কথা-কাজে মিল থাকতে হবে

এবারের স্বাধীনতা দিবস অনুষ্ঠানে ‘জনশূন্য মাঠে অতিথিদের বক্তব্য’ শিরোনামে ‘দেশ রূপান্তরে’ ছবিসহ একটি খবর প্রকাশিত হয়েছে। এমন একটা খবর আর ছবি যে কারও দৃষ্টি কাড়বে, সেটাই স্বাভাবিক। এই ছবি এরই মধ্যে নেটিজেনদের মাঝে ব্যাপক আলোচনা ও প্রতিক্রিয়া তৈরি করেছে। ছবিটি দেখে আমিও অবাক বিস্ময়ে কিছু সময় তাকিয়ে ছিলাম। কীভাবে সম্ভব, দেশের জাতীয় দিবসে সরকারিভাবে আয়োজিত একটা অনুষ্ঠানে কোনো সাধারণ মানুষ আসেনি! এমনকি বিদ্যালয়ের শিক্ষার্থীরাও না।

চোখের সামনে হঠাৎ ভেসে ওঠে এখন থেকে প্রায় ৩০ বছর আগের স্মৃতি। ৯০ দশকের মাঝামাঝি সময়। যখন মাধ্যমিক স্কুলে পড়ি। তখন একেকটা ২৬ মার্চ আর ১৬ ডিসেম্বর ছিল আমাদের সারা বছরের অপেক্ষায় থাকার দিন। এসব দিন এলে স্কুলে দলবেঁধে জাতীয় সংগীত, খেলাধুলা আর বিকেল থেকে রাত অবধি সাংস্কৃতিক অনুষ্ঠানসহ আরও কত কী আয়োজন ছিল। এসব অনুষ্ঠানে শুধু স্কুলশিক্ষার্থীরাই নয়, এলাকার মানুষের উপস্থিতিতে মাঠে জায়গা দেওয়া মুশকিল হয়ে যেত। সেখানে কে কোন দলের রাজনীতি করে, সেটা কখনো মুখ্য ছিল না। সাধারণ মানুষের কাছে এসব দিন ছিল আনন্দের উপলক্ষ। যারা আমার বয়সী বা তার চেয়ে আরও ১০ বছর কম-বেশি তাদেরও মনের মধ্যে স্কুলজীবনের এমন স্মৃতি ভেসে ওঠা স্বাভাবিক। আগে তো এমনটাই ছিল। এসব দিন ঘিরে কত যে বাহারি আয়োজন থাকত!

মাত্র ২০-৩০ বছরের ব্যবধানে দেশে এমন কী ঘটল যে, স্বাধীনতা দিবসের অনুষ্ঠানে এমন চিত্র দেখা দিল! কেউ কেউ হয়তো বলবেন, এটা একটা জেলার অনুষ্ঠান, এই দৃশ্য দিয়ে সারা দেশের প্রকৃত অবস্থা বিবেচনার সুযোগ নেই। কিন্তু একজন সংবাদকর্মী হিসেবে যতটুকু খোঁজখবর রাখি, তাতে সারা দেশের চিত্র এমন না হলেও খুব পজিটিভ না। এমনকি আমার নিজ জেলার আয়োজনগুলোর চিত্রও হতাশাজনক। এর আগে একই ধরনের একটি ঘটনা ঘটেছিল মানিকগঞ্জের একটি অনুষ্ঠানে। তার মানে কী, মানুষের মধ্যে স্বাধীনতা বা মুক্তিযুদ্ধের চেতনা কমে যাচ্ছে? নাকি সমস্যা অন্যখানে!

সম্ভবত এখানে কয়েকটি বিষয় কাজ করছে। আমার মনে হয়, প্রথম কারণটা হলো রাজনৈতিক। এখন যে অনুষ্ঠানগুলো হয়, সেখানে সহাবস্থানের সংস্কৃতি নেই। অথাৎ এ ধরনের অনুষ্ঠাগুলোতে এখন আর সব দলের কর্মী-সমর্থকদের অংশগ্রহণ থাকে না। এমনকি সাধারণ মানুষও যেহেতু নানা ধরনের রাজনৈতিক মতাদর্শ ধারণ করে, ফলে এর প্রভাব পড়ে আয়োজনের ক্ষেত্রে। দেখা যায়, যে দল যখন ক্ষমতায় এ ধরনের অনুষ্ঠানে তাদের একটা প্রভাব কাজ করে। তাই অন্য দলের কেউ আর আসতে চায় না। আগে এসব অনুষ্ঠানে সব দলেরই গণ্যমান্য মানুষদের দাওয়াত করা হতো। ফলে তাদের কর্মী-সমর্থকরাও আসতেন। এসব অনুষ্ঠানে মানুষ আসবে না, এমন চিন্তা কখনই ছিল না। এখন যে দল ক্ষমতায় থাকে তারা মনে করে, এসব দিবস বুঝি শুধু তাদেরই। এর ফলে সম্মান রক্ষার্থে কিংবা অভিমানে অন্য দলের মানুষ খুব বেশি আসতে চায় না। ফলে অনুষ্ঠানগুলো আর সর্বজনীন হচ্ছে না।

