সাম্প্রতিক সন্ত্রাসী ঘটনার পর রুমা, থানচিসহ বান্দরবানের দূরের অসংখ্য জনপদে জনজীবন থমকে গেছে। গত বছর পাহাড়ে জুম চাষ হয়নি। এ বছর এ রকম পরিস্থিতিতে হবে কী করে? ফলফলাদি আগাম বিক্রি করার মৌসুম চলছে। পরিস্থিতির কারণে ব্যবসায়ীরা সেখানে যাচ্ছেন না। জুম চাষ করতে না পারলে, ফল আগাম বিক্রি করতে না পারলে খাদ্যাভাব এবং অর্থাভাবে পড়ে যাবে।
কিন্তু ঘটনার জের ধরে এডেন পাড়ার এক গৃহবধূকে লালমনিরহাট পাঠিয়ে দেওয়া হলো। যিনি ‘কাগজে কলমে’ একজনের স্ত্রী! এক নিরীহ গৃহবধূকে, একজন স্বাস্থ্যসেবা কর্মীকে রুমা থেকে লালমনিরহাটে পাঠিয়ে দিয়ে বাস্তবে কী অর্জিত হয়েছে? এতে কি সন্ত্রাসী গোষ্ঠীর নেটওয়ার্ক ভেঙে পড়েছে? যে পুরনো কৌশল আশির দশকে আমরা শান্তিবাহিনীর তৎপরতার সময় অসংখ্যবার প্রত্যক্ষ করেছিলাম তা কি আমরা ভুলে গেলাম? সপ্তাহ দুই জুড়ে সন্ত্রাসী গোষ্ঠী দমনে নেতৃত্বহীন বিচ্ছিন্ন অপারেশনের অভিঘাত কতদূর বিস্তৃত হয়েছে? তার আফটারম্যাথ কোথায় কী আকার ধারণ করতে যাচ্ছে? ক্ষোভ দানা বাঁধছে। অভিযান, ধরপাকড়ে সীমান্ত অতিক্রম করে অসংখ্য বম সম্প্রদায়ের বাসিন্দাদের স্থানান্তরের ঘটনা তৈরি করেছে সহানুভূতির কালোমেঘ। বান্দরবান সীমান্তের ওপারে মিজোরামে কী ঘটে চলেছে?
একটি সশস্ত্র গোষ্ঠীর কারণে আপাত শান্ত বান্দরবান গত দুই বছর ধরে অশান্ত, উত্তপ্ত। তাদের গঠন, বিকাশ বা পটভূমি সবারই কমবেশি জানা। কাদের আশ্রয় প্রশ্রয়ে তারা বেড়ে উঠেছিল এ কথা সবার মুখে মুখে ঘোরে ফেরে। ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের চারুকলায় পড়া ছেলেটির পিসিপিআর যাচাই করলে রুমা থেকে ঢাকায় আসা, ভর্তি পরীক্ষায় না টিকেও ভর্তি হতে পারার পরাক্রম তথ্যানুসন্ধান করলে অনেক কিছুই পরিষ্কার হয়ে যায়। উচ্চাকাক্সক্ষা তার জীবন জুড়ে। বঞ্চনা, প্রাপ্তি-অপ্রাপ্তির হিসাব মেলাতে মেলাতেই বাঁকা পথের সন্ধান পেয়ে যায় সে। আঞ্চলিক পরিষদে ঘুরেছে, পাত্তা পায়নি। রাজনৈতিকভাবে দাঁড়াতে চেষ্টা করেছে, সুবিধা করতে পারেনি। সবশেষ ডেভেলপমেন্ট অর্গানাইজেশন তৈরির আড়ালে সুযোগ বুঝে লক্ষ্য ও অবস্থান বদলাতে বদলাতে তৈরি করে ‘কেএনএফ’ নামে বিচ্ছিন্নতাবাদী সংগঠন। যার নেতৃত্বে নাথান।
গোয়েন্দা তথ্য ইঙ্গিত দিচ্ছে, সেখানেও নেতৃত্ব প্রশ্নে স্পষ্ট ফাটল দেখা দিয়েছে। একপক্ষ চায় শান্তি, স্বাভাবিক জীবনে ফিরতে। আরেকপক্ষ তা চায় না। যারা চায় না তারাই কথিত শান্তি আলোচনা চালু থাকার মধ্যেই জন্ম দেয় অবিশ্বাস্য এক ঘটনার। শান্তিবাহিনীর তৎপরতার সময়ও এমন ঘটনা কখনো দেখেনি পাহাড়ের মানুষ। এই সামর্থ্য ও সাহস তারা কীভাবে অর্জন করল সে হিসাব মেলে না। চুপেচাপে অতর্কিতও নয়। গাড়ি হাঁকিয়ে গুলি করতে করতে তারা রাষ্ট্রীয় ব্যাংকে হামলা করেছে। লুটে নিয়েছে অর্থ, কেড়ে নিয়েছে অস্ত্র। একটি দুটি নয়, চৌদ্দটি রাইফেল। বলা হয়ে থাকে, জীবনের চেয়েও হাতিয়ার মূল্যবান। তার রক্ষায় ন্যূনতম প্রতিরোধ গড়ে তোলার খবরও আমরা পেলাম না কেন? মৌলিক কিছু প্রশ্ন মাথায় ঘুরপাক খায়। যার সদুত্তর কাউকে দিতে শুনিনি এখন পর্যন্ত। হামলার পর দুই সপ্তাহ পার হতে চলল। এখনো পর্যন্ত অস্ত্রগুলো উদ্ধার করা গেল না।
আমরা খেয়াল করে দেখলাম, চাকমা রাজা ব্যারিস্টার দেবাশীষ রায়ের বক্তব্য। তিনি এক বক্তৃতায় পুরো ঘটনাটিকে ‘নাটক’ হিসেবে চিত্রিত করেছেন। ঘটনার পর আমরা পুলিশ প্রধানকে ছুটে যেতে দেখেছি। তারপর সেনাপ্রধানকেও দেখলাম। তাদের ছুটে যাওয়া তাৎপর্য বহন করে। সবশেষে গেছেন, স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী। তার হুঁশিয়ারির কথা আমরা শুনেছি। একই সঙ্গে শুনেছি, শান্তি আলোচনার দরজা খোলা রাখার কথাও। প্রশ্ন এখানেই! আলোচনার কথা পার্বত্য চট্টগ্রাম বিষয়ক মন্ত্রণালয় জানে না। আঞ্চলিক পরিষদ জানে না। তাহলে আলোচনা কেমন করে, কোন পরিকাঠামোতে এগিয়ে যাবে?
