‘ঘরোয়া কাঠামোর তুলনা হোক বৈশ্বিক মানদণ্ডে’

বাংলাদেশের শ্রীলঙ্কা সিরিজ মূল্যায়ন করলে ঘরোয়া ও আন্তর্জাতিক ক্রিকেটের মধ্যে চ্যালেঞ্জগুলো কীভাবে দেখেন?

নাঈম ইসলাম : আমাদের ঘরোয়া এবং আন্তর্জাতিক ক্রিকেটের মধ্যে অনেকখানি ফারাক আছে- এ কথাটা সৌরভ (মুমিনুল হক) বা শান্ত যে এবারই প্রথম বলেছে তা নয়, টেস্ট ক্রিকেটে আমাদের পথচলা দুই যুগ হয়ে গেছে। আমাদের শুরুর সময় থেকেই সীমাবদ্ধতা ছিল, যেগুলো সময়ের সঙ্গে সঙ্গে অনেক দূর হয়েছে। দিন যত যাবে, সেগুলো কাটতে থাকবে। এখন যে সীমাবদ্ধতাটি বেশি দেখা যাচ্ছে, সেটাই আসলে ঘরোয়া ও আন্তর্জাতিক ক্রিকেটের মধ্যে চ্যালেঞ্জের পার্থক্য। আমার কাছে মনে হয় সৌরভ বা শান্ত যে বিষয়টা তুলে ধরতে চেয়েছে তা হলো, মানের জায়গায়। আন্তর্জাতিক ক্রিকেটে আপনাকে ১৪০+ গতির সম্মুখীন হতে হবে, কিন্তু ঘরোয়া ক্রিকেটে আপনি ওই গতির কয়টা বল খেলেন। তাই স্বাভাবিকভাবেই ঘরোয়া ক্রিকেট আপনার জন্য অনেক সহজ হয় খেলা। আর এরপর আন্তর্জাতিক ক্রিকেটে গেলে সেই একই গেম আপনার জন্য চ্যালেঞ্জিং হয়ে যায়। 

এই চ্যালেঞ্জ মোকাবিলায় কী করা যেতে পারে?

নাঈম : আমার মনে হয় ঘরোয়া ক্রিকেটে আপনার এমনভাবে মনোনিবেশ করা উচিত, যাতে এই সমস্যাগুলো সমাধান করা যায়। আমাদের কিছু খেলোয়াড় আছে যাদের মূল ফোকাস লাল বল বা লঙ্গার ভার্সন খেলার দিকে। যেমন সাদমান ইসলাম বা মুমিনুল হক সৌরভ। ওদের মতো খেলোয়াড়দের জন্য একটা আর্থিক কাঠামো তৈরি করা যেতে পারে, যেখানে একটা ছেলে যদি মনে করে আমি শুধু লঙ্গার ভার্সন ফোকাস করব। বছরে ১৫-২০টা টেস্ট খেলে ওর সারা বছরের উপার্জন নিয়ে চিন্তা করতে হবে না। তাহলে কিন্তু সেই খেলোয়াড়গুলো লঙ্গার ভার্সনেই নিজের খেলার ধরন আরও অনেক উন্নতি করতে চাইবে। লঙ্গার ভার্সনে যদি মানসম্পন্ন ক্রিকেটার তৈরি করতে চান তাহলে শুধু এখানেই ফোকাস করে এমন একটা আর্থিক কাঠামো তৈরির প্রতি আমাদের গুরুত্ব দেওয়া উচিত। 

বিসিবির নীতিনির্ধারণী পর্যায় থেকে ঘরোয়া কাঠামোর উন্নতির কথা বলা হচ্ছে। একজন অভিজ্ঞ ক্রিকেটার হিসেবে ঘরোয়া কাঠামোয় টেকনিক্যালি আর কী কী পরিবর্তন আনা যেতে পারে?

