শাসক দলের ভোটব্যাংকে ফাটল?

বিভিন্ন মিডিয়ায় জল্পনা শুরু হয়ে গেছে এবারের লোকসভা ভোটে কে জিতবে! ব্যক্তিগতভাবে এখনই আগাম ভবিষ্যদ্বাণী করার পক্ষে আমি নই। আসলে বহুবার আগে বলেছি, সত্যি কথা বলতে কী এখন সারা পৃথিবীতেই গণতন্ত্রের মৃত্যু ঘণ্টা বেজে গেছে। জনগণের ভোটে নাকি মানি, মিডিয়া, মাসলম্যানদের দাপটে দেশের সরকার নির্বাচিত হন এ নিয়ে সংশ্লিষ্ট সব মহলেই প্রশ্ন উঠছে। ভোট ও ভোটারদের প্রভাবিত করতে দেশে দেশে ক্ষমতাসীন দল যেভাবে যথেচ্ছ নিজেদের প্রভাব খাটান তা মোটেও গণতান্ত্রিক পথ নয়। তবুও ঢাকঢোল পিটিয়ে দাবি করা হয় যে, পৃথিবীর সবচেয়ে বড় গণতান্ত্রিক দেশ ভারত। এমন এক গণতান্ত্রিক দেশের বাসিন্দা আমরা, যেখানে ভোট এলেই স্বয়ং প্রধানমন্ত্রী খোলাখুলিভাবে সাম্প্রদায়িক তাস খেলেন। আবার এটাও ঠিক, এ দেশের সাধারণ লোকে, সরকারের পরিবর্তন করতে এখনো ভোট দেওয়াকেই একমাত্র অস্ত্র মনে করেন।

ইতিমধ্যেই দুদফা ভোট হয়ে গেছে। সেখানে ভোট পোল হয়েছে অন্যান্য বারের চেয়ে কম। ফলে এর মধ্যেই কানাঘুষা শুরু হয়ে গেছে নির্বাচনের আগে আগে বিজেপি যেভাবে হুঙ্কার দিয়ে চারশ আসন জিতবে বলে বাজার গরম করছিল, বাস্তবে যে ঘটবে না, এই আশঙ্কা ইতিমধ্যেই বিজেপি শিবিরকে উদ্বেগে ফেলেছে। ভোট কম পড়ার ট্রেন্ড দেখলে বোঝা যায়, বিজেপি যথেষ্ট চাপে আছে। গো বলয়ে বিজেপির শক্ত ঘাঁটি উত্তর প্রদেশে দ্বিতীয় দফায় পোল হয়েছে প্রথম দফায় চেয়ে আট শতাংশ কম। মেরে কেটে ষাট ছুঁইছুঁই। বিহার, ইউপি, রাজস্থানের পক্ষে ষাট খুব বড় অঙ্ক নয়।

হতেই পারে ভোট কম পড়ার অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ কারণ গরম। কিন্তু একমাত্র কারণ নয়। বিশেষ করে বিজেপির মতো একটি রেজিমেন্টেড দলের সদস্যরা এতদিন ঝড় জল গরম উপেক্ষা করে দীর্ঘ লাইনে দাঁড়িয়ে ভোট দিয়ে এসেছে। এবার যে কোনো কারণেই হোক বিজেপির চিরাচরিত ভোট ব্যাংকের অনুপস্থিতি ভোট বিশেষজ্ঞদের চোখ এড়িয়ে যায়নি। বস্তুত শাসক দলের ভোট ব্যাংকেই কার্যত এবার ফাটল ধরেছে। রাজপুত, ক্ষত্রিয়, জাঠদের বড় অংশ এবার বিজেপির দিক থেকে মুখ ফিরিয়ে নিয়েছেন। উচ্চবর্গের এই হিন্দুদের প্রতিপত্তি গো বলয়ের বিভিন্ন রাজ্য, এমনকি প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদির খাসতালুকেও বিরাট। আগের নির্বাচনগুলোতে নরেন্দ্র মোদি গুজরাটের ভোট নিয়ে সেভাবে গা লাগাতেন না। জয় নিয়ে নিশ্চিত থাকতেন বলে নামকাওয়াস্তে গুজরাটে যেতেন। এবার তিনি বাড়তি সময় দিচ্ছেন নিজের রাজ্যকে।

