এই সময় এরকম তাপমাত্রা থাকে

জলবায়ু পরিবর্তন বিশেষজ্ঞ এবং ব্র্যাক বিশ্ববিদ্যালয়ের সাবেক উপাচার্য ও বর্তমানে ওই বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রফেসর ইমেরিটাস ড. আইনুন নিশাত। সম্প্রতি তাপপ্রবাহে পুড়ছে সারা দেশ। অন্যদিকে মরুভূমির দেশ আরব আমিরাত, সৌদি আরব ভাসছে বৃষ্টিতে। ফলে জলবায়ু পরিবর্তন নিয়ে আলোচনা চলছে। এসব বিষয় নিয়ে দেশ রূপান্তরের সঙ্গে কথা বলেছেন এই জলবায়ু পরিবর্তন বিশেষজ্ঞ। সাক্ষাৎকার নিয়েছেন সম্পাদকীয় বিভাগের সাঈদ জুবেরী

দেশ রূপান্তর : বলা হচ্ছে, ৩০ বছর থেকে ঢাকার গ্রীষ্মকালীন গড় তাপমাত্রা ছিল ৩৩ ডিগ্রি সেলসিয়াস কিন্তু গত দু-তিন বছরে যেটা হিউজ পরিমাণে বেড়ে গিয়েছে, এটার কারণ কী?

আইনুন নিশাত : এভারেজ কাকে বলে? সবচেয়ে বড়টা এবং সবচেয়ে কমটার গড়। আপনি গড় বলছেন ৩৩ ডিগ্রি সেলসিয়াস। এখন যদি গড়ের মানে না বুঝেন আর ম্যাক্সিমামের মানে তাহলে তো হবে না। আমার কথা শুনতে হবে। আপনি যেখান থেকে বা যার থেকে এই তথ্য কালেক্ট করেছেন ভুল কালেক্ট করছেন কিংবা যে দিয়েছে সে ভুল দিয়েছে। আমি আপনাকে বলি, এটা বড় জটিল সাবজেক্ট। গড় হিসাব করার একটা পদ্ধতি আছে। সেই হিসাব অনুযায়ী এপ্রিল মাসের মাঝামাঝি গড় তাপমাত্রা এক্সপেক্টেড হচ্ছে ৩৩ ডিগ্রি সেলসিয়াস, ঠিক আছে!

ধরেন, আপনার স্কুলের সবচেয়ে ছোট যে, তার উচ্চতা ৫ ফুট। আর সবচেয়ে যে লম্বা তার উচ্চতা ১০ ফুট। তাহলে গড় উচ্চতা কত? ৫ ফুট ৫ ইঞ্চি। এর থেকে লম্বাও আছে এর থেকে বেটেও আছে এবং ওই গড় উচ্চতার শিক্ষার্থীও আছে। কাজেই যে আপনাকে বলেছে যে গড় তাপমাত্রা ৩৩ ডিগ্রি তাকে বুঝতে হবে, হ্যাঁ গড় তাপমাত্রা ৩৩ কিন্তু সাধারণত এ সময় তাপমাত্রা হয় ৩৭ ডিগ্রি থেকে ৩৮ ডিগ্রি সেলসিয়াস। আজকের (বৃহস্পতিবার) তাপমাত্রা অত্যন্ত স্বাভাবিক। আপনি আমার নাম দিয়ে লিখে দেন যে, ড. নিশাত এই কথা বলেছেন। আমি গত ৪ দিন ধরে ৮ থেকে ১০টা টেলিভিশন চ্যানেলে বলেছি এ কথা। আপনি যে কোনো একটা চ্যানেলের কথাগুলো ডাউনলোড করে শুনতে পারেন।

দেশ রূপান্তর : আরেকটা জিনিস, তাপমাত্রা ধরেন ৩৩ বা ৩৮ যাই হোক, ফিল হচ্ছে বেশি। মানে বলা হচ্ছে ৩৩ ডিগ্রি সেলসিয়াস তাপমাত্রা, কিন্তু ফিল হচ্ছে ৩৫ ডিগ্রির মতো। কেন?

