শেষ মুহূর্তের ভুলে হারের পরিণতি

বাংলাদেশ ০-১ ফিলিস্তিন

এবারও হলো না। আরেকবার শেষ সময়ের অসতর্কতায় বসুন্ধরা কিংস অ্যারেনায় প্রথম হারের তেতো স্বাদ পেতে হলো বাংলাদেশকে। যোগ করা সময়ে ফিলিস্তিনের মাইকেল তেরমানিনির গোলে হৃদয় ভেঙে চূর্ণ হলো স্বাগতিক বাংলাদেশের। বিশ্বকাপ ও এশিয়ান কাপের যৌথ বাছাইয়ের হোম ম্যাচে এই হারে বলতে গেলে শেষ হয়ে গেলো তৃতীয়পর্বে খেলার সম্ভাবনা।

অথচ র‌্যাঙ্কিংয়ে ৮৬ ধাপ এগিয়ে থাকা ফিলিস্তিনকে প্রায় পুরোটা সময় আটকে রেখে বাংলাদেশ ইঙ্গিত দিয়েছিল ১৮ বছর আগের স্মৃতি ফিরিয়ে আনার। ২০০৬ সালে বঙ্গবন্ধু জাতীয় স্টেডিয়ামে ফিলিস্তিনের সঙ্গে প্রথম সাক্ষাৎটা স্মরণীয় হয়ে ছিল ১-১ ড্রয়ে। এরপর খেলা ছয় ম্যাচেই হারতে হয়েছে। সর্বশেষটা ২১ মার্চ কুয়েতের মাটিতে ৫-০ ব্যবধানে। সেই হারের ধাক্কা সামলে যে রকম ফুটবলটা খেলা উচিত ছিল, সেটাই খেলেছে বাংলাদেশ। গত নভেম্বরে কিংস অ্যারেনায় লেবাননকে রুখে দেওয়া দলটি ছকে বাঁধা ফুটবলে চেয়েছিল আরেকবার প্রবল প্রতিপক্ষকে থমকে দিতে। সেটা শেষ পর্যন্ত হয়নি পুরো ম্যাচে ডিফেন্সের একটিমাত্র ভুলে। অথচ প্রথমার্ধে কুয়েতের মতো শেষ মুহূর্তে কোন বিপদ হতে দেয়নি বাংলাদেশ। তবে শক্তিশালী ফিলিস্তিনকে গোল করতে না দেওয়ার স্বস্তি যেমন সঙ্গী হয়েছে, তেমনই গোল করতে না পারার আক্ষেপও পুড়িয়েছে। প্রথমার্ধের শেষ দিকে ফয়সাল আহমেদ ফাহিম দারুণ সুযোগ পেয়েও পারেননি ফিলিস্তিন কিপার রামি হামাদে পরাস্ত করতে।

দুই পরিবর্তন করে এই ম্যাচের একাদশ সাজিয়েছিলেন বাংলাদেশ কোচ হাভিয়ের কাবরেরা। লেফটব্যাক ঈসা ফয়সালকে বেঞ্চে পাঠিয়ে তপু বর্মণের সঙ্গে সেন্টারব্যাক পজিশনে পাঠান শেখ জামালের ডিফেন্ডার শাকিল হোসেনকে। আর কুয়েতে ফ্লপ জুনিয়র সোহেল রানার জায়গায় মাঠে আসেন কার্ড খাঁড়ায় আগের ম্যাচ মিস করা সিনিয়র সোহেল রানা। শুরু থেকেই নিজেদের দুর্গ সামলানোতে মনোযোগী ছিল বাংলাদেশ। এবার আর তেড়েফুঁড়ে আক্রমণে যাওয়ার কৌশল নেয়নি তারা। বরং কাউন্টার অ্যাটাক থেকে সুযোগ তৈরি চেষ্টা করেছে স্বাগতিকেরা। রক্ষণে মনোযোগী হওয়ায় ফিলিস্তিনকে আক্রমণ গোছাতে বেগ পেতে হয়েছে। প্রথমার্ধে সেভাবে গোলের সুযোগ তারা তৈরি করতে পারেনি। ম্যাচের ১২ মিনিটে মহাজন রাশিদের ফ্রি-কিক গোলকিপার মিথুন মারমা ক্লিয়ার করেন। ২২ মিনিটে ফয়সাল আহমেদ ফাহিমের ক্রস ফেলেছিলেন অন্য প্রান্তে তবে সেখানে কেউ ছিলেন না। ম্যাচের ৩০ মিনিটে রাকিবের ব্যাক পাস থেকে মজিবর রহমান জনি বক্সে ঢুকে এলোমেলো হয়ে বল হারান। ম্যাচের ৩৯ মিনিটে মিতুলের কৃতিত্বে বেঁচে যায় বাংলাদেশ। মুসাব বাত্তাতের ফ্রি-কিকে ছোট ডি-বক্সের ওপর থেকে শেহাব কুমবরের হেড ফিস্ট করেন মিতুল। এর দুই মিনিট পর প্রথম কর্নার আদায় করে নিলেও তা থেকে তেমন কিছু করতে পারেনি বাংলাদেশ। তবে ম্যাচের ৪৪ মিনিটে গোলের সেরা সুযোগ পেয়েছিল বাংলাদেশ। জামালের ডিফেন্স চেঁড়া থ্রু পাস পেয়েছিলেন ফাহিম। আগুয়ান ফিলিস্তিন কিপারকে একা পেয়েও তিনি ঠিকঠাক শট নিতে পারেননি। ফিলিস্তিন কিপার দ্রুত বল ক্লিয়ার করেন। কিপার আগেই এসেই ক্লিয়ার করেন। ফলে গোল না পাওয়ার কষ্ট নিয়ে সাজঘরে ফিরেছে বাংলাদেশ। ২১ মার্চ কুয়েতে অবশ্য প্রথমার্ধে শেষ চার মিনিটে দুই গোল হজম করতে হয়েছিল তাদের। সেটা না হওয়ার স্বস্তি নিয়ে তারা খেলতে পারবে দ্বিতীয়ার্ধ।

