নানান ফাঁদ পেতে রাজনীতি বন্ধই করে দেওয়া হচ্ছে

জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয়ের নৃবিজ্ঞানের অধ্যাপক মানস চৌধুরী। সমাজ, রাজনীতির পর্যবেক্ষণকারীর পাশাপাশি তিনি সাহিত্যিক হিসেবে সমাদৃত। নব্বইয়ের ছাত্র আন্দোলন, বিশ্ববিদ্যালয়ে যৌন নিপীড়নবিরোধী আন্দোলনে তিনি সক্রিয় ছিলেন। পরবর্তীকালে পেশাগত জীবনে দেশের বিশ্ববিদ্যালয় পরিস্থিতি ও শিক্ষার্থীদের বিভিন্ন মুভমেন্ট তিনি দেখছেন ঘনিষ্ঠভাবে। সম্প্রতি বুয়েটকে কেন্দ্র করে ছাত্ররাজনীতি নিয়ে আলোচনা চলছে। বিষয়টি নিয়ে তিনি কথা বলেছেন দেশ রূপান্তরের সঙ্গে। সাক্ষাৎকার নিয়েছেন সম্পাদকীয় বিভাগের সাঈদ জুবেরী

দেশ রূপান্তর : আপনি নিজে ছাত্ররাজনীতি করেছেন এবং পরবর্তী সময় ঘনিষ্ঠভাবে ছাত্ররাজনীতি ও শিক্ষার্থীদের আন্দোলন দেখেছেন। এ দেশের ছাত্ররাজনীতি নিয়ে বর্তমানে দাঁড়িয়ে আপনার মূল্যায়ন কী?

মানস চৌধুরী : ছাত্ররাজনীতি বলতে কে কী বোঝেন ও কীসের পক্ষে বা বিপক্ষে মতামত দেন তা সুনির্দিষ্ট ও অভিন্ন বলে আমি মনে করি না। নানান সময়ে নানান কারণে নানান মানুষ রাজনীতি বলতে নানান সাংঘর্ষিক সব জিনিস বুঝে থাকেন। অন্তত দুটি অর্থ প্রকটভাবে বিপ্রতীপ রাজনীতি মানে গুণ্ডাগার্দি, প্রায়ই বিপক্ষীয়রা মনে করেন; রাজনীতি মানে অধিকার সচেতনদের আন্দোলন, প্রায়ই এর পক্ষের লোকজন মনে করেন। ছাত্ররাজনীতির বিষয়ে এই বৈপরীত্যটা আরও বেশি খাটে, যেহেতু বিগত বছরগুলোতে নিন্দামন্দ অনেক বেশি হয়েছে তথাকথিত ছাত্ররাজনীতি নিয়ে। কমবেশি নিন্দার এই মাত্রাটা বাড়ার সঙ্গে আমি এরশাদ-উত্তরকালের ‘সিভিল সমাজ’ তৎপরতার একটা সম্পর্ক দেখতে পাই। এটা একটা অদ্ভুত রকমের পরিহাস যে, যাবতীয় ট্রেড ইউনিয়ন আন্দোলন কমবেশি রাষ্ট্রের জবরদস্তি নিয়মে আর কিছু ক্ষেত্রে নির্মম পিটানিতে পাতলা হয়ে গেছে; অন্যদিকে ছাত্ররাজনীতি বন্ধে হৈচৈ করা হয়েছে। বন্ধ করার যেসব কারণ বা অজুহাত দেওয়া হয় সেগুলোও নিজ গুণে কৌতুককর। আপনাদের মনে পড়বে, এই আহ্বান একদা রাষ্ট্রপতি শাহাবুদ্দিনও তুলেছিলেন (আগেরজন) এবং ব্যাপক নিন্দিত হয়েছিলেন। আমার মূল্যায়ন অনন্য কিছু নয়। নয়া-উদারতাবাদী বিশ্ব রাজনৈতিক-অর্থনৈতিক কাঠামোর মধ্যে সংগঠন সংক্রান্ত ধারণা এবং রাজনৈতিক প্রক্রিয়া আগাপাশতলা বদলে গেছে। গণতন্ত্র ও স্বাধীনতার পূর্বতন ধারণাগুলো নিয়ে নতুন প্রজন্মের বোঝাবুঝির রাস্তাও প্রায় বন্ধ করে দেওয়া আছে শিক্ষাব্যবস্থায়। ফলে এটা কয়েকজন কারক বা সংগঠকের ব্যক্তিগত দক্ষতা বা বিশ্ববীক্ষার অভাবের মধ্যেও আমি দেখি না।   