এ ক্ষেত্রে প্রশ্ন আসে, বর্তমানে তো স্বাধীনতা ও মুক্তিযুদ্ধের পক্ষের শক্তি এককভাবে ক্ষমতায়। ১৬ বছর তারা টানা দেশ চালাচ্ছে। মুক্তিযুদ্ধের চেতনাকে মানুষের মাঝে আরও দৃঢ় করতে সরকার অনেক রকম চেষ্টা চালাচ্ছে। সেখানে স্বাধীনতা দিবসের অনুষ্ঠানে এমন চিত্র কেন হবে? এখানেও আছে বিভক্তির রাজনীতি। এটা মানি আর না মানি, বর্তমানে বেশিরভাগ জেলায় আওয়ামী লীগের রাজনীতিতে কমপক্ষে তিন-চারটি গ্রুপ। গত নির্বাচনে সেই গ্রুপিং আরো প্রকাশ্য রূপ নিয়েছে। প্রত্যেক এমপি প্রার্থীর একটা কোর গ্রুপ তৈরি হয়েছে এবং সেটা এখনো বিদ্যমান। ফলে কোথাও কোনো আয়োজন হলে যিনি ‘প্রধান অতিথি’ থাকেন বা আয়োজক থাকেন, তার কর্মী-সমর্থকরা এলেও অন্যরা আসেন না। ফলে দলীয় সব নেতাকর্মীকেও আর এসব অনুষ্ঠানে পাওয়া যাচ্ছে না। আবার অনেক সময়, বিভিন্ন গ্রুপের মধ্যে মারামারির ঘটনা ঘটে। এ কারণে নানারকম ভয়-শঙ্কা এড়াতে সাধারণ মানুষও অনুষ্ঠানে না যাওয়াকেই নিরাপদ মনে করেন। তাই তাদের অংশগ্রহণও কমে গেছে এসব অনুষ্ঠানে। অতীতে এ ধরনের অনুষ্ঠানে অসংখ্য হট্টগোল, হাঙ্গামার কথা আমরা জানি।

এবার আসা যাক, সরকারি আয়োজনগুলোতে। বিশেষ করে জেলা প্রশাসন ও উপজেলা প্রশাসন যেসব আয়োজন করে, সেখানে কেন সাধারণ মানুষের অংশগ্রহণ কমে গেল? স্কুলজীবনে দেখেছি, প্রতিষ্ঠানগুলো স্বাধীনতা দিবস বা বিজয় দিবসের অনুষ্ঠানের আয়োজন করত। সেখানে দাওয়াত করা হতো জেলা প্রশাসক কিংবা ইউএনওকে। তারাও আনন্দের সঙ্গে এসব অনুষ্ঠানে অংশ নিতেন। একেকটা আয়োজন হতো জমকালোভাবে। এখন দেখা যাচ্ছে, রাষ্ট্রীয় আয়োজন করে জেলা প্রশাসন ও উপজেলা প্রশাসন। অভিযোগ আছে, এসব আয়োজন করতে গিয়ে তারা এলআর ফান্ড নামক বিধির সুযোগ নিয়ে রীতিমতো চাঁদা তুলছে স্থানীয় ব্যবসায়ীসহ বিভিন্ন ব্যক্তি ও প্রতিষ্ঠানের কাছ থেকে। এ নিয়ে সম্প্রতি বেশ কিছু গণমাধ্যম একাধিক সংবাদও প্রকাশ করেছে। ফলে কেউ বাড়তি সুযোগ পাওয়ার আশায়, প্রশাসনের সঙ্গে ভালো সম্পর্ক তৈরিতে নিয়মিত চাঁদা দেন বটে কিন্তু মন থেকে বিষয়টা মানতে পারেন না। ফলে স্থানীয় ব্যবসায়ী কমিউনিটির মাঝে এ বিষয়ে প্রশাসনের প্রতি একটা চাপা ক্ষোভ থেকে যায়, যার প্রভাব পড়ে কোনো অনুষ্ঠান আয়োজন করলে।

