দ্বাদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনের পর প্রথমবারের মতো তিন দিনের সফরে ঢাকায় এসেছে যুক্তরাষ্ট্রের একটি বাণিজ্য প্রতিনিধিদল। গতকাল শনিবার রাতে প্রতিনিধিদলটি ঢাকায় পৌঁছেছে।
যুক্তরাষ্ট্রের বাণিজ্য প্রতিনিধি দপ্তরের (ইউএসটিআর) দক্ষিণ ও মধ্য এশিয়াবিষয়ক সহকারী ব্রেন্ডান লিঞ্চের নেতৃত্বে দলটি বাণিজ্য সম্প্রসারণ ছাড়াও শ্রম আইন সংস্কার, তথ্য আইনের সুরক্ষাসহ স্বার্থসংশ্লিষ্ট ইস্যুতে বাংলাদেশের সঙ্গে আলোচনা করবে।
পররাষ্ট্র ও বাণিজ্য মন্ত্রণালয়ের কর্মকর্তারা বলছেন, বৈঠকে বাংলাদেশ বাণিজ্যসুবিধা এবং যুক্তরাষ্ট্রের আন্তর্জাতিক উন্নয়ন অর্থায়ন সংস্থার (ডিএফসি) বিশেষায়িত তহবিল থেকে সহায়তা চাইবে।
কূটনৈতিক বিশ্লেষক ও পর্যবেক্ষকরা বলছেন, এই সফর বাণিজ্য সম্পসারণসংক্রান্ত এবং একটি রুটিন সফর হলেও ইতিবাচক। এখানে দুই দেশের বাণিজ্যিক বিষয়গুলো গুরুত্ব পাবে। তারা বলেন, যুক্তরাষ্ট্র ও বাংলাদেশের দ্বিপক্ষীয় বাণিজ্য ও বিনিয়োগ সহযোগিতা ফোরাম চুক্তির (টিকফা) বাস্তবায়ন নিয়ে বরাবরই যুক্তরাষ্ট্রের আগ্রহ রয়েছে। এর সঙ্গে শ্রম আইনের সংস্কার নিয়ে তাদের ব্যাপক আগ্রহ দেখা গেছে। পাশাপাশি গত দ্বাদশ সংসদ নির্বাচন ঘিরে ঢাকা-ওয়াশিংটন সম্পর্ক অনেকটাই অস্বস্তিকর পর্যায়ে চলে গিয়েছিল। দ্বিপক্ষীয় এসব সফরের মধ্য দিয়ে সেই সব টানাপড়েন কমে আসবে। এটাকে অন্যভাবে ব্যাখ্যা করা ঠিক হবে না।
পররাষ্ট্র ও বাণিজ্য মন্ত্রণালয় সূত্রে জানা গেছে, গত বছরের সেপ্টেম্বরে ওয়াশিংটনে টিকফার সপ্তম কাউন্সিল বৈঠক হয়। ওই বৈঠকেই পরিকল্পনা করা হয়টিকফার পরবর্তী অষ্টম কাউন্সিল বৈঠকের আগেই দুই দেশ দ্বিপক্ষীয় বাণিজ্যবিষয়ক সংলাপ চালিয়ে যাবে। এরই অংশ হিসেবে এবারের মার্কিন প্রতিনিধিদলের সফরটি সাজানো হয়েছে। এ বছরে ওয়াশিংটন ডিসিতে অনুষ্ঠিতব্য টিকফা বৈঠকের আগে এই সফরের আলোচনা গুরুত্ব পাবে।
প্রসঙ্গত, গত বছরের সেপ্টেম্বরে যুক্তরাষ্ট্রে অনুষ্ঠিত টিকফা কাউন্সিলে যৌথভাবে সভাপতিত্ব করেন দেশটির দক্ষিণ ও মধ্য এশিয়ার ভারপ্রাপ্ত সহকারী বাণিজ্য প্রতিনিধি ব্রেন্ডান লিঞ্চ ও বাংলাদেশের পক্ষ থেকে বাণিজ্য মন্ত্রণালয়ের সিনিয়র সচিব তপন কান্তি ঘোষ। টিকফার অষ্টম কাউন্সিল বৈঠকের আগে হওয়া ওয়াশিংটনের প্রতিনিধিদলের সঙ্গে অনুষ্ঠেয় বৈঠকেও বাংলাদেশ প্রতিনিধিদলের নেতৃত্ব দেবেন বাণিজ্য সচিব তপন কান্তি ঘোষ।
