পানির অপর নাম জীবন। কিন্তু পানির গুরুত্বপূর্ণ উৎসগুলো নানা রকম দূষণের শিকার হয়ে প্রাণঘাতী হয়ে উঠছে। তেমনি একটি উৎস হচ্ছে মাধবপুর উপজেলার রতনপুর-ছাতিয়াইন সড়কের পাশ ঘেঁষে কাষ্টি নদীতে পড়া ছাতিয়াইন খালটি। একসময়ে এই খালটি দিয়ে বড় বড় নৌযান চললেও এখন দখল-দূষণে মৃতপ্রায়। পাশে পাকা সড়ক থাকায় বন্ধ প্রবাহ। এর ফলে মাছ ধরা কিংবা সেচের মতো কাজ অসম্ভব হয়ে পড়েছে। এর মধ্যে খালের পাড়ে গড়ে ওঠা বেশ কয়েকটি শিল্পকারখানার বর্জ্য হুমকিতে ফেলেছে খালকে। জমাট বাঁধা বর্জ্যরে দুর্গন্ধে খালপাড়ের ১০টি গ্রামের বাসিন্দাদের প্রাণও প্রায় ওষ্ঠাগত। দেশ রূপান্তরের এক প্রতিবেদনে জানা যায়, গ্রামবাসী বর্জ্য খালে না ফেলার অনুরোধ জানিয়ে পাচ্ছেন মামলার হুমকি।
গত শনিবার প্রতিবেদক সরেজমিনে রতনপুর-ছাতিয়াইন সড়কে গিয়ে দেখেছেন, খালে তরল বর্জ্য শুকিয়ে চরে পরিণত হয়েছে। দূর থেকে মনে হয় খালের মধ্যে পিচ ঢালা রাস্তা। স্থানীয় বাসিন্দারা জানান, ৬-৭টি শিল্পকারখানা গড়ে উঠেছে রাস্তা ও খালের পাশে। এর মধ্যে গ্লোরি এগ্রো প্রোডাক্ট লি. নামে একটি কারখানার তরল বর্জ্য এলজিইডির রাস্তার নিচ দিয়ে (পাইপে) পড়ছে খালে। খাদ্যপণ্যসহ বিভিন্ন কাজে ব্যবহারের জন্য ভুট্টা থেকে ‘স্ট্রার্চ’ তৈরি হয় গ্লোরি এগ্রো প্রোডাক্ট কারখানাটিতে। এলাকাবাসীর অভিযোগ, খরচ কমাতে ইটিপি ব্যবহার না করে প্রতিনিয়ত কারখানার দূষিত তরল বর্জ্য ফেলে খালটিকে দূষিত করছেন কারখানা কর্তৃপক্ষ। স্থানীয় এক পরিবেশকর্মী দেশ রূপান্তরকে বলেন, মাধবপুরে তিন ফসলি জমির ওপর বেশ কিছু শিল্প কারখানা গড়ে ওঠায় আশপাশের কয়েকটি গ্রামের প্রাকৃতিক পরিবেশ নষ্ট হয়ে যাচ্ছে। গ্লোরির তরল বর্জ্যরে দুর্গন্ধে রাস্তায় চলাফেরাসহ বাড়িঘরে বসবাস এখন কঠিন। প্রায় ১০টি গ্রামের অসংখ্য নরনারী ও শিশুরা চর্মরোগ, শ্বাসকষ্টসহ নানা রোগে ভুগছেন।
কারখানার বিষাক্ত বর্জ্যরে কারণে খাল ও নদীতে মাছ নেই। শুষ্ক মৌসুমে খালের নষ্ট পানি জমিতে ব্যবহার করা যাচ্ছে না। স্থানীয়রা জানিয়েছেন শিল্পের বর্জ্যরে কারণে কীভাবে গ্রাম, খাল-নদী ও জমিজমা বিনষ্ট হচ্ছে তা তারা হাড়ে হাড়ে টের পাচ্ছেন। তবে, এর প্রতিবাদ করতে গিয়ে উলটো হুমকির সম্মুখীন হচ্ছেন বলে জানিয়েছেন এলাকাবাসী। এমন এক স্থানীয় আওয়ামী লীগ নেতা জানান, কোম্পানিটিকে দূষিত তরল বর্জ্য খালে না ফেলার জন্য অনুরোধ জানানোয় উলটো তারা মামলা-মোকদ্দমা দিয়ে জেলে পাঠানোর ভয় দেখাচ্ছেন। এই বিষয়ে তারা ঈদের পর কর্মসূচি দেবেন বলেও জানিয়েছেন। গ্লোরি এগ্রো প্রোডাক্ট লিমিটেডের পরিচালক সারোয়ার আহমেদ খালের পানি নষ্টের পেছনে তারা দায়ী নন দাবি করে বলেন, একটি গোষ্ঠী শত্রুতাবশত কোম্পানির পেছনে লেগেছে। তিনি দাবি করেন, তার কোম্পানি তিন মাস পর পর বুয়েট থেকে পানি পরীক্ষা করেন এবং তাদের ইটিপি সব সময় চালু থাকে। তিনি আরও দাবি করেন, যেসব দখলদারের কারণে প্রবাহে প্রতিবন্ধকতা সৃষ্টি হচ্ছে তারাই কোম্পানিটিকে দোষী হিসেবে দেখাতে চাচ্ছেন। তাদের বিরুদ্ধে আইনগত ব্যবস্থা নেওয়ার কথাও জানিয়েছেন তিনি।
মাধবপুর উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা জানিয়েছেন পরিবেশ অধিদপ্তরকে এ বিষয়ে অবগত করা হয়েছে। এটি এখন তাদের বিচারাধীন। পরিবেশ অধিদপ্তর হবিগঞ্জ অফিসের সহকারী পরিচালক আক্তারুজ্জামান বলেন, পরীক্ষায় পানি দূষণের আলামত পাওয়া গেছে। ব্যবস্থা গ্রহণের জন্য তদন্ত রিপোর্ট সিলেট বিভাগীয় কার্যালয়ে পাঠানো হয়েছে। দোষী যেই হোক, ছাতিয়াইন খাল এবং এর আশপাশের মানুষের সুরক্ষার জন্য অতিসত্বর দূষণ বন্ধ এবং খালটির প্রবাহ ফেরানো জরুরি।