গরুর মাংস রপ্তানি নিয়ে গত কয়েক বছর ধরে বাংলাদেশের সঙ্গে আলোচনা চালিয়ে যাচ্ছে লাতিন আমেরিকার দেশ ব্রাজিল। এতে বাংলাদেশের পক্ষ থেকেও অনেক আগেই ইতিবাচক সাড়া দেওয়া হয়েছে। সবশেষ গতকাল রবিবার ব্রাজিলের পররাষ্ট্রমন্ত্রী মাউরো ভিয়েরার সফরেও এ বিষয়ে আগ্রহ প্রকাশ করা হয়েছে। ব্রাজিল মাংস রপ্তানিতে আগ্রহী হলেও বাংলাদেশ চাইছে গরু আমদানির সুযোগ। একই সঙ্গে ব্রাজিল থেকে গরু আমদানির পর মাংস প্রক্রিয়াজাত করে এশিয়ার দেশগুলোতে রপ্তানির প্রস্তাবও দিয়েছে ঢাকা। ব্রাজিলের পররাষ্ট্রমন্ত্রীর সঙ্গে বাণিজ্য প্রতিমন্ত্রী আহসানুল ইসলাম টিটুর বৈঠকে এ বিষয়টি উঠে এসেছে।
দেশে কয়েক মাস ধরেই আলোচনায় আছে গরুর মাংসের দাম। অনেকেই মনে করেন, ভারত থেকে গরু আমদানি বন্ধ থাকার সুযোগে দেশে গরুর মাংসের দাম ব্যাপকভাবে বাড়িয়ে দিয়েছেন একশ্রেণির বিক্রেতা। গত ১০ বছরে দেশে গরুর মাংসের দাম বেড়েছে আড়াইগুণ। ২০১৪ সালেও গরুর মাংস কেজিপ্রতি বিক্রি হতো ৩০০ টাকায়। উৎসবে আয়োজনে এখন সেটি ৭৫০ টাকাও ছাড়িয়ে যায়। দেশে গরুর উৎপাদন বাড়লেও চাহিদার তুলনায় সরবরাহ সংকট রয়েছে। ফলে কোনোভাবেই গরুর মাংসের দাম নিয়ন্ত্রণে রাখতে পারছে না সরকার। তবে গবাদি পশুর উৎপাদন বাড়া সত্ত্বেও আবারও কেন গরুর মাংস আমদানিতে ঝুঁকছে বাংলাদেশ এ প্রশ্নও উঠেছে।
সংশ্লিষ্ট বিশ্লেষক ও সরকারপক্ষ বলছেন, দেশে গরুর মাংসের উৎপাদন এখনো চাহিদার তুলনায় অপ্রতুল। এ কারণে গত এক দশকে কোনোভাবেই এর দাম নিয়ন্ত্রণ করতে পারেনি সরকার। ব্রাজিলের কাছ থেকে গরু আমদানির পর মাংস প্রক্রিয়াজাত করে সেটি এশিয়ার অন্যান্য দেশে রপ্তানি করতে পারলে নতুন বাণিজ্যের দ্বার খুলবে।
তারা বলছেন, যখন ভারত থেকে গরু আমদানি করা হতো তখন গরুর মাংসের দাম কম ছিল। বর্তমানে বাংলাদেশে এক কেজি গরুর টাকারও বেশি; কিন্তু ভারতে ২৫০ টাকা। তাছাড়া বাংলাদেশ চাল, চিনি, তেল, পেঁয়াজ, ডালসহ অনেক ভোগ্যপণ্যই আমদানি করে থাকে। কাজেই ব্রাজিল থেকে আমদানির সিদ্ধান্ত অবশ্যই ইতিবাচক হবে। দেশটির সঙ্গে নতুন করে একটি কূটনৈতিক বাণিজ্যিক সম্পর্কও গড়ে উঠবে। এখন এ ব্যাপারে বাংলাদেশের পক্ষ থেকে কতটা সুবিধা নেওয়া যায়, তাই দেখা উচিত।
