বাঙালির নিজস্ব উৎসব পহেলা বৈশাখ

বাঙালির নববর্ষ এক অনন্য বৈশিষ্ট্যমণ্ডিত উৎসব। কেননা, পৃথিবীতে প্রচলিত অধিকাংশ বর্ষপঞ্জির উৎপত্তি কোনো না কোনো ধর্মের সঙ্গে সম্পর্কিত, কিন্তু বাংলা নববর্ষের সঙ্গে ধর্মীয় অনুষঙ্গ নেই। মূলত কৃষিকাজ ও খাজনা সংগ্রহের ব্যবস্থাকে ঘিরে এর প্রচলন, পরে এর সঙ্গে যুক্ত হয় ব্যবসা-বাণিজ্যের দেনা-পাওনার হিসাব মেটানো। দিনে-দিনে পহেলা বৈশাখ হয়ে ওঠে এক সর্বজনীন সাংস্কৃতিক আনন্দ-উৎসব। ধর্ম-সম্প্রদায় নির্বিশেষে বাংলা ভূখণ্ডের সব মানুষের প্রাণের উৎসব পহেলা বৈশাখ। 

কবি দাউদ হায়দার ডয়েচ ভেলের স্প্যানিশ বিভাগের এক সাংবাদিককে বাংলা নববর্ষের প্রথম দিনকে ‘বাঙালির কার্নিভাল’ বলে উল্লেখ করেন। বাঙালির এ কার্নিভালে অসাম্প্রদায়িক দিকটা ফুটে ওঠে। বাংলাদেশ, ভারত ও প্রবাসী বাঙালিদের মধ্যে নববর্ষের এই উৎসবের প্রাণ-সঞ্চরণ প্রকাশিত হতে দেখা যায়। বেশ কিছু নতুন বিষয় সংযুক্ত হয় পহেলা বৈশাখকে ঘিরে। সাহিত্যেও প্রভাব রয়েছে বোশেখের রুদ্ররূপ ও বিভিন্ন উৎসব নিয়ে। রবীন্দ্রনাথ-নজরুল থেকে হালের কবি-সাহিত্যিকরা বৈশাখ নিয়ে কবিতা-সাহিত্য রচনা করছেন।

বাংলা নববর্ষে ব্যবসা-বাণিজ্যে নতুন উদ্যমে শুরুর আয়োজন থাকে। বাঙালিরা ‘হালখাতা’ নামে ব্যবসা-বাণিজ্যে নতুন করে হিসাব শুরু করে থাকেন। ক্রিস্টমাস উপলক্ষে দোকানে বা বিভিন্ন ব্যবসার ক্রয়-বিক্রয়ে রিবেট বা ছাড় দেওয়ার রেওয়াজ আছে। বাংলা নববর্ষেও কলকাতা বা বাংলাদেশে ছাড় বা বাট্টা দেওয়ার সংস্কৃতি রয়েছে। কলকাতাতে ‘চৈত্র সেল’ নামে পরিচিত।

বাঙালির এই উৎসব অসাধারণ বৈশিষ্ট্যময়। বাংলা নববর্ষের  এ ঐতিহ্য মাটি ও মানুষের সঙ্গে সরাসরি জড়িত; এখানে কোনো জাতিভেদ ও ধর্মভেদ নেই। ঢাকা ও কলকাতার পাশাপাশি প্রবাসে ও শহর-গ্রামে তরুণ-তরুণী, যুবক-যুবতীসহ আবাল-বৃদ্ধ-বনিতা উৎসবে মেতে ওঠেন। নববর্ষে সবাই রবীন্দ্রনাথের এ গানটি গেয়ে ওঠেন, ‘এসো, এসো, এসো হে বৈশাখ/ তাপস নিঃশ্বাস বায়ে মুমূর্ষুরে দাও উড়ায়ে,/বৎসরের আবর্জনা দূর হয়ে যাক যাক পুরাতন স্মৃতি,/ যাক ভুলে যাওয়া গীতি, অশ্রুবাষ্প সুদূরে মিলাক।/মুছে যাক গ্লানি, ঘুচে যাক জরা,/ অগ্নিস্নানে শুচি হোক ধরা...।’

‘প্রলয়োল্লাস’ কবিতায় নজরুল বলেছেন ধ্বংস আর যুদ্ধ থেকেই নতুনের সৃষ্টি হয়! তেমনই বাংলা নববর্ষের কালবৈশাখী বা রুদ্র রূপ থেকেই অনুপ্রেরণা পায় বাঙালি :