ক্রিকেট ফুটবলে জেতা দলকে নিয়ে অনেক সময় আমরা ঠাট্টা ইয়ার্কি করি, ওরা তো চৌদ্দজন নিয়ে খেলেছে। আম্পায়ার বা রেফারি, মাঠ, আয়োজকরা। অনেক সময় আরও অন্যান্য কারণ থাকে। আগেই ঠিক করে রাখা হয়, অমুককে ছলে বলে কৌশলে হারাতেই হবে। সেসব নিয়ে জুয়াড়িরা বাজিও ধরে। নরেন্দ্র মোদির দল সম্পর্কেও বিষয়টি খাটে। নির্বাচন কমিশন, প্রশাসনিক কর্তা, পুলিশ এবং কেন্দ্রীয় একাধিক এজেন্সি মিলেমিশে নির্বাচন করতে মাঠে নেমে পড়েছে। নিরপেক্ষতা শব্দটিকে কুলুঙ্গীতে সযতেœ রেখে দেওয়া হয়েছে। করপোরেট মালিকদের পনেরো লাখ কোটি টাকা সরকার ছাড় দিয়েছে। ফলে তারাও অত্যন্ত কৃতজ্ঞ হৃদয়ে প্রথমেই বিপুল টাকা দিয়ে দেশের যাবতীয় মিডিয়া কিনে নিয়ে নরেন্দ্র মোদির ইমেজ নির্মাণে অতি সক্রিয় ভূমিকা নিয়েছে।

তিনি গরুকে খাওয়াচ্ছেন, ময়ূরের পাখা মেলা দেখছেন, গড় হয়ে সংসদের সিঁড়িতে গণতন্ত্রের মন্দির বলে মাথা ঠুকছেন, গেরুয়া রঙের পোশাকে আপাদমস্তক ঢেকে নব্য রাম সাজছেন, কখনো পশ্চিমবঙ্গে এসে ভুলভাল রবীন্দ্রনাথ আওড়াচ্ছেন এভাবে বিজ্ঞাপন সংস্থার পেশাদারি দক্ষতা জনমনে পৌঁছে দেওয়ার কাজটি করে চলেছেন। নিরন্তর এই ভাবমূর্তি নির্মাণের নির্যাস হচ্ছে মোদিই ভারত, ভারতই মোদি। মুশকিল হচ্ছে, এই ‘ব্র্যান্ড মোদি’ই মোদিকে বিপদে ফেললে অবাক হবেন না। এমনিতেই মোদি মোদি আওয়াজে ক্ষীণ হতে হতে অন্য নেতাদের কণ্ঠস্বর মিলিয়ে গেছে। দল হিসেবে বিজেপি বলে সংগঠনটি বিলুপ্তির পথে। এক অদ্বিতীয় শ্রীল শ্রীযুক্ত মহামহিম নরেন্দ্র মোদি, হয় বাঁচাবেন নয় ডোবাবেন। বিজ্ঞাপন সংস্থা এলিট মধ্যবিত্তের অনেকটা প্রভাবিত করলেও নিচতলায় যে ভারতীয় জনতা পার্টির জনপ্রিয়তা কমছে তা এর মধ্যেই আভাস পাওয়া যাচ্ছে। নরেন্দ্র মোদিকে নিয়ে করপোরেট এক ধরনের ফাটকা খেলছে। কিন্তু একবার যদি ফাটকা না মেলে বা ঠিকঠাক কার্যকর না হয়, তখন শেয়ারবাজারে ধস নামার মতো মোদি সাম্রাজ্য তাসের ঘরের মতো ভেঙে পড়তে বাধ্য। ঠিক তাই ঘটতে চলেছে, এখনই বলা না গেলেও পরিস্থিতি বিজেপির পক্ষে ভালো নয়, সে ইঙ্গিত দ্বিতীয় দফা নির্বাচনের পরেই বোঝা যাচ্ছে।

ভালো নয় বলেই নরেন্দ্র মোদি যে ভাষায় নিজেরই দেশের সংখ্যালঘু সম্প্রদায়ের ওপর আক্রমণ করছে তা ভারতের ইতিহাসে কোনো প্রধানমন্ত্রী করেননি। বিজেপির অটলবিহারী বাজপেয়িও কখনো এ রকম অশ্লীল ভাষা বলা দূরে থাক, বোধহয় কল্পনাও করেননি যে, তার দলেরই কেউ কদর্য ভাষায় প্রকাশ্যে রুচিহীন এসব শব্দ ব্যবহার করতে পারে।

