গাজা যুদ্ধের ভেতর দিয়ে হেঁটে গেছেন এক নারী। মিডল ইস্ট আই-কে দেওয়া তার বিবরণ তুলে ধরেছেন সালাহ উদ্দিন শুভ্র
ফিলিস্তিনের গাজার ওপর গত বছরের ৭ অক্টোবর থেকে শুরু হওয়া ইসরায়েলি নিপীড়ন এখনো চলছে। এমনকি যুদ্ধবিরতি উপেক্ষা করেও গাজায় হামলা চালাচ্ছে ইসরায়েল। এ পর্যন্ত প্রায় ৩২ হাজার ফিলিস্তিনি নিহত হয়েছে। বীভৎস এ নিপীড়নের প্রত্যক্ষদর্শী মায়ার আল-জাখবির এবং তার পরিবার। মিডল ইস্ট আই কথা বলেছে তার সঙ্গে। জাখবির বিবরণ দিয়েছেন কীভাবে তার পরিবারের অন্য সদস্যদের হত্যা করা হয়েছে, উচ্ছেদ করা হয়েছে।
গাজায় ইসরায়েলি আগ্রাসন শুরু হওয়ার পর, আল-জাখবির এবং তার পরিবার গাজার উত্তরে বেইট লাহিয়ায় তাদের বাড়ি ছেড়ে যেতে বাধ্য হয়। দক্ষিণে জাবালিয়ার একটি পাড়া আল-কাসাইবে আশ্রয় নেয়। ইসরায়েলি সৈন্যরা ৮ নভেম্বর জাবালিয়ায় স্থল অভিযান শুরু করে। হামাস যোদ্ধারা সেখানে তীব্র প্রতিরোধ গড়ে তোলে। যদিও ১১ ডিসেম্বর ইসরায়েলি সেনাবাহিনী আল-কাসাইব অবরোধ করে আল-জাখবির এবং তার পরিবারের শিশু ও বয়স্ক ব্যক্তিসহ প্রায় ২০ ফিলিস্তিনি যে বাড়িতে ছিল সেখানে আক্রমণ করে।
ওই আক্রমণের পর থেকে শুধু ধ্বংস-হত্যা-রক্ত বহন করে চলেছেন মায়ার আল-জাখবির।
অকথ্য নির্যাতন
১১ ডিসেম্বর ওই হামলার বিষয়ে মায়ার বলেন, এটা ছিল অকথ্য। তারা আমাদের নির্মমভাবে মারধর করে, অত্যাচার করে, আমাদের দিকে গ্যাস গ্রেনেড নিক্ষেপ করে, আমাদের টাকা চুরি করেছে এবং মানব ঢাল হিসেবে ব্যবহার করে। সকাল ৯টা থেকে সন্ধ্যা পর্যন্ত এসব অত্যাচার চালায় তারা।
আল-জাখবির বয়স মাত্র ২০ বছর। এত অল্প বয়সে এ নারী পৃথিবীর জঘন্যতম এক নিপীড়নের শিকার হয়। সেদিন রাতেই তার চোখের সামনে ইসরায়েলি সেনারা ভাইবোনদের মারধর ও অপমান করে। তার চাচাকে হাতকড়া পরিয়ে বাকি সদস্যদের সামনে ছুরি দিয়ে আঘাত করে। তিনি বলেন, আমরা কাঁদছিলাম এবং তাকে ছেড়ে দেওয়ার জন্য তাদের অনুরোধ করছিলাম। তারা ছাড়েনি। বরং আমাদের বাড়ি থেকে বের হতে নিষেধ করে। বের হলেই গুলি করবে বলে জানায়। একই দিনে পাশের জাবালিয়া শরণার্থী শিবিরে ইসরায়েলি বিমান হামলায় আলজাজিরার সাংবাদিকের ৯০ বছর বয়সী বাবা নিহত হন।
