আমরা বারোজন ও একটি ডায়েরি

প্রখ্যাত সাংবাদিক ও সাংস্কৃতিক ব্যক্তিত্ব। ছিলেন বাংলাদেশ সম্মিলিত সাংস্কৃতিক জোটের প্রতিষ্ঠাতা সভাপতি। ১৯৯২ সালে প্রতিষ্ঠা করেন আর্ট গ্যালারি ‘শিল্পাঙ্গন’। প্রগতিশীল পাঠাগার ‘সমাজতান্ত্রিক পাঠাগার’-এর প্রতিষ্ঠাতা। বাংলাদেশ সংবাদ সংস্থার (বাসস) প্রথম প্রধান সম্পাদক অকৃতদার এই কবি ও ছড়াকার মারা যান ২০১২ সালের ২০ ফেব্রুয়ারি। অতীতের সঙ্গে অধুনার সংযোগ ঘটাতে চিন্তা পাতায় ছাপা হলো তার লেখা উপসম্পাদকীয়

মুক্তিযুদ্ধের সময় রাজনৈতিক দিক থেকে আগস্ট-সেপ্টেম্বর মাস ছিল বিশেষভাবে গুরুত্বপূর্ণ সময়। বাংলাদেশ থেকে আশ্রয়গ্রহণকারীদের কাছে কলকাতা ছিল মুজিবনগর; অর্থাৎ বাংলাদেশ অঞ্চলে মেহেরপুরে বৈদ্যনাথতলায় প্রতিষ্ঠিত অস্থায়ী গণপ্রজাতন্ত্রী বাংলাদেশ সরকারের রাজধানী নবঘোষিত মুজিবনগর পাকিস্তানি বাহিনীর ব্যাপক আক্রমণের মুখে কলকাতায় রাতারাতি স্থানান্তর করা হয়েছিল। সেই থেকে বাংলাদেশ নাগরিকদের কাছে স্বাধীন সরকারের অবস্থান কলকাতাই চিহ্নিত ছিল মুজিবনগর নামে। এই রাজধানীতেই সে সময় রাজনৈতিক তৎপরতা দেশি-বিদেশি ‘দূত’দের ব্যস্ততায় এমনই ঘোলাটে হয়ে উঠছিল যে, উচ্চপর্যায়ে অধিষ্ঠিত কোনো কোনো ব্যক্তি পর্যন্ত মুক্তিযুদ্ধের পথ বন্ধ করে ‘রাজনৈতিক মীমাংসার’ কথা চিন্তা করতে কুণ্ঠাবোধ করেননি।

