মুজিবনগর: যেখানে দাঁড়ালে পুরো মুক্তিযুদ্ধ দেখা যায়

আগামীকাল (১৭ এপ্রিল) ৫৩তম মুজিবনগর দিবস পালিত হতে যাচ্ছে মেহেরপুরের ঐতিহাসিক মুজিবনগরে। সরকারের গুরুত্বপূর্ণ মন্ত্রী ও নেতৃবৃন্দ দিনটি পালন উপলক্ষে মুজিবনগর গিয়ে সেখানে নির্মিত শেখ হাসিনা মঞ্চে দাঁড়িয়ে সমবেত মুক্তিযোদ্ধাদের উদ্দেশে বক্তব্য দেবেন। রাষ্ট্রীয়ভাবে মুজিবনগর স্মৃতিসৌধে ফুল দিয়ে শ্রদ্ধা জানানো হবে। প্রতিবারের মতো এবারও মুক্তিযুদ্ধ বিষয়ক মন্ত্রণালয় এবং সাংস্কৃতিক মন্ত্রণালয় দিনটি যথাযোগ্য মর্যাদায় পালনের জন্য ব্যাপক কর্মসূচি গ্রহণ করেছে।

যেখানে দাঁড়ালে পুরো মুক্তিযুদ্ধ দেখা যায়। ছবি: দেশ রূপান্তর

কিন্তু ২৬ বছর দৃশ্যত অপরিবর্তিত রূপে দাঁড়িয়ে আছে মুজিবনগর। ২৫ বছর আগে মুক্তিযুদ্ধভিত্তিক যে সমস্ত কাজ শেষ হয়েছে মুজিবনগরকে ঐতিহাসিক পর্যটন কেন্দ্র হিসাবে গড়ে তোলার জন্য, সেই সমস্ত কাজের কোনোটিরই আনুষ্ঠানিক উদ্বোধন হয়নি আজও। অব্যবহৃত অবস্থায় পড়ে থেকে নষ্ট হচ্ছে মুক্তিযুদ্ধভিত্তিক জাদুঘর ও গ্যালারির মূল্যবান অনেক সম্পদ। ৭১ সালের এই ১৭ এপ্রিল মেহেরপুর জেলার বৈদ্যনাথতলা (পরবর্তীতে মুজিবনগর) বাংলাদেশের প্রথম সরকারের শপথ অনুষ্ঠান, গার্ড অব অনার এবং স্বাধীনতার ঘোষণাপত্র পাঠ হয়। সেদিন মুজিবনগরের জন্ম না হলে হয়তো বাংলাদেশের জন্ম হতো না। তাই মুক্তিযুদ্ধের পুরো ইতিহাসকে জীবন্ত করে ধরে রাখতে মুজিবনগরে নির্মাণ করা হয়েছে শতশত ম্যুরাল বা ভাস্কর্য। যেখানে দাঁড়ালে পুরো মুক্তিযুদ্ধ দেখা যায়। দেশের এক জায়গায় এত ম্যুরাল আর কোথাও নেই।

যেখানে দাঁড়ালে পুরো মুক্তিযুদ্ধ দেখা যায়। ছবি: দেশ রূপান্তর7

স্বাধীনতার ৫৩ বছরেও মুক্তিযুদ্ধের তীর্থস্থান ঐতিহাসিক মুজিবনগর অনেকটাই অবহেলিত অবস্থায় পড়ে আছে। ১৪ বছর ধরে সরকার মুজিবনগরকে আন্তজার্তিকমানের করতে এক হাজার কোটি টাকার উন্নয়ন পরিকল্পনা ও বাজেট বরাদ্দ নিয়ে কাজ করছে। কয়েক দফা আন্তমন্ত্রণালয় মিটিং হয়েছে। নকশা তৈরি ও কাঁটছাট হয়েছে কয়েকদফা। কিন্তু এখনও কাজ শুরু হয়নি। অযত্নে এবং জনবল সঙ্কটে রোদে-বৃষ্টিতে পুড়ে মুক্তিযুদ্ধভিত্তিক শতশত ম্যুরাল ফেটে চৌচির-বিবর্ণ হয়ে দাঁড়িয়ে আছে। নতুন উন্নয়ন পরিকল্পনায় সমস্ত ম্যুরাল ভেঙে আবার আধুনিক করা হবে। ওই দিন যে পথ অতিক্রম করে জাতীয় ৪ নেতাসহ বিদেশি গণমাধ্যমকর্মীরা কলকাতা থেকে গাড়িবহর নিয়ে মেহেরপুরের মুজিবনগর গিয়েছিল সেই সড়কটিকে দুই দেশ নাম দিয়েছে স্বাধীনতা সড়ক। মুক্তিযুদ্ধে দুই দেশের বন্ধুত্বপূর্ণ সম্পর্ককে চির অম্লান করে রাখতে চেকপোস্ট চালুর জন্য স্বাধীনতা সড়ক নির্মাণ কাজ ৪ বছর আগে শেষ হলেও তা চালু হয়নি আজও। এখন হাজার কোটি টাকার মুজিবনগর উন্নয়ন প্রকল্পের কাজ এবং স্বাধীনতা সড়ক চালুর অপেক্ষায় মুজিবনগরের মানুষ।