বিরতি থেকে ফিরেই গোলকিপার মিতুল মারমার মহা ভুলে গোল হজম করতে পারতো বাংলাদেশ। শাকিলের ব্যাকপাস অনেক সময় পেয়েও ক্লিয়ার করতে গিয়ে ওদায় দাবাগের পায়ে তুলে দেন। আগের ম্যাচের হ্যাটট্রিকম্যান অবশ্য ফাঁকা পোস্টে বল রাখতে পারেননি। তার ডান পায়ের প্লেসিং সাইড পোস্ট ঘেসে বাইরে যায়। ম্যাচের ৫২ মিনিটে প্রতি আক্রমণ থেকে বল পেয়ে রাকিব ঠিকঠাক ক্রস করতে পারলে বিপদ ঘটতে পারতো ফিলিস্তিনের। তবে তার ক্রস চলে যায় কিপারের গ্লাভসে। এর ছয় মিনিট পর ক্যামিলিও সালদানার ক্রসে দাবাগের হেড মিতুল ফিস্ট করে বিপদমুক্ত করেন। দ্বিতীয়ার্ধের শুরুর ওই ভুলের প্রায়শ্চিত্ত অবশ্য মিতুল করেছেন বেশ কিছু অসাধারণ সেভে। যার একটি ৬৫ মিনিটে। আলাদিন হাসানের দূর থেকে নেওয়া শট রুখে দেন তিনি। ৭৪ মিনিটে বাত্তাতের লো ক্রস গোলমুখ থেকে ক্লিয়ার করেন বিশ্বনাথ ঘোষ। পরের মুহূর্তে খারোইবের শট শুয়ে পড়ে ঠেকান মিতুল। ম্যাচের ৮৪ মিনিটে মিতুলের চোটের কারণে পোস্টের দায়িত্বে আসেন মেহেদী হাসান শ্রাবন।

আট মিনিট যোগ করা সময়ের শুরুতেই দশজনের দলে পরিণত হয়েছিল ফিলিস্তিন। বদলী ঈসা ফয়সালের আড়াআড়ি পাস ঠিকঠাক সংযোগ ঘটাতে পারেননি রাকিব। শট নিতে গিয়ে পড়ে যান তিনি। তাকে পা ধরে টেনে মাঠের বাইরে পাঠিয়ে প্রথম হলুদ কার্ড দেখেন আমিদ মাহাজনেহ। এ নিয়ে রেফারির সঙ্গে তর্কে জড়িয়ে দ্বিতীয় হলুদ কার্ড দেখে মাঠ ছাড়তে হয় এই ডিফেন্ডারকে। তবে প্রতিপক্ষের দুর্বলতা কাজে লাগাতে পারেনি বাংলাদেশ। উল্টো যোগ করা সময়ের চতুর্থ মিনিটে ক্ষনিকের অসতর্কতায় ভাঙে সব প্রতিরোধ। ডান দিক থেকে বাত্তাতের ক্রস বাতরান ইসলাম হেড করে নামিয়ে দিলে ডিফেন্সের ফাঁক গলে বল পেয়ে যান মাইকেল তেরমানিনি। ঠান্ডা মাথায় বল শ্রাবনের পাশ দিয়ে পৌঁছে দেন জালে। ফলে কিংস অ্যারেনার গ্যালারিতে উপস্থিতি পাঁচ হাজারের বেশি দর্শককে ঘরে ফিরতে হয়ে হারের হতাশা সঙ্গী করে।