দেশ রূপান্তর : বুয়েটে ছাত্ররাজনীতি নিয়ে ছাত্রলীগ ও শিক্ষার্থীদের চলমান দ্বন্দ্বকে কীভাবে দেখছেন?

মানস চৌধুরী : আমি বুয়েটের শিক্ষার্থীদের সাধারণ অনুভূতিকে সম্মান জানাই। একজনের নির্মম মৃত্যুর ক্ষত নিয়ে তারা তাদের দাবিকে প্রতিষ্ঠিত করতে চাইছেন। কিন্তু তারা মূলগতভাবে যে ফয়সালাটা করেছেন সেটাকে ত্রুটিপূর্ণ মনে করি। সেটা হচ্ছে, ছাত্ররাজনীতি বন্ধ করার মাধ্যমে ছাত্রলীগের গুণ্ডাগার্দি বন্ধ থাকবে কিংবা যে কোনো নিপীড়ক বাহিনীর উদ্ভব এতে বাধাগ্রস্ত হবে। এই ধরনের ফয়সালা আমি অতিসরল মনে করি এবং রাজনৈতিক-ক্ষমতাচক্রীয় পদ্ধতি সম্বন্ধে যথেষ্ট বোঝাবুঝিকে প্রমাণ করে না এটা। এ সময় হাইকোর্টের হস্তক্ষেপ বা ইত্যাদি একটা উছিলা হিসেবে কাজ করেছে। কিন্তু একটা শক্তিশালী গুণ্ডাচক্রীয় পাটাতন অন্তর্গতভাবে কাজ না করলে এই ঘোষণার সবচেয়ে বড় ফায়দা তো গণতন্ত্রমনস্ক ও নিপীড়নবিরোধী শিক্ষার্থীদেরই নিতে পারার কথা। আমি একটা উদাহরণ দিই। সম্ভবত ১৯৮৮ সালের শেষ দিকে এরশাদ তার পৃষ্ঠপোষকতার ছাত্রসংগঠনটি বিলুপ্ত করেন। তিনি ঘোষণা করেন, এটা নাকি ক্যাম্পাসের বিবদমান পরিস্থিতি দূর করতে তার তরফের প্রচেষ্টা ছিল। এই ফালতু ইমেজমূলক বক্তৃতা আমরা যা ভাবার তাই ভেবেছিলাম। কিন্তু সংগঠনটির বিলুপ্তি ঘোষণার সঙ্গে সঙ্গেই বিভিন্ন ক্যাম্পাসে ম্যাজিকের মতো জাতীয়তাবাদী ছাত্রদল বিদঘুটে রকমের শক্তিশালী ও মারমুখী হয়ে ওঠে। বস্তুত, বামপন্থি ও ‘প্রগতিশীল’ (ঘটনাচক্রে তখন এই বর্গে ছাত্রলীগও থাকতে চাইত এবং অন্যরাও রাখতে সম্মত ছিল) সংগঠনগুলোকে পিটিয়ে তক্তা বানানোর লাগাতার দায়িত্বটা তখন ছাত্রদল পালন করে। সেটা এরশাদের পতনের পর এবং বেগম খালেদা জিয়া প্রধানমন্ত্রী হওয়ার পর আরও ‘যৌক্তিক’ভাবেই বাড়ে। সম্ভবত, বাংলাদেশের ক্যাম্পাস রাজনীতির অন্যতম রহস্যময় এক অধ্যায় এটি। সারাংশে, কোনো একটা পেটোয়া স্বার্থচক্র তৈরি হয়ে যাওয়ার জন্য ছাত্ররাজনীতি নিষেধাজ্ঞা যথেষ্ট কার্যকরী না হতে পারে। প্রতিষ্ঠানের নাম ধরে ধরে দেখানো সম্ভব। কোনো সুনির্দিষ্ট আলাপে তা করা যাবে।     