‘‘ধ্বংস দেখে ভয় কেন তোর? প্রলয় নূতন সৃজন-বেদন!/আসছে নবীন জীবন-হারা অসুন্দরে করতে ছেদন।/তাই সে এমন কেশে বেশে/প্রলয় বয়েও আসছে হেসে-/মধুর হেসে।/ভেঙ্গেও আবার গড়তে জানে সে চির-সুন্দর।/তোরা সব জয়ধ্বনি কর!/তোরা সব জয়ধ্বনি কর!/এ ভাঙ্গা-গড়া খেলা যে তার কিসের তবে ডর?/তোরা সব জয়ধ্বনি কর’ বাংলাদেশে আমাদের সবচেয়ে বড় অর্জন স্বাধীনতা অর্জন। নয়মাসের যুদ্ধের মাধ্যমে আমরা বিজয় ছিনিয়ে আনতে সক্ষম হয়েছি। রক্ত বিসর্জন দিতে হয়েছে, ত্যাগ-তিতিক্ষা সইতে হয়েছে। স্বাধীনতার প্রথম মাসেই এসেছিল পহেলা বৈশাখ বাংলা নববর্ষ। কবি সমুদ্র গুপ্তের  ‘বৈশাখ : একাত্তর’ কবিতায় স্মৃতিচারণ পাই; মুক্তিযুদ্ধের আবেগ ও ব্যঞ্জনা, যুদ্ধাবস্থার কথা পাই :‘যুদ্ধের প্রথম মাসে এসেছিল পহেলা বৈশাখ/মেঘের ডম্বরু ফেলে হাতে হাতে উঠেছিল/স্বাধীনতাযুদ্ধের বজ্রনিনাদ/যুদ্ধমুখী পা আর স্বাধীনতা দেখে-ফেলা চোখ/আমাদের জেগে ওঠার প্রথম সাক্ষী ছিল বৈশাখী মেঘ...।’

পহেলা বৈশাখের উৎসব শুরুর দিকে ছিল মূলত গ্রামাঞ্চলকেন্দ্রিক। গ্রামীণ-মেলা, লোকজ খেলাধুলা ও নৃত্য-সংগীত ছিল প্রধান আকর্ষণ। দিনে-দিনে তা শহরাঞ্চলেও ছড়িয়ে পড়ে। বাঙালির আদি সাংস্কৃতিক পরিচয় বহনকারী এই অসাম্প্রদায়িক উৎসব বাংলাদেশের রাজনৈতিক ও সাংস্কৃতিক ইতিহাসের বিভিন্ন পর্যায়ে অনেক গুরুত্বপূর্ণ অধ্যায়ে আমাদের বিশেষ প্রেরণা জুগিয়েছে। এ ভূখণ্ডের বাঙালিদের ঐক্যবদ্ধ করেছে এ সাংস্কৃতিক-উৎসব ও চেতনা।  ষাটের দশকে রমনা বটমূলে ছায়ানটের বর্ষবরণ উৎসব বাঙালির সশস্ত্র-মুক্তিসংগ্রামসহ বিভিন্ন আন্দোলন ও সংগ্রামকে বেগবান করে। বৈশাখের সংস্কৃতি আমাদের জীবন-সাহিত্য ও বাঙালি জীবনে জড়িয়ে পড়ে ওতপ্রোতভাবে। নৃ-তাত্ত্বিক, সামাজিক অনন্য বৈশিষ্ট্য মিলে নববর্ষ উৎসব এখন বাঙালির এক প্রাণের উৎসব-প্রাণবন্ত এক মিলনমেলা।

নববর্ষ আদিম মানবগোষ্ঠীর কাছে ছিল সিজনাল ফেস্টিভ্যাল। নববর্ষ হিসেবে ‘পহেলা বৈশাখ’ সভ্য মানুষের ‘এগ্রিকালচারাল ফেস্টিভ্যাল’। বাংলা নববর্ষ এ দেশের একটা প্রাচীনতম ঐতিহ্য। পহেলা বৈশাখের উৎসবের মধ্য দিয়ে এ দেশের মানুষ এই ঐতিহ্যকে বাঁচিয়ে রেখেছে। বৈশাখী মেলায় সম্প্রদায় নির্বিশেষে মানুষের আনাগোনা। মৈত্রী-সম্প্রীতির এক উদার মিলনক্ষেত্র। নারী-পুরুষ, শিশু-কিশোর সবাই আসে মেলায়। এর সঙ্গে জড়িয়ে আছে বিকিকিনির আশা আর বিনোদনের টান।

কৃষিক্ষেত্রেও বৈশাখ মাসের গুরুত্ব অনেক। বৃক্ষের ক্ষেত্রেও নবউদ্যমে নতুন জীবন শুরু হয় নতুন পাতা গজিয়ে।

একটি খনার বচন বলতেই পারি। ‘মাঘে মুখী, ফালগুনে চুখি, চৈতে লতা, বৈশাখে পাতা’। আরও কয়েকটি খনার কথা উল্লেখ করা যায় : (১) ‘বৈশাখের প্রথম জলে, আশুধান দ্বিগুণ ফলে’, (২) ‘পৌষের কুয়া বৈশাখের ফল। য’দ্দিন কুয়া ত’দ্দিন জল। শনিতে সাত মঙ্গলে/(বুধ) তিন। আর সব দিন দিন’।