তবে ইসরায়েলি সৈন্যরা নিষেধ করলেও আল-জাখবিরের মা সাইদা আল-মালফোহ পরদিন সকালে বাড়ি ছেড়ে যেতে চান। কারণ তার ছেলেরা জিম্মি ইসরায়েলি সেনাদের হাতে। ভোর ৩টায় বৃষ্টি নামে, আল-জাখবিরের ভাইয়েরা বাড়ি ফিরে আসেন। তাদের প্রচণ্ড মারধর করা হয়েছিল এবং তাদের শরীরে কাপড় ছিল না। মা সাইদা ছেলেদের শরীরে ক্ষতচিহ্নগুলোতে হাত বুলাচ্ছিলেন। তার মনে এই স্বস্তি ছিল যে তারা বেঁচে আছে এবং ফিরে এসেছে।
শেষ ঘুম
মায়ার জানান, ভাইরা বেঁচে ফিরে এলেও ১১ ডিসেম্বর রাতে পরিবারের অন্য দশ সদস্যের সঙ্গে যে তিনি শেষবারের মতো ঘুমাতে যাবেন তা কল্পনাও করেননি। বাইরে বের হলে গুলি করা হবে, এমন হুমকি দিয়ে ইসরায়েলি বাহিনী যে বাড়িতে তাদের থাকতে বাধ্য করেছিল, সেখানে বোমাবর্ষণ করে। ঘুমন্ত আল-জাখবির যখন জেগে ওঠেন, তখন দেখতে পান তিনি ধ্বংসস্তূপের নিচে।
তিনি বলেন, আমি রকেট বা বিস্ফোরণের শব্দ শুনিনি। আমি যে ধ্বংসস্তূপের নিচে রয়েছি সেটা বুঝতে একটু সময় লেগেছে। তখন তিনি জানতে পারেন ২০ বছর বয়সী তার মামার স্ত্রী সোমাইয়া তার কণ্ঠস্বর শুনতে পান। যা তাকে আশাবাদী করে তোলে। তিনি বলেন, ওই অবস্থায় আমি কান্নাকাটি করছিলাম এবং তার কাছে অনুরোধ করছিলাম যেন আমাকে উদ্ধার করেন এবং আমাকে মরতে না দেন; ‘প্লিজ সোমাইয়া, প্লিজ, আমি অনুভব করছি যে আমি আমার শেষ নিঃশ্বাস নিচ্ছি। প্লিজ সোমাইয়া, আমার মুখ থেকে ধ্বংসস্তূপটা সরিয়ে দাও যাতে আমি শ্বাস নিতে পারি।’
অবশ্য বোমার আঘাতে সোমাইয়া এবং তার ছোট মেয়ের হাত পুড়ে গেছে। তারা ওই অবস্থায় অন্ধকারে হাতড়ে আল-জাখবিরকে উদ্ধার করেন। ওই অবস্থায় তিনি খুব তৃষ্ণার্ত ছিলেন। পানি না পেয়ে মুখ থেকে যে রক্ত ঝরছিল তা পান করতে হয়। এক ঘণ্টা পর সোমাইয়া তাকে টেনে বের করতে সক্ষম হন। ১৭ বছর বয়সী আহমেদ ছাড়া আর সবাই নিহত হন ওই হামলায়। মায়ার বলেন, আমি আমার মা, ভাই, বোন এবং স্বামী, ভাতিজিসহ পরিবারের ১৮ সদস্যকে হারিয়েছি। নিহত হওয়ার পর থেকে তারা ধ্বংসস্তূপের নিচে রয়েছে। আমি তাদের বিদায় জানাতে পারিনি।
পোড়া মুখ, ঘাড়ে ক্ষত