দেশ রূপান্তর : সাধারণ পর্যবেক্ষণ হচ্ছে চাকরি, বিদেশ গমনসহ বিভিন্ন ক্ষেত্রে বুয়েটের শিক্ষার্থীরা বেশি সুযোগ পায়। এই সুবিধাজনক অবস্থা কি তাদের দৃঢ়ভাবে রাজনীতিবিরোধী করে তুলেছে?

মানস চৌধুরী : আমি এই পরিসংখ্যানের সঙ্গে পরিচিত নই। বরং বিগত বছরগুলোতে বিদেশি ডক্টরেটধারী আমলা ও পুলিশদের দেখে আড়ালে-আবডালে নীরবে দীর্ঘশ্বাস ফেলতে দেখেছি বিশ^বিদ্যালয়ের কলিগদের। কিন্তু এই যুক্তিগুলোর একটা আত্মঘাতী দিক আছে। প্রধানমন্ত্রীর সঙ্গে যে অবিশ্বাস্য সংখ্যক সফরসঙ্গীরা বিভিন্ন দেশে যান, তাদের পূর্ণ তালিকা পত্রিকা প্রকাশ করে না ঠিকই, কিন্তু লোকমুখে কিছু খবর তো নিতেই পারেন। এই তালিকার একটা গুরুত্বপূর্ণ অংশ বর্তমান বা সাবেক ছাত্রলীগ কর্মী। বিদেশ গমন যদি একটা প্রণোদনা হয়, তাহলে তো রাজনীতি করতে আগ্রহী হওয়ারই বরং কথা। আমি নিজেই অন্তত চারজনের কথা মনে করতে পারি, যারা ক্যাম্পাসে এসে কাস্তে-হাতুড়ি এঁকেছেন অন্তত এই সম্ভাবনায় যে তাদের (তদানীন্তন) সোভিয়েত ইউনিয়ন যাওয়া হতে পারে। অন্তত দুজনের হয়েওছিল। বাস্তবে সোভিয়েত বা পূর্ব ইউরোপে বৃত্তিতে সুপারিশের সময় ব্যাপকহারে দুর্নীতিগ্রস্ত (সাবেক) বামদের তালিকা এক্ষুণি বলে দিতে পারি। কিন্তু সেটা সৌজন্যবোধে করব না। এর মানে হলো, এই প্রস্তাবনাগুলো অন্তর্গতভাবে ত্রুটিপূর্ণ।

বুয়েটের শিক্ষার্থীরা রাজনীতিবিরোধী এ রকম একটা অনুসিদ্ধান্তেও আমি অনায়াসে আসব না; যদিও ওরা, এই বিশেষ সময়ে অন্তত, গুণ্ডাতন্ত্রকে ছাত্ররাজনীতির সমার্থক হিসেবে দেখেছেন। ওরা আন্দোলন করেছেন বলেই তো যা ও যতটুকু ফাহাদের মৃত্যু-পরবর্তী সংক্ষোভ জারি থেকেছে। কিংবা তার আগে সনি হত্যার আন্দোলনও স্মর্তব্য। কোনো প্রতিষ্ঠানেই শিক্ষার্থীদের চৈতন্যের কোনো সমসত্ত্ব দশা নেই। সত্যি বললে, নিম্ন ৮০-এর দশকে বেশ গুরুত্বপূর্ণ কিছু দিকনির্দেশনা বুয়েটের শিক্ষার্থীরাও দিয়েছেন। দুই বিশ্ববিদ্যালয়ের মধ্যে ‘আত্মরক্ষামূলক’ প্রাচীর দেওয়ার আগ পর্যন্ত ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় ও বুয়েটের বৃহত্তর গণতন্ত্রমনস্ক ও বামকর্মীদের আদান-প্রদানও অনেক নৈমিত্তিক ছিল। যদি সমকালের প্রবণতা হিসেবে বলি, তাহলে মোটের ওপর ‘রাজনীতিবিরূপ’ চৈতন্য তারুণ্যেরই একটা প্রবণতা হিসেবে গড়ে উঠছে এবং সারা বিশ্বেই। বুয়েটের শিক্ষার্থীদের আলাদা করে চিহ্নিত করব না।  

দেশ রূপান্তর : ছাত্ররাজনীতির বিষয়ে আদালতের নির্দেশকে কীভাবে দেখছেন?

