ঈদে হাসুক গরিব-দুঃখীরাও

মাসব্যাপী সিয়াম সাধনার পর আনন্দের বার্তা নিয়ে উদিত হলো ঈদের চাঁদ। বছর শেষে প্রতিবারের ন্যায় আবারও ফিরে এলো খুশির ঈদ। ঈদ আসে শত্রুতা ও বৈরিতার প্রাচীর ডিঙিয়ে বন্ধুত্ব ও মিত্রতার সম্পর্ক তৈরি করতে। ঈদ আসে মহামিলনের মহোৎসবে মুমিনহৃদ মাতিয়ে তুলতে এবং পরিশোধিত হৃদয়ে পরিতৃপ্তির ছোঁয়া লাগাতে। ঈদের শিক্ষা হচ্ছে মানুষ মানুষের পাশে দাঁড়াবে, মানুষ মানুষকে বুকে টেনে নিবে। ধনী-গরিব, উঁচু-নিচু ও ছোট-বড় ব্যবধান ভুলে একে অপরের মুখে হাসি ফোঁটাবে।
 
ঈদে গরিব-দুঃখীদের খোঁজ নিন : আসন্ন এই ঈদ আনন্দ সবার মাঝে ছড়িয়ে দিতে বিত্তশালী ও সামর্থ্যবানরা এগিয়ে আসুন। ঈদের এই আনন্দোৎসবকে আরও রঙিন করতে গরিব ও অসহায়দের দিকে সাম্যের হাত বাড়িয়ে দিন। শহরের আবর্জনার সঙ্গে বেড়ে ওঠা কিংবা রেলস্টেশনে পড়ে থাকা সুবিধাবঞ্চিত শিশু-কিশোরদের সাধ্যানুযায়ী কেনাকাটা করে দিন, তাদের সঙ্গে ঈদের আনন্দ ভাগাভাগি করে নিন।
 
বয়স্কদের খোঁজ নিন : যারা বয়স্ক, বয়সের ভারে ন্যুব্জ, তাদের দিকে ভালোবাসার দৃষ্টিতে তাকাই। এদের কারও প্রতি কোনো করুণা নয় বরং সামাজিক দায়বদ্ধতা থেকেই এগিয়ে যাই। নিজেদের ঈদের কেনাকাটার কিছু অংশ তাদেরও দিই।
 
অসুস্থদের ভুলে না যাই : ঈদ উৎসব পালনকালে সেই সব ভাই-বোনদের কথাও আমাদের মনে রাখতে হবে, যারা অসুস্থ হয়ে বাড়িতে কিংবা হাসপাতালে পড়ে আছে। ব্যথা, যন্ত্রণা ও মানসিক পীড়নে ঈদের আনন্দ যাদের মাটি হয়ে গেছে। নতুন পোশাক কেনা দূরে থাক, পুরোনো কোনো ভালো পোশাকও যাদের নেই। আমরা যারা সচ্ছল আছি, এদের মুখে হাসি ফোটানোর চেষ্টা করি। সেবা শুশ্রূষা করে হোক, আর্থিক সহযোগিতার মাধ্যমে হোক, এদের পাশে দাঁড়ানোর চেষ্টা করি। মহান আল্লাহ বলেন ‘নিজেদের কল্যাণের জন্য তোমরা যে উত্তম কাজ করে থাকো, তার পুরস্কার আল্লাহর কাছে পাবে।’ -সুরা বাকারা ১১০
 
ইসলামের শিক্ষা : দুঃখী মানুষের কল্যাণে এগিয়ে আসা, বিপদগ্রস্ত লোকদের দিকে সাহায্যের হাত বাড়িয়ে দেওয়া হল ফিতরাত। এটিই মানুষের স্বভাবজাত প্রকৃতি। সে-ই প্রকৃত মানুষ, যে অন্য মানুষের দুঃখে দুঃখী হয়। বিপদগ্রস্তের কষ্ট লাঘবে এগিয়ে আসে। মানুষকে বলা হয় ইনসান। কেউ কেউ বলেছেন, ইনসান শব্দটির মূল ধাতু হচ্ছে উনস, যার অর্থ ভালোবাসা, দরদ, মমতা। অর্থাৎ ইনসানকে ইনসান বলা হয় ‘উনসের’ (সদয় হওয়ার) কারণে।
 
তাই দুঃখী-দরদি মানুষের সেবা ও সহযোগিতায় এগিয়ে আসা মানুষের ফিতরাত তথা স্বভাবজাত বিষয়। ইসলাম যেহেতু ‘দ্বীনে ফিতরত’ তথা স্বভাবজাত ধর্ম, তাই মানবতার সর্বোচ্চ শিক্ষা রয়েছে ইসলামে। ইসলামের নবী হজরত মুহাম্মদ (সা.) ছিলেন মানবতার মুক্তির দূত। তিনি নিজে যেমন পরোপকারে সর্বাগ্রে থাকতেন তেমনি মুসলমানদের জন্য রেখে গেছেন কল্যাণকামিতা ও সহমর্মিতায় উদ্বুদ্ধকারী অনেক অমিয় বাণী।
 
