দেশ জুড়ে এখন বয়ে যাচ্ছে তীব্র বা অতিতীব্র তাপপ্রবাহ। যশোরে সর্বোচ্চ তাপমাত্রা হয়েছিল ৪২ দশমিক ৬ ডিগ্রি। ঢাকায় তাপমাত্রাও ৪০ ডিগ্রি ছাড়িয়েছে। আবহাওয়া অধিদপ্তরের আশঙ্কা, এই তাপপ্রবাহ আগামী মাসের প্রথম সপ্তাহ পর্যন্ত চলবে। দেশে চলছে হিট অ্যালার্ট। বন্ধ করে দেওয়া হয়েছে শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান। প্রতিদিনই হিট স্ট্রোকে মানুষের মৃত্যুর খবর আসছে। খোলা আকাশের নিচে যাদের কাজ করতে হয়, তাদের জীবন অসহনীয় হয়ে উঠেছে। এখন যেমন আমরা অতি গরম নিয়ে হাহাকার করছি, কদিন আগে তেমনি তীব্র শীতে কুঁকড়ে গেছি। নিশ্চয়ই কদিন পর প্রবল বর্ষণে-জলাবদ্ধতায় ভেসে যেতে যেতে প্রকৃতিকে অভিশাপ দেব, গালাগাল করব। কিন্তু প্রকৃতির এই চরম হয়ে ওঠার পেছনে কি আসলেই প্রকৃতির কোনো দায় আছে? প্রকৃতির ওপর দায় চাপানো সহজ। কারণ প্রকৃতি আমাদের অভিযোগের জবাব দিতে পারবে না। প্রকৃতি বা সরকারের ওপর দায় না চাপিয়ে আমরা যদি সততার সঙ্গে নিজেদের দিকে তাকাই, তাহলেই বুঝব, প্রকৃতি কেন দিনে দিনে আরও চরম হয়ে উঠছে।
২০০৭ সালে ভয়ংকর ঘূর্ণিঝড় সিডরে উপকূলীয় এলাকার ব্যাপক ক্ষয়ক্ষতি হয়েছিল। সুন্দরবন যদি বুকে আগলে আমাদের রক্ষা না করত, তাহলে ক্ষতি আরও অনেক বেশি হতে পারত। সিডরে সুন্দরবনেরও ব্যাপক ক্ষতি হয়েছিল। সিডরের পর সুন্দরবনের ক্ষতি কীভাবে কাটিয়ে ওঠা যাবে, তা নিয়ে অনেক কথা হয়েছে। আলোচনা শেষে সবাই একমত হন, সুন্দরবনকে আগের অবস্থায় ফিরিয়ে নেওয়ার একটাই উপায়, কোনো হস্তক্ষেপ না করা। তাই হয়েছিল। আমাদের রক্ষার পাশাপাশি সুন্দরবন নিজেই নিজের শুশ্রুষা করেছিল। আমাদের বারান্দার টবের গাছে প্রতিদিন পানি দিতে হয়। কিন্তু কোনো বনের গাছে পানি দিতে হয় না। প্রকৃতি নিজেই নিজেকে রক্ষা করতে পারে। শুধু জঙ্গলের গাছ নয়; পৃথিবীর প্রতিটি প্রাণ, প্রাণবৈচিত্র্য, পরিবেশ, প্রতিবেশ রক্ষার সহজাত ক্ষমতা আছে প্রকৃতির। কিন্তু আমরা বারবার সেই ক্ষমতায় বাদ সাধছি। প্রকৃতিকে প্রকৃতির মতো বাড়তে দিচ্ছি না। গাছ কেটে উজাড় করছি, জলাধার ভরাট করছি, নদীতে বাঁধ দিচ্ছি, পাহাড় কেটে সমতল বানাচ্ছি। প্রকৃতি প্রতিবাদ হয়তো করতে পারছে না। কিন্তু প্রকৃতি আমাদের ওপর প্রতিশোধ নিচ্ছে। এই যে অতি গরম, তীব্র শীত, প্রবল বৃষ্টি এই চরম হয়ে ওঠাটাই আসলে প্রকৃতির প্রতিশোধ। সভ্যতা এগিয়ে নিতে হলে আমাদের উন্নয়ন করতে হবে। কিন্তু প্রকৃতি ধ্বংস করে এই উন্নয়ন একদিন আমাদের গলার ফাঁস হবে। এখন যেমন গরমে কষ্ট পাচ্ছি, এই প্রবণতা ক্রমশ বাড়বে, বাড়তেই থাকবে। জলবায়ু বদলে যাচ্ছে। পৃথিবী ক্রমশ উত্তপ্ত হচ্ছে। মান্না দে গেয়েছিলেন, ‘যদি হিমালয়, আল্পসের সমস্ত জমাট বরফ, গলতে গলতে গলেও যায়, তবুও তুমি আমারৃ।’ মান্না দে ভেবেছিলেন, এই জমাট বরফ কখনোই গলবে না। তিনি বেঁচে থাকলে দেখতেন, এই বরফ গলছে এবং দ্রুতগতিতে গলছে। পৃথিবী আরও বেশি উত্তপ্ত হচ্ছে বলেই বরফ দ্রুত গলছে।
আদিবাসী নেতা সঞ্জীব দ্রংয়ের একটি বইয়ের নাম ‘ধরিত্রী আমার নয়, আমিই ধরিত্রীর’। এমনিতে আমরা সারাক্ষণ বলি, এই জমি আমার, এই বাড়ি আমার, এই দেশ আমার, এই বিশ্ব আমার। সারাক্ষণ ‘আমার আমার’ বলতে আমরা মুখে ফেনা তুলে ফেলি। কিন্তু আদিবাসীরা বলেন, পৃথিবী আমার নয়, আমিই পৃথিবীর। এই ভূমি আমার নয়, আমিই ভূমির। এই ধরিত্রী ও ভূমি কেনাবেচা করার, একে নষ্ট করার, ধ্বংস করার, বিকৃত করার অধিকার মানুষের নেই। মানুষ ধরিত্রী ও ভূমির মালিক নয়, যত্নকারী ও রক্ষাকারী মাত্র। কিন্তু আমরা রক্ষা তো করছিই না, বরং উল্টো ধরিত্রীকে ধ্বংস করছি, বিকৃত করছি। অত দূর যাওয়ার দরকার নেই। এই যে আমরা ঢাকায় বসে গরমে হাঁসফাঁস করছি। এই ঢাকা এখন মৃত্যুফাঁদ। অথচ এই ঢাকা হতে পারত বিশ্বের সবচেয়ে সুন্দর, সবচেয়ে বাসযোগ্য শহরগুলোর একটি। চারপাশেই নদী আর বুক জুড়ে জালের মতো খাল; এমন শহর বিশ্বেই বিরল। কিন্তু খালগুলো আমরা অনেক আগেই গিলে খেয়েছি। নদীগুলোকে গলা টিপে মারছি। ভবিষ্যৎ প্রজন্ম অবশ্যই আমাদের অভিশাপ দেবে, অবশ্যই দেবে। আমরা যেমন দিচ্ছি আগের প্রজন্মকে। অথচ দেখুন, এক টুকরো হাতিরঝিল কেমন পাল্টে দিয়েছে ঢাকার চিত্র। হাতিরঝিল আমাদের আফসোস বাড়ায় শুধু। এক হাতিরঝিলেই যদি ঢাকাকে এমন প্রাণবন্ত লাগে, সবগুলো খাল থাকলে আর নদীগুলো প্রবহমান হলে কেমন হতে পারত। আহারে।
গাছ থাকলে, জলাধার থাকলে যে তাপমাত্রা সহনীয় থাকে, এটা বুঝতে পরিবেশ বিজ্ঞানী হতে হয় না। আপনি এখনই হাতিরঝিলে, রমনা পার্কে, ধানমন্ডি লেকে বা বোটানিক্যাল গার্ডেনে যান; তারপর সেখান থেকে মতিঝিল বা কারওয়ানবাজারে যান; পার্থক্যটা টের পাবেন। যেখানে গাছ থাকবে, পানি থাকবে; সেখানে গরম কম লাগবে গায়ে। অথচ এই নগরীতেও একসময় গাছ ছিল, জলাধার ছিল। ‘বটবৃক্ষের ছায়া যেমন, মোর বন্ধুর মায়া তেমন’ সেই মায়া, সেই ছায়া পেতে আপনি কোথায় পাবেন বটবৃক্ষ? ঢাকার বিভিন্ন এলাকার নামগুলো দেখুন শাহবাগ, পরীবাগ, কলাবাগান, কাঁঠালবাগান, ধানমন্ডি, সেগুনবাগিচা, দিলখুশা, মতিঝিল, ধোলাইখাল। কিন্তু