মানস চৌধুরী : দেখুন, প্রথমত আমাদের ওই নিষেধাজ্ঞাটিকে নিয়েই ভাবা দরকার যেটা ২০১৯ সালের অক্টোবর মাসে আবরার ফাহাদকে খুন করার পর হয়েছিল। সংক্ষুব্ধ শিক্ষার্থীরা একটা লোকচর্চিত কথাকে দাবি আকারে তুলেছেন যে ‘ছাত্ররাজনীতি বন্ধ চাই’। কিন্তু প্রশাসকদের তো বয়স আরেকটু বেশি। তাদের হম্বিতম্বির মধ্যে প্রায়ই ৬০-এর দশকের শিক্ষার্থী আন্দোলন, ৭১-এর স্বাধীনতা যুদ্ধ, এরশাদবিরোধী শিক্ষার্থী আন্দোলন এসব কথাবার্তার ফুলঝুরি আসে। তো, তাদেরই তো সাব্যস্ত করতে পারার কথা যে বিষয়টা ‘ছাত্ররাজনীতি’র নয়, কোন ধরনের গুণ্ডাবৃত্তিকে হলে হলে লালন করা হচ্ছে তার। তারা এবং সরকারের পদস্থরা একত্রে বরং নিশ্চিত করতে পারতেন, যাতে এই গুণ্ডাদের সর্বোচ্চ এবং দ্রুততর শাস্তি হয়। পারতেন, যদি তাদের এই নিয়ত থাকত। সরকারের ভূমিকা এসব ক্ষেত্রে কমবেশি সবাই জানি। এসব গুণ্ডাগার্দির আড়ত তারা প্রশ্রয় দিয়ে আসছেন। প্রশাসকদের মাজায় ন্যূনতম কোনো জোর নেই। এ রকম একটা পরিস্থিতিতে ওই ‘জনপ্রিয়’ সিদ্ধান্তটি ছিল তখনকার সংক্ষোভ থেকে প্রশাসনিক পরিত্রাণ। মূল প্রয়োজনের সঙ্গে এর কোনো সংশ্রব নেই। আদালতের নির্দেশটা শুধু সময়ের অপেক্ষা ছিল। তিনটা বিষয় লক্ষ্য করার মতো : প্রথমত, সকল পাবলিক বিশ্ববিদ্যালয়ে তথাকথিত ছাত্ররাজনীতি বহাল রেখে বুয়েটে বন্ধ রাখার আসলেই কোনো সামুহিক আইনি পরিস্থিতি নেই; দ্বিতীয়ত, বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রায় সব সিদ্ধান্ত আদালতে লাগাতার খারিজ হতে থাকে; তৃতীয়ত, বুয়েটের ছাত্রলীগ জানতই এই সম্ভাবনার কথা, তারা কেবল রেজিমের স্থিতাবস্থার জন্য অপেক্ষা করেছে।

দেশ রূপান্তর : দেশের সব আবাসিক বিশ্ববিদ্যালয়ে একক দখলদারত্ব রয়েছে ছাত্রলীগের। অন্য সংগঠনের অবস্থান নেই বললেই চলে। এর আগে বিএনপি ক্ষমতায় থাকাকালে ছাত্রদলের ভূমিকাও অনুরূপ বা কাছাকাছি ছিল। নব্বই-পরবর্তী ছাত্ররাজনীতি নিয়ে আপনার পর্যবেক্ষণ কী?