নিজের বেঁধে দেওয়া চারশ আসন এখন মোদিজিকে দুশ্চিন্তায় ফেলেছে। এখনই ফিসফিসানি শুরু হয়ে গেছে, ইসবার নয়া সরকার। সবচেয়ে মজার, নরেন্দ্র মোদির প্রিয় করপোরেট মিডিয়ার সুর কেমন যেন বেসুরো বাজছে। নির্বাচন শুরুর আগে ভাবা হচ্ছিল, নরেন্দ্র মোদির তৃতীয়বার প্রধানমন্ত্রী হয়ে মসনদে বসা শুধু সময়ের অপেক্ষা। এখন পরিস্থিতি পাল্টে গেছে। বিজেপির ইশতেহার দেখুন, শুধুই নরেন্দ্র মোদির জয়গান। টিভি রেডিও, সোশ্যাল মিডিয়া, খবরের কাগজ সর্বত্রই মোদি। ভবিষ্যতে ভারত কোন পথে চলবে তা বিজেপি বলছে না। যা বলার মোদিজি বলবেন। উন্নত দেশ গড়ার গ্যারান্টি দিচ্ছেন দল নয়, ব্যক্তি। এই স্বৈরতান্ত্রিক প্রবণতা গণতন্ত্রের পক্ষে নিঃসন্দেহে অত্যন্ত বিপজ্জনক। দলের অন্য নেতাদের বামনাকৃতি করে দিয়ে সাময়িক লাভ করলেও আখেরে ক্ষতি হতে চলেছে বিজেপির। শুধু মোদি জাদু দিয়ে বারবার ভোটে জেতা অসম্ভব। সংগঠন এত বড় নির্বাচনে সাফল্যের জন্য অপরিহার্য।

রাজস্থান, উত্তর প্রদেশ, ছত্তিশগড়, হিমাচল প্রদেশের বিভিন্ন জায়গায় ইতিমধ্যেই বিজেপির দলীয় কোন্দল চরম আকার নিয়েছে। কোথাও আর কোনো নেতা নেই, যার ব্যক্তিত্ব সব গোষ্ঠীকে ঐকমত্যে নিয়ে এসে জয়ের রাস্তা দেখাবে। শোনা যায়, নরেন্দ্র মোদির অসম্ভব নার্সিসিস্ট স্বভাব অনেক কাছের মানুষকেও দূরে ঠেলে দিয়েছে। যার ফল ভুগতে হবে বিজেপি পার্টিকে।

আপাত দুর্বল বিরোধী দল কিন্তু আগের থেকে অনেক ঐক্যবদ্ধ। বিভিন্ন রাজ্য তাদের আলাদা আলাদা নেতা নীরবে কাজ করে চলেছেন। ইতিমধ্যেই দুটো বিষয় তারা সাফল্যের সঙ্গে জনমনে ঢোকাতে পেরেছেন। এক, নরেন্দ্র মোদি ক্ষমতায় ফিরলে দেশের সংবিধান বদলে যাবে। দুই, রুজি-রুটি হকের গুরুত্বকে প্রাধান্য দেওয়া। নিছক ধর্ম দিয়ে অন্তহীন সমস্যার সমাধান নেই। সে কারণেই মোদির সাধের কয়েক লাখ কোটি টাকার রাম মন্দির এখনো সেভাবে হিন্দুমনে ছাপ ফেলতে পারেনি। মনে রাখবেন যে বিজেপি, আরএসএসের হিন্দুত্ববাদ আসলেই ব্রাহ্মণ্যবাদ। মনুবাদ। কিন্তু হিন্দুধর্ম একমাত্রিক নয়। বহুমাত্রিক।

ফলে সারা ভারত মনুবাদী রাজনীতি মেনে গো বলয়ের রক্ষণশীল বিধিনিষেধের কাছে পুরোপুরি সমর্পিত প্রাণ হয়ে মাথা নোয়াবে, এমনটা হওয়ার কথা নয়। অধুনা শাসকদের ইতিহাস বোধ দুর্বল। তাই তারা জানেন না যে, এ দেশে বিভিন্ন দর্শন, মতবাদ, ধর্মীয় অনুসারীদের মধ্যে শতাব্দীর পর শতাব্দী লড়াই, সমন্বয় দুই-ই চলে আসছে। আদর্শ আইকন রামচন্দ্র গো বলয়ের কাছে যত গ্রহণযোগ্য, বাকি ভারতে তা নয়। এখানে শৈব, গণপতি, বৈষ্ণব, জৈন, লিঙ্গায়েত, নৈয়ায়িক ইত্যাদি অজস্র ঘরানা। ফলে এক ছাঁচে দেশকে নির্মাণ করা কঠিন কাজ। বহুত্ববাদ বনাম একমাত্রিকতার লড়াইয়ে আপাতত এই মুহূর্তে বহুত্ববাদ নির্বাচনী সমীক্ষায় কিছুটা হলেও এগিয়ে। তবে নরেন্দ্র মোদি হারের গন্ধ পেলে কি করতে পারেন তা গুজরাটের মুখ্যমন্ত্রী থাকার সময় থেকে তাকে চিনি বলে খানিকটা আন্দাজ করতে পারি। ফলে যে যাই বলুক, নির্বাচনী ফলাফল নিয়ে কোনো মন্তব্য এখনই করতে যাব না।

লেখক: ভারতীয় প্রামাণ্যচিত্র নির্মাতা ও লেখক

sdastidar27@gmail.com