মুঘল সম্রাট আকবর (১৫৫৬-১৬০৫) বাংলা সনের প্রবর্তন করেন। সম্রাট আকবর সিংহাসন আরোহণের সময় (৯৬৩ হিজরি) ‘ফসলি সন’ নামে যে সন প্রবর্তন করেন যা কালক্রমে ‘বাংলা সন’ নামে পরিচিত লাভ করে। তখন হিজরি সনের ভিত্তিতে এ দেশে বছর গণনা হতো। হিজরি বছর সৌর বছর থেকে ১১ দিন ছোট হওয়ায়

কৃষির হিসাব-নিকাশ এলোমেলো হয়ে যেত। এতে কৃষকদের ‘ফসলি সন’ গণনায় সমস্যা তৈরি হয়। ফলে কৃষকের কাছ থেকে জমিদারের খাজনা আদায় করতেও  সমস্যা দেখা দেয়। জমিদার ও কৃষকদের সুবিধার্থে ও এই  সমস্যা দূর করতে মূলত বাংলা সনের প্রবর্তন করা হয়। বাংলাদেশ ও পশ্চিমবঙ্গ কৃষিপ্রধান দেশ। তাই, বাংলা নববর্ষের  উৎসবের আমেজটা কৃষকের একটু বেশিই থাকে।

বৈশাখের প্রথম সকালে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের চারুকলা অনুষদের সামনে থেকে ‘মঙ্গল শোভাযাত্রা’ শুরু হয়। বৈশাখী সাজে নানান বাহারি মুখোশ, শোলার পাখি, টেপা পুতুল হাতে হাতে নিয়ে ঢাক-ঢোল-বাঁশি বাজিয়ে হাজারো মানুষ অংশ নেন মঙ্গল শোভাযাত্রায়। ১৯৮৯ সালে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের চারুকলার শিক্ষার্থী ও শিক্ষকদের উদ্যোগে প্রথমবারের মতো পহেলা বৈশাখে এই মঙ্গল শোভাযাত্রার আয়োজন শুরু হয়। ১৯৯০ সালে চারুকলার শোভাযাত্রা জনপ্রিয়তায় নতুন মাত্রা লাভ করে। ২০১৬ খ্রিস্টাব্দের ৩০ নভেম্বর ইউনেস্কো কর্র্তৃক ‘বিশ্ব সাংস্কৃতিক ঐতিহ্যে’ হিসেবে স্বীকৃতি পেয়েছে এ সর্বজনীন মঙ্গল শোভাযাত্রা। ধর্ম, বর্ণ, জাতি, লিঙ্গ পরিচয় নির্বিশেষে সব পেশার, সব শ্রেণির মানুষ শামিল হন মঙ্গল শোভাযাত্রায়। পহেলা বৈশাখ উদযাপনে অংশ নিতে আসা নারীদের মাথায় শোভা পায় ফুল, মুখে মুখে আলপনা, তরুণদের হাতে পতাকাসহ বিভিন্ন আয়োজন আমাদের কষ্ট-দুঃখ ভুলিয়ে দেয়।

পৃথিবীতে প্রচলিত অধিকাংশ বর্ষপঞ্জির উৎপত্তি কোনো না কোনো ধর্মের সঙ্গে সম্পর্কিত, কিন্তু বাংলা নববর্ষের সঙ্গে ধর্মীয় অনুষঙ্গ কমই। মূলত কৃষিকাজ ও খাজনা সংগ্রহের ব্যবস্থাকে ঘিরে এর প্রচলন, পরে এর সঙ্গে যুক্ত হয় ব্যবসা-বাণিজ্যের দেনা-পাওনার হিসাব মেটানো। বিশ্বের বড় বড় উৎসব ধর্মকেন্দ্রিক বা জাতিকেন্দ্রিক। এদিক থেকে ব্যতিক্রম বাঙালির পহেলা বৈশাখের নানা আয়োজন।

পহেলা বৈশাখের অনুষ্ঠানমালা নির্ভেজাল বাঙালির অনুষ্ঠান, অসাম্প্রদায়িক উৎসব-আমাদের ঐকতানের কথাও বলে। এদিন সবাই বাধহীন উল্লাসে ফেটে পড়ে; শুধুমাত্র কাঁটাতার এপার-ওপারের বিভাজন থাকে। বিশ্বে এমন নির্ভেজাল উৎসব আর দ্বিতীয়টি নেই।

লেখক: কবি ও প্রাবন্ধিক

[দেশ রূপান্তরে পূর্বে প্রকাশিত]