মানস চৌধুরী : গুণগত কিছু বড় রূপান্তর ঘটেছে, যেটাকে আমি বৈশ্বিক অনেক ঘটনাপ্রবাহ ও কার্যকারণের সঙ্গেও সম্পর্কিত করে দেখি। প্রথম ও প্রধান বিষয় হলো, আমাদের মতো রাষ্ট্রসমাজগুলোতে অনুঘটক বা ক্যাটালিস্ট হিসেবে ছাত্র (ও ছাত্রী) রাজনীতির গুরুত্বের বদলটা। সরকারের পৃষ্ঠপোষকতাপ্রাপ্ত সংগঠনের লাগাতার পেটোয়া বাহিনীর ভূমিকা পালন করতে থাকা বেশ পুরনো ঘটনা। এনএসএফের কথা শুনে আসছেন সেই ৬০-৭০ বছর আগে। কিংবা পার্শ্ববর্তী রাষ্ট্র ভারতে এখন নতুন করে অখিল ভারতীয় বিদ্যার্থী পরিষদের পেটোয়া ভূমিকার কথা জেনে আসছেন। বিজেপি যতই এটা তাদের সংগঠন নয় বলে প্রচার করুক, সবাই জানে যে রাষ্ট্রীয় স্বেচ্ছাসেবক সংঘ (আরএসএস) এই সংগঠনের মাধ্যমে রেজিমের জন্য প্রয়োজনীয় হুমকি-ত্রাস ও পেটাই চালানোতে ব্যবহৃত। ছাত্রদল এই কাজটিই করত, এমনকি করতে সুযোগ পেয়েছিল খোদ এরশাদের শাসনামলে, যে রহস্যটার কথা আমি আগেই বললাম। আবার এরশাদের সময় সেই কাজটা জাতীয় ছাত্রসমাজ করে আসত। ইতিহাস সাক্ষী যে, ১৯৭১ পরবর্তী ছাত্রলীগও তাই করেছে, কিংবা ১৯৯৬ পরবর্তী ছাত্রলীগ। ফলে এগুলো কমবেশি সেট জব ডেস্ক্রিপশন। তবে বলাই বাহুল্য, এদের প্রত্যেকেরই নথিপত্র ওয়েবসাইট দেখে আচমকা কারও মাথা গুলিয়ে যাবে। একদম রাজপথের লড়াকু সৈনিক-টৈনিক এসব পরিচয়ই পাবেন, এমনকি এরশাদের সংগঠনটারও। আমি পরখ করেই বলছি।কিন্তু এগুলো হলো দশার একটা দিক। অন্যদিকটাতে আপনাদের মনোযোগের দাবি করব আমি। বৈশ্বিক শাসনপ্রণালির এমনসব গুণগত বদল ঘটেছে যেখানে জাতিসংঘীয় দাড়িগোঁফওয়ালা শিশুরা নানান রকমের সমর্থন দল (ইয়েস গ্রুপ) গঠন থেকে শুরু করে সিউডো সব সচেতনতার কর্মকাণ্ড করার ইন্ধন পাচ্ছে, একদম বেরাজনৈতিক বা এপোলিটিক্যাল জগদ্বীক্ষা থেকে। রাষ্ট্রের অভ্যন্তরে বণিকতন্ত্র ও সমরতন্ত্রের দুর্দান্ত আঁতাত হয়েছে এবং বহু বড় বড় জনবিরোধী নীতিমালা একদম আন্ডারগ্রাউন্ড/চক্ষুর-অন্তরালে সাধিত হচ্ছে; এই নেক্সাস বা আঁতাতের উপরিভাগের ঘোষণাপত্রের মধ্যে ‘উন্নয়ন’ প্রায় একটা ঐশীবাণীর মতো প্রোপাগাণ্ডা হচ্ছে, সেসব  প্রোপাগাণ্ডাতে উচ্চ পারিশ্রমিকে ‘গবেষক’ নামের মানুষজন যুক্ত হয়ে সম্প্রচার জারি রাখছেন। অভ্যন্তরের এই নেক্সাসের বহুরাষ্ট্রীক পৃষ্ঠপোষক আছে কখনো কূটনীতির ছদ্মবেশে, কখনো একদম মিলিটারি অ্যালায়েন্সের মাধ্যমে, যাকে আবার ‘ইন্টারন্যাশনাল পিস কিপিং’য়ের মতো একটা বদমায়েশি ভাষার আড়ালে রাখা হয়েছে। এ রকম একটা বিধিব্যবস্থায় স্থানীয় পর্যায়ে জনরাজনীতির গুরুত্ব, পূর্বতন ‘মধ্যবিত্ত শিক্ষার্থী’ অংশের নির্ধারণী সামর্থ্য, এমনকি খোদ নির্বাচনী রাজনীতির প্রভাববলয় খর্ব হয়েছে। সেগুলো দেখতে না-পারা আমাদের জন্য গর্হিত হবে। রাজনৈতিক ময়দানের অভূতপর্ব বদলের মধ্যে আপনি আমি যদি পুরনো রাজনৈতিক বিশ্লেষণের টুলগুলো নিয়ে ঠুকঠাক করতে থাকি, তাহলে হাতুড়ে বিদ্যাই হবে তা। শিক্ষার্থীদের সেই ‘বৌদ্ধিক’ গুরুত্ব রাজনৈতিক ময়দানে আর নেই। ফলে গুণ্ডাশিক্ষার্থীদের প্রতিরোধ করার সময় প্রতিরোধীরাও যদি মাথায় রাখেন যে তারা যে মূল্যে বইপত্রে আলোচিত সেই মূল্য আর বহন করেন না তাহলে আখেরে তাদের উপকার হবে। এটা আত্মোপলব্ধি ও ক্ষমতা অনুধাবনের সঙ্গে সম্পর্কিত।   