কূটনৈতিক পর্যবেক্ষক ও অধ্যাপক ড. ইমতিয়াজ আহমেদ যুক্তরাষ্ট্রের এই বাণিজ্য প্রতিনিধিদলের সফরকে ইতিবাচক ও রুটিন সফর বলে মন্তব্য করেন। তিনি বলেন, টিকফা বাস্তবায়ন নিয়ে যুক্তরাষ্ট্রের আগ্রহ সব সময়ই রয়েছে। তারা বাংলাদেশের সঙ্গে বাণিজ্য সম্প্রসারণে আগ্রহী। টিকফা নিয়ে দেশটি অন্য দেশগুলোর সঙ্গেও নিয়মিত বৈঠক করে। আর শ্রম অধিকার এবং উপাত্ত সুরক্ষা নিয়েও তারা বাংলাদেশের মতো দেশগুলোর সঙ্গে আলোচনা করে। তাদের কিছু প্রত্যাশা এবং চাহিদা তারা দিয়ে থাকে। এটা নিয়ে তারা আলোচনা করতে থাকে।
কূটনৈতিক বিশ্লেষক ও সাবেক রাষ্ট্রদূত হুমায়ুন কবীর দেশ রূপান্তরকে বলেন, যুক্তরাষ্ট্র টিকফা চুক্তির বাস্তবায়ন চায়। তারই আলোকে তারা কৌশল নির্ধারণ করে থাকে। এ পর্যন্ত তারা ৮৭ দেশের সঙ্গে ভিন্ন ভিন্ন নামে বাণিজ্য চুক্তি করেছে। শ্রম অধিকার ও তথ্য-উপাত্ত সুরক্ষা এগুলোতে তারা জোর দিয়ে আসছে।
এ সফরটি অবশ্যই ইতিবাচক এমন মন্তব্য করে তিনি বলেন, ‘এই সফরগুলোর সঙ্গে অন্য বিষয় যুক্ত করার সুযোগ নেই। তাদের সব বিষয় আলাদা। নির্বাচন, গণতন্ত্র বা সরকার-সুশাসন এগুলো নিয়ে এই প্রতিনিধিদল দৃশ্যমান কোনো আলোচনা করবে না। তবে যেকোনো প্রভাবশালী দেশের প্রতিনিধিদের বাংলাদেশ সফর ইতিবাচক বলেই আমি মনে করি।’
উল্লেখ্য, দ্বাদশ সংসদ নির্বাচনের আগে গত বছর যুক্তরাষ্ট্র নতুন শ্রমনীতি ঘোষণা করেছে। এর আগে ন্যূনতম মজুরি বাস্তবায়নের দাবিতে গাজীপুর ও সাভারে পোশাকশ্রমিকদের বিক্ষোভ সহিংসতায় রূপ নেয়। নিহত হন কয়েকজন শ্রমিক। ফলে যুক্তরাষ্ট্রের নতুন শ্রমনীতির প্রভাব নিয়ে তখন ব্যাপক আলোচনা হয়েছে দেশে।
কূটনৈতিক সূত্রের দাবি, এবারের সফরে যুক্তরাষ্ট্র দুই দেশের দ্বিপক্ষীয় বাণিজ্য সম্পর্কে প্রভাবিত করে এমন বিষয়গুলো নিয়ে আলোচনা করবে। এর মধ্যে শ্রম আইনের সংস্কার, বিনিয়োগ পরিবেশ ও ডিজিটাল বাণিজ্যকে প্রভাবিত করে এমন নীতি, মেধা সম্পদের সুরক্ষা, আইনের প্রয়োগসহ সংশ্লিষ্ট বিষয় নিয়ে আলোচনা করবে।
