কিশোরগঞ্জের শোলাকিয়ায় ঈদগাহ মাঠে নৃশংস জঙ্গি হামলার ঘটনার আজ আট বছর। ২০১৬ সালে ঈদুল ফিতরের দিন জঙ্গিরা ওই ঈদগাহে হামলা চালায়। ছেলে হত্যার বিচারের স্বপ্ন আঁকড়ে বেঁচে আছে নিহত আনসারুলের পরিবার। ঘটনায় জড়িতদের দ্রুত ফাঁসি চান আনসারুলের মা।
জানা যায়, ওই হামলার ঘটনায় করা মামলা বিচারাধীন রয়েছে। আনসারুল হক উপজেলার দৌলতপুর গ্রামের মৃত সিদ্দিকুর রহমানের ছেলে।
২০১৬ সালের ৭ জুলাই ছিল পবিত্র ঈদুল ফিতরের দিন। কিশোরগঞ্জের শোলাকিয়া ঈদগাহ মাঠের অদূরে আজিম উদ্দিন উচ্চ বিদ্যালয়ের পাশে পুলিশের ওপর হামলা চালায় জঙ্গিরা। তারা নির্মমভাবে চাপাতি ও কুড়াল দিয়ে কুপিয়ে হত্যা করে পুলিশ কনস্টেবল আনসারুলকে। সেই দুঃসহ স্মৃতি এখনো ভুলতে পারছেন না আনসারুলের মা রাবেয়া খাতুন।
প্রতি ঈদুল ফিতরের দিন ছেলে হত্যার স্মৃতিচারণ করতে গিয়ে ঈদ আনন্দই ম্লান হয়ে যায় আনসারুলের বৃদ্ধ মায়ের। ছেলে হত্যাকারীদের ফাঁসি চান তিনি। ওই ঘটনায় তার পুরো পরিবার তছনছ হয়ে গেছে। শোলাকিয়া ঈদগাহ মাঠের ঐতিহ্য ও মর্যাদা রক্ষায় দ্রুত এর বিচারকার্য শেষ করে দোষী ব্যক্তিদের শাস্তি নিশ্চিত করার দাবি জানিয়েছেন স্থানীয় বিশিষ্টজনেরা।
ওই দিন পুলিশের তল্লাশির সময় জঙ্গিরা গ্রেনেড হামলা করে। এ ছাড়া তাদের চাপাতির কোপে জহিরুল নামের একজন কনস্টেবল ঘটনাস্থলে মারা যায় আর আনসারুল হক চিকিৎসাধীন অবস্থায় ওইদিন মারা যান। ওই সময় আরও ১২ পুলিশ সদস্য আহত হন। পুলিশের সঙ্গে বন্দুকযুদ্ধে’ ঘটনাস্থলে জঙ্গি আবির রহমান মারা যান। উভয় পক্ষের গোলাগুলির মধ্যে নিজ বাসায় গুলিবিদ্ধ হয়ে মারা যান এলাকার গৃহবধূ ঝর্ণা রানী ভৌমিক।
এ ঘটনায় আটক করা হয় জঙ্গি শফিউল ও স্থানীয় তরুণ জাহিদুল ইসলাম ওরফে তানিমকে। পরে একই বছরের ৪ আগস্ট ময়মনসিংহের নান্দাইল উপজেলার ডাংরি এলাকায় র্যাবের সঙ্গে এক ‘বন্দুকযুদ্ধে’ শফিউল নিহত হন। হামলার তিন দিন পর ১০ জুলাই পাকুন্দিয়া থানার ওসি মোহাম্মদ সামসুদ্দীন বাদী হয়ে সন্ত্রাসবিরোধী আইনে কিশোরগঞ্জ মডেল থানায় একটি মামলা করেন।
এ ঘটনায় পুলিশ ২০১৮ সালের ১২ সেপ্টেম্বর আদালতে অভিযোগপত্র দাখিল করে। আর ২৮ নভেম্বর মামলার অভিযোগ গঠন করা হয়েছে। মামলাটি বর্তমানে কিশোরগঞ্জের স্পেশাল ট্রাইব্যুনাল-২ বিচারাধীন। মামলার মোট ২৪ জনকে আসামি করে অভিযোগপত্র দাখিল করা হয়। তাদের মধ্যে আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর অভিযানকালে ১৯ জন মারা যায়।
বৃহস্পতিবার বিকেলে জঙ্গি হামলায় নিহত আনসারুলের বাড়িতে গিয়ে দেখা যায়, তার মা ছেলের কবরের পাশে বসে আছেন। সাংবাদিক পরিচয় পেয়ে বিলাপ করে কান্না জরিত কণ্ঠে রাবেয়া খাতুন বলেন, আট বছর ধরে আমার পরিবারে ঈদের দিন চুলায় আগুনের পরিবর্তে আমার মনে আগুন জ্বলে। সরকার থেকে পাওয়া সব সুবিধা নিয়ে ছেলের বউ অন্যত্র বিয়ে করে চলে গেছে। তারা অনেক দিন ধরে চেষ্টা করছেন আনসারুলের পেনশন ভাতা রাবেয়া খাতুনের নামে নেওয়ার।
নিহত আনসারুল হকের ভাই নাজমুল হক বলেন, আনসারুলের স্ত্রী অন্যত্র বিয়ে করেও আমার ভাইয়ে সরকারি সব সুবিধা নিচ্ছে। নিয়মানুযায়ী এ সুবিধা আমার মা পাওয়ার কথা। আমি চাই এ ব্যাপারে সংশ্লিষ্টরা ব্যবস্থা গ্রহণ করুক।
মা রাবেয়া খাতুন বলেন, আমার ছেলে আনসারুলের হত্যাকারীদের বিচার কি হয়েছে জানি না। আমরা চাই এ ঘটনায় যারা জড়িত তাদেরকে সরকার ফাঁসি দিক। আমার ছেলে লাখ লাখ মানুষের জীবন বাঁচাতে গিয়ে দুনিয়া থেকে বিদায় হয়ে গেছে। ঈদের চাঁদ উঠলেই আমার বুকে আগুন জ্বলতে থাকে।
নেত্রকোণার পুলিশ সুপার ফয়েজ আহমেদ জানান, শোলাকিয়া ঈদগাহ মাঠে দায়িত্ব পালনকালে জঙ্গি হামলায় নিহত আনসারুলের এক ভাইকে চাকরি দেওয়া হয়েছে। পরিবারের সদস্যরা প্রায় সময় আমার এখানে আসে।