অ্যাপোক্যালিপস অথবা কেয়ামতের আলামত

ইরানে ক্ষেপণাস্ত্র হামলা চালিয়েছে ইসরায়েল। এপ্রিলের ১৯ তারিখে। কারণ, এর আগে ১৩ এপ্রিল ইসরায়েলে আধুনিককালের ইতিহাসে প্রথমবারের মতো হামলা চালিয়েছিল ইরান। সে আক্রমণের পেছনে পূর্বাপর অনেক কাহিনি আছে। আপাতত ইরানের হামলার ব্যাপারেই বলা যাক। হামলাটি ঘটেছিল ১ এপ্রিল সিরিয়ার রাজধানী দামেস্কে ইরানি কনসুলার অফিসে (দূতাবাসে) ইসরায়েলি হামলার জবাবে। ইরানি স্থাপনায় বা স্বার্থে ইসরায়েলের হামলা অনেক আগে থেকেই ঘটেছে এবং অনেকবার ঘটেছে। সিরিয়ায় ও ইরাকে। সিরিয়ায়ে ইরানের কনসুলেটে হামলায় ইরানের বড় বড় সামরিক নেতাও মারা গেছেন। ১ এপ্রিলের হামলাতেও অনুরূপ ঘটনা ঘটেছে।

সাম্প্রতিক সময়ে, বিশেষ করে ২০১৫ সালের পরে মার্কিন ওয়ার অন টেররের পরিপ্রেক্ষিতে (যার পশ্চিম এশীয় সহযোগী ইসরায়েল) সিরিয়া ও ইরাকে ইরানের বিরুদ্ধে ইসরায়েলের ছায়াযুদ্ধের তীব্রতা বেড়েছে। ১ এপ্রিলের আক্রমণটিও ওই ছায়াযুদ্ধেরই বহিঃপ্রকাশ। কারণ ওয়ার অন টেররের নামে যে মগের মুল্লুক (প্রকারান্তরে দায়েশের মুল্লুক) মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র এবং ইসরায়েল কায়েম করেছিল তাতে বড় বাধা হয়ে দাঁড়িয়েছিল ইরান। ইরানের জেনারেল সোলায়মানির সক্রিয় দূতিয়ালিতে রাশিয়া ওয়ার অন টেররের বিরুদ্ধে এবং দায়েশের তথা আইএস বা আল-কায়েদা বা আল নুসরা বা ফাতাহ আল শামের বিরুদ্ধে অবস্থান নিয়েছে। রাশিয়ার বিরুদ্ধে ইসরায়েলের শত্রুতার লক্ষণগুলো বাইরে তত স্পষ্ট নয়। কিন্তু ইরানের বিরুদ্ধে ইসরায়েলের শত্রুতার লক্ষণগুলো খুবই স্পষ্ট। কথিত আছে, সোলায়মানির হত্যকান্ডে প্রকাশ্যে যুক্তরাষ্ট্রের হাত থাকলেও ইসরায়েলের গোপন হাত রয়েছে।

ফলে ১ এপ্রিলের হামলার জবাবে ইরান যে একটা হামলা চালাবে সে ব্যাপারে ওয়াকিবহাল ছিল সারা বিশ্ব এবং উদ্বিগ্ন অপেক্ষায় ছিল ইসরায়েল। ইসরায়েল অপেক্ষা করছিল কারণ সে ধরে নিয়েছে আঙ্কল শ্যাম তার সব পাখনা মেলে, জলে-স্থলে-অন্তরীক্ষে তার সহায়তায় এগিয়ে আসবে ব্ল্যাক নাইট রাইডার অব দ্য মিডল আর্থ। শুধু ইসরায়েল নয়, এমন একটি ঘটনার জন্য অপেক্ষমাণ ছিল গোটা পশ্চিম এশিয়া, গোটা বিশ্ব; অপেক্ষমাণ ছিল পূর্ব এশিয়া (অর্থাৎ চীন ও উত্তর কোরিয়া), মধ্য এশিয়া এবং রাশিয়া ও ইউক্রেন। ইউক্রেন-রাশিয়ার রণাঙ্গনেরই সম্প্রসারিত রূপ পশ্চিম এশিয়ার এ রণাঙ্গন।

