তীব্র গরমে মানুষের হাঁসফাঁস অবস্থা। দেশের দক্ষিণ-পশ্চিমাঞ্চলের যশোর ও চুয়াডাঙ্গায় যখন প্রতিযোগিতা দিয়ে তাপমাত্রা বৃদ্ধির রেকর্ড হচ্ছে তখন বৃষ্টির সুবাতাস আসছে পূর্বাঞ্চল দিয়ে। অর্থাৎ দেশের পূর্বাঞ্চলের চট্টগ্রাম, পার্বত্য চট্টগ্রাম ও সিলেট এলাকার জলীয়বাষ্পপূর্ণ বাতাসে শীতলতা আসবে মধ্যাঞ্চল ও পশ্চিমাঞ্চলের জেলাগুলোতে।
আগামী বৃহস্পতিবারের (২ মে) পর থেকে আগামী সপ্তাহে ছড়িয়ে পড়তে পারে এই শীতলতা। আজ মঙ্গলবার দেশের সর্বোচ্চ তাপমাত্রা রেকর্ড হয়েছে যশোরে ৪৩ দশমিক ৮ ডিগ্রি সেলসিয়াস। যা চলতি মৌসুমে এপ্রিলে সর্বোচ্চ তাপমাত্রার রেকর্ড। একই দিনে চুয়াডাঙ্গা জেলায় রেকর্ড হয়েছে ৪৩.৭ ডিগ্রি সেলসিয়াস তাপমাত্রা। এর আগে ১৯৮৯ সালের ২১ এপ্রিল বগুরায় ৪৪ ডিগ্রি সেলসিয়াস পর্যন্ত তাপমাত্রার পারদ উঠেছিল।
আবহাওয়া অফিসের আবহাওয়াবিদ আবুল কালাম মল্লিক জানিয়েছেন, এমন তাপমাত্রা আর বেশিদিন অব্যাহত থাকবে না। তিনি মঙ্গলবার সন্ধ্যায় দেশ রূপান্তরকে বলেন, ‘আগামী বৃহস্পতিবারের পর থেকে সারা দেশে কালবৈশাখী ঝড়সহ বৃষ্টি হতে পারে।’
এই বৃষ্টি কোন দিক থেকে আসবে? এমন প্রশ্নের জবাবে তিনি বলেন, ‘পূর্বাঞ্চল থেকে এই বৃষ্টি আসবে। আমরা ইতোমধ্যে সিলেট ও চট্টগ্রামে কালবৈশাখী ঝড়সহ বৃষ্টির পূর্বাভাস দিয়েছি এবং বৃহস্পতিবারের পর তা দেশের মধ্যাঞ্চল হয়ে ছড়িয়ে পড়তে পারে।’
কিন্তু বছরের এই সময়ে তো পশ্চিম মধ্যাঞ্চল দিয়ে বজ্রমেঘ প্রবেশের কথা। আর এই বজ্র মেঘ প্রবেশ না করায় তাপমাত্রার পারদ ঊর্ধমুখী বলে অনেকের ধারণা। এ বিষয়ে কথা হয় সাউথ এশিয়ান মিটিওরোলোজিক্যাল অ্যাসোসিয়েশনের যুগ্ম সাধারণ সম্পাদক ড. মোহন কুমার দাশের সাথে। তিনি বলেন, ‘বিহার এলাকা থেকে আসা বজ্রমেঘগুলো দেশের পশ্চিম মধ্যাঞ্চল হয়ে প্রবেশ করতো। কিন্তু এবার তা না হয়ে উল্টো চিত্র দেখা যাচ্ছে। বৃহস্পতিবারের পর পূর্বাঞ্চল থেকে আসা জলীয়বাস্পপূর্ন বাতাস সারা দেশে ছড়িয়ে পড়বে।’
