ভারতের লোকসভা ভোট যত ঘনিয়ে আসছে পশ্চিমবঙ্গের রাজনৈতিক পরিস্থিতি যেন ততই উত্তপ্ত হচ্ছে। এর আঁচ থেকে রেহাই পাচ্ছে না বনগাঁ অঞ্চলের মতুয়া জনগোষ্ঠীর ঠাকুরবাড়ি। ভারতের নির্বাচন কমিশন লোকসভা ভোটের সময়সূচি প্রকাশের আগে দেশটির সরকার সংশোধিত নাগরিকত্ব আইন (সিএএ) চালু করলেও মতুয়ারা আলোচনার কেন্দ্রে চলে আসে। বর্তমানে পশ্চিমবঙ্গের শাসক দল তৃণমূল কংগ্রেস এবং কেন্দ্রের শাসক ভারতীয় জনতা জনতা পার্টির (বিজেপি) রাজনৈতিক বিভেদ মতুয়া ঠাকুরবাড়ির অন্দরে প্রবেশ করেছে। মতুয়া ধর্মগুরু হরিচাঁদ ঠাকুর ও গুরুচাঁদ ঠাকুরের বংশধরদের বিবাদে কয়েকদিন ধরে উত্তপ্ত বনগাঁ।
২০১৯ সালের লোকসভা নির্বাচনের আগ দিয়ে বিজেপিতে যোগ দিয়ে বনগাঁ লোকসভা কেন্দ্রের প্রার্থী হন ঠাকুরবাড়ির সন্তান শান্তনু ঠাকুর। পরবর্তী সময়ে তিনি কেন্দ্রীয় জাহাজ প্রতিমন্ত্রীর দায়িত্ব পান। এবারও তিনি প্রার্থী হয়েছেন বনগাঁ থেকে। এবার তার বিরুদ্ধে ‘শারীরিক নিগ্রহের’ অভিযোগ তুলেছেন তৃণমূল কংগ্রেসের রাজ্যসভা সাংসদ মমতাবালা ঠাকুর।
মতুয়া ধর্ম মহামেলা চলাকালেই গত রবিবার রাতে ধুন্ধুমার কান্ড বাধে বনগাঁর গাইঘাটার ঠাকুরনগরের মতুয়া ঠাকুরবাড়িতে। শান্তনুর বিরুদ্ধে তালা ভেঙে মতুয়াদের প্রয়াত বড়মা বীণাপাণি দেবীর ঘরের ‘দখল’ নেওয়ার অভিযোগ উঠেছে। মমতাবালার দাবি, বড়মার ঘরে ঢোকার সময় তাকে ও তার মেয়েকে ধাক্কা মেরে ফেলে দিয়েছেন শান্তনু। দেশে বিজেপির শাসনকালে একজন রাজ্যসভার সাংসদের ওপর যদি এমন ‘অত্যাচার’ হয়, তা হলে সাধারণ মহিলাদের কী অবস্থা হতে পারে আগামী দিনে, সেই প্রশ্ন তুলে আশঙ্কা প্রকাশ করেছেন মমতাবালা।
২০১৯ সালে মমতাবালা ঠাকুরকে হারিয়ে এমপি নির্বাচিত হন শান্তনু। তিনি সম্পর্কে শান্তুনুর জেঠিমা হন। এবার তৃণমূল বনগাঁ থেকে প্রার্থী করেছে বিশ্বজিৎ ঘোষকে। মমতাবালা ঠাকুর মতুয়াদের ভোট তৃণমূল প্রার্থীর দিকে টানতে চাইছেন।
এ অবস্থায় হামলার বিষয়ে শান্তনু এখনো মুখ খোলেননি। তবে তিনি ঘটনার দিন গণমাধ্যমকে বলেন, ‘বীণাপাণি দেবীর ঘরে আমার প্রবেশের অধিকার রয়েছে। মমতাবালা ঠাকুরের যতখানি অধিকার, আমার মা ছবি রানি ঠাকুরেরও ততখানি অধিকার রয়েছে।’ তবে এ নিয়ে কথা বলেছেন বিজেপির রাজ্য সভাপতি সুকান্ত মজুমদার। তার ভাষ্য, ‘ঠাকুরবাড়িতে কী হয়েছে, সে ব্যাপারে বলে দিয়েছেন আমাদের প্রার্থী তথা দেশের মন্ত্রী। কিন্তু মহিলাদের ওপর নির্যাতন নিয়ে সন্দেশখালি কান্ডের পর তৃণমূলের আর মুখ খোলাই উচিত নয়।’
সনাতন ধর্মের বর্ণপ্রথার বাইরে অবস্থান করা জনগোষ্ঠীর মানুষ এই মতুয়ারা। বাংলাদেশের গোপালগঞ্জ, ফরিদপুর, যশোর, খুলনাসহ আরও অনেক এলাকায় শত শত বছর ধরে মতুয়াদের বাস ছিল। গোপালগঞ্জের ওড়াকান্দি তাদের তীর্থ যেখানে হরিচাঁদ ঠাকুরের অবস্থান ছিল। ব্রিটিশ ঔপনিবেশিক শাসনের পর বড় অংশের মতুয়া জনগোষ্ঠী ভারতে চলে যায়। আবার বাংলাদেশের মুক্তিযুদ্ধের সময় কিংবা এর আগে-পরেও অনেকে চলে যায়। এসব মানুষ পশ্চিমবঙ্গের বনগাঁ ও রানাঘাট অঞ্চলে বসতি গেড়েছেন। এ বাইরেও ভারতের ওড়িশা, আসাম, ত্রিপুরা, উত্তরপ্রদেশ ও আন্দামানেরও বহু মতুয়ার বসবাস। তবে ভারতে মতুয়াদের প্রাণকেন্দ্র। বনগাঁ ও রানাঘাট লোকসভায় মতুয়ারাই ভোটের ফল নির্ধারণ করেন। অন্যান্য আরও কয়েকটি লোকসভায়ও তারা বড় প্রভাব ফেলেন। বিধানসভা হিসেবে ১০-১২টিতে তারাই নির্ণায়ক। সেই কারণে রাজনৈতিক দলগুলো মতুয়াদের ভোটব্যাংক হিসেবে দেখে।
বিজেপি আশ্বাস দিয়ে আসছিল, বাংলাদেশ থেকে আসা উদ্বাস্তুদের নাগরিকত্ব দিতে সিএএ চালু হয়েছে। সিএএ চালুর পর মতুয়াদের ভোটে জোয়ার দেখার আশায় রয়েছে বিজেপি। অন্যদিকে তৃণমূল প্রধান মুখ্যমন্ত্রী মমতা বন্দ্যোপাধ্যায় বলছেন, সিএএতে আবেদন করা মানে নিজেকে ‘অ-নাগরিক’ ঘোষণা করা। মূলত রাজ্যে তৃণমূল ও বিজেপির মধ্যে মতুয়াদের কেন্দ্র করে সিএএ বিতর্ক এখন তুঙ্গে। ভোটের সময় যত ঘনিয়ে আসছে ঠাকুরবাড়ির অন্দরে এই বিবাদ যেন ক্রমশ জটিল হচ্ছে।