ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় সুইমিংপুলে গোসল করতে নেমে মো. সোহাদ হক সোয়েব নামে দর্শন বিভাগের প্রথম বর্ষের এক শিক্ষার্থীর মৃত্যু হয়েছে। গতকাল সোমবার দুপুর ২টার দিকে ঢাবির কেন্দ্রীয় খেলার মাঠসংলগ্ন বিশ্ববিদ্যালয় সুইমিং পুলে এ ঘটনা ঘটে। এদিকে তার মৃত্যুর মধ্য দিয়ে আবারও আলোচনায় এসেছে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের (ঢাবি) সুইমিং পুলের অব্যবস্থাপনা। বিশ্ববিদ্যালয়ের শারীরিক শিক্ষা কেন্দ্রের অধীনে থাকা এ পুলে মানা হয় না কোনো নিয়মকানুন। তদারকির অভাবে দিন দিন ঝুঁকিপূর্ণ ও ব্যবহারের অনুপযোগী হয়ে পড়ছে এই পুল।
মো. সোহাদ হক সোয়েব গতকাল পুলে ডুবে গেলে অচেতন অবস্থায় সহপাঠীরা উদ্ধার করে ঢাকা মেডিকেল কলেজ (ঢামেক) হাসপাতালে জরুরি বিভাগে নিয়ে এলে ডাক্তার তাকে মৃত ঘোষণা করেন। সোয়েবের বাড়ি বগুড়া জেলায়। তিনি হাজী মুহম্মদ মুহসীন হলে থাকতেন।
সোয়েবের বন্ধু ও পরিচিতজনের সঙ্গে কথা বলে জানা যায়, হলের দুজন বন্ধুসহ সুইমিং পুলে গোসল করতে গিয়েছিলেন সোহাদ। সবার সঙ্গে সাঁতার কাটার সময় হঠাৎ একজন খেয়াল করেন সোয়েব ডুবে যাচ্ছে। তখন তারা তাকে টেনে ওপরে তোলেন। এ সময় বমি করে অচেতন হয়ে পড়েন তিনি। অবস্থা বেগতিক দেখে তাকে হাসপাতালে নেওয়া হয়। হাসপাতালে ডাক্তার তাকে মৃত ঘোষণা করেন। তারা আরও জানান, সোয়েবের শ্বাসকষ্ট ছিল। তিনি বিভিন্ন সময় ইনহেলার নিতেন।
একই হলের এবং ইসলামের ইতিহাস ও সংস্কৃতি বিভাগের সাব্বির হোসেন খোকা বলেন, সোয়েব তাদের হলে থাকেন। তার সহপাঠী বঙ্গবন্ধু হলের মো. সোহাগসহ সুইমিং পুলে গোসল করতে যান। সোহাগই তাকে হাসপাতালে নিয়ে আসেন। আরেক শিক্ষার্থী মোল্লা তৈমুর রহমান জানান, সুইমিং পুলে গোসল করার সময় পাড়ে ভিড় দেখেন। গিয়ে দেখেন সহপাঠীরা সোয়েবের পেট চাপাচাপি করে পানি বের করার চেষ্টা করছিলেন। সুইমিং পুলের স্টাফ বারবার মাইকে ঘোষণা দিয়েও দায়িত্বরত চিকিৎসককে পাননি। পরে তাকে ঢামেক হাসপাতালে নিয়ে আসা হয়।
সুইমিং পুলের অব্যবস্থাপনা : খোঁজ নিয়ে জানা যায়, বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষক, কর্মকর্তা ও তাদের পারিবারিক সদস্যসহ শিক্ষার্থী এবং বহিরাগতদের সাঁতার প্রশিক্ষণ ও অনুশীলনের জন্য ব্যবহৃত হলেও মানা হয় না কোনো নিয়মকানুন। সুইমিং পুলে কাগজে-কলমে সুনির্দিষ্ট নিয়ম থাকলেও এসব নিয়মের তোয়াক্কা করেন না কেউ। যার যখন ও যেভাবে খুশি ভেতরে ঢুকে যান এবং পুলের পানিতে কয়েক ঘণ্টা ধরে গোসল করেন। কখনো একা, কখনো দল বেঁধে তাদের এ গোসল চলে। ছাত্রদের জন্য নির্দিষ্ট সময় বেঁধে দেওয়া হলেও এ নিয়ম মানেন না বেশিরভাগ শিক্ষার্থী। সুইমিং কস্টিউম না পরে পানিতে নামা নিষেধ হলেও ৯০ শতাংশই মানেন না এ নিয়ম। এ ছাড়া সুইমিং পুলে নামার আগে গোসলও করেন না অনেকে।
সুইমিং পুলের নোটিস বোর্ডে টানানো নিয়মানুযায়ী, নারী শিক্ষার্থীদের জন্য আলাদা শিফটে সাঁতারের ব্যবস্থার কথা লেখা থাকলেও তারা আসলে বাকিদের অনিয়মের কারণে সেখানে যেতেই পারেন না।
শিক্ষক ও শিক্ষার্থীরা বলছেন, শারীরিক শিক্ষা কেন্দ্র কর্র্তৃপক্ষ যথাযথ তদারকিও করেন না। নামকাওয়াস্তে দুই-একজন লোক সুইমিং পুলের ভেতরে থাকেন, যদিও সেখানে আরও বেশি দায়িত্বপ্রাপ্ত কর্মকর্তা-কর্মচারী থাকার কথা। এ ছাড়া কে সাঁতার পারে না কিংবা কোনো রোগবালাই আছে কি না, সেদিকে কারও নজর নেই। দলবদ্ধভাবে যে যার মতো করে সুইমিং করে চলে যায়।
বিশ্ববিদ্যালয়ের এক শিক্ষক দেশ রূপান্তরকে বলেন, বাজে অবস্থা এ সুইমিং পুলের! রাত ২টা বাজে, ভোর ৬টা বাজে এখানে শিক্ষার্থীরা সাঁতার কাটার জন্য জবরদস্তি করে! প্রতিদিন একসঙ্গে শতাধিক শিক্ষার্থী সাঁতার কাটতে নামে! দায়ী কে? বিদেশের বিশ্ববিদ্যালয় যখন সাঁতার কাটতে নামতাম; সুইমিং পুলের চারপাশে সদাপ্রস্তুত একদল প্রশিক্ষিত সাঁতারু চেয়ার পেতে বসে থাকত! যেকোনো বিপজ্জনক অবস্থা দেখলে বাঁশি বাজিয়ে সতর্ক করত। বাধ্যতামূলক ডিউটি ছিল সুইমিং পুলের চারপাশে চেয়ার পেতে বসে থাকা। চারদিকে নজরদারি ছাড়া এদের অন্য কোনো কাজ দেওয়া হতো না। এখানে এসবের কোনো বালাই নেই। সুনির্দিষ্ট সময় বলতে যা কিছু আছে, সেটিও এখানে অনুসরণ করা হয় না!
