ইয়ারজান বেগম। সারা দেশে নারী ক্রীড়াঙ্গনে আলোচিত একটি নাম। নেপালে অনুষ্ঠিত সাফ অনূর্ধ্ব-১৬ ফুটবল চ্যাম্পিয়নশিপের ফাইনালে ভারতের বিপক্ষে টাইব্রেকারে বিজয় ছিনিয়ে আনার মূল কারিগর এই ইয়ারজান বেগম। তার বাড়ি পঞ্চগড় সদর উপজেলার হাড়িভাসা ইউনিয়নের খোপড়াবান্দি গ্রামে। ভাঙাচোড়া ঝুপরি ঘরে বাবা মায়ের সাথে থাকেন ইয়ারজান বেগম।
ক্ষুদে এই ফুটবল কন্যার সাফল্যের খবরে তার বাড়িতে উৎসুক মানুষের ভিড় বাড়তে থাকে। তার পরিবারের করুণ অবস্থা দেখে অনেকেই সাধ্যমত তাদের সহযোগিতাও করেন। পঞ্চগড়ের জেলা প্রশাসক মো. জহুরুল ইসলাম ইয়ারজানের বাড়ি পরিদর্শনের সময় নিজ উদ্যোগে একটি বাড়ি তৈরি করে দেয়ার ঘোষণা দিয়েছিলেন। জেলা প্রশাসকের নির্দেশে ইয়ারজানের বাড়িতে শুরু হয়েছে সেমিপাকা ঘর নির্মাণ কাজ। দুই কক্ষ বিশিষ্ট ওই ঘরে থাকবে টয়লেট ও সুপেয় পানির ব্যবস্থাসহ বিদ্যুৎ সুবিধা। এতে খরচ হবে প্রায় ৪ লাখ টাকা। আগামী এক মাসের মধ্যে ঘর নির্মাণের কাজ শেষ হবে বলে জানিয়েছেন সদর উপজেলা নির্বাহী অফিসার মো. জাকির হোসেন।
ইয়ারজানের বাড়িতে গিয়ে জানা যায়, তার বাবা আব্দুর রাজ্জাক শ্বাসকষ্টের রোগী। চলাফেরা করতে পারলেও কোনো কাজ করতে পারেন না তিনি। মা রেনু বেগমই সংসারের একমাত্র উপার্জনক্ষম ব্যক্তি। অন্যের বাড়ি এবং ক্ষেত খামারে কাজ করে যা আয় করেন তা দিয়েই চলে দুই মেয়েসহ চার জনের সংসার।
ইয়ারজান বেগমের অসাধারণ নৈপুণ্যে ভারতের বিপক্ষে ৩-২ গোলে জয় পায় বাংলাদেশ। এই জয়ের পর থেকেই দেশের ফুটবল প্রেমীদের সাথে আনন্দে ভাসছে ইয়ারজানের পরিবারসহ এলাকার মানুষ। তার পারিবারিক অবস্থা তুলে ধরে বিভিন্ন গণমাধ্যমে সংবাদ প্রকাশের পর অনেকে আসছেন তার পরিবারের বাস্তব অবস্থা দেখতে। চেষ্টা করছেন সাধ্যমত সহযোগিতা করার। ইতোমধ্যে স্থানীয় সংসদ সদস্য, জেলা প্রশাসন, সদর উপজেলা প্রশাসন, র্যাব—১৩ এর পক্ষ থেকে আর্থিক সহায়তা দেয়া হয়েছে। তা দিয়েই চলছে তাদের সংসার।
ইয়ারজানের বাবা আব্দুর রাজ্জাক বলেন, আমি শ্বাসকষ্টের রোগী। আমি দুইবার টিবির চিকিৎসা নিয়েছি। কোনো কাজ করতে পারি না। ইয়ারজানের মায়ের সামান্য আয় দিয়েই আমাদের খেয়ে না খেয়ে থাকতে হয়। সরকারি কোনো সাহায্য সহযোগিতাও পাইনি। মেয়েকে ভালো কিছু খাওয়াতে পারিনি। আর আমার ডানপিটে সেই মেয়েই কপাল খুলে দিয়েছে।