যেখানে দাঁড়ালে পুরো মুক্তিযুদ্ধ দেখা যায়। ছবি: দেশ রূপান্তর

সারাদেশের মধ্যে একমাত্র মুজিবনগর যেখানে বঙ্গবন্ধুর ৭ই মার্চের ভাষণসহ পুরো মুক্তিযুদ্ধের উল্লেখযোগ্য সমস্ত ঘটনাবলীর ইতিহাস মানুষ সমান ভাস্কর্য বা ম্যুরালে তুলে ধরা হয়েছে। সেখানে মুক্তিযুদ্ধের ওপর নির্মাণ করা হয়েছে বিশাল স্মৃতি মানচিত্র ও কমপ্লেক্স। ২৫ বছর আগে প্রায় পাঁচশ কোটি টাকা ব্যয়ে ৬০ একর জমির ওপর এই সমস্ত স্থাপনা এবং ম্যুরাল নির্মাণ করা হয়।

১৯৯৯ সালে শেষ হওয়া এই কাজগুলো আজও আনুষ্ঠানিকভাবে উদ্বোধন হয়নি। উপরন্তু লোকবল না থাকায় অরক্ষিত মুজিবনগরের শতবর্ষী গাছগুলো আজ শুকিয়ে মরতে বসেছে। রক্ষণাবেক্ষণের অভাবে সাদা সিমেন্টে তৈরি মুক্তিযুদ্ধের ম্যুরালগুলোতে চিড় ধরেছে। ফাটল ধরেছে স্মৃতিসৌধসহ মুক্তিযুদ্ধের স্মৃতি মানচিত্র ভবনের চর্তুদিক। শপিংমল ভবন নির্মাণের ২০ বছর অব্যবহৃত অবস্থায় পড়ে আছে। ২ কোটি টাকা ব্যয়ে ৬ দফা ভিত্তিক গোপালবাগান এখন অনেকটা বিরাণভূমি। এভাবে পড়ে থাকা পুরনো স্থাপনার অনেককিছুই এখন ভেঙে আবার নতুন করে করার পরিকল্পনা নিয়েছে সরকার। তারপরও দর্শনার্থীরা স্বাধীনতার সূতিকাগার ঐতিহাসিক এই স্থানটি দেখতে প্রতিদিন মুজিবনগর ভিড় করে।

মুজিবনগরের বাগোয়ান ইউনিয়ন চেয়ারম্যান বলেন, 'মুজিবনগরকে আন্তজার্তিকমানের পর্যটনকেন্দ্র করতে সরকার হাজার কোটি টাকার প্রকল্প হাতে নিয়েছে। এজন্য নতুন করে আরও ৩০ একর জমি অধিগ্রহণ করা হবে। মুজিবনগরে স্বাধীনতা সড়ক নির্মাণ হয়েছে। অথচ সবকিছুই অর্ধসমাপ্ত অবস্থায় পড়ে আছে। এতে পিছিয়ে পড়েছে মুজিবনগর।'