কেউ কেউ এমন মতামত ব্যক্ত করতে শুরু করেন যে, আমাদের পক্ষে দীর্ঘস্থায়ী যুদ্ধ সম্ভব নয় এবং সে কারণে ভারতের সশস্ত্র হস্তক্ষেপ বাঞ্ছনীয়। অপর পন্থা প্রস্তাবিত রাজনৈতিক মীমাংসা, মুক্তিযুদ্ধ নয়। এই উভয় চিন্তার মধ্যেই ছিল বাংলাদেশের লক্ষ লক্ষ মানুষের রক্তে রঞ্জিত মুক্তিযুদ্ধকে পরিহার করা; যার পরিণতিতে পুনরায় পাকিস্তানের আধিপত্য পর্যন্ত গ্রহণযোগ্য। এক্ষেত্রে হয়তো মীমাংসার সমর্থক যুদ্ধক্ষেত্র থেকে নিরাপদ স্থানে অবস্থানরত এই মুষ্টিমেয় ব্যক্তিরা কল্পনা করতে সমর্থ হননি যে, বিভিন্ন ফ্রন্টে যুদ্ধরত মুক্তিযোদ্ধারাই এই অসম্মানজনক প্রস্তাব বা কোনো প্রকার সমঝোতা প্রত্যাখ্যান করতেনই অথবা অস্ত্র পরিহার করতেন না। নিয়মিত সেনাবাহিনীর বিদ্রোহী মুক্তিযোদ্ধাদের ভবিষ্যতের কথাও তারা ভুলে গিয়েছিলেন। তারা হয়তো সেই ভয়াবহ পীড়ন, হত্যা আর ধ্বংসের কাহিনি মনে রাখতে চাননি। পঁচিশে মার্চের রাত্রি দশটার পর থেকে এম-চব্বিশ ট্যাঙ্কের গর্জন, মেশিনগান, মর্টার, সাঁজোয়া গাড়ির রণহুঙ্কার সবই হয়তো তারা ভুলতে চেয়েছিলেন নিরাপদ জীবনের জন্য। পিলখানায় ইপিআর নিবাসে যে দুদিনব্যাপী যুদ্ধ, রাজারবাগ পুলিশ ব্যারাকে পঁচিশে মার্চের সারা রাত্রি যে সশস্ত্র সংগ্রাম, সাতদিন পূর্বে জয়দেবপুরে বাঙালি সেনানীর যে বীরত্বপূর্ণ প্রতিরোধ যুদ্ধ, এসবই দেশবাসীকে জীবন সংগ্রামে উদ্বুদ্ধ করে অগ্নিশিখার মতো প্রজ¦লিত করে রেখেছিল। হাজার অশ্রুসিক্ত ঘটনার উল্লেখ করেও যার ইতিহাস আংশিক করে তোলা যায় না। সামান্য ক’জন বিশ্বাসঘাতককে বাদ দিলে দেশের প্রতিটি মানুষই যেন কোনো না কোনোভাবে নিজেকে মুক্তির মন্ত্রে জড়িয়ে ফেলেছিল। যারা এই নিদারুণ অতীতকে বহন করেছেন নিজেদের বিশ্বাসরূপে, তারা আজও করেন; যারা ২৫ মার্চ থেকে ১৬ ডিসেম্বর পর্যন্ত রক্তাক্ত দিনগুলোকে স্মরণ করেছেন দেশবাসীর বীরত্বের আর গৌরবের উজ্জ্বল এক একটি পৃষ্ঠা হিসেবে, তারা এখনো স্মরণ করেন চলমান প্রতিরোধের ইতিহাসে তারা প্রত্যেকে সৈনিক; প্রতিপক্ষ যেখানে যে ক্ষমতাতেই অবস্থান করুক না কেন। বিশ্ববিদ্যালয়ের অঙ্গনে যে বুদ্ধিজীবীদের হত্যা করা হলো তারা বাঙালি, মেধা হরণের মানসে যে সমস্ত সাহিত্যিক-সাংবাদিকদের বধ্যভূমিতে নিয়ে যাওয়া হলো, বাঙালি তারা; পিলখানা আর রাজারবাগে যে সৈনিকদের রাতের অন্ধকারে হত্যা করা হলো, তারাও বাঙালি। বাঙালিরা ছিল অস্ত্রের শিকার, প্রতিবাদী শত্রু। স্বাভাবিকভাবেই যে বাঙালির অস্তিত্ব থাকার কথা ছিল না, আজ তাদের অন্তত জাতিসত্তার প্রয়োজন নেই! ‘বাংলাদেশি’ নামের আড়লে সেই বাঙালির ঐতিহ্য ও চেতনার অবলুপ্তির প্রচেষ্টা এমনকি আর ঐতিহাসিক মূঢ়তা! সে তো কেবল ২৫ মার্চের ঘৃণ্য বিশ্বাসকে প্রতিষ্ঠারই এক নবপদ্ধতি। হত্যার অস্ত্র যে কেবল ইস্পাতেই তৈরি হতে হবে, তা নয় শানিত হলেই হয়।

শত্রুর সেই শানিত অস্ত্র উপেক্ষা করেই তরুণ ছাত্র-সৈনিক লেফটেন্যান্ট সামাদ গর্জে উঠেছিল রায়গঞ্জে। মুক্তির শেষ যুদ্ধের ২০ নভেম্বর পূর্ব রাত্রে দুকোম্পানি মুক্তিফৌজের অধিনায়ক লে. আবু মঈন আসফাকুস সামাদ হানাদার পাকিস্তানি সেনাদের মুখোমুখি যুদ্ধে ঝাঁপিয়ে পড়েছিল। রংপুর জেলার দুধকুমার নদীর পার্শ্ববর্তী এই এলাকায় সে রাতে তরুণ সামাদ শহীদ হয়েছিল বুকের রক্ত ঢেলে। রায়গঞ্জ থেকে তিন মাইল দূরবর্তী জয়মনিরহাট মুক্ত করেছিল বীর সামাদ ও তার কোম্পানি। জয়মনিরহাটে শহীদ সামাদকে কবর দেওয়ার পর স্থানটির নাম হয়েছে সামাদনগর, যাকে ঈর্ষার সঙ্গে আমরা স্মরণ করি, সেই সামাদও ছিল বাঙালি। হাজার হাজার পঙ্গু মুক্তিযোদ্ধাদের আমরা কীভাবে সম্মান জানাবো জানি না; যেখানে তাদের সুচিকিৎসার আর বেঁচে থাকার মতো পর্যাপ্ত উপযুক্ত ব্যবস্থা করা হয়নি। লক্ষ লক্ষ মানুষ, যারা প্রাণ দিয়েছেন যুদ্ধক্ষেত্রে, তাদের প্রতি শ্রদ্ধার প্রশ্নটি অনেকের কাছে আজ প্রশ্নবোধক চিহ্ন দিয়ে চিহ্নিত। আমাদের এই গৌরবের ইতিহাস সৃষ্টির অবিশ্বাস্য উজ্জ্বল মানুষগুলো বাঙালি।

