‘টেহা মিল করতে পারলে চান রাইতে জামা কিনমু’

এবারের ঈদ আনন্দের বার্তা নিয়ে আসেনি চাঁদপুরের জেলে পল্লীগুলোতে। নদীতে মাছ ধরায় দুই মাসের নিষেধাজ্ঞা থাকায় বেকার সময় কাটছে জেলেদের। কাজ না থাকায় বন্ধ আয়ের পথ।

সংসারে দুবেলা খাবার জোটাতেই হিমশিম খাওয়া জেলেদের স্ত্রী-সন্তানদের নতুন জামা কাপড় দেয়ার স্বপ্ন, স্বপ্নই রয়ে গেল। দুই সন্তানকে কথা দিয়ে ছিলেন, এই ঈদে তাদের পছন্দের পোশাক কিনে দিবেন বিল্লাল। কিন্তু জাটকা রক্ষায় চলা দুই মাসের অভিযানে বেকার সময় কেটেছে উল্লেখ করে বিল্লাল বলেন, ‘কোনো মতে ধার দেরা কইরা সংসারটা চলতেছে। ঠিকমত দুই বেলা খাওন যোগানোর নিশ্চয়তা নাই, স্ত্রী সন্তানদের কেমনে ঈদের নতুন পোশাক কিন্না দিমু। মনডারে কোন মতেই মানাইতে পারি না। বছর ঘুইরা একটা ঈদ আসে, হেও কিছু করতে পারলাম না।

সন্তানদের পাতে একটু নাস্তা কিংবা সেমাই তুলে দিতে পারবেন কি না তা নিয়েও অনিশ্চিতা রয়েছে জেলের স্ত্রী পারভিন বেগমের। তিনি বলেন, ‘মাইয়াডা কত আবদার করে। চুড়ি কিন্না দেও, লিপস্টিক কিন্না দেও। হের লগের পোলাপাইন আগেই নতুন জামা কাপড় কিন্নালাইছে, হেডিন আয়া আমগো কাছে কয়। খুব কষ্ট লাগে। আমি নয়তো নাই নিলাম, পোলাপানগোও কিছু দিতে পারি নাই আমরা। তয় মাইয়ার লইগ্যা একটা জামা সিলাইতে দিছি, টেহা মিল করতে পারলে চান রাইতে জামা আনুম।’

চাঁদপুর সদর উপজেলায় বসবাসকারী শুধু বিল্লাল দম্পতিই নয়, একই পরিস্থিতি মাছ ধরে জীবিকা নির্বাহ করা প্রায় অর্ধলক্ষাধিক জেলে পরিবারের। জাটকা রক্ষায় চাঁদপুরের পদ্মা—মেঘনাসহ দেশে ইলিশের ৬টি অভয়াশ্রমে গত ১ মার্চ থেকে চলছে ২ মাসের নিষেধাজ্ঞা কার্যক্রম। এই সময়টাতে নদীতে সকল ধরনের মাছ ধরার নিষেধাজ্ঞা থাকায় বেকার সময় কাটছে জেলেদের। আয়ের পথ বন্ধ হয়ে যাওয়ায় মানবেতর জীবন কাটছে তাদের।

সদর উপজেলার হরিনা ফেরীঘাট এলাকার জেলে মিজান মিয়া বলেন, ‘নিষেধাজ্ঞাকালীন সময়ে আমরা পুরা বেকার। কেউ কেউ জাল আর নৌকা মেরামত কইরা সময় কাটাইছে। অনেকে পেডের দায়ে প্রশাসনের চোখ ফাঁকি দিয়া গাঙ্গ নামছে মাছ ধরতে। তয় আইন—শৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর হাতে ধরা পইরা অনেকেই সাজা খাটছে কারাগারে। আমরা অনেক কষ্টে আছি।’

এ বছর জেলায় নিবন্ধিত ৪০ হাজার ৫ জন জেলেকে নিষিদ্ধকালীন সময়ে ৪০ কেজি করে ৪ মাস চাল দেয়া হবে। এরমধ্যে ২ মাসের চাল বিতরণ করা হয়েছে। প্রয়োজনের তুলনায় এই সাহায্য অনেক কম। ঈদের খুঁশি ছড়িয়ে দিতে সরকারি সহায়তার পাশাপাশি বিত্তবানদেরও এগিয়ে আসার আহ্বান মৎস্যজীবী নেতা ও জনপ্রতিনিধিদের।

চাঁদপুর জেলা কান্ট্রি ফিসিং বোট মালিক সমিতির সভাপতি মো. শাহ আলম মল্লিক বলেন, সরকার যে চাল দেয় তা দিয়ে জেলেদের সংসার চলে না। তার উপর এ বছর এই নিষিদ্ধকালীন সময়ে এসেছে ঈদ। বেকার জেলেরা অনেক কষ্টে আছেন। সরকারি সহায়তা বাড়ানোর পাশাপাশি বেসরকারীভাবে সহায়তা করা হলেও জেলেরা অনেক উপকৃত হতো।

চাঁদপুর সদর উপজেলার রাজরাজেশ্বর ইউনিয়নের চেয়ারম্যান হযরত আলী বেপারী বলেন, সরকার যে সহায়তা পাঠিয়েছে, তা আমরা বিতরণ করেছি। ইতমধ্যে দুই মাসের চাল জেলেদের দেওয়া হয়েছে। বাকি দুই মাসের চাল বিতরণ করা হবে। তবে আমি একজন জনপ্রতিনিধি হিসেবে সরকারের কাছে জেলেদের সহায়তা বৃদ্ধির জন্য দাবি জানাই। যাতে করে তারা আরেকটু ভালোভাবে বাঁচতে পারে।