দেশ রূপান্তর : বাম ছাত্রসংগঠনের সাম্প্রতিক তৎপরতা, অবস্থান ও সীমাবদ্ধতা আপনার চোখে কেমন?

মানস চৌধুরী : সীমাবদ্ধতা নিয়ে সারা দিন ধরে বলা যাবে। বরং একটা বাস্তবতার দিকে চোখ ফেরানো বেশি জরুরি। যদি শিথিলভাবেও দেখেন, বাংলাদেশে সরকারি পৃষ্ঠপোষকতা ও বণিক শ্রেণির স্নেহে বাম শিক্ষার্থীদের পেটাই চলছে সেই স্বাধীনতার পর থেকেই। আরও সূক্ষ্ম ইতিহাসদর্শীরা বলবেন এটা চলছে এমনকি মধ্য ষাটের দশক থেকেই। এই পেটাই কখনো শারীরিক, কখনো লাগাতার প্রোপাগান্ডার, কখনে গণগালির আয়োজন করে। এই অসীম প্রতিপক্ষের মধ্যে কাজ করতে হয়েছে বাম ছাত্রসংগঠনগুলোর। এর সঙ্গে অগ্রজ নেতৃবৃন্দের সীমাহীন লোভ ও হঠকারিতার অজস্র নজির আছে। একটা যেমন বললাম সোভিয়েতে বৃত্তি পাইয়ে দেওয়ার ‘ঠিকাদারি’। বাকিগুলো অন্য কখনো খতিয়ে দেখতে পারি আমরা। এখন এই সংগঠনগুলোর নিভু নিভু দশা। অনেকেই বলতে পছন্দ করেন ‘আজকালকার বাম ছেলেমেয়েদের পড়ালেখা নেই’। আমার ওগুলো অজরুরি কথা মনে হয়। যদি কোনো সিস্টেম্যাটিক অভাব থেকে থাকে, তা আমি মনে করি নিবিড় ও পরিব্যাপ্ত সংগঠন চর্চা করার অভাব। আর সেই দায় আমি নতুন প্রজন্মকে দেব না। তার অনেক কারণ আছে। পরের প্রশ্নটাতেই প্রসঙ্গটা আবার আসবে। 

দেশ রূপান্তর : আলাদা করে ইসলামি ছাত্রসংগঠনের ভূমিকা কেমন দেখতে পান?

