সম্ভাবনাময় ক্রিকেটার থেকে এলিট আম্পায়ার

১৯৯৪ সালে কেনিয়ায় আইসিসি ট্রফিতে ফারুক আহমেদের নেতৃত্বে অংশ নেয় বাংলাদেশও। সেই দলে স্পিন বিভাগের দায়িত্ব সামলাতেন এনামুল হক মনি। তার সঙ্গে দলে ছিলেন আরও একজন বাঁহাতি স্পিনার। ক’বছর আগে স্কুলের গণ্ডি পেরোনো শরফুদ্দৌলা ইবনে শহীদ, দেশের ক্রিকেটাঙ্গনে যিনি বহুল পরিচিত সৈকত নামে। 

ক্রিকেটার সৈকতের নামডাক খুব কম। তবে আম্পায়ার সৈকতের পরিচিতির মাত্রা পুরো উল্টো। বাংলাদেশের যে কজন আন্তর্জাতিক আম্পায়ার রয়েছেন তাদের মধ্যে বর্তমান সময়ে সবচেয়ে জনপ্রিয় মুখ তিনি। ২০১০ সাল থেকে সামলে আসছেন আন্তর্জাতিক ম্যাচে আম্পায়ারিংয়ের কঠিন দায়িত্ব। ব্যাকপেইন ক্রিকেট খেলার সুযোগ কেড়ে নিলে নাদির শাহ, এনামুল হক মনিদের ধারাবাহিকতায় সৈকত আসেন খেলা পরিচালনার দায়িত্বে। নিজের নিষ্ঠা ও পরিশ্রমের ফলস্বরূপ সেই সৈকত আম্পায়ারিং জগতে বাংলাদেশকে নিয়ে গেলেন অনন্য উচ্চতায়। বিশ্বকাপের ম্যাচ পরিচালনা করা প্রথম আম্পায়ার হওয়ার পর এবার বিশ্বময় আম্পায়ারদের এলিট প্যানেলে জায়গা করে নিয়ে গড়েছেন ইতিহাস। বাংলাদেশের প্রথম আম্পায়ার হিসেবে এ গৌরবময় কীর্তি গড়েন সৈকত। গতকাল যার ঘোষণা দিয়েছে বিশ্ব ক্রিকেটের সর্বোচ্চ নিয়ন্ত্রক সংস্থাটি।

এলিট প্যানেলে অন্তর্ভুক্ত হওয়ার পর প্রতিক্রিয়ায় সৈকত জানান, ‘এ দায়িত্ব পাওয়া গর্বের। এটা আরও বিশেষ হয়ে গিয়েছে কেননা আমার দেশ থেকে আমিই প্রথম। সামনের নতুন চ্যালেঞ্জগুলো নিতে আমি প্রস্তুত। এ বিশেষ সময়ে আইসিসি, বিসিবি, আমার সহকর্মী এবং পরিবার-স্বজন-বন্ধুদের প্রতি আমার ধন্যবাদ ও কৃতজ্ঞতা।’

এতদিন সৈকত ছিলেন আইসিসির আন্তর্জাতিক আম্পায়ার প্যানেলে। এখানে বাংলাদেশের আরও আছেন মাসুদুর রহমান মুকুল, তানভির আহমেদ এবং গাজী সোহেল। নির্বাচক কমিটির বার্ষিক মূল্যায়ন শেষে সৈকতের পদোন্নতির ব্যাপারে সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়। ২০০৬ সাল থেকে আন্তর্জাতিক প্যানেলে থাকলেও ২০১০ সালের জানুয়ারিতে বাংলাদেশ-শ্রীলঙ্কা ম্যাচ দিয়ে আন্তর্জাতিক আম্পায়ারিংয়ের অভিষেক হয় সৈকতের। সবশেষ অস্ট্রেলিয়ায় দ্বিতীয় বাংলাদেশি আম্পায়ার হিসেবে ব্রিজবেন দিবা-রাত্রির টেস্টে অনফিল্ড আম্পায়ার ছিলেন সৈকত। এ পর্যন্ত পুরুষদের ক্রিকেটে ১০টি টেস্ট, ৬৩টি ওয়ানডে, ৪৪টি টি-টোয়েন্টি ম্যাচে অনফিল্ড আম্পায়ারিং করেছেন তিনি। নারীদের ক্রিকেটে ১৩টি ওয়ানডে ও ২৮টি টি-টোয়েন্টি ম্যাচেও আম্পায়ার ছিলেন সৈকত। নারীদের ২০১৭, ২০১৮ ও ২০২১ বিশ্বকাপসহ পুরুষদের সবশেষ ২০২৩ বিশ্বকাপেও দায়িত্ব পালন করেন তিনি।

ম্যাচ পরিচালনার সময় সৈকত

১৯৮৯-৯০ মৌসুমে রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয় স্কুলের ছাত্র থাকাবস্থায় সূর্যতরুণের হয়ে ঢাকা প্রিমিয়ার ডিভিশন ক্রিকেট লিগে খেলেন। সাফ গেমসের বাংলাদেশ দলে সুযোগ পান ১৯৯২ সালে। ছিলেন বাংলাদেশ অনূর্ধ্ব-১৯ দলের অধিনায়ক। ১৯৯৪ আইসিসি ট্রফির দ্বিতীয় রাউন্ডের তিন ম্যাচে ৬টি উইকেট নেন সৈকত। সেই দলটির অধিনায়ক ও বাংলাদেশ জাতীয় দলের সাবেক প্রধান নির্বাচক ফারুক আহমেদ সৈকতের এ কীর্তিতে ভীষণ গর্বিত। দেশ রূপান্তরকে তিনি বলেন, ‘আমরা খুব গর্বিত। টেস্ট স্ট্যাটাস পাওয়ার এতদিন পর এলিট প্যানেলে প্রথম আম্পায়ার পেলাম আমরা। সংখ্যাটা বেশি হতে পারত। তবে নিজের মেধা দিয়ে সৈকত তা করে দেখিয়েছেন। এটা আমাদের জন্য খুব আনন্দের সংবাদ।’

ব্যাকপেইন সৈকতের খেলোয়াড়ি ক্যারিয়ার লম্বা হতে দেয়নি। ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের আন্তর্জাতিক সম্পর্ক বিভাগ থেকে পড়াশোনা শেষ করা সৈকত নিজের নিষ্ঠায় প্রমাণ করলেন- কোনো কিছুই অসম্ভব নয়। ফারুক আহমেদের আকাঙ্খা বিসিবি আরও সচেতন হোক এ বিষয়ে। মাঠের খেলায় সাকিবদের মতো খেলা পরিচালনাতেও ভবিষ্যৎ প্রজন্মের সামনে আলোকবর্তিকা হয়ে থাকবেন সৈকত।