আজ বিশ্ব ম্যালেরিয়া দিবস। গত ১০ বছরে বাংলাদেশে ম্যালেরিয়া আক্রান্তের পরিসংখ্যান বলছে, তিন বছর আগেও যেখানে পরিস্থিতি উন্নতির দিকে ছিল, কিন্তু সর্বশেষ দুই বছরে নতুন করে বাড়ছে মশাবাহিত এ রোগে আক্রান্তের সংখ্যা।
মূলত বাংলাদেশের তিন পার্বত্য জেলা এবং সীমান্তবর্তী ১৩টি জেলাকে ম্যালেরিয়া প্রবণ হিসেবে বিবেচনা করা হয়। কিন্তু সম্প্রতি ঢাকাতেও ম্যালেরিয়াবাহী অ্যানোফিলিস মশার অস্তিত্ব মিলেছে বলে জানাচ্ছেন গবেষকেরা।
বাংলাদেশে মশাবাহিত রোগের মধ্যে অন্যতম হল ম্যালেরিয়া। স্ত্রী অ্যানোফিলিস মশা ম্যালেরিয়া রোগের জীবাণু ছড়ায়।
বাংলাদেশে মোট ৩৬ প্রজাতির অ্যানোফিলিস মশা দেখা যায়, এদের মধ্যে সাতটি প্রজাতি বাংলাদেশে ম্যালেরিয়া রোগ ছড়ায়।
স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের তথ্য বলছে, ২০১৪ সালের পর থেকে আস্তে আস্তে ম্যালেরিয়ায় আক্রান্ত মানুষের সংখ্যা ধারাবাহিকভাবে ২০২১ সাল পর্যন্ত কমেছে। কিন্তু ২০২২ এবং ২০২৩ সালে সে সংখ্যা আবার বাড়তে শুরু করে। যদিও আক্রান্তের হিসেবে মৃত্যুর সংখ্যা খুবই কম।
বাড়ছে ম্যালেরিয়া আক্রান্তের সংখ্যা
স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের গত ১০ বছরের পরিসংখ্যান বিশ্লেষণ করে দেখা গেছে, ২০১৪ সালে দেশে ম্যালেরিয়ায় সর্বোচ্চ সংখ্যক আক্রান্ত ও মৃত্যু হয়েছে। ওই বছর দেশে ম্যালেরিয়ায় আক্রান্ত হয়েছিলেন ৫৭ হাজার ৪৮০জন। তাদের মধ্যে মারা গিয়েছিলেন ৪৫ জন।
এরপর কিছুটা কমলেও কিন্তু স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের পরিসংখ্যানে দেখা যাচ্ছে, ২০২২ সালে আবার বেড়েছে ম্যালেরিয়ায় আক্রান্তের সংখ্যা। সে বছর ১৮ হাজার ১৯৫ জন আক্রান্তের বিপরীতে মারা যান ১৪ জন। এরপর ২০২৩ সালে আক্রান্ত হন ১৬ হাজার ৫৬৭ জন, বিপরীতে মারা গিয়েছিলেন ছয় জন।
সর্বশেষ চলতি বছরের প্রথম তিন মাসে ম্যালেরিয়ায় আক্রান্ত হয়েছেন ১১৫৮ জন, এদের মধ্যে একজন মারাও গেছেন।
জনস্বাস্থ্য বিশেষজ্ঞরা বলছেন, সময়োপযোগী উদ্যোগের অভাবে বাংলাদেশ থেকে ম্যালেরিয়া পুরোপুরিভাবে নির্মূলের লক্ষ্যমাত্রা অর্জন করা যাচ্ছে না।
বেশি ঝুঁকিতে পার্বত্য এলাকা
বাংলাদেশের পার্বত্য জেলা এবং সীমান্ত এলাকার মোট ১৩টি জেলার ৭২টি উপজেলায় ম্যালেরিয়ার প্রাদুর্ভাব দেখা যায়। এর মধ্যে বান্দরবান, রাঙামাটি এবং খাগড়াছড়িতে ম্যালেরিয়া রোগের প্রাদুর্ভাব সবচেয়ে বেশি।
জনস্বাস্থ্য বিশেষজ্ঞরা বলছেন, এ তিনটি জেলার মধ্যে আবার সবচেয়ে বেশি ঝুঁকিপূর্ণ বান্দরবান। বান্দরবানের লামা, আলীকদম ও থানছি দেশের মধ্যে সবচেয়ে বেশি ঝুঁকিতে রয়েছে।
গত বছর অর্থাৎ ২০২৩ সালে সারাদেশে ম্যালেরিয়া আক্রান্ত রোগীর সংখ্যা ছিল ১৬ হাজার ৫৬৫, এই আক্রান্তদের মধ্যে ১০ হাজারই বান্দরবানের বাসিন্দা। বান্দরবানের পরই রয়েছে রাঙ্গামাটি জেলা। পরিসংখ্যানে দেখা যাচ্ছে, গত বছর চার হাজার ৭১৩ জন আক্রান্ত হয়েছে রাঙ্গামাটিতে।
স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের তথ্য অনুযায়ী, ১৩টি জেলা বাদে বাংলাদেশের বাকি ৫১ জেলায় ম্যালেরিয়া রোগের ঝুঁকি নেই।
তবে, সম্প্রতি ঢাকায় ডেঙ্গু পরিস্থিতি ভয়াবহ আকার ধারণ করার পর জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষক ও কীটতত্ত্ববিদ অধ্যাপক কবিরুল বাশারের নেতৃত্বে গবেষক দলের ফাঁদে ঢাকায় ধরা পড়েছে ম্যালেরিয়াবাহী অ্যানোফিলিস মশা।
অধ্যাপক কবিরুল বাশার বলেছেন, বাংলাদেশে ম্যালেরিয়ার প্রাদুর্ভাব রোধে পদক্ষেপ নেওয়ার দুই দশকের বেশি সময়ের মধ্যে এবারই প্রথম এই মশার অস্তিত্ব পেয়েছে গবেষক দল।
বিবিসি বাংলাকে তিনি বলেছেন, “ডেঙ্গু নিয়ে গবেষণা করতে গিয়ে ম্যালেরিয়ার বাহক আমি ঢাকায় পেয়েছি। যেহেতু ঢাকায় ম্যালেরিয়ার অস্তিত্ব মিলেছে সে কারণে ঢাকায় ম্যালেরিয়ার ভেক্টর নিয়ে সার্ভিলেন্স (নজরদারি) জোরদার করা জরুরি।”
ঢাকায় ম্যালেরিয়ার বাহক পাওয়ার পরপরই গবেষক দলের প্রধান অধ্যাপক বাশার বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থা ঢাকা অফিসকে বিষয়টি জানিয়েছেন। তবে অধ্যাপক বাশারের এই দাবির সাথে একমত নয় স্বাস্থ্য অধিদপ্তর।
স্বাস্থ্য অধিদপ্তর বলছে, তারা গণমাধ্যমের খবরে বিষয়টি জানলেও আনুষ্ঠানিকভাবে সেটি তারা জানেন না।এমনকি স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের কীটতত্ত্ববিদদের কোন গবেষণায়ও বিষয়টি উঠে আসেনি, ফলে তারা এর অস্তিত্ব সম্পর্কে নিশ্চিত নন।
সূত্র: বিবিসি বাংলা