হামলার জবাবে ইরানের মিত্র পক্ষ যেমন সিরিয়া ও ইরাকের শিয়া সশস্ত্র বিভিন্ন সংগঠন ইসরায়েলে হামলা চালায়নি তবে প্রস্তুত ছিল; হামাস গাজায় প্রতিরোধযুদ্ধে লিপ্ত, তারা ইরানের হামলাকে স্বাগত জানিয়েছে, ইয়েমেনের হুতি বিদ্রোহী গোষ্ঠী যারা ইরানের নিবিষ্ট এবং নিবেদিত সমর্থক তারা কোনো হামলা ইসরায়েলে চালায়নি। হামলাটি যেন ব্যাপক আকার ধারণ না করে সে জন্য ইরান তার মিত্র পক্ষগুলোকে অর্থাৎ এক্সিস অব রেজিস্ট্যান্সকে বিরত থাকার অনুরোধ জানিয়েছিল; শুধু লেবাননের হিজবুল্লাহ উত্তর ইসরায়েলে এবং ইসরায়েল-অধিকৃত সিরিয়ার গোলান মালভূমি এলাকায় ওইদিন হামলা চালিয়েছিল। ইরানি হামলার আশঙ্কায় ইসরায়েল তার সামরিক বাহিনীর সব ছুটি বাতিল করে। অবশেষে ইরান হামলা করল, তিনশোর বেশি ড্রোনের, ভ্রাম্যমাণ ক্ষেপণাস্ত্রের এবং ব্যালিস্টিক ক্ষেপণাস্ত্রের এক পৌরাণিক হামলা, যে হামলার কথা পশ্চিমাদের কেউ, পশ্চিম এশিয়ার কোনো রাষ্ট্র এবং খোদ ইসরায়েল ভাবতে পারেনি। ভাবত, ইরান কয়েকটা ড্রোন এবং দুয়েকটা ক্ষেপণাস্ত্রের হামলা হয়তো চালাতে পারে।

এর কারণ ইরানের সামরিক শক্তি সংক্রান্ত সব প্রচারণাকে ইসরায়েল এবং যুক্তরাষ্ট্রসহ সম্মিলিত পাশ্চাত্য শুধু প্রচারণা তথা প্রোপাগান্ডা মনে করেছে। বিশ্বাস-অবিশ্বাসের এ টেকনিক তারা ইউক্রেনের রণাঙ্গনে চালাতে অভ্যস্ত আর কোনো এক দুর্বোধ্য কারণে পাশ্চাত্যের প্রায় সব প্রেস্টিটিউট বা মূলধারার গণমাধ্যম (এমএসএম) জায়নবাদীদের বা ইসরায়েল-অন্তপ্রাণ মিডিয়া মুঘলদের হাতে। আর আধুনিককালে ইসরায়েলে সরাসরি হামলা চালানোর রেকর্ড ইরানের নেই।

ফাঁকে গাজা দৃষ্টির বাইরে রয়ে গেল। ডামাডোলে সব হারিয়ে গেল। গাজায় নিহত বেড়ে ৩৪,০৪৯ জন হয়েছে, আহত হয়েছে ৭৬,৯০১ জনের বেশি। যুদ্ধের কারণে গাজার বেসামরিক জনসংখ্যার ৮৫ শতাংশ অভ্যন্তরীণভাবে বাস্তুচ্যুত হয়ে মূলত রাফায় জড়ো হয়েছে। তারা খাদ্য, পানীয় জলের এবং জরুরি ওষুধের চরম ঘাটতিতে রয়েছে। গাজার ৬০ শতাংশ অবকাঠামো ধ্বংস হয়ে গেছে, এ হিসাব খোদ জাতিসংঘের। এতকিছুর পরও ইসরায়েলের অভীষ্ট লক্ষ্য এখনো অর্জিত হয়নি। তারা হামাসকে নির্মূল করার ঘোষিত লক্ষ্য অর্জনে ব্যর্থ হয়েছে।

ইসরায়েলকে ইরানের হামলা থেকে রক্ষায় বেশ কয়েকটি দেশ সংশ্লিষ্ট। এসবের মধ্যে রয়েছে জর্দান, যুক্তরাষ্ট্র, যুক্তরাজ্য ও ফ্রান্স। মার্কিন প্রতিরক্ষামন্ত্রী লয়েড অস্টিন বলেছেন, মার্কিন সেনাবাহিনী ইরানের কয়েক ডজন ক্ষেপণাস্ত্র ও ড্রোনকে প্রতিহত করছে। খবর বিবিসি।

