স্বপ্ন যাবে বাড়ি, দুঃস্বপ্নরা ফিরবে অফিস 

ঈদ এলেই স্বপ্ন বাড়ি যাবার বিজ্ঞাপন শুরু হয়ে যায়। নানারকম জিংগেলে, আবেগী চিত্রায়ণে ফুটে উঠে কীভাবে মানুষ শত বাঁধন পেরিয়ে বাড়ি ফিরে যায়। নাড়ির টান, শেকড়ের মায়া ইত্যাদি বিশেষণে মহিমান্বিত করা হয়। আর সংবাদ মাধ্যমগুলোতে ফুটে উঠে কীভাবে অবর্ণনীয় কষ্টে মানুষ বাড়ি ফেরে। কেউ ট্রেনের ছাদে, কেউ ঘণ্টার পর ঘণ্টা হাইওয়ের জ্যামে। আর অনেকগুন ভাড়া তো আছেই। 

ঈদে বাড়ি যেতে গিয়ে কেউ লাশ হয়ে যান, ঈদের পরদিন গোটা পরিবারের মারা যাবার খবর আসে। ঈদের খরচ করে বাকি মাস প্রায় খালি হাতে চলার খুব বেশি খবর অবশ্য আসে না মিডিয়ায়। 

কিন্তু, কেন এই অদম্য যাত্রা? পশ্চিমা দুনিয়ায় আমরা দেখি উৎসব মানে কেনাকাটা, বিভিন্ন টুরিস্ট স্পটে ঘুরতে যাওয়া। এমনকি পাশের দেশ ভারতেও আমরা দেখি না গ্রামে ফেরার ঢল। সে দেশের সাহিত্য বা সিনেমাতেও এইরকম কিছু দেখানো হয় না। 

আমাদের ছোটবেলায় বাসায় নতুন কোনো বন্ধু আসলে আব্বুর প্রথম প্রশ্ন হতো, তোমার বাড়ি কই? এই অতি আশ্চর্য প্রশ্নে অবাক এবং বিরক্তও হতাম। আমাদের যাদের ঢাকা শহরে জন্ম, কার গ্রামের বাড়ি কোথায় এই ব্যাপারটা ছিলো একেবারেই গুরুত্বহীন। আর পরিচয়ের মূল বৈশিষ্ট্য হিসেবে ধরাটা একেবারেই বিস্ময়কর। আরেকটু বড় হয়ে, আরও রেগে যেতাম এই ব্যাপারটার মতো একটা স্থুল রেসিজমের ইঙ্গিত থাকায়। 

কিন্তু, নৃতত্ত্ব আর সমাজবিজ্ঞান আমাদের শেখায় যে মানুষের এইরকম আপাত যুক্তিহীন আচরণের উপর ক্ষেপে না গিয়ে এর মূল খুঁজে বের করার জন্য। সেইটা কী?

ঢাকা এক অদ্ভুত শহর। এই শহরকে কেউ নিজের ভাবে বলে মনে হয় না, একে নিয়ে গর্ব করা তো দূর। সারা দুনিয়ায় শহরগুলো গড়ে উঠে নদীকে সামনে রেখে। নদীর পেছনে শহর বাড়তে থাকে। অথচ আমাদের বুড়িগঙ্গাকে পেছনে রেখে আমাদের এই চারশো বছরের পুরনো শহর বাড়ছে। স্নেহের বুড়িগঙ্গা কেবলই যেন ভাগাড়। 