শান্তিবাহিনীর তৎপরতার সময়ও কিন্তু আলোচনা চলেছিল। এরশাদ করেছেন। খালেদা জিয়া করেছেন। শেখ হাসিনাও করেছেন। প্রত্যেকের নির্বাচিত, নির্ধারিত প্রতিনিধি অফিশিয়ালি এ কাজের জন্য নিয়োগ করা ছিল। এখন সেই কাজ আমরা করতে দেখলাম বান্দরবান জেলা পরিষদ চেয়ারম্যানকে। এই রকম আলোচনা ঘোলাটে মনে হয়। কারণ এখানে স্বচ্ছতা নেই। এই আলোচনা যেমন অস্বচ্ছ, ‘কেএনএফ’ এর দাবি তারও বেশি অস্বচ্ছ। সেখানে রাষ্ট্র বা সরকারের বিরুদ্ধে ক্ষোভের বদলে আঞ্চলিক পরিষদ, চাকমা, মারমাদের বিরুদ্ধে রাজ্যের ক্ষোভ ঝেড়েছে। প্রশ্ন হলো, এভাবে কি কুকিচিন টেরিটোরিয়াল কাউন্সিল সংক্ষেপে কেটিসি প্রতিষ্ঠা পায়? রাজ্য তৈরির কৌশলের ধরন কি তাই? সময় হয়েছে, দৃষ্টি আরও গভীরে ফেলার। কাশবন দূর থেকে যেমন ঘন দেখায়, কাছে গেলে বুঝা যায় কতটা ফাঁকা। কেএনএফও অনেকটা তাই ছিল।
কেএনএফকে হালকা করে দেখার সময় ফুরিয়ে গেছে। আরও গভীরে ঢুকতে হবে। নজর রাখতে হবে, বান্দরবান সীমান্তের ওপারে মিজোরামে। তাদের সমর্থনে গড়ে ওঠা নীরব সংঘবদ্ধ ভাষা পড়তে হবে। অস্ত্র আদান প্রদান, কেনাবেচা, আর্থিক সমর্থনের প্রক্রিয়া বস্তুনিষ্ঠভাবে জানতে হবে।
মায়নমারের চিন প্রদেশ, আরাকান, মিজোরাম, মনিপুর জুড়ে বম সম্প্রদায়ের এক বিরাট জনগোষ্ঠীর বসবাস। তারা এখন আগের যেকোনো সময়ের চেয়ে সংগঠিত। ঘরের খবর এখন সবখানে ছড়িয়ে পড়েছে। এ নিয়ে সভা, সমাবেশ, বিক্ষোভ মিছিল প্রতিনিয়ত মিজোরামে হচ্ছে। ঘটনাপ্রবাহ মোড় নিচ্ছে। সীমান্ত অতিক্রম কঠোরভাবে নিয়ন্ত্রণ করতে হবে।
গত বছর যৌথ অভিযানের সময় দেড় হাজারেরও বেশি বম সম্প্রদায়ের মানুষ বান্দরবান ছেড়ে মিজোরামে আশ্রয় নিয়েছিল। সেই সময় চিন প্রদেশ ও আরাকান থেকেও প্রচুর কুকি সম্প্রদায়ের মানুষ আশ্রয় নিয়েছিল। তারা সবাই খ্রিস্টান ধর্মাবলম্বী। এই দেশ থেকে যাওয়া এবং মায়ানমার থেকে আসাদের ভেতর একটা পারস্পরিক ভাব আদান-প্রদান হয়েছে। এগুলো নতুন করে সংকট তৈরি করছে। তাদের ভেতর সহানুভূতি ও সমর্থন তীব্র হচ্ছে। এরই মধ্যে তারা ভারতের কেন্দ্রীয় সরকারের কাছে নির্বিঘ্নভাবে বসবাসের জন্য আবেদন জানিয়েছে।
ইতিমধ্যেই বান্দরবানের পর্যটন ব্যবসায় ধস নেমে গেছে। ঈদ এবং নববর্ষে পর্যটক সেখানে যায়নি। নিশ্চল থেকেছে অসংখ্য ভাড়ার গাড়ি। সব মিলিয়ে পাহাড়ের অর্থনীতির চাকা থেমে গেছে। এই সব কিছুকে স্বাভাবিক অবস্থায় ফিরিয়ে আনতে হবে।
জীবনে জীবন বাঁচে, বিচ্ছিন্নতায় নয়।
লেখক : সিনিয়র সাংবাদিক ও নির্বাহী পরিচালক স্পিক আউট ফাউন্ডেশন
supan@speakout.com.bd