ঈদ বোনাস চালু করেছেন হুসেইন মুহাম্মদ এরশাদ

এখন প্রায় সবাই বোনাস বা উৎসব ভাতা পান। সব সরকারি-বেসরকারি চাকরিজীবী বোনাসের আওতায়। মোড়ের দোকানের যে কর্মচারী তাকেও বোনাস দিতে হয়। বোনাস থেকে বাদ যান না বাড়ির কাজের লোকটিও। রোজ সকালে দরজার নিচ দিয়ে খবরের কাগজ ঠেলে দেওয়া হকারও বিলের সঙ্গে উৎসব ভাতার দাবি জানান। রিকশাচালক থেকে শুরু করে গণপরিবহনকর্মীরাও বোনাসের জন্য হাত বাড়ান।

বিপুল জনপ্রিয় এই বোনাস কিন্তু খুব বেশি দিন আগে চালু হয়নি। আজ যা উৎসবের অন্যতম অনুষঙ্গ তা দেশ স্বাধীন হওয়ার পরও ছিল না। স্বাধীনতার প্রায় দেড় দশক পার হওয়ার পর ১৯৮৪ সালে বোনাস চালু হয়।

কীভাবে বোনাস এসেছে জানতে চাইলে জনপ্রশাসন বিশেষজ্ঞ ফিরোজ মিয়া দেশ রূপান্তরকে বলেন, 'বোনাস চালু করেছেন হুসেইন মোহাম্মদ এরশাদ। পরে তা ব্যাপক জনপ্রিয়তা পায়।'

কেন বোনাস চালু করা হলো বা বোনাস চালু করার প্রয়োজন কেন দেখা দিল-জানতে চাইলে শতাধিক গ্রন্থের লেখক ও সরকারের সাবেক এই অতিরিক্ত সচিব বলেন, 'বোনাস চালু হয়েছে সরকারি কর্মকর্তা কর্মচারীদের সাপোর্ট দেওয়ার জন্য। আগে এত মূল্যস্ফীতি ছিল না। দ্রব্যমূল্যের তুলনায় পে-স্কেলগুলো ভালো ছিল। কিন্তু কালক্রমে মূল্যস্ফীতি বেড়ে যায়। এক সময় সরকারি কর্মকর্তা-কর্মচারীদের আর্থিক সহায়তা দেওয়ার প্রয়োজন দেখা দিলো। সেই প্রয়োজন নানাভাবে মেটানো হয়েছে। এরমধ্যে একটি হচ্ছে বোনাস বা উৎসব ভাতা।'

এরশাদ সরকারের সময় শুরুতে হাফ বোনাস অর্থাৎ বেসিকের অর্ধেক বোনাস হিসেবে দেওয়া হতো। পরে তা ফুল বোনাস অর্থাৎ পুরো বেসিকটাই বোনাস হিসাবে পেতেন সরকারি কর্মকর্তা কর্মচারীরা। ওই সময় তৃতীয় ও চতুর্থ শ্রেণির কর্মচারীদের সঙ্গে প্রথম ও দ্বিতীয় শ্রেণির কর্মকর্তাদের বোনাস ও শ্রান্তি বিনোদন ভাতায় একটু পার্থক্য ছিল। শ্রান্তি বিনোদন ভাতা তিন বছর পর পর পাওয়া যায়। কিন্তু যে বছর প্রথম ও দ্বিতীয় শ্রেণির কর্মকর্তারা শ্রান্তি বিনোদন ভাতা ওঠাতেন সে বছর তারা বোনাস পেতেন না। কিন্তু তৃতীয় ও চতুর্থ শ্রেণির কর্মচারীরা যে বছর শ্রান্তি বিনোদন ভাতা পেতেন সে বছর বোনাসও পেতেন। কিন্তু এখন সে নিয়ম তুলে দেওয়া হয়েছে। এখন তিন বছরের মাথায় সব শ্রেণির কর্মকর্তা-কর্মচারীরা শান্তি বিনোদন ভাতা পান। আবার ধারাবাহিকভাবে বোনাসও পেয়ে থাকেন।

প্রজাতন্ত্রের কর্মচারীরা ধর্মীয় উৎসবে বোনাস পান। মুসলমানরা দুই ঈদে দুটি বোনাস পান। সনাতন ধর্মাবলম্বীরা বোনাস পান সার্বজনীন দুর্গোৎসবে। একইভাবে বৌদ্ধ খ্রিষ্টানরাও তাদের প্রধান ধর্মীয় উৎসবে বোনাস পান। মুসলমানরা দুই ঈদে মূল বেতনের সমান দুটি বোনাস পান। অন্য ধর্মাবলম্বীরা এক ধর্মীয় উৎসবেই দুটি মূল বেতনের সমান বোনাস পান। 

বোনাস চালুর আগে প্রজাতন্ত্রের কিছু কর্মচারীদের প্রয়োজনে তাদের আবেদনের ভিত্তিতে এক মাসের স্যালারি অ্যাডভান্স দেওয়া হতো। পরের বারো মাসে তা সমন্বয় করা হতো। বোনাস চালু হওয়ার পর স্যালারি অ্যাডভান্স বন্ধ হয়ে যায়। ফিরোজ মিয়া বলেন, 'এখনো বিভিন্ন প্রতিষ্ঠানের বিধি-বিধানে স্যালারি অ্যাডভান্সের বিষয়টি উল্লেখ আছে। কিন্তু বাস্তবে এর দেখা মেলা ভার।'

পাকিস্তান আমলে ষাটের দশকে শ্রমিকেরা প্রফিট বোনাস পেতেন বা তাদের ইনসেনটিভ দেওয়া হতো। কোম্পানি মুনাফা করলে এখনো তারা প্রফিট বোনাস পান। কিন্তু বোনাস অবধারিত। এখন বোনাস না পেলে শ্রমিকেরা রাস্তায় নেমে আসেন। এবারের ঈদের আগেও গাজীপুরের কোনাবাড়িতে শ্রমিকেরা বকেয়া পাওনা ও বোনাসের দাবিতে রাস্তা অবরোধ করেছেন। পরে তাদের বোনাসের নিশ্চয়তা দেওয়ার পর অবরোধ তুলে নিয়েছেন। 

বেসরকারি প্রতিষ্ঠানে এক বছর কাজ করলে মূল বেতনের সমান বোনাস পাওয়া যায়। ইদানীং এক বছরের কম সময়ে কাজ করলেও নির্দিষ্ট অনুপাতে বোনাস দিতে দেখা যায় বিভিন্ন বেসরকারি প্রতিষ্ঠানকে।