মায়ারেরও মুখ ও পা পুড়ে যায় এবং তার ঘাড়ে ও মুখে ক্ষত তৈরি হয়। তার পিঠ, পাঁজর ও কাঁধে ফ্র্যাকচার হয়। তার পক্ষে হাঁটা সম্ভব ছিল না। ইসরায়েলি বাহিনী অ্যাম্বুলেন্স চলাচলেও বাধা দিচ্ছিল। এ অবস্থায় সোমাইয়া মায়ারকে কাছের জাতিসংঘের স্কুলে নিয়ে যান। সেই সময় ইসরায়েলি সেনারা তাদের আশপাশের বাড়িঘর বুলডোজ করে জ্বালিয়ে দেয়। কয়েক মিনিট পর আল-জাখবির অজ্ঞান হয়ে যান। পরে যখন জেগে ওঠেন তখন একজন ডাক্তার তাদের বলেন, অ্যাম্বুলেন্সের জন্য অপেক্ষা করতে। তবে অ্যাম্বুলেন্স আসেনি। উল্টো ইসরায়েলি বাহিনী বুলডোজার দিয়ে ওই স্কুল ভাঙতে শুরু করে। ১২ ডিসেম্বর ইসরায়েলি বাহিনী উত্তর গাজার ওই স্কুল উড়িয়ে দেওয়ার ভিডিও পরে প্রকাশ পায়। তারা দাবি করেছিল স্কুলটি হামাস ঘাঁটি হিসেবে ব্যবহার করা হচ্ছে।
মায়ার বলেন, (ওই অবস্থায়) আমাদের চারপাশের সব মানুষ পালিয়ে যায়। আমি সোমাইয়ার সঙ্গে একাই রয়ে গেলাম, রক্তপাত হচ্ছিল আমার। ইসরায়েলি সৈন্যরা আমাদের ঘিরে ফেলে এবং আমাদের কাছাকাছি মাটিতে গুলি চালায়। আমরা তাদের সামনে কান্নাকাটি করছিলাম এবং অনুনয়-বিনয় করছিলাম। তারা আমাকে বলেছিল তুমি না উঠলে আমরা তোমাকে গুলি করব। সোমাইয়া কাঁদছিল এবং আমাদের যেতে অনুমতি দেওয়ার জন্য তাদের অনুরোধ করছিল। অবশেষে তারা রাজি হয় এবং আমাদের জোর করে জাবালিয়ার অন্য একটি স্কুলে যেতে বাধ্য করে যেটা অনেক দূরে ছিল।
অসহনীয় অবস্থা
ওই স্কুলে পৌঁছানোর পর তারা একটি গাধার গাড়িতে করে একটি ছোট ক্লিনিকে যায়। যেখানে তারা প্রাথমিক চিকিৎসা পায়। আল-জাখবিরকে জাবালিয়ার আল-খাইর হাসপাতালে স্থানান্তরিত করা হয়, যেখানে তিনি তার গুরুতর আহত চাচার সঙ্গে দেখা করেন। চিকিৎসকরা তাদের গাজার আল-আহলি হাসপাতালে স্থানান্তর করার সিদ্ধান্ত নেয়। কিন্তু এ জন্য ইসরায়েলি সেনাবাহিনীর কাছ থেকে অনুমতি নেওয়ার প্রয়োজন ছিল। এ অনুমতি পেতে দেরি হওয়ায় আল-জাখবিরের চাচা মারা যান। তবে ওই হাসপাতালে যাওয়ার পথে হামলার শিকার হন মায়ার। তিনি বলেন, আমরা যখন যাচ্ছিলাম তারা অ্যাম্বুলেন্সে গুলি করছিল। হাসপাতালে আসার পর, প্রয়োজনীয় ডিভাইস ছিল না। ডাক্তারের তীব্র ঘাটতি ছিল। হাসপাতালটি রোগীতে পূর্ণ ছিল এবং এই অতিরিক্ত ভিড়ের কারণে, তাকে অন্য স্কুলে চলে যেতে হয়, যেখানে