ইসরায়েলের সামরিক মুখপাত্র বলেছেন, ইসরায়েলকে রক্ষায় যুক্তরাজ্যের যুদ্ধবিমান এবং ফ্রান্স আকাশপথে টহল দিয়েছে। জর্ডান জানিয়েছে, তারা তাদের আকাশে প্রবেশ করা ইরানের ক্ষেপণাস্ত্র আটকে দিয়েছে।

ইরানের ইসলামিক রেভলিউশনারি গার্ড কোর (আইআরজিসি) জানিয়েছে, ইসরায়েলে চালানো তাদের অপারেশনটির নাম ‘ট্রু প্রমিজ’। ইসরায়েলে ইরানের ক্ষেপণাস্ত্র ও ড্রোন হামলার কথা যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েলের পক্ষ থেকেও নিশ্চিত করা হয়েছে।

সিআইয়ের সাবেক অ্যানালিস্ট ল্যারি জনসন বলেছেন, , Most Western analysts were popping champagne corks today proclaiming Israel’s ‘massive’ victory over Iran’s 14 April combined drone, cruise missile and ballistic missile attack on targets in Israel. I don’t know if they are really this blind to what happened...

ইসরায়েলে হামলার বিষয়টি ওমানকে জানিয়েছিল ইরান। ওমান ব্যাক চ্যানেলে যোগাযোগ করেছিল তেহরান ও ওয়াশিংটনের মধ্যে। তুর্কি, জর্দানি, ইরাকি কর্মকর্তারাও বলেছেন, ইরান সংশ্লিষ্ট পক্ষগুলোকে কয়েকদিন আগেই নোটিস করেছিল। কিন্তু মার্কিন কর্মকর্তারা বিষয়টি বেমালুম অস্বীকার করেছেন এবং বলেছেন, ‘Tehran... was aiming to cause significant damage. ...US officials can no longer be accepted as accurate given their established history of lying. This is a ‘cover-my-ass’ denial.’ বলেছেন ল্যারি জনসন।  

The drones were used in the same way that pawns are employed in a chess match- draw out the opponent and create vulnerabilities. Israel used up over 700 Iron Dome missiles in countering Iran’s 300 plus drones. Why?... What we know for a fact is that most of the ballistic missiles hit their targets in Israel. ... Iran demonstrated a remarkably sophisticated capabilitiy... .

Scott Ritter summed it up : For all those trying to spin yesterday’s events as an Israeli victory, chew on that fact : The best missile defense system in the world could not protect the sites they were tasked with protecting from attacks by Iranian missiles.

(Despite Western Insistence That Iran Failed, Iran Did What It Planned to Do In Israel/LARRY JOHNSON /APRIL 15, 2024/ https://www.unz.com/article/despite-western-insistence-that-iran-failed-iran-did-what-it-planned-to-do-in-israel/)

ইসরায়েলে ইরানের হামলায় তেহরানের খরচ হয়েছে ৩৫ মিলিয়ন ডলার, ইসরায়েলের খরচ হয়েছে ১.৩৫ বিলিয়ন ডলার; এক ইসরায়েলি কর্মকর্তার মতে ইসরায়েলের খরচের তুলনায় ইরানের খরচ হয়েছে মাত্র ২.৬ শতাংশ (পেপি এস্কোবার)।

Iran has been able to accomplish this without either disrupting its strategic pivot to the east or undermining the cause of Palestinian statehood. “peration True Promise,” as Iran named its retaliatory attack on Israel, will go down in history as one of the most important military victories in the history of modern Iran. ... Iran has established a credible deterrence posture without disrupting major policy goals and objectives is the very definition of victory.