মানস চৌধুরী : আমি ধরেই নিচ্ছি, আমরা উভয় পক্ষই জানি যে, ইসলামি ছাত্রসংগঠন একটি মাত্র নয় এবং একক কোনো রূপ নিয়ে কাজ করছে না। আমার পর্যবেক্ষণ হলো গত ৩-৪ দশকে সবচেয়ে পদ্ধতিগত, নিরুত্তেজিত, প্রগ্রাম্যাটিকভাবে কাজ করে চলেছেন এসব সংগঠনের কর্মীরাই। তার অজস্র আলামত আছে। খুঁজলে প্রমাণও পাওয়া যাবে। বস্তুত, যখনই ‘সেক্যুলার’ স্পেসে তাদের চাপ মনে হয়েছে তারা নানাবিধ ‘সামাজিক’ সংগঠনের বিস্তার ঘটিয়েছেন। আমি একটা ছোট্ট তালিকা বলি, যার সবটাই আপনার ও অনেকের জানা থাকার কথা। কিন্তু সংবদ্ধভাবে দেখার একটা সুযোগ পাব। ঢাকা ও মুখ্য নগরীগুলোর প্রায় ১০০ ভাগ কোচিং সেন্টার ওঁরা চালান; চুক্তিভিত্তিক বীমা এজেন্সির অনেকগুলোতে তাদের কর্মীদের সিস্টেম্যাটিক নিয়োগ দেওয়া আছে; ওষুধ বিপণনের চাকরিতে খুব গুরুত্বপূর্ণভাবে ইসলামি সংগঠনের কর্মীরা পার্টিপলিসিতে কাজ করেন। আমি ঢাকা শহরের প্রচুর বাস টিকিট বিক্রেতাকে এসব সংগঠনের কর্মী হিসেবে পাই। আইটি পেশাতে কম করে হলেও ২০০৩ সাল থেকে (আফগানিস্তানে মার্কিন হামলা) একদম পলিসিগতভাবে তারা কাজ করেন। আসলে আরও নিবিড় তালিকা করে দেখাতে পারব। যারা সংগঠনের অ-আ-ক-খ বোঝেন, তারা বুঝবেন এই নিবিড় পরিব্যাপ্ত কর্মযজ্ঞের অর্থ কী। তাদের ভূমিকা সুবিশাল। 

দেশ রূপান্তর : নাগরিক পর্যায়ে এক রকম দাবি আছে ছাত্ররাজনীতি বন্ধের। এ বিষয়ে আপনার মন্তব্য কী?

মানস চৌধুরী : এসব নাগরিককে আমি খুব ভালো চিনি। কদিন পরপর নানান কিছুতে হৈচৈ বাঁধানো আর ছিঁচকাঁদুনি করে ‘বাঙালি গেল’, আর র‌্যাব আসার পর স্বাগত জানানো লোক এসব। আমি পারলে এসব নাগরিককে জড়ো করে ট্রেড ইউনিয়ন আন্দোলন ধ্বংসের পরোক্ষ কারিগর হিসেবে আনুষ্ঠানিকভাবে মাফ চাওয়াতাম। আমি সব পরিসরে রাজনীতির পক্ষে। বরং নানান ফাঁদ পেতে রাজনীতি বন্ধই করে দেওয়া হচ্ছে। রাজনীতি মানে পার্লামেন্টের সিটগুলো বিলিবণ্টন করা নয়। রাজনীতি আপনার আমার সামাজিক বাসনা ঘোষণা করার অভ্যাস। 

দেশ রূপান্তর : বেসরকারি বিশ্ববিদ্যালয়ে ছাত্ররাজনীতি কখনোই ছিল না সেভাবে। আপনার পর্যবেক্ষণ কী এ বিষয়ে?