এখন ধোলাইখালে খাল নেই, সেগুনবাগিচায় বাগান নেই, মতিঝিলে ঝিল নেই, দিলখুশায় গেলে দিল আর খুশ হয় না। এই অবস্থা তো প্রকৃতি, সরকার করেনি। দায় আমার-আপনার। পৃথিবী যেভাবে দ্রুত উষ্ণ হচ্ছে, তাতে আমাদের এই বিশ্বকে বাসযোগ্য রাখতে আরও বেশি করে গাছ লাগাতে হবে, কাটার তো কোনো প্রশ্নই নেই। কিন্তু প্রতিদিন গাছ কাটছি, ভবন বানাচ্ছি। জলাধার ভরাট করে প্লট বানাচ্ছি। পাঁচ কাঠার একটি জমিতে উঁচু ভবন তৈরির সঙ্গে পাঁচটা গাছ লাগালে কী এমন ক্ষতি হয়? কিন্তু সবকিছু মাপি বর্গফুটের হিসাবে। সাত মসজিদ রোড বা গুলশান অ্যাভিনিউতে গেলে আপনার মন ভালো হয়ে যাবে। চমৎকার স্থাপত্যশৈলীর সব গ্লাস টাওয়ার। সব আধুনিক ভবন কেন্দ্রীয়ভাবে শীতাতপ নিয়ন্ত্রিত। এই গ্লাস টাওয়ারগুলো আমাদের উত্তাপ আরও বাড়িয়ে দিচ্ছে। বাসা, অফিস, গাড়ির যে শীতাতপ নিয়ন্ত্রণ ব্যবস্থার পার্শ্বপ্রতিক্রিয়া, চারপাশের প্রকৃতিকে আরও অসহনীয় করে তুলছে।
বাঁচতে হলে আরও বেশি করে গাছ লাগাতে হবে। কিন্তু করছি উল্টো কাজ। এই যে ঢাকার এত কাছে গাজীপুরের ভাওয়াল উদ্যান আপনি গিয়ে দেখে আসুন। প্রতিদিনই গাছ কমছে, বন কমছে। অল্প হলেও প্রতিদিন সুন্দরবন কমছে। বিশ্বের ফুসফুস হিসেবে পরিচিত আমাজন ধ্বংস হচ্ছে প্রতিদিন। ফেসবুকে একজন মজা করে লিখেছেন, হয়তো এমন দিন আসবে, মানুষ আমাজন বলতে বুঝবে ই-কমার্স প্রতিষ্ঠান, আর সুন্দরবন বলতে বুঝবে কুরিয়ার সার্ভিস। এটা নিছক কথার কথা নয়। যদি সত্যিই কখনো এমন দিন আসে আমাজন নেই, সুন্দরবন নেই; তাহলে সেটা দেখার জন্য কেউ বেঁচে থাকব না। কারণ যেখানে আমাজন থাকবে না, সুন্দরবন থাকবে না; সেখানে মানুষও থাকতে পারবে না।
প্রকৃতির ওপর, সরকারের ওপর দায় চাপিয়ে পার পাওয়া যাবে না। আমার জন্মের সময় পৃথিবী যতটা বাসযোগ্য ছিল, যতটা সবুজ ছিল, যতটা শীতল ছিল; যদি আমি মারা যাওয়ার সময় তার চেয়ে খারাপ থাকে, গাছ যদি তার চেয়ে কমে যায়, ধরিত্রী যদি আরও উষ্ণ হয়, তাহলে উত্তর প্রজন্মের কাছে আমি অপরাধী। মানুষ হিসেবে আমি দায়িত্ব পালন করিনি। আমরা সবাই যদি স্বার্থপরের মতো আমার সন্তানের জন্য আরেকটু বাসযোগ্য পৃথিবী রেখে যেতে চাই, তাহলেই ধরিত্রী আরও সবুজ হবে, আরও শীতল হবে। কিন্তু আমরা যদি সুন্দরবন ধ্বংস করি, গাছ কেটে ফেলি, নদী দখল করি; আমার সন্তান শ্বাস নিতে পারবে না। এমন দিন এলে কেউ বাঁচব না, সভ্যতা টিকবে না। এর আগেই আমাদের সচেতন হতে হবে।
লেখক: বার্তা প্রধান, এটিএন নিউজ
probhash2000@gmail.com