ফুল সুন্দেরর প্রতীক। ফুল মানুষকে সুবাস বিলায়, মনে আনন্দ জোগায় এবং বিষন্ন মনে শান্তির পরশ বিলিয়ে দেয়। তাই ফুলকে সবাই ভালোবাসে। ফুলের মতো বিনয় মানুষের সৌন্দর্য। বিনয়ী মানুষকে সবাই ভালোবাসে। বিনয় মানুষের ভূষণ এবং ভদ্রতা ও নম্রতার সহায়ক। বিনয় দ্বারা ব্যক্তিত্ব প্রতিষ্ঠা করা সম্ভব। সম্ভব বিশ্ব জয় করাও। যার মধ্যে যত বেশি বিনয় পাওয়া যাবে, সে তত বেশি সম্মান ও মর্যাদার অধিকারী। বিনয়ী ব্যক্তিকে আল্লাহতায়ালা ভালোবাসেন। বিনয়ীরা হাশরের মাঠেও পাবেন বিশেষ মর্যাদা।
হাদিসে বর্ণিত হয়েছে, ‘যে ব্যক্তি সামর্থ্য থাকা সত্ত্বেও মহান আল্লাহর সন্তুষ্টি অর্জনের জন্য দামি পোশাক পরা ছেড়ে দেবে, আল্লাহতায়ালা কিয়ামতের ময়দানে তাকে ডেকে সব সৃষ্টির সামনে নিয়ে আসবেন এবং তাকে তার পছন্দমতো এক জোড়া ইমানের পোশাকে সুসজ্জিত করবেন।’ (সুনানে তিরমিজি : ২৪৮১)
বিনয় বলা হয় কাজকর্ম ও আচরণে আমিত্ব ভাবকে দমন করা। নিজের মাঝে যেসব গুণাবলি ও যোগ্যতা রয়েছে, সেগুলো আল্লাহর দয়া ও দান মনে করা। সেগুলোকে নিজের কোনো কৃতিত্ব ও বাহাদুরি মনে না করা। আল্লাহতায়ালা বিনয়ী ব্যক্তির প্রশংসায় বলেন, ‘রহমানের বান্দা তারাই, যারা পৃথিবীতে নম্রভাবে চলাফেরা করে এবং তাদের সঙ্গে যখন মূর্খরা কথা বলতে থাকে, তখন তারা বলে, সালাম (শান্তি)।’ (সুরা ফুরকান : ৬৩)
বিনয়ীরা পৃথিবীতে নম্রভাবে চলাফেরা করে। গর্বভরে চলে না এবং অহংকারীর মতো পা ফেলে না। অহংকারের সঙ্গে বুক ফুলিয়ে পথ চলে না। গর্বিত স্বৈরাচারী ও বিপর্যয়কারীর মতো চলে নিজের শক্তি প্রকাশের চেষ্টা করে না। বরং তাদের চাল-চলন হয় একজন ভদ্র, মার্জিত ও সৎস্বভাব সম্পন্ন ব্যক্তির মতো।
হজরত উমর (রা.) বর্ণনা করেন, ‘আমি হজরত রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লামকে বলতে শুনেছি, যে ব্যক্তি আল্লাহতায়ালার সন্তুষ্টির উদ্দেশ্যে বিনয়ী হয়, আল্লাহতায়ালা তার মর্যাদা উঁচু করেন। ফলে সে নিজের চোখে ও নিজের ধারণায় ছোট হয়। কিন্তু মানুষের দৃষ্টিতে সে উচ্চ মর্যাদাসম্পন্ন। আর যে অহংকার করে, আল্লাহতায়ালা তার মর্যাদা নিচু করে দেন। ফলে সে মানুষের চোখে ছোট হয়ে যায়, যদিও সে নিজের ধারণায় বড় হয়। এমনকি সে মানুষের দৃষ্টিতে কুকুর ও শূকরের চেয়ে নিকৃষ্ট হয়ে যায়।’ (শোয়াবুল ইমান : ৭৭৯০)
হাদিসের মধ্যে একটি শর্ত জুড়ে দেওয়া হয়েছে, ‘তাওয়াজায়া লিল্লাহ’ অর্থাৎ আল্লাহর জন্য বিনয়। এই মহৎ গুণটি একমাত্র আল্লাহর জন্য হতে হবে। আমাদের মধ্যে অনেক বিনয়ী মানুষ পাওয়া যায়, কিন্তু উদ্দেশ্য আল্লাহর জন্য নয়, বরং অন্য কোনো দুনিয়ার হীন স্বার্থ। এর দ্বারা কখনো সে আল্লাহর কাছে সম্মানিত হতে পারবে না। বরং এটি অহংকারের ভিন্ন রূপ। আমাদের সমাজে বাহ্যত বেশভূষায় বিনয়ী মানুষে ভরে গেছে। এর দ্বারা নতুন নতুন ফেতনা সৃষ্টি হয়। বিনয়ের মূল উদ্দেশ্য ব্যাহত হয়। নামের শুরুতে অধম লেখলেই বিনয়ী হওয়া যায় না, বরং তা অন্তরের সঙ্গে সম্পৃক্ত। বিনয়ী ব্যক্তিদের মর্যাদা সম্পর্কে অসংখ্য আয়াত ও হাদিস বর্ণিত হয়েছে। কোরআনে কারিমে বলা হয়েছে, ‘নিশ্চয় যারা ইমান এনেছে, সৎকর্ম করেছে এবং বিনীত হয়েছে তাদের রবের প্রতি, তারাই জান্নাতবাসী, তারা সেখানে স্থায়ী হবে।’ (সুরা হুদ : ২৩)
হজরত রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম ইরশাদ করেছেন, ‘আমি কি তোমাদের জানাব না যে, কারা জাহান্নামের জন্য হারাম বা কার জন্য জাহান্নাম হারাম করা হয়েছে? জাহান্নাম হারাম আল্লাহর নৈকট্য লাভকারী প্রত্যেক বিনয়ী ও নম্র লোকের জন্য।’ (সুনানে তিরমিজি)
হজরত রাসুল (সা.) ছিলেন বিনয়ের সর্বোচ্চ আসনে সমাসীন। তাই তার কণ্ঠে বারবার বিনয়ের বাণী উচ্চারিত হয়েছে। আয়েশা সিদ্দিকা (রা.) থেকে বর্ণিত। হজরত রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম ইরশাদ করেছেন, ‘হে আয়েশা! আল্লাহতায়ালা অতি নম্র ব্যবহারকারী। তিনি নম্রতা ভালোবাসেন। তিনি নম্রতার জন্য এমন কিছু দান করেন, যা কঠোরতার জন্য দান করেন না, এমনকি অন্য কিছুর জন্যও তা দান করেন না।’ (সহিহ মুসলিম : ৬৩৬৫)
আমাদের নিকট অতীতের বরেণ্যরা ছিলেন হাদিসের জীবন্ত নমুনা। এক কথায়, মুমিনরা সহজ-সরল, বিনয়ী ও নম্র স্বভাবের হয়। ঠিক যেন লাগাম দেওয়া উটের মতো, তাকে টানা হলে চলতে শুরু করে এবং পাথরের ওপরে বসতে ইঙ্গিত করলে বসে যায়।