কনজ্যুমার্স অ্যাসোসিয়েশন অব বাংলাদেশের (ক্যাব) ভাইস প্রেসিডেন্ট এসএম নাজির হোসেন দেশ রূপান্তরকে বলেন,‘প্রথমদিকে আমরা বলেছিলাম দেশে উৎপাদন বাড়িয়ে আমদানিনির্ভরতা কমানোর কথা। কিন্তু আমরা দেখছি ভোক্তার চাহিদা অনুযায়ী এখনো উৎপাদনে স্বয়ংসম্পূর্ণ হইনি। পাশাপাশি গরুর মাংসের দাম দিন দিন বেড়েই চলেছে। এখানেও একটি বাজার সিন্ডিকেট তৈরি হয়েছে। ফলে আমরা এখন আর আমদানির কোনো বিকল্প দেখছি না। ভোক্তার সুবিধার কথা চিন্তা করে মাংস আমদানি করার সিদ্ধান্ত ইতিবাচক। আর ব্রাজিল থেকে গরু আমদানি করে যদি সেটি প্রক্রিয়াজাত করে এশিয়ার অন্যান্য দেশে বাংলাদেশের পক্ষ থেকে রপ্তানি করা যায়, তা নতুন একটি বাণিজ্যিক দ্বার উন্মোচন হবে বলেও আমি মনে করি।’
পররাষ্ট্র ও বাণিজ্য মন্ত্রণালয়ের সূত্র বলছে, এ বছর কোরবানির ঈদের আগেই ব্রাজিল থেকে মাংস আমদানির বিষয়টি সুরাহা হবে। আসছে জুলাইতে প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার সফরে ব্রাজিলের সঙ্গে বাংলাদেশের বাণিজ্যিক ও কূটনীতিক সম্পর্কের নতুন নতুন দ্বার উন্মোচনেরও সম্ভাবনা রয়েছে।
সংশ্লিষ্টরা বলছেন, ২০১৪ সালে ভারত গরু রপ্তানি বন্ধের ঘোষণা দেওয়ার পর গত ১০ বছরে দেশে গরুর মাংসের দাম বেড়েই চলেছে। এরপরও সরকার আমদানির বিকল্প বাজার না খুঁজে উৎপাদন বাড়িয়ে চাহিদা পূরণের উদ্যোগ নেয়। দেশজ উৎপাদন বাড়লেও সঙ্গে সঙ্গে চাহিদাও বেড়েছে। ফলে নানা পদক্ষেপ নেওয়ার পরও গত ছয় বছরে গরুর মাংসের দাম নিয়ন্ত্রণে আনতে পারেনি সরকার। এর মধ্যে ২০১৯ সালে গরুর মাংস আমদানির জন্য বিকল্প বাজার খোঁজা শুরু হয়। ওই বছরের শেষদিকে সাবেক বাণিজ্যমন্ত্রী টিপু মুনশির নেতৃত্বে একটি প্রতিনিধিদল ব্রাজিলসহ চারটি দেশ সফর করে। ওই সফরেই ব্রাজিল থেকে গরুর মাংস আমদানির ব্যাপারে আলোচনা হয়। বাংলাদেশের পক্ষ থেকে গরুর মাংসের ওপর শূন্য শতাংশ শুল্ক আরোপের কথা বলা হয়। এরপর ব্রাজিলও এ ব্যাপারে কূটনৈতিক আলোচনা অব্যাহত রাখে।
জানা গেছে, ব্রাজিলের গরুর মাংসের সবচেয়ে বড় আমদানিকারক দেশ চীন। গত কয়েক বছরে ব্রাজিলের মাংসের আমদানির পরিমাণ বেড়েছে চীনে। ২০১৬ সালে চীন আমদানি করত ৭০ কোটি ২৭ লাখ ডলারের মাংস। ২০১৮ সালে তা বৃদ্ধি পেয়ে দাঁড়িয়েছে ১৪৯ কোটি ডলার। ব্রাজিল থেকে মাংস আমদানিকারক শীর্ষ দেশগুলোর মধ্যে রয়েছে মিসর, ইরান, সৌদি আরব, সংযুক্ত আরব আমিরাত, চিলি, হংকং, নেদারল্যান্ডস, ইতালি ও ফিলিপাইন। এর মধ্যে চারটি দেশই মুসলিম।
ক্যাবের তথ্যমতে, ২০১৪ সালে দেশে এক কেজি গরুর মাংসের দাম ছিল ৩০০ টাকা। ওই বছর ভারত রপ্তানি বন্ধ করে দেয়। এরপর সরবরাহ সংকটে বাংলাদেশে প্রতি বছরই গরুর মাংসের দাম বাড়তে থাকে। গত ১০ বছরে প্রাণিজ মাংসের এ উৎসটির দাম বেড়েছে ১৫০ শতাংশ। ২০১৩ সালে ভারত থেকে গরু আমদানি হয়েছিল ২৩ লাখ।