রাসুল (সা.) বলেছেন, মুমিন মাত্রই একে অন্যের ভাই। এক মুমিন অপর মুমিনের মধ্যে এমন ভালোবাসা ও আন্তরিকতা থাকবে যে, পরস্পর একটি দেহের মতো মনে হবে। একজনের ক্ষতি আরেকজনকে ততটাই আহত করবে, মাথায় আঘাত পেলে যেমন সারা শরীর আহত হয়। বিপদগ্রস্ত ও অভাবের সময় একে অন্যের প্রতি আন্তরিকভাবে সহযোগিতার হাত প্রসারিত করবে। ইরশাদ হয়েছে, ‘দয়া, মায়া ও হৃদ্যতায় মুমিনদেরকে দেখবে এক দেহের মতো। কোনো এক অঙ্গ আক্রান্ত হলে তার সারা শরীর নির্ঘুম ও জরাক্রান্ত হয়ে পড়ে।’ -সহিহ বুখারি
 
নুমান (রা.) থেকে বর্ণিত, রাসুলুল্লাহ (সা.) এরশাদ করেছেন, ‘সব মুমিন এক দেহের মতো। যখন তার চোখে যন্ত্রণা হয়, তখন তার পুরো শরীরই তা অনুভব করে। যদি তার মাথা ব্যথা হয়, তাতে তার পুরো শরীরই বিচলিত হয়ে পড়ে।’ -সহিহ মুসলিম
 
সহযোগিতা যখন ধর্মীয় দায়িত্ব : সমাজের সুবিধাবঞ্চিত ও দুস্থদের পাশে দাঁড়ানো শুধু সামাজিক দায়িত্বই নয়, বরং এটা একজন মুসলিমের ধর্মীয় দায়িত্বও বটে। যেমন রাসুল (সা.) বলেছেন, ‘যে ব্যক্তির অতিরিক্ত বাহন জন্তু বা বাহনের খালি জায়গা আছে, সে যেন বাহনহীন ব্যক্তিকে তা দিয়ে সাহায্য করে। কোনো ব্যক্তির যদি অতিরিক্ত পাথেয় থাকে, সে যেন পাথেয়হীন ব্যক্তিকে তা দিয়ে সাহায্য করে। বর্ণনাকারী বলেন, নবীজি এভাবে আরও বহু সম্পদের কথা বলেছেন, তাতে আমাদের মনে হতে লাগল যে, প্রয়োজনের অতিরিক্ত সম্পদে আমাদের কোনো অধিকার নেই।’ -সহিহ মুসলিম
 
আত্মীয়-স্বজনের বাড়িতে যাই : সারা বছর কর্মব্যস্ততার কারণে আমরা অনেক আপনজনকেই ভুলে থাকি। খোঁজ-খবর নেওয়ার সময় সুযোগ হয়ে ওঠে না।। ঈদের উৎসবে অবসর যাপনের দিনগুলোতে আমরা আত্মীয়-স্বজনের খোঁজ নিই। তাদের বাড়িতে বেড়াতে যাই। সুখ-দুঃখের কথা শুনি। কেউ আর্থিক টানাপোড়েনে থাকলে সহযোগিতার হাত বাড়িয়ে দিই। 
 
জীবন চলার পথে বিভিন্ন পর্যায়ে কারও কারও ক্ষেত্রে সম্পর্কের অবনতি হতে পারে। ঈদের সময় পারস্পরিক মনোমালিন্য দূর করা ও সম্পর্ক সুদৃঢ় করার উত্তম সময়। হাদিসে এসেছে, রাসুল (সা.) বলেছেন, ‘কোনো মুসলিমের জন্য বৈধ নয় যে, তার ভাইয়ের সঙ্গে তিন দিনের বেশি সময় সম্পর্ক ছিন্ন রাখবে। তাদের অবস্থা এমন যে, দেখা সাক্ষাৎ হলে একজন অন্য জনকে এড়িয়ে চলে। এ দুজনের মাঝে ওই ব্যক্তি শ্রেষ্ঠ, যে প্রথম সালাম দেয়।’ -সহিহ মুসলিম
 
আগামী দিনগুলো সত্য, সুন্দর ও সৌন্দর্যমণ্ডিত হোক। হাসি-খুশি ও ঈদের অনাবিল আনন্দে প্রতিটি মানুষের জীবন পূর্ণতায় ভরে উঠুক। ব্যক্তি, পরিবার, সমাজ ও রাষ্ট্রীয় জীবনে মুসলমানদের আত্মশুদ্ধি, সৌহার্দ্য ও সম্প্রীতির পরিবেশ পরিব্যাপ্তি লাভ করুক— এটাই হোক ঈদ উৎসবের ঐকান্তিক কামনা। তাই আসুন, ঈদের নির্মল আনন্দ ছড়িয়ে দিই সবার মনে-প্রাণে।