প্রতারণা, ঘুষ, দুর্নীতি এবং স্বজনপ্রীতি যখন একটি সমাজে গেড়ে বসে, তখন ‘নৈতিকতা’ বা ‘দায়বদ্ধতা’ শব্দ বড়ই বেখাপ্পা শোনায়। সরকারি অফিসের কোনো কাজ যখন স্বাভাবিক নিয়মে হয় না, দেশের সাধারণ মানুষের চাপা কান্না এবং অসহায়ত্ব তখন কেউ বুঝতে চায় না। অধিকাংশ মানুষের রন্ধ্রে রন্ধ্রে প্রতারণা-দুর্নীতির অন্ধকার ছায়া, সহজ-সরল মানুষকে জাপটে ধরেছে। দেশে এমন কোনো সেক্টর নেই, যেখানে কোনো কাজ স্বাভাবিক গতিতে হবে। বাংলাদেশ থেকে চাকরি নিয়ে যেসব শ্রমিক এরই মধ্যে বিদেশে গেছেন, তাদের ৯০ ভাগেরও বেশি মধ্যপ্রাচ্যে। জনশক্তি, কর্মসংস্থান ও প্রশিক্ষণ ব্যুরো (বিএমইটি) বলছে, তাদের সংখ্যা ১ কোটি ৪৮ লাখের বেশি। সংসদে এক প্রশ্নের জবাবে প্রবাসী কল্যাণ ও বৈদেশিক কর্মসংস্থানমন্ত্রী জানিয়েছিলেন, বিদেশে বাংলাদেশি কর্মী রয়েছে ১ কোটি ৫৫ লাখ। সৌদি আরব, সংযুক্ত আরব আমিরাত, মালয়েশিয়া, কুয়েত, ওমান, সিঙ্গাপুর, বাহরাইন, লিবিয়াসহ আরও কিছু দেশে তারা কর্মরত। এসব দেশই বাংলাদেশের প্রধান শ্রমবাজার।
বৈধভাবে বিদেশে কাজ করতে যাওয়ার জন্য বিএমইটিতে নিবন্ধিত হতে হয়। এই নিবন্ধন জেলা অফিস কিংবা অনলাইনে ‘আমি প্রবাসী’ অ্যাপের মাধ্যমে করা যায়। নিবন্ধিত হওয়ার পর কর্মীর কাগজপত্র যাচাই-বাছাই করে ক্লিয়ারেন্স হিসেবে তাকে ‘স্মার্ট কার্ড’ দেওয়া হয়। এই কার্ড সংগ্রহ করে বিদেশে যেতে হয় কর্মীদের। সম্প্রতি বিদেশগামীদের সরলতাকে কাজে লাগিয়ে প্রতারক চক্র একের পর এক ‘বিএমইটি স্মার্ট কার্ড’ জালিয়াতি করে যাচ্ছে। এ কারণে ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছেন বাংলাদেশি কর্মীরা জানা যাচ্ছে দেশ রূপান্তরে রবিবার প্রকাশিত ‘বিএমইটি স্মার্ট কার্ডে প্রতারণার ফাঁদ’ প্রতিবেদনে। দেশের বেশ কয়েকটি জেলার প্রত্যন্ত গ্রামের অনেক মানুষ বিএমইটি স্মার্ট কার্ড নকল হওয়ার কারণে বিদেশে যেতে পারেননি। সবকিছু ঠিকঠাক জেনে বিমানবন্দরে গিয়ে তারা জানতে পারেন, তাদের কাছে থাকা বিএমইটি ‘স্মার্ট কার্ড’ নকল। তাদের বিমানবন্দর থেকেই গ্রামে ফিরতে হয়েছে।
এমনটি ভাবার কোনো কারণ নেই যে, এই কাজের সঙ্গে শুধু প্রকাশ্য দালাল-প্রতারকরাই জড়িয়ে রয়েছে। ২০২২ সালে বিএমইটি স্মার্ট কার্ডের জালিয়াতি তদন্ত করে প্রবাসী কল্যাণ ও বৈদেশিক কর্মসংস্থান মন্ত্রণালয়। তদন্ত কমিটির প্রতিবেদনে বলা হয়, জালিয়াতি করে সংযুক্ত আরব আমিরাতগামী কর্মীদের ভুয়া বহির্গমন ছাড়পত্র (স্মার্ট কার্ড) দেওয়া হয়েছে। মন্ত্রণালয়ের নিয়োগ অনুমতি ছাড়াই রিক্রুটিং এজেন্সি ও দালালরা ভুয়া স্মার্ট কার্ডে কর্মীদের বিদেশ পাঠিয়েছে। বিএমইটির ৯ কর্মকর্তা ও কর্মচারী এবং ছয় রিক্রুটিং এজেন্সি জালিয়াতিতে জড়িত বলে প্রবাসী কল্যাণ মন্ত্রণালয়ের তদন্তে প্রমাণ পাওয়া যায়। তবে তদন্ত হয়েছে সীমিত পরিসরে, আমিরাতে লোক পাঠানো মাত্র আটটি এজেন্সির বিরুদ্ধে। অন্য দেশগুলোর ক্ষেত্রেও স্মার্ট কার্ডে একই ধরনের জালিয়াতি ঘটেছে। অবশ্য পরবর্তী সময়ে বিএমইটি মহাপরিচালক অপর এক ঘটনার প্রেক্ষিতে জানিয়েছিলেন, জালিয়াতি যেটা হয়েছে সেটা বিএমইটির ক্লিয়ারেন্স নয়, বাইরের একটি চক্র বিএমইটি কার্ডের অনুরূপ কার্ড বানিয়েছে। এর সঙ্গে বিএমইটির কর্মকর্তা জড়িত নয়। প্রশ্ন হচ্ছে, বিএমইটির কোনো কর্মকর্তা-কর্মচারী এই জালিয়াতির সঙ্গে জড়িত না থাকলে, এটা কীভাবে সম্ভব হচ্ছে? একবার প্রবাসী কল্যাণ ও বৈদেশিক কর্মসংস্থান মন্ত্রণালয় থেকে বিএমইটি বরাবর একটি চিঠি দিয়ে বলা হয়েছিল, বিএমইটি সার্ভার থেকে জাল-জালিয়াতির মাধ্যমে তথ্য মুছে দেওয়ার অভিযোগ প্রাথমিকভাবে প্রমাণিত হয়েছে। ফলে আল মামুন ওভারসিজ এবং ঘটনার সঙ্গে জড়িত এক ব্যক্তির বিরুদ্ধে ফৌজদারি মামলা করা হয়। সেই মামলার পরিণতি আমরা জানি না।
‘আমি প্রবাসীর’ সিস্টেমে ত্রুটির সুযোগ নিয়ে হ্যাকাররা অতিরিক্ত মহাপরিচালকের আইডি ব্যবহার করার সুবিধা নিয়ে বাতিল কার্ড অনুমোদন করেছে। এমন পরিস্থিতিতে জালিয়াতি বন্ধে সার্ভার সরিয়ে নিচ্ছে বিএমইটি। বর্তমানে সার্ভারটি বিএমইটির কার্যালয়ে রয়েছে। এর মাধ্যমে আসলে জনগণকে কী বোঝানো হলো? বাঘের ঘরেই ঘোগের বাসা! মূল প্রতারক চক্র বিএমইটির কার্যালয়েই রয়েছে? সার্ভার সরিয়ে কি সমস্যার সমাধান হবে? অপরাধীকে চিহ্নিত করে, কঠিন শাস্তি না দিলে এ ধরনের প্রতারণা আরও বাড়বে।