সাধারণ মানুষও এখন এসব অনুষ্ঠানে আসতে চায় না। কারণ নানা কারণে প্রশাসনের প্রতি মানুষের বিশ্বাস ও শ্রদ্ধার জায়গাটা কমে গেছে। কেন কমেছে তা নিয়ে প্রশাসনের উচিত গবেষণা করা। কারণগুলো কমবেশি সবাই জানে। আবার বিভিন্ন জেলায় প্রশাসন ও রাজনীতিকদের মাঝে একটা টানাপড়েন ও দূরত্ব তৈরি হয়েছে। যার প্রভাব পড়ছে এসব আয়োজনে। অনেক ক্ষেত্রেই দেখা যায়, বড় কোনো আয়োজনে রাজনীতিক আর প্রশাসক একে অপরকে এড়িয়ে চলতে পছন্দ করে।

নয় মাসের রক্তক্ষয়ী সংগ্রামে ৩০ লাখ মানুষের রক্তস্রোতে যে দেশের জন্ম, সে দেশের মানুষের মাঝে মুক্তিযুদ্ধের চেতনা কমে যাবে, তা স্বাভাবিক বিষয় নয়। সাধারণ মানুষ কেন এসব অনুষ্ঠানবিমুখ হচ্ছে, তা নিয়ে ভাবার সময় এসেছে। ঠান্ডা মাথায় ভাবার সময় এসেছে, এই দায়টা কার। যে আদর্শের জন্য এত লড়াই, এত সংগ্রাম, এত রক্ত সেই স্বাধীনতা বোধ কেন সব শ্রেণির মানুষের মাঝে যথার্থভাবে তৈরি হচ্ছে না? কেন নতুন প্রজন্ম এসব বিষয় নিয়ে নানারকম নেতিবাচক চিন্তা করছে! বিষয়টি কিন্তু গুরুত্ব সহকারে ভাবার সময় হয়েছে।

বঙ্গবন্ধু আমাদের স্বাধীন দেশ ও একটি আদর্শ উপহার দিয়ে গেছেন। কিন্তু সেই আদর্শকে যারা বহন করে নিয়ে যাবেন, কিংবা যাদের দেখে সেই আদর্শে মানুষ উদ্বুদ্ধ হবে, আমরা কি তেমন নেতা বা নেতৃত্ব পাচ্ছি? মানুষ প্রতিদিন নানা প্রয়োজনে যেসব নেতাদের কাছে যাচ্ছে, তারা দেখছে কথা আর কাজে মিল নেই। মানুষ প্রশাসনের যেসব কর্তাদের কাছে যাচ্ছে, তারা তাকে সঠিক সেবা দেওয়া দূরে থাক, তাদের সঙ্গে প্রভুর মতো আচরণ করেন! দিনের পর দিন, মাসের পর মাস, বছরের পর বছর মানুষ এসব দেখে এখন ক্লান্ত। তাই ‘স্বাধীনতা দিবস’ বা ‘বিজয় দিবস’ আলোচনায় তাদের সুন্দর সুন্দর কথা আর বাণীর কোনো মানে খুঁজে পান না। কর্তারা যা বলেন, মানুষ তার বাস্তবায়ন পায় না। হতাশ মানুষ এসব আলোচনায় এখন কি আগ্রহ হারিয়ে ফেলছে?

মুক্তিযুদ্ধের চেতনায় দেশের মানুষকে উদ্বুদ্ধ করতে হলে, নেতাদের কথা আর কাজে মিল থাকতে হবে। প্রশাসনের কর্তাদের মানুষকে ‘মানুষ’ ভাবার মানসিকতা তৈরি করতে হবে। মানুষ যেন একজন রাজনীতিবিদ বা প্রশাসনের ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তাকে মন থেকে সত্যিকার অর্থে সম্মান করতে পারেন, সেই পরিবেশ তৈরি করতে হবে। তবেই মুক্তিযুদ্ধের চেতনার আলোয় উদ্ভাসিত হবে সমাজ, প্রিয় দেশ। সুদীর্ঘ সংগ্রামে রক্তধোয়া এ দেশের জন্ম ইতিহাস এভাবে মলিন হতে পারে না।

লেখক: বিশেষ প্রতিনিধি, জিটিভি

sayeedn17@gmail.com