শুধু কি তাই? দেশের সমস্ত উন্নয়নের কেন্দ্রবিন্দু হয়ে উঠায় ঢাকা যেন অপ্রিয় একটা অফিসের শহর। অফিস যতো মনোরমই হোক, যে কোনো স্বাভাবিক মানুষের চাওয়া থাকে দ্রুত সেখানকার কাজ শেষ করে বাড়ি ফেরার। ঢাকার এতো এক্সপ্রেসওয়ে, এতো মেট্রোরেল, এতো ফ্লাইওভার এগুলো যেন অফিসের দামি এসি আর আরামদায়ক চেয়ারের মতো। দিনশেষে এগুলো কেবলই কেজো ব্যাপার। এর সঙ্গে আবেগের তুলনা হয় না ঘরের ভাঙ্গা খাট বা খটখট শব্দ করা ফ্যানের। 
কিন্তু এই দোষ কি জনগণের? না। কেবল রাজধানীকেন্দ্রিক যে উন্নয়ন আর পরিকল্পনা তা এই ঢাকাকে করে তুলছে আরও বড় কারাগার। জীবিকার তাগিদে আর জীবনে নিশ্চয়তার জন্য মানুষ বাধ্য হয়ে ছুটে আসছে ঢাকায়। শহরটা এর ধারণক্ষমতার বহুগুন মানুষকে ধারণ করছে। উন্নয়নের মডেলে, আমাদের ভোগবাদী চিন্তার সুবাদে এর উপর চাপ প্রতিনিয়ত বাড়ছেই। 

সমাজবিজ্ঞানী উলরিখ বেখ ‘রিস্ক সোসাইটি’ শব্দটার উদ্ভাবন করেছিলেন। তিনি দেখিয়েছিলেন আধুনিক নগর জীবনে আমরা সমস্ত ঝুঁকিকে ঝেটিয়ে বিদায় করতে চাই। পানি, বিদ্যুতের নিরবচ্ছিন্ন চাহিদা, হাতের কাছে সেরা চিকিৎসা আর শিক্ষা ব্যবস্থা এবং প্রয়োজনের চেয়ে অনেকগুন সম্পদ যা আমাদের ভবিষ্যতের নিশ্চয়তার একটা আশ্বাস দেয়। 
কিন্তু এইসব বাদ দিয়েও মানুষ গ্রামে ফিরে যেতে চায় যখনই সুযোগ পায়। সমাজবিজ্ঞানীরা অবশ্য গবেষণা করে দেখতে পারেন যে, উচ্চ আয় হলে এই আকাঙ্খা কমে যায় কিনা। ধনীরা গ্রামের বদলে টুরিস্ট স্পষ্ট আর শহুরে উদযাপনই পছন্দ করে কিনা। তবে, আপাতত এই ব্যাপারটা নিশ্চিত যে, ঢাকা শহরে বাস করা বড় একটা অংশের মানুষ ঢাকাকে অফিস আর গ্রামকে বাড়ি বলেই ভাবেন। 

ফলত, ঢাকার উপর আরো চাপ না বাড়ায়ে আমাদের উন্নয়ন ভাবনাটাই বরং সহজে উলটে ফেলা অনেক বেশি যুক্তিযুক্ত। আমাদের উন্নয়নগুলো হইতে পারতো গ্রামকেন্দ্রিক। অন্তত যোগাযোগ ব্যবস্থা এমন হইতে পারতো যে, শ দুয়েক কিলোমিটার দূর থেকে ঘণ্টা দেড়কের মধ্য ঢাকায় আসার। এতে শহরটার উপর চাপ কমতো, মানুষের মানসিক স্বস্তি হইতো, অর্থনীতির বিকেন্দ্রীকরণ ও গতি বাড়তো। 

আলাপগুলো নতুন কিছু না। এই বিকেন্দ্রীকরণের উপদেশ কয়েক দশক ধরেই অনেকে দিচ্ছেন। বারবার বলছেন সর্বগ্রাসী উন্নয়ন বাদ দিয়ে টেকসই উন্নয়নের কথা। নদীর দেশ, পানির দেশ বাংলাদেশের মূল যোগাযোগ ব্যবস্থা নদী কেন্দ্রিক করা। আধুনিক প্রযুক্তিতে নদীযানের গতিও কোনো সমস্যা নাই। নদীকেন্দ্রিক যোগাযোগ আর গ্রামকেন্দ্রিক উন্নয়নে একদিকে যেমন উন্নয়ন হবে টেকসই অন্যদিকে হবে পরিবেশবান্ধব। তবে, নানা মারপ্যাঁচে তাতো হচ্ছেই না, অবস্থা আরও খারাপ হচ্ছে দিনকে দিন। 

ফলত, জান হাতে নিয়ে স্বপ্নের বাড়ি ফেরা আর দুঃস্বপ্নের আবারও অফিসে ফিরতে বাধ্য হওয়া ছাড়াটাই ভবিতব্য।