নাঈম : ভারতে আইপিএল কিন্তু খুব জমজমাট। সেখানে বোর্ডের পাশাপাশি খেলোয়াড়রাও আর্থিকভাবে বেশ সুবিধা পেয়ে থাকে। তারকাখ্যাতির পাশাপাশি কাভারেজও পাচ্ছে। আবার দেখেন ওদেরই রঞ্জি ট্রফিতে যারা খেলে, তারা বছরে কী পরিমাণ অর্থ উপার্জন করছে? অর্থাৎ টি-টোয়েন্টি জমজমাট হচ্ছে বলেই যে ওরা প্রথম শ্রেণির ক্রিকেটে মনোযোগ দিচ্ছে না, তা কিন্তু নয়। টি-টোয়েন্টির জায়গায় যেমন মনোযোগ ঠিক আছে আবার প্রথম শ্রেণির ক্ষেত্রেও সেই গুরুত্ব দেওয়া হচ্ছে। একটি সংস্করণকে অন্যটার সঙ্গে গুলিয়ে ফেললে কিন্তু চলবে না। আমাদের একদম পাশের দেশে কোনো নির্দিষ্ট কাঠামোর কারণে যদি উন্নতি হয় আমরা অন্তত ওরকম কিছুর শুরুটা তো করতে পারি। রঞ্জি ট্রফিতে একজন সর্বোচ্চ ৬০ হাজার রুপি প্রতিদিন বেতন পেয়ে থাকে। ওরা জানে যে ক্রিকেটের যদি উন্নতি করতে হয় তাহলে ঘরোয়া ক্রিকেটের উন্নতি করতে হবে। আর ঘরোয়ার প্রধান উপাদান লঙ্গার ভার্সন ক্রিকেট। ওরা কিন্তু ওভাবেই কাজ করেছে। আমাদেরও আর্থিক কাঠামো, আনুষঙ্গিক সুবিধা আগের তুলনায় অনেক গুণ বেড়েছে। এনসিএলে ম্যাচপ্রতি সর্বোচ্চ ১ লাখ ও সর্বনিম্ন ৫০ হাজার টাকা, বিসিএলে ম্যাচপ্রতি ৮০ হাজার। আন্তর্জাতিক ক্রিকেটে প্রতিদ্বন্দ্বিতা করতে হলে, ঘরোয়া কাঠামোর তুলনা হোক বৈশ্বিক মানদণ্ডে। আমাদের বোর্ডে অনেক বিজ্ঞ মানুষ দায়িত্বে আছেন। আমি নিশ্চিত ওনারাও এভাবেই চিন্তা করেন। একজন ক্রিকেটার যদি ক্রিকেটটাকেই পুরোদস্তুর পেশা হিসেবে নেওয়ার চিন্তা করতে পারবে এবং এর পেছনে নিজের পুরোটুকু নিংড়ে দিতে পারবে, তখন ক্রিকেট আরও উন্নতি করবে। 

যশস্বী জয়সওয়াল, কামিন্দু মেন্ডিসরা জাতীয় দলে এসেই নৈপুণ্য দেখান, আমাদের পরিণত হতে হয়। জাতীয় দলে আসার প্রক্রিয়ায় কি কোথাও গলদ আছে?

নাঈম : জয়সওয়াল-কামিন্দুদের ঘরোয়া ক্রিকেটের পরিসংখ্যান দেখলে বিষয়টা পরিষ্কার হবে। কতগুলো ম্যাচ খেলে এসেছে, সেখানে পারফরম্যান্স কেমন ছিল। প্রক্রিয়ায় গলদ আছে ঠিক বলা যাবে না। তবে আমাদের দেশে একটা জায়গায় পরিবর্তন করা দরকার। একটা মৌসুম ভালো করে জাতীয় দলে সুযোগ পাওয়ার নজির যেমন আছে, তেমনি হারিয়ে যাওয়ার নজিরও আছে। খেলোয়াড়টিকেও তো দোষ দেওয়া যায় না এ ক্ষেত্রে। আমার মনে হয়, টানা দুই-তিন বছর ভালো খেলার পর, একটা প্রক্রিয়ার মধ্য দিয়ে এইচপি, ‘এ’ টিম হয়ে তারপর জাতীয় দলে আসা উচিত। তখন তার জন্য আন্তর্জাতিক মঞ্চে পারফর্ম করাটা সহজ হবে। আমাদের চলমান প্রক্রিয়ায় কী ফলাফল এসেছে তা দেখতে পেয়েছি। এখন লিপু ভাই, রাজ ভাই, হান্নান ভাইয়েরা আছেন। ওনারা নিশ্চয়ই এই প্রক্রিয়ার দিকে দৃষ্টি দেবেন।