আরবি বর্ষপঞ্জি অনুসারে দশম মাসের নাম শাওয়াল। এই মাসের প্রথম দিন ঈদুল ফিতর উদযাপিত হয়। এই দিনে আল্লাহতায়ালা বান্দাদের প্রতি বিশেষ রহমত বর্ষণ করেন। তিনি মৌমাছিকে মধু তৈরিতে উদ্বুদ্ধ, জান্নাত সৃষ্টি, তুবা নামক জান্নাতি বৃক্ষ সৃষ্টি এবং ওহির জন্য হজরত জিবরাইল (আ.)-কে নির্বাচন করেন এই দিনে। এ ছাড়া ফেরাউনের জাদুকররা তওবা করেছিল এই দিনে। (গুনিয়াতুত তালেবিন ৪০৫)
এই মাসের ৪ তারিখে রাসুল (সা.) নাজরানের খ্রিস্টানদের সঙ্গে যুদ্ধের অবতারণা করেন এবং এই মাসের ১৫ তারিখে উহুদের যুদ্ধ সংঘটিত হয়। যেখানে শহীদদের সরদার হজরত আমির হামজা (রা.) শহীদ হন। এই মাসের ২৫ তারিখ থেকে মাসের শেষ পর্যন্ত দিনগুলো ছিল আদ সম্প্রদায়ের জন্য খারাপ দিন। আল্লাহতায়ালা এ সময়ে আদ জাতিকে ধ্বংস করেছিলেন। (ফাজায়িলুল আইয়াম ওয়াশ শুহুর ৪৪৪)
শাওয়াল মাসে বহু ফজিলতের পাশাপাশি আমাদের সমাজে বহু কুসংস্কার ও বিদআত প্রচলিত আছে। সেগুলো উল্লেখ করা হলো।
পহেলা শাওয়াল মৃত ব্যক্তির বাড়িতে যাওয়া : কারও মৃত্যু হলে আত্মীয়স্বজনরা প্রথম ঈদুল ফিতর ও ঈদুল আজহার দিন মৃত ব্যক্তির বাড়িতে যাওয়াকে ফরজ বলে মনে করেন এবং শোক পালন করে থাকেন। যদিও মৃত্যুর পর কয়েক মাস কেটে যায়। তিন দিনের মধ্যে একবার শোক পালন করা সুন্নত। তাই একবার শোক পালন করা হলে ঈদের দিন আবার শোক পালন করা সুন্নতবিরোধী কাজ। শরিয়তে এর কোনো প্রমাণ নেই। এই দিনে দুঃখকে নবায়ন করে ঈদের আনন্দকে দুঃখে পরিণত করা অত্যন্ত জঘন্য ও শরিয়ত পরিপন্থী। তাই এই খারাপ প্রথা ও বিদআত পরিহার করা জরুরি। (হিন্দিয়া ১/১৬৭)
ঈদের দিন কবরস্থানে যাওয়া : কোনো কোনো এলাকায় ঈদের নামাজের পরপরই কবরস্থানে যাওয়া জরুরি মনে করা হয়। যারা ওইদিন কবর জিয়ারত করে না তাদের প্রতি নিন্দা জানানো হয়। অথচ এটি বিদআত ও নাজায়েজ, যা পরিহার করা আবশ্যক। তবে যদি কবরস্থানে যাওয়াকে আবশ্যিক ও সুন্নত মনে না করা হয়, তাহলে ঈদের দিন কবরস্থানে যাওয়া জায়েজ। (মাহমুদিয়া ৯/২০১)
শাওয়াল মাসে বিয়ে করাকে অশুভ মনে করা : এই মাসে মাদি উট নর উট থেকে দূরে থাকত, তাই আরবরা এই মাসে বিয়েকে অশুভ মনে করত। (লিসানুল আরব ১১/৩৭৭) এ ছাড়া একবার শাওয়াল মাসে মহামারী হয়েছিল, এতে অনেক কনে মারা গিয়েছিল। তাই জাহেলিয়াতের যুগে লোকরা শাওয়াল মাসে বিয়ে করাকে অশুভ মনে করত। (তাবাকাতে ইবনে সাদ ৮/৬০)
রাসুল (সা.) এই মাসে হজরত আয়েশা (রা.)-কে বিয়ে করেন এবং জাহেলিয়াতের ভ্রান্ত ধারণাকে প্রত্যাখ্যান করে একই মাসে তাকে নিজ বাড়িতে নিয়ে আসেন। আয়েশা (রা.) থেকে বর্ণিত। তিনি বলেন, ‘রাসুল (সা.) আমাকে শাওয়াল মাসে বিয়ে করেন এবং শাওয়াল মাসেই আমাকে তার ঘরে নিয়ে আসেন। রাসুল (সা.)-এর কোন স্ত্রী আমার চেয়ে বেশি সৌভাগ্যবান ছিলেন?’ (সহিহ মুসলিম ৩৪৮)
ইমাম নববি (রহ.) এই হাদিসের ব্যাখ্যায় লিখেছেন, আরবরা শাওয়াল মাসে বিয়ে করাকে খারাপ ও অশুভ মনে করত। হজরত আয়েশা (রা.)-এর উদ্দেশ্য হলো এই ভ্রান্ত ধারণাকে খণ্ডন করা যে, এর মধ্যে যদি কোনো সত্যতা থাকত, তাহলে কেন তিনি সব নবীপত্নী (রা.)-এর মধ্যে সবচেয়ে ভাগ্যবান হবেন? (শারহুন নববি ৯/২০৯)
আল্লামা ইবনে কাসির (রহ.) বলেন, রাসুল (সা.) শাওয়াল মাসে আয়েশা (রা.)-কে বিয়ে করার মাধ্যমে ওইসব লোকের ভ্রান্ত বিশ্বাসকে প্রত্যাখ্যান করেছেন, যারা দুই ঈদের মধ্যবর্তী সময়ে কোনো নারীকে বিয়ে করাকে অপছন্দ করত। (আল-বিদায়া ওয়ান নিহায়া ৪/৫৮০)
আল্লাহতায়ালা এই বরকতময় মাসের বরকতে আমাদের সমৃদ্ধ করুন এবং বিদআত ও কুসংস্কার থেকে হেফাজত করুন। এই মাসের যথাযথ মূল্যায়ন এবং ভালোভাবে ইবাদত করার তওফিক দান করুন। আমিন।