পূর্বাঞ্চল থেকে কেন আসবে? এই প্রশ্নের জবাবে মোহন কুমার দাশ বলেন, ‘মিয়ানমার এলাকায় (পার্বত্য চট্টগ্রামের বিপরীতে) এবং সিলেট প্রান্তে একটি উচ্চচাপ বলয় রয়েছে। মধ্যবর্তী এলাকায় একটি নিম্নচাপ বিরাজ করছে। উচ্চচাপ ও নিম্নচাপের মধ্যবর্তী এলাকায় বৃষ্টিপাত হতে পারে এবং সেই বৃষ্টি মধ্যাঞ্চল হয়ে পশ্চিমাঞ্চলের জেলাগুলোকে সম্প্রসারিত হতে পারে।’
এই বক্তব্যের সাথে একমত পোষণ করে আবহাওয়া অধিদপ্তরের তরিফুল নেওয়াজ কবির বলেন, ‘দেশের পূর্বাঞ্চল থেকে কালবৈশাখী ঝড়ের সাথে বৃষ্টি ঢাকা হয়ে উত্তরের জেলাগুলোতে হতে পারে।’
কিন্তু বজ্রমেঘ নিয়ে দেশে অনেক গবেষণা করা এবং বর্তমানে অস্ট্রেলিয়ার কার্টিন বিশ্ববিদ্যালয়ের স্কুল অব আর্থ অ্যান্ড প্ল্যানেটারি সায়েন্সের অধ্যাপক ড. আশরাফ দেওয়ান বলেন, ‘এ সময়ে পশ্চিমবঙ্গ থেকে বজ্রমেঘ দেশে প্রবেশ করে থাকে। কিন্তু পূবালী বাতাস অনেক শক্তিশালী। বজ্রপাত তেমন একটা হয়নি। তবে দেশের পূর্বাঞ্চলে স্বাভাবিকভাবেই এ সময় কালবৈশাখী ঝড় হওয়ার কথা। আর পূবালী বায়ু এখন শক্তিশালী হওয়ায় কালবৈশাখী ঝড়ের প্রভাবে মধ্যাঞ্চল ও উত্তরাঞ্চলের জেলাগুলোতে তাপমাত্রার প্রভাব কমে এসে শীতলতা বাড়াতে পারে।’
দেশে টানা ৩০ দিন ধরে তাপপ্রবাহ বইছে। এই ধারা আগামী বৃহস্পতিবারের পর থেকে কমে আসতে পারে। সাধারণত কোনো অঞ্চলের তাপমাত্রা ৩৬ থকে ৩৭ দশমিক ৯ ডিগ্রি সেলসিয়াস থাকলে মৃদু তাপপ্রবাহ, ৩৮ থকে ৩৯ দশমিক ৯ ডিগ্রি হলে মাঝারি ও ৪০ থেকে ৪২ ডিগ্রি সেলসিয়াস হলে তীব্র তাপপ্রবাহ বয়ে যায়। আর ৪২ ডিগ্রি সেলসিয়াসের বেশি হলে অতি তীব্র তাপপ্রবাহ হয়ে থাকে।
মঙ্গলবার সন্ধ্যায় আবহাওয়া অধিদপ্তরের পরবর্তী ৭২ ঘণ্টার পূর্বাভাসে জানিয়েছে, যশোর, কুষ্টিয়া, চুয়াডাঙ্গা, পাবনা, রাজশাহী, বাগেরহাট ও সাতক্ষীরা জেলা সমূহের ওপর দিয়ে অতি তীব্র তাপপ্রবাহ বইছে। এ ছাড়া দেশের অনেক জেলার ওপর মৃদু, মাঝারি এবং তীব্র তাপপ্রাবহ বইছে। যা আগামীকাল বুধবার অব্যাহত থাকতে। বুধবার সিলেট ও চট্টগ্রাম বিভাগের বিভিন্ন জায়গায় বৃষ্টি হতে পারে। বৃহস্পতিবার এই বৃষ্টি প্রশমিত হবে। যার মাধ্যমে দিন ও রাতের তাপমাত্রা কমতে শুরু করবে।
বর্ধিত পাঁচ দিনের আবহাওয়া পরিস্থিতে অধিদপ্তর বলছে, এ সময় সারা দেশে বৃষ্টি/বজ্রসহ বৃষ্টিপাতের প্রবণতা বিস্তারলাভ করতে পারে।