কোনো না কোনো ধরনের দুর্যোগের কাহিনি মুক্তিযুদ্ধের সময় প্রায় সব বাঙালিরই জীবনে রয়েছে। আজকের দিনের প্রেক্ষিতে সেই নিদারুণ মুহূর্তের কাহিনি সমৃদ্ধ ইতিহাস কোনো বিরোধী শক্তি কর্তৃক মুছে ফেলার চেষ্টা অস্বাভাবিক কিছু নয়। রাজনৈতিক ক্ষমতা অর্জনের ইতিহাসে পরাজিত শক্তির পুনরুত্থানের অশুভ প্রচেষ্টার নজির বিরল নয়। এর প্রতিরোধ শক্তির বৈকল্যই অস্বাভাবিক ঘটনা। হত্যা ও ধ্বংসকে উপেক্ষা করে এই বাঙালি যখন সশস্ত্র মুক্তিসংগ্রামের বিজয়ের পথে এগিয়ে চলছিল, মধ্যপথে আগস্ট মাসে দুদিক থেকে আঘাত আসতে শুরু করে। মুক্তিযুদ্ধে বিজয়ের তাৎপর্যের কথা অগ্রিম উপলব্ধি করে একদিকে যেমন রাজনৈতিক মীমাংসার কথা উত্থাপন করা হয়েছিল, অপরদিকে তেমনি মুক্ত ও স্বাধীন বাংলাদেশের ভবিষ্যতে একটি শক্তি কর্তৃক নির্দেশিত হওয়ার আশঙ্কা দেখা দিয়েছিল। শেষ পর্যন্ত মুক্তিযুদ্ধের মাধ্যমে বাংলাদেশ স্বাধীনতা অর্জন করলেও তার শাসনব্যবস্থা কি ভবিষ্যতে অপর কোনো শক্তি দ্বারা নির্দেশিত হবে? একটি শোষণ ব্যবস্থা থেকে আর একটি আধিপত্যের অক্টোপাসে আবদ্ধ হওয়ার আশঙ্কা তখন থেকেই অনেকের মধ্যে দেখা দিচ্ছিল। মুজিবনগরের দ্বিধারার প্রেক্ষিতে স্বাভাবিকভাবেই ঢাকা ফেরার পথে এ জাতীয় আশঙ্কার কথা আমাদের মধ্যে অনেকের মনে দেখা দিয়েছিল। ১৬ ডিসেম্বরের পর পাঁচদিন পর্যন্ত বিধ্বস্ত ঢাকা বিমানবন্দরে কোনো বিমান অবতরণ করতে পারেনি। তড়িৎ গতিতে বন্দরটির একটি রানওয়ের অংশ বিমান অবতরণের উপযুক্ত করে মেরামত করা হয়। যুদ্ধের শেষের দিকে ভারতীয়  বোমাতেই তেজগাঁও বিমানবন্দরের রানওয়ে বিশেষভাবে ক্ষতিগ্রস্ত হয় এবং তখন পর্যন্ত সম্পূর্ণ নিরাপদ ছিল কি না, সে বিষয়ে অনেকে নিশ্চিত ছিলেন না। মুক্তি লাভের ছদিন পর ২২ ডিসেম্বর বিকেলে মুজিবনগর অস্থায়ী সরকার (মন্ত্রিবর্গ ও উচ্চপদস্থ সরকারি অফিসার) ভারতীয় সামরিক বিমানে করে আনুষ্ঠানিকভাবে প্রকৃত রাজধানী ঢাকায় ফিরে আসে। অবশ্য ইতিপূর্বে আগরতলা হয়ে হেলিকপ্টারে দুজন সিনিয়র সেক্রেটারি রুহুল কুদ্দুস ও নুরুল কাদের খানকে সরকারি দায়িত্ব গ্রহণের জন্য ঢাকায় ১৮ ডিসেম্বর পাঠানো হয়েছিল। তাদের বিমানবন্দরে অভ্যর্থনা জানান বৈদেশিক দপ্তরের ফারুক চৌধুরী ও হুমায়ুন কবীর (বর্তমানে দুজনই রাষ্ট্রদূত) এবং ঢাকার ডিসি আহমদ ফরিদ। তখনো ঢাকা ও দেশের বিভিন্ন অঞ্চলে ১৪ হাজার পাকিস্তানি যুদ্ধবন্দি ও ঢাকা অঞ্চলে এক ডিভিশনের ওপর ভারতীয় সৈন্য।  নিরাপত্তা ও বিশেষ সতর্কতার জন্য মন্ত্রীদের প্রথম ঢাকায় প্রেরণ করা হয়নি। ক্ষতিগ্রস্ত বিমানবন্দরে ‘স্টল’ বিমানের প্রথম অবতরণ ছিল অনেকটা পরীক্ষামূলক এবং ঝুঁকিপূর্ণ। সেদিন প্রথম অবতরণের যাত্রী ছিলাম আমরা মাত্র ১২ জন। বিমানটিতে কোনো আসন ছিল না। সৈন্যদের জন্য প্রেরিত মালপত্রের ওপর বসেই আমরা ঢাকায় ফিরি। আমাদের ১২ জনকে (আমি, এম.আর. আখতার, এ.বি. মুসা, কামাল লোহানী, সমর দাস অন্যান্য) সকালের দিকে ঢাকায় নামিয়ে দিয়ে বিমানটি কয়েকজন সেক্রেটারিসহ উচ্চপদস্থ অফিসারদের ঢাকায় আনয়ন করে। বিকেলের দিকে তৃতীয় দফায় মন্ত্রীদের বহন করে ভারতীয় সামরিক বিমান। মেরামত করা বন্দরে অল্প পরিসরে বিমানটি অবতরণ করতে সক্ষম ছিল।