আইনুন নিশাত : না না এটাও ঠিক না; অনুভূতি তেমন বেশি হচ্ছে না। তাপটা আসছে সৌদি আরব থেকে কাতার-কুয়েত হয়ে। সেটা এসে ইরাক-ইরানের দক্ষিণ দিয়ে পাকিস্তানের দক্ষিণ দিয়ে ভারতের পশ্চিম পাশ দিয়ে শ্রীলঙ্কার দক্ষিণ দিয়ে বাংলাদেশে ঢুকছে। এই বাতাসটা মরুভূমির গরম বাতাস। এটা ঢুকে এখন যশোরের ওই দিক থেকে যে বাতাস, যেটাকে স্ট্রিম বলে সেটা ঈশ্বরদী কিংবা সেই সমস্ত জায়গার মেহেরপুর, পদ্মা পাড় হয়ে পৌঁছায় এবং অন্যদিকে উত্তরের বাতাসের প্রবাহ কমছে। আগামী দশ দিন পরে এটা রংপুর-দিনাজপুর পর্যন্ত পৌঁছে যাবে। আমার কথা হচ্ছে, এ সময় এ রকম তাপমাত্রা থাকে। আমি যখন স্কুলে পড়তাম, পঞ্চাশ-ষাট বছর আগে তখন গ্রীষ্মের ছুটি হতো, কারণ ছেলেপেলেরা যাতে মাঠে হইচই না করে।

দেশ রূপান্তর : আমরা যেটাকে আম কাঁঠালের ছুটি বলে থাকি?

আইনুন নিশাত : আম পাকার সিজন আরও এক মাস পরে, জ্যৈষ্ঠ মাসে। আপনার তো আমের সিজন বুঝতে হবে। ফাল্গুনে মুকুল আসে বা ফুল ফুটে, চৈত্রে সেটা গুটি হয়, বৈশাখে আঁটি আসে এগুলো তো জানতে হবে। কাজেই আম পাকার সিজন লাগবে, গরম লাগবে। আর এ বছরের গরম অত্যন্ত স্বাভাবিক গরম। আপনার গরম লাগে, কারণ এখন শহরবাসী বাইরের গরমের সঙ্গে অভ্যস্ত না। আর গ্রামবাসী কোনো সময় এ গরমে বের হতো না। তারা বাড়ির ভেতরে থাকত, গাছতলাতে থাকত, মাঠে কাজ করত না। কিন্তু এখন জীবিকার তাগিদে অনেকের বাইরে থাকতে হচ্ছে ট্রাফিক পুলিশ, নির্মাণ শ্রমিক, ইটের ভাটার লোক, রিকশাচালক, তাই না? এ সময়, এই রোদে তাদের তো বাইরে থাকার কথা না, কিন্তু থাকতে হচ্ছে পেটের তাগিদে। আর যারা এয়ারকন্ডিশনে থাকেন তারা গরম গরম বলে চিৎকার করছেন।

দেশ রূপান্তর : কিন্তু এ সময় কৃষকদের কি মাঠে থাকা লাগে না হাওর অঞ্চলের ফসল তোলার জন্য?

আইনুন নিশাত : শোনেন, আমার কথা আমি বলে দিয়েছি। আমার নতুন কোনো কথা নেই। ব্যতিক্রম কোনো সময় নিয়মের অংশ না। ব্যতিক্রমী কিছু ঘটনাকে আপনারা স্বাভাবিক নিয়ম বানিয়ে ফেলছেন।

দেশ রূপান্তর : এবার তো হিটস্ট্রোকে মারা যাচ্ছে বেশি লোক। এটা কীভাবে দেখছেন?

আইনুন নিশাত : স্ট্রোকে চিরকাল মারা গেছে। কেন স্ট্রোক হয়? ডা. আব্দুল্লাহ গত পাঁচদিন ধরে সমানে বলছে আপনি রোদে থাকলে দুই ঘণ্টা পরে আপনার স্ট্রোক হতে বাধ্য। তো আপনি রোদে থাকেন কেন? আগে কেউ রোদে থাকত না।

দেশ রূপান্তর : কিন্তু মানুষের তো গরম বেশি লাগছে, রাস্তার পিচও গলে যাচ্ছে...

আইনুন নিশাত : আপনি গান শুনেছেন, ‘এই পিচ গলা রোদ্দুরে’? পিচ গলবে তো।

দেশ রূপান্তর : শুনেছি, মহিনের ঘোড়াগুলোর গান ‘এই পিচ গলা রোদ্দুরে বৃষ্টির বিশ্বাস/ তোমায় দিলাম’...