(The Missiles of April. “Iranian Missiles Rained Down on Israel/ Scott Ritter/ Global Research, April 15, 2024/ https://www.globalresearch.ca/missiles-april-scott-ritter/5854779)

ইরানের পৌরাণিক হামলার জবাবে ইসরায়েলকে একটা পাল্টা হামলা চালাতেই হয়, না হলে মুখরক্ষা হয় না। এটা ইসরায়েলের অহং তথা ইগোর সমস্যা। ইসরায়েল মনে করে সে যার ওপর খুশি, যখন ইচ্ছে তখন হামলা করতে পারে; কিন্তু তার ওপর কেউ হামলা করতে পারে না। আর তাদের পেছনে আছে যুক্তরাজ্যের মতো, যুক্তরাষ্ট্রের মতো আদিপুস্তকনিবিষ্ট কিছু বশংবদ শক্তি। আর আছে জায়নবাদী অর্থশক্তি এবং জায়নবাদী অপ্সরা, অনুঢ়াদের মোহিনী কামশক্তি। আর আছে গন্দমের আদম ভুলানো মাতোয়ারা শক্তি। ইসরায়েল সর্ববিবেচনাতেই সশস্ত্র একটা শক্তি, সিমিংলি অল এভেডিং মিলিটারি পাওয়ার। হেজিমনস গার্ড ইন দ্য মিডিলইস্ট। আর তাকেই কিনা নাস্তানাবুদ করল ইরান! অতএব তাকে তো ইরানে হামলা চালাতেই হয়।

অবশ্য সে হামলা প্রতিহত করে দিয়েছে ইরান। ইরান ক্ষেপণাস্ত্র হামলার কথা বলেনি। তারা বলেছে তিনটি ড্রোনের কথা। ড্রোনগুলোকে তারা প্রতিহত করেছে। দাপ্তরিকভাবে তারা ড্রোন কিংবা ক্ষেপণাস্ত্র হামলার কথা স্বীকারও করেনি। তবে বলেছে তারা এ মুহূর্তে ইসরায়েলে পাল্টা হামলা চালিয়ে উত্তেজনাকে আর বাড়াতে চায় না। বাহ্যত সেটি তেমন কোনো হামলাও নয়। বোঝা যায় ইসরায়েল অহংবোধে তাড়িত হয়েই এ হামলা চালিয়েছে। নাতাঞ্জে ইরানের একটি এস-৩০০ পিএমইউ ক্ষেপণাস্ত্র প্রতিরোধক ব্যবস্থা ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে বলে জানা গেছে। ১৩-১৪ তারিখে ইরানি হামলার বিপরীতে ১-৩টি ক্ষেপণাস্ত্র অথবা ড্রোন ব্যবহার করা ইসরায়েলের জন্য ইজ্জত রক্ষার কাজই ছিল। তবে সাইকোলজি বলে ইসরায়েল আরও হামলার অজুহাত খুঁজবে। এটাই ইসরায়েলের স্বভাব। না হলে বিবলিক্যাল ঠ্যাঁটামির কোনো মানেই থাকে না।

ইসরায়েল ইরানের ইস্পাহানের নাতাঞ্জে, পারমাণবিক স্থাপনায় বা বিমান ঘাঁটিতে যে ক্ষেপণাস্ত্র দিয়ে হামলা চালিয়েছিল তাতে একটি গোপন ক্ষেপণাস্ত্র ব্যবহার করা হয়েছিল, টু স্টেজ ক্ষেপণাস্ত্র। সেটি যে টু স্টেজ ক্ষেপণাস্ত্র ছিল সেটি বোঝা গেছে একই সময়ের হামলায় ইরাকের লতিফিয়া ও আজিজিয়া শহরে হামলায় ব্যবহৃত ক্ষেপণাস্ত্র দেখে। সেটি এফ-১৫ বিমান থেকে ছোড়া হয়েছিল। ক্ষেপণাস্ত্রটির পাল্লা ১ হাজার কিলোমিটার। এবং সেটি ইসরায়েলের আকাশসীমার মধ্য থেকে ছোড়া হয়নি। ছোড়া হয়েছে ইসরায়েল-জর্দান-সিরিয়া সীমান্ত থেকে। পাল্লা প্রায় ২০০ কিলোমিটার কমিয়ে আনার জন্য। নিক্ষিপ্ত ক্ষেপণাস্ত্র সম্ভবত রুপালি চড়ুই জাতের (Silver Sparrow) এগুলো এফ-১৫ জেট জঙ্গি বিমানে ব্যবহার করা হয়। উল্লেখ্য, ইরানে হামলার একই সময়ে সিরিয়া ও ইরাকেও হামলা চালায় ইসরায়েল।

লেখক: সাংবাদিক

tarik69@gmail.com