মানস চৌধুরী : আনুষ্ঠানিকভাবে রাজনৈতিক সংগঠন নেই, যেমনটা সবাই জানেন। কিন্তু একদিকে যেমন অনানুষ্ঠানিক সংগঠন আছে, এমনকি ইসলামি সংগঠনই, অন্যদিকে প্রচুর শিক্ষার্থী আছেন যারা একদম চৌকষ রাজনীতিমনস্ক। কিন্তু মোটের ওপর বেতন কাঠামো, শিডিউল, একেবারেই করপোরেট ব্যবস্থাপনা ইত্যাদির মধ্যে রাখার কারণে তাদের ফুরসতও খুব কম। দুয়েকটা ক্ষেত্রে আমি এই প্রমাণও পেয়েছি যে, তারা দু-চারজন শিক্ষক/গুরু পেলেই গুরুত্বপূর্ণ রাজনৈতিক অভিলাষ প্রকাশে সক্ষম ও আগ্রহী। ভ্যাটবিরোধী আন্দোলন তার একটা দলিল, কিন্তু একমাত্র নয়। কিন্তু বেসরকারি বিশ্ববিদ্যালয়ের ছদ্মবেশে প্রচুর মিলিটারি বিশ্ববিদ্যালয় আছে এখন। সেগুলো নিয়ে স্বতন্ত্র বিশ্লেষণ আছে আমার।   

দেশ রূপান্তর : শিক্ষক রাজনীতিকে অনেকে ছাত্ররাজনীতির বর্ধিত রূপ বলে মনে করেন, আপনার মত কী?

মানস চৌধুরী : স্থূলবিচার এটা। দুটোর গতিপ্রকৃতি ও প্রেষণা সম্পূর্ণ আলাদা। শিক্ষকদের স্বার্থগুলো হলো ক্যাম্পাসপদ, ‘উন্নয়ন’ বাজেট, ‘রিসার্চ ফান্ড’, বিদেশ ভ্রমণ। আমার মনে হয় না যে, আমি সরাসরি বললাম বলে ত্রুটিপূর্ণ বললাম। শিক্ষার্থীদের স্বার্থ হলো হল দখল (ক্রেডিবিলিটি), মাদক ও অন্যান্য খুচরা ব্যবসা, কেন্দ্রীয় পদপ্রাপ্তি। অন্যদিকে শিক্ষকদের কিছু অকহতব্য যোগসাজশ আছে অন্য দুয়েকটা পেশাজীবীদের সঙ্গে, এটা রাষ্ট্রীয় প্যাটার্ন নয়, আঞ্চলিক হওয়ারই সম্ভাবনা বেশি। গুণ্ডাছাত্ররা সেখানে মূলত এজেন্ট বা দালালির কাজ করে। পরিপূরক বললে একটা পর্যায় পর্যন্ত মানব। কিন্তু ‘বর্ধিত’ নয়, খুব স্বতন্ত্র।

দেশ রূপান্তর : বদরুদ্দিন উমর, মুজাহিদুল ইসলাম সেলিম কিছুদিন আগে ভিন্ন প্রসঙ্গের এক লেখায় শ্রমিক রাজনীতির কথা বলেছেন। তাদের বক্তব্যের মূল সুর ছিল  আগে ছাত্ররা আন্দোলনের নেতৃত্ব দিয়ে শ্রমিক, পেশাজীবীদের রাস্তার সংগ্রামে নিয়ে এসেছে। এখন শ্রমিকদের ডাকে ছাত্ররা আসবে। আপনার মন্তব্য কী?

মানস চৌধুরী : আমি তাদের এই রচনাগুলো দেখিনি। তবে শুনতে মিষ্টি। কিন্তু [অতীতে] ‘ছাত্ররা আন্দোলনের নেতৃত্ব দিয়েছে’ এই ন্যারেটিভটা ক্লিষ্ট এবং সন্দেহযোগ্য; বা অন্তত পক্ষপাতদুষ্ট। সেটা সেলিম সাহেবের তুলনায় উমর সাহেবের মুখে/কলমে বেশি বেমানান লাগছে। কিন্তু যা হোক, সর্বাত্মক শ্রমিক রাজনীতি বিনাশের মধ্য দিয়ে কেবল গার্মেন্ট শ্রমিকদের মরিয়া মরতে-থাকা টিকে আছে তো এর মধ্যে এই আশাবাদকে কোথায় রাখব আমি অনিশ্চিত।