এক নারী শিক্ষার্থী বলেন, আমরা মেয়েরা তো এখানে আসতেই পারি না। যখনই আসি তখনই কোনো না কোনো একটি ছেলের দল এখানে থাকেই। এসব বিষয়ে প্রশাসনের কোনো পদক্ষেপ এখনো দেখলাম না। কোনো ধরনের তদারকিই করে না তারা।
নিহত সোহাদ ছিলেন প্রেসিডেন্ট স্কাউট, জানতেন সাঁতার : নিহত শিক্ষার্থী মো. সোহাদ হক ছিলেন প্রেসিডেন্ট স্কাউট এবং ভালো সাঁতারও জানতেন। বিশ্ববিদ্যালয় রোভার স্কাউট গ্রুপের সিনিয়র রোভার মেট (যোগাযোগ) আহসান উল্লাহ (পিএস) বলেন, স্কুলপর্যায়ের স্কাউটদের সর্বোচ্চ অ্যাওয়ার্ড প্রাপ্তির জন্য চারটি পর্যায়ে বাধ্যতামূলক সাঁতার পরীক্ষা দিতে হয়, এসব বিষয়ে উত্তীর্ণ হওয়ার পরই একজন স্কাউটকে প্রেসিডেন্টস স্কাউট (পিএস) অ্যাওয়ার্ড প্রদান করা হয়। সোহাদ ২০১৭ সালে বগুড়া জিলা স্কুল থেকে এ অ্যাওয়ার্ড অর্জন করেছে। তার সিরিয়াল ৪৮২। সে ক্ষেত্রে সাঁতার না জানলে এই অ্যাওয়ার্ডের জন্য মনোনীত করা হয় না। সে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় রোভার স্কাউট গ্রুপের সহচর হিসেবে গত বছর যোগদান করেছে। গত ২১ ফেব্রুয়ারিতেও সে দক্ষতার সঙ্গে দায়িত্ব পালন করেছে।
দায়িত্ব অবহেলা ও অব্যবস্থাপনার বিষয় অস্বীকার করেন শারীরিক শিক্ষা কেন্দ্রের ভারপ্রাপ্ত পরিচালক মো. শাহজাহান আলী। বরং শিক্ষার্থীদের ওপর নিয়ম না মানার এবং হুমকির অভিযোগ তোলেন। দেশ রূপান্তরকে তিনি বলেন, ‘আমাদের পর্যাপ্ত ট্রেনার এবং দায়িত্বপ্রাপ্ত কর্মচারী উপস্থিত থাকেন। কিন্তু শিক্ষার্থীরা কোনো ধরনের নিয়ম মানতে চায় না। ছাত্ররা যখন-তখন চলে আসে, পুলের গার্ডকে হুমকি-ধমকি দিয়ে ভেতরে যায়, দেয়াল টপকে ভেতরে যায়। এ ক্ষেত্রে আমাদের তেমন কিছু করার থাকে না। আর ডাক্তার এখানে এমনিতেও থাকেন না, এখন হয়তো রাখা হবে। আপাতত বিশ^বিদ্যালয়ের নির্দেশনা অনুযায়ী অনির্দিষ্টকালের জন্য বন্ধ ঘোষণা করা হলো।’
শিক্ষার্থীর মৃত্যু এবং অব্যবস্থাপনার বিষয়ে তদন্তের কথা জানিয়েছেন বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রক্টর অধ্যাপক মাকসুদুর রহমান। দেশ রূপান্তরকে তিনি বলেন, ‘তার (সোহাদ হক) বন্ধুদের সঙ্গে পুলে গোসল করতে গিয়ে সে মৃত্যুবরণ করেছে। কীভাবে মারা গেছে, এটা তদন্তের পরই বলা যাবে। সুইমিং পুলে কোনো অব্যবস্থাপনা আছে কি না, কর্র্তৃপক্ষের দায়িত্ব অবহেলার অভিযোগ আছে কি না, সে বিষয়গুলোও আমরা দেখব।’