এদিকে সরকারের হিসাব বলছে, ২০১৩ সালে দেশে উৎপাদিত গরুর সংখ্যা ছিল ২ কোটি ৩৫ লাখ। এর পরের বছর ভারত গরু রপ্তানি নিষিদ্ধ করলে বাংলাদেশ আমদানিনির্ভরতা কাটাতে গবাদি পশু উৎপাদনে জোর দেয়। ২০২২-২৩ অর্থবছরে উৎপাদন হয়েছে ২ কোটি ৪৯ লাখ গরু। আমদানির সংখ্যাসহ স্থির চাহিদা বিবেচনা করা হলেও গরুর ঘাটতি থাকে এখনো ৩০ লাখ। ফলে মাংসের চাহিদা যেকোনো সময়ের চেয়ে এখন বেশি।
এদিকে গতকাল সফররত ব্রাজিলের পররাষ্ট্রমন্ত্রীর সঙ্গে বৈঠকের পর গরুর মাংস আমদানির বিষয়ে বাণিজ্য প্রতিমন্ত্রী বলেছেন, ব্রাজিল অত্যন্ত কম দামে বিভিন্ন দেশে গরুর মাংস সরবরাহ করে। বাংলাদেশেও তারা ব্যবসা করতে চায়। সে বিষয়ে তারা কথা বলেছে। আগামী কোরবানির ঈদ সামনে রেখে আমি তাদের অনুরোধ করেছি যদি সস্তাই হয়, তবে জীবন্ত গরু আনার ব্যবস্থা করা যায় কি না।
তিনি আরও বলেন, ‘ব্রাজিল মাংস প্রক্রিয়াজাতকরণে জোর দিয়েছে। আমরা চাই, শুধু বাংলাদেশের বাজার নয়, তারা যাতে বাংলাদেশে প্রক্রিয়া করার পর গোটা এশিয়াতে রপ্তানি করে, সেটির বিষয়ে তাদের আমরা উৎসাহিত করেছি।’
এদিকে গরুর মাংস আমদানির খবরে মাংসব্যবসায়ী ও সংশ্লিষ্ট খামারিরা কিছুটা নাখোশ। তবে ভোক্তারা খুশি। গতকাল বিকেলে রাজধানীর হাতিরপুল এলাকার একটি দোকানে ঈদ উপলক্ষে গরুর মাংস কিনতে এসেছেন ক্রেতারা। কেজি কত জানতে চাইলে দোকানি বললেন ৭৮০ টাকা। কালকে (আজ) আরও বাড়বে বলে দোকানদার মাথা নিচু করে মাংস টুকরো শুরু করেন। এক থেকে শুরু করে দশ কেজির অর্ডার। বিরক্তি নিয়ে ক্রেতারা অর্ডার করছেন। কিন্তু উপায় নেই বাঙালির ঈদ উৎসবে গরুর মাংস থাকতেই হবে।
সেন্ট্রাল রোডের বাসিন্দা রইস উদ্দিন পাঁচ কেজি মাংসের অর্ডার দিলেন। দোকানিকে বললেন, সরকার ৬৬৪ টাকা দাম ঠিক করেছে। কিন্তু আপনারা ৭৫০ টাকা বিক্রি করছেন। আমি ৭৫০ টাকাই দেব। কিন্তু দোকানদার ৭৮০ টাকায় অটল। রইস উদ্দিন বললেন, আর দুই মাস পর ৫০০ টাকার নিচে বিক্রি করবে তোমরাই। ব্রাজিল থেকে মাংস আমদানি হচ্ছে। দোকানি খেপে বললেন, মাংস আমদানি হবে না। গরুর তাজা মাংস আর সুদূর থেকে আসা বাসি মাংস এ দেশের মানুষ খাবে না।
রমজানের আগে সরকার প্রতি কেজির গরুর মাংসের দাম নির্ধারণ করে দিয়েছিল ৬৬৪ টাকা। যদিও এ দামে কোথাও বিক্রি হয়নি। রমজানের আগে থেকেই ৭৫০ টাকায় প্রতি কেজি বিক্রি হচ্ছিল।