ভোর রাতে আমাদের এই ১২ জনকে কলকাতায় বিভিন্ন স্থান থেকে গাড়িতে উঠিয়ে নিয়ে আসা হয় দমদম বিমানবন্দরের বিশেষ অঞ্চলে। সদ্যমুক্ত স্বদেশে প্রত্যাবর্তনের মুহূর্তে আমরা সবাই ছিলাম উত্তেজনায় অস্থির। রেডিও, টেলিভিশন, তথ্য দপ্তর ও বিভাগে প্রাথমিক সহযোগিতাদানের জন্যই এই ১২ জনকে নির্বাচন করা হয়েছিল বলে পরে জানতে পেরেছি। উচ্চপর্যায়ে এই সিদ্ধান্তটা আমাদের প্রথমে জানানো হয়নি। রক্তাক্ত বাংলাদেশের মাটিতে পা দিতেই একটি অতীত ঘটনা আমাকে আচ্ছন্ন করে ফেলল। বন্ধু-সাংবাদিক মুসা মুক্তিযুদ্ধের সময় দেশত্যাগ করে একটি নবগঠিত বিদেশি সংবাদ সংস্থার প্রতিনিধিরূপে সপরিবারে কলকাতার শহরতলিতে বাস করছিলেন। ভবিষ্যতের স্বাধীন বাংলাদেশ কারও নাগপাশে আবদ্ধ হওয়ার আশঙ্কাটা তার কানেও গিয়েছিল। একদিন আমরা (আমি তখন স্বাধীন বাংলা বেতার কেন্দ্রে রাজনৈতিক ভাষ্যকার ও প্রতিনিধি) সন্ধ্যার পর বাংলাদেশ সরকারের একজন প্রভাবশালী মন্ত্রীর সুরক্ষিত ফ্ল্যাটে গিয়ে উপস্থিত হলাম। আকস্মিকভাবে আমাদের দেখেই তিনি বুঝতে পেরেছিলেন উদ্দেশ্য। নানা কথার মধ্যে বিষয়টি আমরা দু’বন্ধু উত্থাপনের চেষ্টা করলাম। আমাদের বক্তব্য সুস্পষ্টভাবে ব্যক্ত করার পূর্বেই তিনি তার ডায়েরি বের করলেন। ‘রাজনৈতিক মীমাংসার’ সমর্থক বলে পরিচিত সেই মন্ত্রী তার ডায়েরির আগস্ট মাসের একটি বিশেষ তারিখের পৃষ্ঠা খুলে পড়লেন। ইংরেজিতে লেখা : ‘হ্যান্ডিং ওভার অ্যান্ড টেকিং ওভার ইজ কমপ্লিট’ অর্থাৎ হস্তান্তর ও গ্রহণের কাজ সম্পন্ন হয়ে গেছে। ঐতিহাসিক মন্তব্য সংবলিত তার সেই ডায়েরি (অবশ্য নিজের দৃষ্টিকোণ থেকে লিখিত) এখনো যত্নের সঙ্গে সুরক্ষিত। অব্যাহত মুক্তিযুদ্ধের বিকল্প রাজনৈতিক মীমাংসার সমর্থকের ডায়েরির এই মন্তব্য কতটা সত্যনিষ্ঠ, তা ইতিহাসের ঘটনাপ্রবাহের মাধ্যমে নির্ধারিত হবে। (সংক্ষেপিত)

লেখক: বরেণ্য সাংবাদিক ও সাংস্কৃতিক ব্যক্তিত্ব