মা রেনু বেগম বলেন, খেলার জন্য আমার মেয়ে ইয়ারজানকে কত মারপিট করেছি। অনেক বকাবকি করতাম, ভয় দেখাতাম। খেলতে যেতে নিষেধ করতাম। কিন্তু সে লুকিয়ে চলে যেত খেলতে। পরে যখন বুঝলাম সে ভালো খেলতেছে, তখন আর গালি দিতাম না। এখন সে বিদেশের মাটিতেও খেলে ভালো করেছে। আমরা খুব খুশি হয়েছি। আমাদের মতো এলাকার সবাই খুশি হয়েছি। ডিসি স্যার আমাদের বাড়ি করে দিচ্ছে। আমার মেয়ে এখন ঢাকায়। সে যখন বাড়ি আসবে, দেখবে আমাদের আগের বাড়ি আর নাই। আমরা বসবাস করছি পাকা বাড়িতে। সে যে কি আনন্দ পাবে বলে বোঝাতে পারবো না।
হাড়িভাসা বালিকা উচ্চ বিদ্যালয়ের প্রধান শিক্ষক শামুস কিবরিয়া প্রধান বলেন, ইয়ারজান একদিনে গড়ে উঠেনি। তার নেতৃত্বে আমাদের স্কুল পরপর তিন বার স্কুল পর্যায়ে ফুটবলে জেলা চ্যাম্পিয়ন হয়েছিল। শুধু ফুটবল নয় হ্যান্ডবল ও কাবাডিও ভাল খেলে সে। আমাদের স্কুলে তার মতো একজন মেধাবী খেলোয়ারকে পেয়ে আমরা গর্বিত।
পঞ্চগড় জনস্বাস্থ্য প্রকৌশল অধিদপ্তরের নিবার্হী প্রকৌশলী মিজানুর রহমান জানান, জনস্বাস্থ্য প্রকৌশল অধিদপ্তরের উদ্যোগে ইয়ারজানের বাড়িতে নিরাপদ পানি সরবরাহ ও স্যানিটেশন ব্যবস্থা কাজ চলছে।
সদর উপজেলা নির্বাহী অফিসার মো. জাকির হোসেন বলেন, জেলা প্রশাসক মো. জহুরুল ইসলামের উদ্যোগ ও নির্দেশনা অনুযায়ী ইয়ারজানের পরিবারের জন্য দুই কক্ষ বিশিষ্ট একটি বাড়ি নির্মাণের কাজ চলছে। সেমিপাকা ঘরের পাশাপাশি থাকছে স্বাস্থ্যসম্মত টয়লেট ও সুপেয় পানির ব্যবস্থা। খুব দ্রুত সময়ের মধ্যে ঘরের কাজ শেষ করতে কাজ করা হচ্ছে। সেমিপাকা ঘর হলেও তা করা হচ্ছে ফাউন্ডেশন দিয়ে। পরবর্তীতে তারা ইচ্ছে করলে ঘরের ছাদ এমনকি দুইতলার কাজও করতে পারবে।
জেলা প্রশাসক মো. জহুরুল ইসলাম বলেন, ইয়ারজান সম্পর্কে আগে জানতাম না। নেপালে অনুষ্ঠিত সাফ অনূর্ধ্ব-১৬ ফুটবল চ্যাম্পিয়নশিপের ফাইনালে ভারতের বিপক্ষে টাইব্রেকারে বিজয় ছিনিয়ে আনার মুল কারিগর এই ইয়ারজান। গণমাধ্যমে প্রকাশিত খবরে জানতে পেরে ছুটে যাই ইয়ারজানের বাড়িতে। বাড়ির অবস্থা দেখে তাৎক্ষণিক একটি থাকার মতো বাড়ি নির্মাণ করে দেওয়ার ঘোষণা দেই। সে ঘোষণা অনুযায়ী বাড়ির কাজ চলছে। আশা করছি ঈদের আগেই নিমার্ণ কাজ শেষ হবে। ইয়ারজান ফিরে এসে পাকা বাড়িতেই উঠতে পারবে।