আইনুন নিশাত : আপনার বয়স কম, আমাদের বয়সে, আমি তো নিম্নবিত্ত ঘরের ছেলে আমাদের ছোটবেলায় গরমে রাস্তার ওই পিচ গলে গেলে, সেগুলোকে মার্বেল বানিয়ে খেলতাম। সুতরাং পিচ তো গলবেই, এটার মধ্যে আপনারা অবাক হলেন কোথা থেকে, কবে থেকে? আমাদের কৃষক কোনো দিন দুপুর বেলায় মাঠে কাজ করত না, গরমের সময় সে গাছতলায় কাজ করত। আর যদি সে সকালবেলা কাজ করত রোদে তখন তার মাথায় ক্যাপ ধরনের কিছু একটা থাকত। এখন আপনি রোদের মধ্যে হাঁটবেন, মাথায় কোনো কভার দেবেন না, তারপর রোদ থেকে এসে যেখানে ঢুকলেন সেখানেই ঢকঢক করে পানি খেলেন তো আপনার রোগ হবেই, আপনার সর্দি গরমি হবেই, হিটস্ট্রোক হবে। হিটস্ট্রোকের লক্ষণ হচ্ছে, যখন গরমের মধ্যে আপনি হাঁটছেন তখন আপনার প্রচুর ঘাম হয় এবং ঘামের সঙ্গে সঙ্গে আপনার আয়োডিন, সোডিয়াম, পটাসিয়াম, ম্যাগনেসিয়াম, আয়রন বেরিয়ে যাচ্ছে। এর একটা স্টেজে গিয়ে দেখবেন আপনার আর ঘাম হচ্ছে না তখনই আপনার হিটস্ট্রোক হবে। বডির টেম্পারেচার অনেক বেড়ে যাচ্ছে। ড. আব্দুল্লাহর কথা এখনো ইউটিউবে পাবেন, শোনেন, ক্লিয়ার হবে।

দেশ রূপান্তর : শহরবাসীর গরম কমাতে সিটি করপোরেশন যে ওয়াটার ক্যানন দিয়ে পানি ছিটাচ্ছে, অনেকে বলছেন এতে আর্দ্রতা বেড়ে যাচ্ছে।

আইনুন নিশাত : দেখেছি কোনো এক পত্রিকায় কোনো এক প-িত যেন এ নিয়ে লিখে বলেছে যে, হিউমিডিটি বাড়লে গরম বাড়বে, সত্যি কথা। কিন্তু এখন হিউমিডিটি তো ২০ শতাংশ, কোথায় হিউমিডিটি? হিউমিডিটি তো নেই, আরে ভাই আপনারা কেউ ওয়েবসাইটে ঢোকেন! কালকে ছিল ৪৩, গত পরশু দিন ছিল ২০ শতাংশ আমি তো এগুলো মনিটর করি। বৃষ্টি বাড়লে তাপ কমবে, হিউমিডিটি বাড়বে কিন্তু তার প্রভাব ফিল করব না। একটা প্যারাগ্রাফ আলাদাভাবে তুলে নিলে তো হবে না। এগুলো টোট্যালি ভুল।

দেশ রূপান্তর : একদিকে বাংলাদেশে তাপপ্রবাহ, অন্যদিকে দুবাইয়ের মতো মরু শহর ভাসিয়ে বৃষ্টি  এটার কারণ কী?

আইনুন নিশাত : এইটা বাংলাদেশেও হতে পারে। বাংলাদেশে যে কোনো সময়ে ওর থেকেও বেশি বৃষ্টি হতে পারে। আমাদের জাতীয় দলিলে, পরিবেশ, বন ও জলবায়ু পরিবর্তন মন্ত্রণালয়ের ন্যাশনাল অ্যাডাপ্টেশন প্ল্যান (ন্যাপ) ডকুমেন্টে আমরা পরিষ্কার সরকারকে বলেছি অথবা সরকারেরই দলিলই বলছে যে, একদিনে ৩০০ মিমি বৃষ্টির জন্য প্রস্তুত থাকতে হবে। দুবাইতে হয়েছে দুদিনে ২৫০ মিমি। অর্থাৎ বাংলাদেশে এর থেকে বড় বৃষ্টি হতে পারে। হ্যাঁ, এটার সঙ্গে ক্লাইমেট চেঞ্জের সম্পর্ক আছে। আপনি যদি ন্যাপ ডকুমেন্ট পড়েন সেখানে আমরা জলবায়ু পরিবর্তনের জন্য ১৪টা বিপর্যয় চিহ্নিত করেছি।

দেশ রূপান্তর : দেশ রূপান্তরে বৃহস্পতিবার প্রকাশিত একটি প্রতিবেদন বলছে, আবহাওয়া অধিদপ্তরের সব রাডার নষ্ট। আমাদের আবহাওয়া অধিদপ্তরের সক্ষমতা নিয়ে আপনার পর্যবেক্ষণ কী?