প্রসঙ্গত, ২০১৩ সালের ২৫ নভেম্বর যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে বাংলাদেশের দ্বিপক্ষীয় চুক্তি টিকফা স্বাক্ষরিত হয়। এর আগে বাংলাদেশের পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয় সূত্রে জানা গেছে, যুক্তরাষ্ট্র সবচেয়ে জোর দিচ্ছে শ্রম অধিকারের বিষয়টিতে। শ্রম পরিস্থিতির অর্থবহ উন্নয়ন, বিশেষ করে সমাবেশ ও ট্রেড ইউনিয়ন করার অধিকার, ট্রেড ইউনিয়ন নিবন্ধন প্রক্রিয়ার আইন সংশোধন নিয়ে সরকারের সঙ্গে শ্রমিকদের খোলামেলা আলোচনা চায় তারা।
গত বছরের সেপ্টেম্বরে ঢাকায় দুই দেশের সপ্তম টিকফা বৈঠকেও শ্রম অধিকার ও সংস্কারের বিষয়টি তুলে ধরেছিল যুক্তরাষ্ট্র। তারা শ্রম আইনের সংস্কার চায়। একই সঙ্গে আইনের বাস্তবায়নও চায়।
এবারের বৈঠকে গত টিকফা বৈঠকের সিদ্ধান্তের বাস্তবায়ন ও অগ্রগতি নিয়েও আলোচনা হবে। বাংলাদেশে যে উপাত্ত সুরক্ষা আইন করা হচ্ছে, তা নিয়ে যুক্তরাষ্ট্রের উদ্বেগ রয়েছে। আইনটি করা হলে দুই হাজারের বেশি মার্কিন প্রতিষ্ঠান বাংলাদেশ থেকে ব্যবসা গুটিয়ে নেবে বলেও যুক্তরাষ্ট্রের পক্ষ থেকে বলা হয়েছে।
এ ছাড়া বাংলাদেশে নকল পণ্য তৈরি নিয়ে বেশ কয়েক বছর ধরে উদ্বেগ জানিয়ে আসছে যুক্তরাষ্ট্র। তাই মেধাস্বত্ব-সংক্রান্ত আইন সংস্কারে বাংলাদেশের সঙ্গে যুক্ত থাকতে চায় দেশটি।
এবারের বৈঠকে যুক্তরাষ্ট্রের বাজারে বাংলাদেশি পণ্যের বাণিজ্যসুবিধা চাইবে বাংলাদেশ; বিশেষ করে যুক্তরাষ্ট্রের তুলা থেকে উৎপাদিত পণ্যের শুল্ক ও কোটামুক্ত সুবিধার বিষয়টি তোলা হবে বলে সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিরা জানিয়েছেন।
টিকফা চুক্তির আগে যুক্তরাষ্ট্রের বাজারে বাংলাদেশের অগ্রাধিকার সুবিধা বা জিএসপি বাতিল করেছিল। তখন বাংলাদেশের সংশ্লিষ্ট দপ্তরের পক্ষ থেকে বলা হয়েছিল টিকফা চুক্তি করলে জিএসপি সুবিধা ফেরত পাওয়া যাবে। কিন্তু ১১ বছর ধরে জিএসপি ফিরে পায়নি বাংলাদেশ।
এ বিষয়ে গত বছর দেশের একটি সংবাদমাধ্যমকে দেওয়া সাক্ষাৎকারে ব্রেন্ডান লিঞ্চ বলেছিলেন, কর্মীদের অধিকারের ঘাটতি ও অনিরাপদ কাজের পরিবেশের কারণে বাংলাদেশ ২০১৩ সালে জিএসপি কর্মসূচির জন্য যোগ্যতা হারিয়েছিল। বিভিন্ন দেশের জন্য তাদের যে জিএসপি কর্মসূচি ছিল তার মেয়াদ ২০২০ সালের ডিসেম্বরে শেষ হয়। মার্কিন কংগ্রেস এই কর্মসূচি আবার অনুমোদনের অপেক্ষায় রয়েছে।