তিনি কয়েক সপ্তাহ মাটিতে শুয়েছিলেন। মায়ার বলেন, স্কুলে বসবাসের অবস্থা অসহনীয় ছিল। পানীয়, খাওয়া এবং টয়লেট ব্যবহার করার জন্য দীর্ঘ সময় ধরে লাইনে দাঁড়িয়ে থাকতে হতো। তিনি বলেন, আমার ১৭ বছর বয়সী আহত ভাই আহমেদ এবং আমাকে প্রতিদিন রাস্তায় রান্নার জন্য জ্বালানি কাঠ খুঁজতে হয়েছিল। শারীরিক ও মানসিক কষ্ট ছিল বর্ণনাতীত। প্রতিদিন আমি ঘুম থেকে উঠলে মনে হতো মা আমাকে পরীক্ষা করতে আসবেন। আমি নিজেকে বোঝাতাম যে, তিনি এখনো আসেননি কারণ রাস্তায় কোনো সমস্যা হয়েছে। ব্যথার জন্য ভালো করে ঘুমাতেও পারি না। যখন আমি আমার শরীরের অজস্র সেলাই এবং পোড়ার দিকে তাকাই, তখন আমি কম্বল দিয়ে আমার মাথা ঢেকে কাঁদি। তবে মায়ার জানান তার বাবা বেঁচে আছেন।
পুনর্মিলন
মায়ার জানান, কয়েক সপ্তাহ পর গাজার উত্তরে দুর্ভিক্ষ দেখা দিলে তারা দক্ষিণে যাওয়ার সিদ্ধান্ত নেন। তিনি মিডল ইস্ট আইকে বলেন, আমার বাবার সঙ্গে দেখা করার প্রবল ইচ্ছা ছিল, কিন্তু আমরা ইসরায়েলি মিলিটারি চেকপয়েন্ট দেখে আতঙ্কিত ছিলাম। কারণ আমরা জানি তারা আমাদের আবার নির্যাতন করবে বা আহমেদ বা আমাদের দুজনকেই গ্রেপ্তার করবে। কিন্তু দুর্ভিক্ষ ছিল অসহনীয়। আমাদের শরীরে চামড়া ও হাড় ছাড়া কিছু ছিল না, আমাদের স্বাস্থ্য খারাপ হয়ে যাচ্ছিল। আমরা আর পশুর খাদ্য খেতে পারতাম না।
অবশ্য পরে তারা উত্তরগামী একটি দলের সঙ্গে যাত্রা করে, যাদের বেশিরভাগই নারী এবং শিশু ছিল। এদের সঙ্গে মায়ার ও তার ভাইকে দীর্ঘ দূরত্বে হাঁটতে হয়। তিনি বলেন, এটা ভয়ংকর ছিল। রাস্তায় লাশ পড়ে আছে এবং বাতাস সংঘর্ষের শব্দে চিৎকার করে উঠছিলাম আমরা। ইসরায়েলি চেকপয়েন্টের কাছে যাওয়ার পর ভয়ে তাদের হৃদয় কেঁপে ওঠে। তবে ইসরায়েলি সৈন্যরা তাদের এগিয়ে যাওয়ার নির্দেশ দেয় এবং বলে, ‘হামাস এভাবেই আপনাকে ক্ষুধার্ত এবং ধ্বংস করে’। ঘণ্টার পর ঘণ্টা এভাবে হাঁটার ক্লান্তিতে তারা অবসাদগ্রস্ত হয়ে পড়ে। আল-জাখবির দুবার অজ্ঞান হয়ে যান। কিন্তু ওই অবস্থাতেই নিজেকে জোর করে তোলেন তিনি এবং যতক্ষণ না ইসরায়েলি সেনাদের থেকে দূরে একটি নিরাপদ জায়গায় পৌঁছান ততক্ষণ হাঁটতে থাকেন। পরে বাবার সঙ্গে তাদের দেখা হয়।