দেশের শ্রম অধিকার বিদেশি দুশ্চিন্তা

আজ ২৪ এপ্রিল, রানা প্লাজা ট্র্যাজেডির ১১ বছর পূর্তি। সাভারের রানা প্লাজা ধসে এইদিন সরকারি হিসাবে ১,১৩৪ শ্রমিকের মৃত্যু হয় এবং কমপক্ষে ২,৫০০ শ্রমিক আহত হন। এই ঘটনার সুদূরপ্রসারী প্রভাব পড়ে বাংলাদেশের অন্যতম শ্রমঘন শিল্পে এবং বৈশ্বিক মানচিত্রে বাংলাদেশের শ্রম পরিবেশ বড়সড় প্রশ্নের সম্মুখীন হয়। কাকতালীয়ভাবে, দুদিন আগে, সোমবার ঢাকা সফররত মার্কিন বাণিজ্য প্রতিনিধিদলের সঙ্গে স্থানীয় নেতাদের আলাপে উঠে এসেছে বাংলাদেশের শ্রমিক অধিকার বিষয়টি। দেশ রূপান্তরের মঙ্গলবারের প্রতিবেদনে জানা যায়, মার্কিন বাণিজ্য প্রতিনিধি কার্যালয়ের (ইউএসটিআর) দক্ষিণ ও মধ্য এশিয়াবিষয়ক সহকারী ব্রেন্ডান লিঞ্চ এ সফরের নেতৃত্ব দিচ্ছেন। এ সফরে ওয়াশিংটন-ঢাকা বাণিজ্য সম্প্রসারণ অর্থাৎ যুক্তরাষ্ট্র ও বাংলাদেশের দ্বিপক্ষীয় বাণিজ্য ও বিনিয়োগ সহযোগিতা ফোরাম চুক্তির (টিকফা) বাস্তবায়ন নিয়ে বরাবরের মতো আলোচনা হয়েছে। এর অংশ হিসেবে শ্রম আইনের সংস্কার নিয়েও ওয়াশিংটনের প্রতিনিধিরা কথা বলেছেন।

প্রতিনিধিদলটি সচিবালয়ে আইন, বিচার ও সংসদবিষয়ক মন্ত্রী আনিসুল হকের সঙ্গেও বৈঠক করে। বৈঠকে যুক্তরাষ্ট্রের পক্ষ থেকে শ্রমিক আইন সংস্কার ও শ্রমিক অধিকারের বিষয়ে জোর তাগিদ দেওয়া হয়েছে। এর আগে সফরের প্রথম দিন প্রতিনিধিদলটি বাণিজ্য মন্ত্রণালয়ের জ্যেষ্ঠ সচিব তপন কান্তি ঘোষের সঙ্গে বৈঠক করে। সেই বৈঠকে দুই দেশের বাণিজ্য সম্প্রসারণ নিয়ে আলোচনা হয়। বাংলাদেশের পক্ষ থেকে যুক্তরাষ্ট্রের বাজারে পণ্যের শুল্কমুক্ত সুবিধার বিষয়ে জোর দেওয়া হয়। যুক্তরাষ্ট্র বাংলাদেশের সঙ্গে বাণিজ্য সম্প্রসারণের আগ্রহ প্রকাশ করে শ্রম অধিকারের উন্নয়নের বিষয়টি তুলেছে। এরপর আইনমন্ত্রীর সঙ্গে বৈঠক করেও একই বিষয়ের অবতারণা করেন। আইনমন্ত্রী জানান যে মার্কিন প্রতিনিধিদলের কাছে এই বার্তা পৌঁছে দেওয়া হয়েছে যে, প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার সরকারের আমলে শ্রমিকদের অধিকার দিন দিন বাড়বে, কমবে না। উল্লেখ্য, দ্বাদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনের পর প্রথমবারের মতো যুক্তরাষ্ট্রের কোনো প্রতিনিধিদলের সফর এটি।

মন্ত্রী জানিয়েছেন মার্কিন বাণিজ্য প্রতিনিধিদল ১১টি বিষয় জানতে চেয়েছে, যার মধ্যে অন্যতম হচ্ছে থ্রেসহোল্ড (ট্রেড ইউনিয়ন গঠনে শ্রমিকদের সম্মতির হার) কমানো বিষয়ে বাংলাদেশের অবস্থান। ২০১৬ সালের দিকে থ্রেসহোল্ড ছিল ৩০ শতাংশ। ২০১৭ সালে আন্তর্জাতিক শ্রম সংস্থার (আইএলও) সঙ্গে বৈঠকের পর এই থ্রেসহোল্ড ২০ শতাংশে নামিয়ে আনার সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়েছিল। বাংলাদেশ শ্রম আইন সংশোধনীতে এই হার ১৫ শতাংশে নামিয়ে আনার প্রস্তাব দেওয়া হয়েছে তবে শর্ত হচ্ছে শুধু যেসব কারখানায় তিন হাজার বা তার চেয়ে বেশি শ্রমিক কর্মরত, তাদের জন্য ব্যাপারটি প্রযোজ্য হবে।

সচিব তপন কান্তি জানান, শুল্কমুক্ত সুবিধা দিতে বাংলাদেশের শ্রম অধিকারের আরও উন্নয়ন চায় যুক্তরাষ্ট্র। বাংলাদেশের পক্ষ থেকে শ্রম আইনের সংস্কারের দাবি জানিয়ে ১১ দফার একটি কর্মপরিকল্পনা দেওয়া হয়েছে। ট্রেড ইউনিয়ন যেন সহজ হয় সে বিষয়ে কথা হয়েছে। এ আইনের সংস্কারে ত্রিপক্ষীয় (মালিক, শ্রমিক ও সরকার) কমিটির ঐকমত্যের প্রয়োজন আছে বলে জানানো হয়েছে। রানা প্লাজার ঘটনার পর বাংলাদেশের শ্রম অধিকার বিষয়ে প্রভূত উন্নতি হয়েছে বলে পরিলক্ষিত হয়েছে। কিন্তু, বাংলাদেশের শ্রম পরিবেশ এখনো বেশ নাজুক অবস্থায় আছে তা সফররত মার্কিন দলের আলোচনাতেই স্পষ্ট।

খোদ মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রই অবশ্য নিওলিবারেল নীতির কারণে শ্রমিক ইউনিয়নসহ অন্যান্য ব্যাপারে কড়াকড়ি অবস্থান নেয় এবং বাংলাদেশের দুর্বলতার সুযোগে দরকষাকষি করে নিজেদের সুবিধা আদায় করে নেবে এতে সন্দেহ নেই। কিন্তু, কোনো সন্দেহ নেই যে বাংলাদেশের শ্রম পরিবেশ সন্তোষজনক পর্যায়ে যেতে আরও অনেকদূর যেতে হবে। সরকার ও মালিকপক্ষ উভয়েরই এই বিষয়ে দায় আছে। দেশের শ্রমিকদের অধিকারবঞ্চিত করা এবং সেই ব্যাপারটা নিয়ে বিদেশি রাষ্ট্রের চাপ প্রয়োগ দেশের জন্য ভালো কিছু নয়।