যেখানে দাঁড়ালে পুরো মুক্তিযুদ্ধ দেখা যায়। ছবি: দেশ রূপান্তর

মেহেরপুর গণপূর্ত বিভাগের নির্বাহী প্রকৌশলী শম্ভুরাম পাল জানান, মুজিবনগরে ১১টি মন্ত্রণালয়ের অর্থায়নে নতুন করে বিভিন্ন কাজ শুরু হবে। মূলত মুক্তিযুদ্ধকে চির অম্লান ও জীবন্ত করতে মুজিবনগরকে আন্তজার্তিকমানের করা হবে। সেক্ষেত্রে পুরনো অনেক স্থাপনা তুলে অন্যত্র সরিয়ে ফেলা হবে। সাদা সিমেন্টে তৈরি পুরনো ম্যুরালগুলো ভেঙে নতুন করে ধাতব পদার্থে আরও বড় আকারের এবং আন্তজার্তিক মানদণ্ডের ব্রোঞ্জের দামি টেকসই ম্যুরালে করা হবে। এছাড়াও ঢাকা হাতিরঝিলের চাইতেও মুজিবনগরকে সৌন্দর্য্যমণ্ডিত করতে আন্তর্জাতিকমানের শব্দ, আলো, ফুয়ারা, লেক, টাওয়ার, নিরাপত্তা, ভিআইপি গেস্ট হাউস, পার্কসহ নানা সুযোগ-সুবিধার অবকাঠামো নির্মাণ করা হবে। দ্রুত কাজ শুরু করতে ইতিমধ্যে আন্তমন্ত্রণালয়ের তিন দফা বৈঠক শেষ হয়েছে। নকশা চূড়ান্ত হয়েছে। দ্রুতই দরপত্র হবে। নতুন এই কাজ শুরু হলে বদলে যাবে মুজিবনগর। তখন মুজিবনগরই হবে দেশের এবং বিশ্বের সবচেয়ে বড় ও গর্বের মুক্তিযুদ্ধভিত্তিক দর্শনীয় পর্যটনকেন্দ্র। তখন দেশি-বিদেশি পর্যটকদের কাছে দেশের মুক্তিযুদ্ধ নিয়ে জ্ঞান আহরণ ও গবেষণার কেন্দ্রবিন্দু হবে মুজিবনগর।

জনপ্রশাসনমন্ত্রী ও মেহেরপুর-১ আসনের এমপি ফরহাদ হোসেন বলেন, 'মুজিবের নামে বাংলাদেশে এই একটিমাত্র স্থান। সেটা মুজিবনগর। যে স্থানের গর্ভে বাংলাদেশের জন্ম। মুজিবনগরকে সরকার মুক্তিযুদ্ধভিত্তিক আন্তজার্তিকমানের পর্যটনকেন্দ্র করতে চায়। সেই লক্ষ্যে বৃহৎ পরিকল্পনা নিয়ে কাজ শুরু করে দিয়েছে সংশ্লিষ্ট একাধিক মন্ত্রণালয়। কেননা মুজিবনগরের প্রতি এই সরকারের বিশেষ দৃষ্টি রয়েছে। এখানে মুজিবনগর নামে চেকপোস্ট, স্থলবন্দর, রেলপথ ও পূর্ণাঙ্গ বিশ্ববিদ্যালয় হলে বদলে যাবে  এলাকার অর্থনৈতিক ও সামাজিক চালচিত্র। ইতিমধ্যে সবগুলো প্রকল্পের কাজ শুরু হয়ে গেছে। দৃশ্যমান কাজ শুরু হবে অচিরেই।

যেখানে দাঁড়ালে পুরো মুক্তিযুদ্ধ দেখা যায়। ছবি: দেশ রূপান্তর

দিনটি পালন উপলক্ষে মুক্তিযুদ্ধ বিষয়ক মন্ত্রণালয়ের সচিব ইসরাত চৌধুরী কর্মসূচিতে ১৭ এপ্রিল সকাল ৯টায় রাষ্ট্রীয়ভাবে মুজিবনগর স্মৃতিসৌধে পুষ্পস্তবক অর্পণ এবং জাতীয় পতাকা উত্তোলন, সাড়ে ৯টায় বিভিন্ন বাহিনী সদস্যদের অংশগ্রহণে কুচকাওয়াজ, সন্ধ্যায় মুজিবনগর মুক্তিযুদ্ধ স্মৃতিকেন্দ্র মাঠে ব্যান্ড 'মাইলস' সহ শিল্পী তানিম মাহমুদ, রেশমি মির্জা ও দিলশাদ নাহার কনা সংগীত পরিবেশন করবেন।

এর আগে, সকাল ১১টায় মুজিবনগরে শেখ হাসিনা মঞ্চে মুজিবনগর দিবস উপলক্ষে আয়োজিত সমাবেশে সভাপতিত্ব করবেন জনপ্রশাসনমন্ত্রী ফরহাদ হোসেন। বক্তব্য রাখবেন মুক্তিযুদ্ধমন্ত্রী আ ক ম মোজাম্মেল হক, মহিলা ও শিশু বিষয়ক প্রতিমন্ত্রী সিমিম হোসেন রিমি, রাজশাহী সিটি মেয়র এ এইচ এম খায়রুজ্জামান লিটন এবং ডা. সৈয়দা জাকিয়া নুর লিপি এমপিসহ কেন্দ্রীয় এবং আঞ্চলিক নেতৃবৃন্দ।