নাটোরের বাগাতিপাড়ায় প্রতি বছরই বৃদ্ধি পাচ্ছে যক্ষ্মা রোগীর সংখ্যা। প্রতি বছর চিকিৎসার বাইরে থেকে যাচ্ছে ৩০ শতাংশ রোগী। চিকিৎসা নেওয়া রোগী শতভাগ আরোগ্য লাভ করলেও চিকিৎসার বাইরে থাকা রোগীদের কারণে এ রোগের নিয়ন্ত্রণ করা সম্ভব হচ্ছে না। যেহেতু উপজেলায় কোনো যক্ষ্মা ওষুধ প্রতিরোধী (এমডিআর রোগী) নেই, তাই যক্ষা নির্মূলে সমাজে পর্যপ্ত পরিমাণে প্রচার-প্রচারণা ও সেচতনতার বৃদ্ধি করতে হবে বলে মনে করেন যক্ষ্মা নিয়ে কাজ করা কর্মীরা।
উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্স ও ব্র্যাকের গত ৫ বছরের তথ্য মতে, প্রতি বছর গড়ে ১৫৫.৮ জন রোগী শনাক্ত করা হচ্ছে। আর প্রতি বছর নমুনা সংগ্রহ করা হচ্ছে গড়ে ২ হাজার ৯ শত ৪৮.৮ জন রোগী। উপজেলায় ৫টি ইউনিয়ন ও ১টি পৌরসভার গত ৫ বছরে হিসেবে ২০১৯ সালে ১৪৪ জন, ২০২০ সালে ৮৮ জন, ২০২১ সালে ১৩৯ জন, ২০২২ সালে ১৫৮ জন ও ২০২৩ সালে ২৫০ জন। ৫ বছরে মোট ৭৭৯ জন যক্ষ্মা রোগী সনাক্ত হয়েছে। তার মধ্যে পুরুষ ৪১৬ জন ও নারী ৩৬৩ জন। এবং ২০২৪ সালেই জানুয়ারি হতে মার্চ পর্যন্ত (নারী ২৩ জন ও পুরুষ ৪৬ জন মোট ৬৯ জনকে চিকিৎসা দেওয়া হচ্ছে। মোট পরীক্ষা করা হয়েছে ১৪ হাজার ৭ শত ৪৪ জন। এবং শনাক্ত হয়েছে ৭ শত ৭৯ জন। এর মধ্যে গত ৫ বছরে যক্ষ্মা রোগে উপজেলায় মৃত্যু হয়েছে ২৩ জন যক্ষা রোগীর। সরকারি কর্মকর্তা-কর্মচারীদের পাশাপাশি ব্র্যাকে একজন ম্যানেজারের নেতৃত্বে ৫ জন মাঠকর্মী ও ১২০ জন সেবিকা (ডটসপ্রোপাইডার) এর মাধ্যমে যক্ষ্মা রোগীদের শনাক্ত করে চিকিৎসা প্রদান করা হচ্ছে।
এনজিও সংস্থা ব্র্যাকের যক্ষ্মা প্রকল্পের ম্যানেজার ফজলুর রহমান জানান, উপজেলায় জনসংখ্যার অনুপাতে প্রতি বছর ২৯৬ জন যক্ষ্মা রোগী শনাক্ত হওয়ার কথা। সে ক্ষেত্রে ৭০ শতাংশ রোগী শনাক্ত করা গেলেও বাকি ৩০ শতাংশ রোগী শনাক্ত করা সম্ভব হচ্ছে না। ১ জন যক্ষ্মা রোগী বছরে ১০ জন যক্ষ্মা রোগী বাড়াতে থাকে। সংক্রামক এ রোগী নীরবে পরিবারের সদস্য কিংবা সমাজে লোকজনের মধ্যে বিস্তার ঘটাতে পারে। যক্ষ্মা রোগীদের ওষুধ খাওয়ানো জন্য ১২০ জন সেবিকা আছেন। এরা প্রতিদিন সকলে যক্ষ্মা রোগীকে ওষুধ খাওয়ানো কাজ করেন, তাদের মধ্যে ৫ জন মাঠকর্মী। মাঠকর্মী ও সেবিকাদের মাধ্যমে যক্ষ্মা রোগীদের খুঁজে পরীক্ষা-নিরীক্ষার করে বিনামূল্যে চিকিৎসা তারা দিয়ে থাকেন। যক্ষ্মা ভালো হওয়ার প্রথম শর্ত হচ্ছে নিয়মিত ওষুধ সেবন। যক্ষ্মা রোগীরা সাধারণত কাশি, জ্বর, খাবারে অরুচি ও ওজন কমে যাওয়ায় ভুগতে থাকেন। রোগ শনাক্তের পর নিয়মিত ছয় মাস ওষুধ খেলে এ রোগ সেরে ওঠে। কিন্তু ওষুধ সেবনে অনিয়মের কারণে অনেক যক্ষ্মা রোগী এমডিআর (যক্ষ্মা ওষুধ প্রতিরোধী) পর্যায়ে চলে যায়। তবে উপজেলায় এ ধরনের কোনো রোগী নেই।
উপজেলায় ব্র্যাকের যক্ষ্মা প্রকল্পের মাঠকর্মী জিল্লুর রহমান জানান, জীবাণুযুক্ত কফ ও কফ পরীক্ষার মাধ্যমে যক্ষ্মা শনাক্ত করা হয়। উপজেলার বিভিন্ন গ্রামে অস্থায়ীভাবে ক্যাম্প করে ৭ সপ্তাহের অধিক কাশি, জ্বর, ওজন কমে যাওয়া এ রকম রোগীদের সেবিকাদের মাধ্যমে একসাথে করে কফ সংগ্রহ করা হয়। উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সে রোগীদের বিনামূল্যে কফ পরীক্ষা করা হয়। যক্ষা রোগী পজিটিভ হলে সেবিকাদের মাধ্যমে ওষুধ খাওয়ানো ব্যবস্থা করা হয়।
উপজেলা পাকা ইউনিয়নের বড় পাকা এলাকার সেবিকা পাপিয়া খাতুন বলেন, উপজেলায় কোনো সেবিকা নিয়োগ দেওয়া হয়নি। তারা ব্র্যাকের সেবাকর্মীর তালিকায় কাজ করেন। রোগী সংগ্রহ করা, মাঠকর্মীদের মাধ্যমে রোগীদের পরীক্ষা করানো ও রেগীকে ওষুধ খাওয়ার কাজ করেন তারা।
উপজেলার জামনগর ইউনিয়নে কৈপুকুরিয়া এলাকার সেন্টু আলী জানান, তিনি দীর্ঘ দিন যক্ষ্মা রোগে আক্রান্ত ছিলেন। একপর্যায়ে কফ পরীক্ষা করে ছয় মাস নিয়মিত ওষুধ সেবনে এখন তিনি পুরোপুরি সুস্থ।
উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সের যক্ষ্মা ও কুষ্ঠ রোগ নিয়ন্ত্রক সহকারী নাজমুল ইসলাম জানান, উপজেলায় প্রতি বছর শনাক্ত হওয়া রোগীদের মধ্যে শতভাগ রোগী আরোগ্য লাভ করছে। তারা শনাক্ত হওয়া রোগীদের সঠিকভাবে দায়িত্ব নিয়ে ওষুধ খাওয়ানোর কারণেই এখানে শতভাগ যক্ষ্মা রোগী সুস্থ হয়ে উঠছেন। তারা চেষ্টা করছেন যক্ষ্মা শনাক্ত না হওয়াদের শনাক্ত করে চিকিৎসার আওতায় আনতে।