আইনুন নিশাত : আপনাদের প্রতিবেদনটি আমি পড়িনি, তাই সে নিয়ে কিছু বলতে পারব না। তবে, আমাদের আবহাওয়া বিভাগ অত্যন্ত ক্যাপাবল, এখানে আধুনিক যন্ত্রপাতি আছে। আবহাওয়া বিভাগ আগারগাঁওতে তাপমাত্রা মাপে। আমি আগারগাঁওয়ের কাছেই দাঁড়িয়ে আছি। এখানে অনেক ঠান্ডা। কাজেই আপনি আগারগাঁওয়ে তাপমাত্রা মাপলেন আর পরে মতিঝিলে গিয়ে মাপলেন, তাহলে দুটো এক হবে না। লোকেশনের পরিবর্তন আছে।

আসলে, আমি আবহাওয়া অধিদপ্তর সম্পর্কে কিছু বলতে চাই না, পারব না। কিন্তু মোদ্দা কথা, আবহাওয়া অধিদপ্তর ভালো কাজ করে। কিন্তু প্রশ্ন, তাদের কাজটা কি তারা প্রকাশ করতে পারে? পারে না। তাদের কিছু ইনস্টিটিউশনাল লিমিটেশন আছে। কিন্তু আদারওয়াইজ তাদের যন্ত্রপাতি আছে, কাজ করে ভালো, প্রেডিক্ট করে। কিন্তু ওটা বুঝতে গেলে আবার ওদের সঙ্গে কথা বলতে হয়। কারণ তারা প্রচার যেটা করে তার একটা ফিক্সড বাধাধরা নিয়ম আছে। আপনি কি জানেন যে, আবহাওয়া অধিদপ্তর ডিফেন্স মিনিস্ট্রির অধীনে? ডিফেন্স মিনিস্ট্রির তো সবকিছুই গোপনীয়।

দেশ রূপান্তর : আবহাওয়া বিভাগ তাহলে কোন মন্ত্রণালয়ের অধীন থাকা উচিত?

আইনুন নিশাত : দেশ কীভাবে চলবে, সরকার কীভাবে চলবে সেটা তো আমি বলতে পারি না। কিন্তু আমি দেখতে পাচ্ছি এটা ডিফেন্স মিনিস্ট্রিতে থাকাতে তাদের স্বাধীনতা নেই। তারা যথেষ্ট ভালো কাজ করে, তাদের যথেষ্ট ইক্যুপমেন্ট আছে। পুরো দেশের ৩২ বা ৩৬টা পয়েন্টে ডাটা কালেক্ট করে। যেখানে ডাটা কালেক্ট করে তারা সেখানকার কথা বলবে। অর্থাৎ তারা যখন ৩৮ ডিগ্রি তাপমাত্রা বলে, আপনার বুঝতে হবে যে ওটা আগারগাঁওয়ের তাপমাত্রা। মতিঝিলে তখন হয়তো হবে ৪১ বা ৪২ ডিগ্রি সেলসিয়াস। এই ফ্যাক্টরগুলো বুঝতে হবে।

দেশ রূপান্তর : আমাদের দেশের তাপমাত্রা বেড়ে গেলে বা হঠাৎ করে কোনো সিচুয়েশন তৈরি হলে গাছ লাগানোর একটা ঘোষণা দিয়ে সিচুয়েশনটাকে ডিল করার একটা প্রবণতা আছে, পলিটিক্যালি এবং সরকারের তরফ থেকেও এ রকম  হয়। এ বিষয়ে আপনার মন্তব্য কী?

আইনুন নিশাত : আজকের গাছটা যদি ৩০ বছরের মতো বড় ৩ দিনে হয়ে যায় তাহলে খুব ভালো কথা, সলিউশন এটা। দ্বিতীয়ত হচ্ছে, নিতান্ত মূর্খ ছাড়া এই সময় কেউ গাছ লাগাতে যাবে না।  গাছ জুলাই মাসে লাগাতে হয় আর এটা হচ্ছে এপ্রিল মাস। কাজেই প্রত্যেকটারই সময় আছে, পদ্ধতি আছে, বিজ্ঞানভিত্তিক এপ্রোচ আছে তাই না?

দেশ রূপান্তর : সময় দেওয়ার জন্য অসংখ্য ধন্যবাদ।

আইনুন নিশাত : আপনাকেও ধন্যবাদ। অনুলিখন : মোজাম্মেল হৃদয়