ব কার?

রাজধানী ঢাকার সড়কে প্রায়ই চোখে পড়ে লক্কর-ঝক্কর বাস। মাঝেমধ্যেই নানা দুর্ঘটনার জন্ম দিয়ে আলোচনায় আসা এই বাসগুলোর বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নেওয়ার দায়িত্ব আসলে কার সে প্রশ্নই এখন উঠছে জোরেশোরে।

এই লক্কর-ঝক্কর বাসের বিষয়ে সড়ক পরিবহন ও সেতুমন্ত্রী ওবায়দুল কাদের গত বুধবার ঢাকা এলিভেটেড এক্সপ্রেসওয়ের একটি র‍্যাম্প খুলে দেওয়া উপলক্ষে এক অনুষ্ঠানে বলেছিলেন, ‘বারবারই বলা হলেও বাসের চেহারা বদলাচ্ছে না। সরকারের গাফিলতির কী আছে? আমি মন্ত্রী কি নিজে গিয়ে বাস রং করব?’

মূলত সরকারের দুটি প্রতিষ্ঠান ঢাকার সড়কে যানবাহন চলাচলের সঙ্গে সরাসরি সম্পৃক্ত। একটি হলো বিআরটিএ আর অন্যটি হল পুলিশের ট্রাফিক বিভাগ।

এর মধ্যে বিআরটিএ ফিটনেস সনদ ও রুট পারমিট দেওয়ার মতো গুরুত্বপূর্ণ কাজটি করে থাকে। একটি বাসের বত্রিশটি বিষয় পর্যবেক্ষণের পর তাদের ফিটনেস সনদ দেওয়ার কথা থাকলেও ভাঙাচোরা বাসগুলো কীভাবে এই সার্টিফিকেট পায়, তা নিয়ে সমালোচনা হচ্ছে বহু বছর ধরেই।

আবার রাস্তায় নামার পর ট্রাফিক বিভাগের সংশ্লিষ্টদের ভাঙাচোরা বা ফিটনেসহীন বাস জব্দ করার কথা থাকলেও সেটি খুব একটা দেখা যায় না। বরং ট্রাফিক পুলিশের সামনে দিয়েই লক্কড়ঝক্কর বাসগুলো রাস্তা আটকে যাত্রী তুলছে, এমন চিত্রও প্রতিনিয়ত দেখা যায়।

ট্রাফিক বিভাগ বলছে অনুপযোগী বা আনফিট যানবাহন রাস্তায় দেখলেই আইন অনুযায়ী ব্যবস্থা নিচ্ছে তারা। কিন্তু তারপরেও এগুলো রাস্তায় কীভাবে, সেটি তাদেরও জানা নেই।

যদিও অভিযোগ আছে মোটরসাইকেল বা প্রাইভেট কার ধরার বিষয়ে পুলিশের মধ্যে যতটা উৎসাহ কাজ করে, ভাঙাচোরা বাসের বিষয়ে তা দেখা যায় না।

সড়ক দুর্ঘটনা ও গণপরিবহন বিষয়ক বিশেষজ্ঞ ও বুয়েটের অধ্যাপক ড. মোহাম্মদ হাদীউজ্জামান বলছেন, লক্কর-ঝক্কর বাসকে ফিটনেস সনদ দিচ্ছে সরকারি প্রতিষ্ঠান বিআরটিএ আর সেই ফিটনেস সনদ নিয়ে এরা রাস্তায় নামছে সংশ্লিষ্ট অন্যদের ‘নানাভাবে ম্যানেজ’ করে।

তিনি বলেন, সড়কে নৈরাজ্য, বিশৃঙ্খলা আর বায়ুদূষণের জন্য এ ভাঙাচোরা বাসগুলোই দায়ী। অনেক বাস এতোই ভাঙাচোরা যে দেখতেই খারাপ লাগে। অথচ এদের বিরুদ্ধে কেউ কোনও ব্যবস্থা নেয় না। এর দায়িত্ব সরকারি প্রতিষ্ঠানগুলোরই, যার মধ্যে বিআরটিএ গুরুত্বপূর্ণ। এটি তো মন্ত্রীরই অধীনে।

অধ্যাপক হাদীউজ্জামান বলছেন, মেট্রো রেল বা এলিভেটেড এক্সপ্রেসওয়ের মতো বড় অবকাঠামোতে সরকার যতটা যত্নশীল ঢাকার সড়ক ব্যবস্থাপনায় তা দেখা যায় না বলেই কেউ আইন মানে না।

তিনি আরও বলেন, এখানে বাস মালিকদের অনুনয় বিনয়ের সুযোগ নেই। সরকার নিয়ম বা আইন করবে এবং সংশ্লিষ্টদের সেটি মেনেই বাস চালাতে হবে। এই বাস দেখার দায়িত্ব সরকারের।

ঢাকা সড়ক পরিবহন মালিক সমিতির কার্যকরী সভাপতি আবুল কালাম বলছেন, ঢাকায় যত বাস চলাচল করে তার মধ্যে মাত্র ১৫-২০ শতাংশের অবস্থা খারাপ।

তিনি বলেন, মন্ত্রী যে কথা বলেছেন সেটা ঠিক। এটা তার একার কাজ না। মালিক, শ্রমিক, সমিতি, যাত্রী, বিআরটিএ ও আইন প্রয়োগকারী সংস্থা সবাই মিলে কাজ না করলে লক্করঝক্কর বাস ও বাসের নৈরাজ্যের অবসান হবে না।

আবুল কালাম বলেন, ‘আইন প্রয়োগের দায়িত্ব যাদের তারা ভাঙা বাস জব্দ করে না কেন? তারা তো জব্দ করে বিআরটিএ-কে জানানোর কথা। বিআরটিএ এগুলো চলতে না দিলে তারা চলে কীভাবে?

বিআরটিএর মুখপাত্র মাহবুব ই রাব্বানী বলেন, বিআরটিএ মোবাইল কোর্টসহ নানা ধরনের অভিযান পরিচালনা করছে এবং প্রতিদিনই আনফিট যানবাহনকে জরিমানা করা হচ্ছে। কিন্তু সবাই মিলে আইনকে শ্রদ্ধা না করলে এ সমস্যার সমাধান কীভাবে হবে।

কিন্তু আনফিট বা লক্কর-ঝক্কর যানবাহন ফিটনেস সনদ পায় কীভাবে, সে প্রশ্নের কোনো সদুত্তর তার কাছে পাওয়া যায়নি।