কম কম খাবার গ্রহণ বেশি দিন বেঁচে থাকার উপায় বলে মনে করছেন অনেক গবেষক। এর সত্যতা কতটা? নিউ ইয়র্ক টাইমস অবলম্বনে লিখেছেন সালাহ উদ্দিন শুভ্র
কম খেলে দীর্ঘায়ু হওয়া যায় এমন এক বিশ্বাস প্রচলিত আছে। বিশ্বের বিভিন্ন দেশে স্বল্পাহারের সংস্কৃতিও চালু আছে। এশিয়ার ভেতর যেমন জাপানের কথা বলা হয়। কম খাওয়া এবং বেশি বয়স বাঁচার জন্য তাদের সুখ্যাতি জগৎজোড়া। তবে কম খেলেই বেশি বয়স পর্যন্ত বাঁচা যাবে কিনা তা নিয়ে বিজ্ঞানে মতবিরোধ আছে। বিজ্ঞানীরা পরস্পর এ বিষয়ে এক মত হতে না পারলেও জানাচ্ছেন, কম খেলে শরীর অধিক সুস্থ থাকে। এখানে কম খাওয়া বলতে ক্যালরি গ্রহণে নিয়ন্ত্রণ আরোপকে বোঝানো হচ্ছে। কম ক্যালরি গ্রহণ করলে শরীরকে তার বিপাক ক্রিয়ায় কম শক্তি ও সময় ব্যয় করতে হয়। এর ফলে শারীরিক জটিলতা কম হয়, হৃদযন্ত্রের উপকার ঘটে।
যে কারণে সঠিক একটি সিদ্ধান্তে আসতে না পারলেও, বিজ্ঞানীরা কম ক্যালরি গ্রহণের ওপর গুরুত্ব দিয়ে আসছেন। তারা এ বিষয়ে অনেক প্রত্যক্ষ ও পরোক্ষ গবেষণা পরিচালনা করেন। গত সপ্তাহে নিউ ইয়র্ক টাইমসে স্বাস্থ্যবিষয়ক প্রতিবেদক ডানা জি স্মিথ এ বিষয়ে একটি প্রতিবেদন প্রকাশ করেন। সেখানে এ প্রশ্নের উত্তর খোঁজা হয়েছে।
ক্যালরি ও দীর্ঘায়ু
তার প্রতিবেদনে ডানা জানাচ্ছেন, গবেষণাগারে ইঁদুরের ওপর পরিচালিত জরিপে দেখা গেছে, ক্যালরি গ্রহণের পরিমাণ যদি ৩০-৪০ শতাংশ কমানো হয়, তাহলে গড়ে সে ৩০ শতাংশ বেশি বাঁচবে। তবে ক্যালরি গ্রহণের পরিমাণ আবার এতটা কমানো যাবে না যে ইঁদুরটি অপুষ্টিতে ভোগে। বিজ্ঞানীরা ১৯৩০-এর দশকে কৃমি থেকে বানর পর্যন্ত প্রজাতিতে এ বিষয়টি পর্যবেক্ষণ করেন। পরবর্তী গবেষণায় আরও দেখা গেছে, ক্যালরি কম গ্রহণ করে এমন প্রাণীর ক্যানসার এবং বার্ধক্যজনিত অন্যান্য দীর্ঘস্থায়ী রোগ হওয়ার সম্ভাবনা কম। অনেক ধরনের গবেষণা চালালেও কম খেলে আয়ু বাড়ে কিনা তা নিয়ে বিশেষজ্ঞদের বিতর্ক রয়েছে। বার্ধক্য বিশেষজ্ঞরা নিজেদের ওপর পরীক্ষা-নিরীক্ষা চালিয়েও বুঝে উঠতে পারছেন না কোনটা সঠিক।
তিনি বলছেন, কেন কম খাওয়া কোনো প্রাণী বা ব্যক্তিকে দীর্ঘজীবী করতে পারে সে বিষয়ে বিজ্ঞানীরা সঠিক কারণ বুঝে উঠতে পারেননি। তবে বিবর্তনের বাঁকে অনেক অনুমান লুকিয়ে আছে। যেমন বন্য পরিবেশে প্রাণী বা মানুষের পূর্বপুরুষদের খাবারের প্রাচুর্য এবং দুর্ভিক্ষ অনুভব করতে হয়েছে। মানুষ এবং প্রাণী কেবল প্রাচুর্যের ঋতু নয়, প্রাকৃতিক বঞ্চনার ভেতর দিয়ে বিবর্তিত হয়েছে। এমনও সময় গিয়েছে যে, খাবার পাওয়া যায়নি। এর মাধ্যমে একটি তত্ত্ব জানা যায় যে, কোষের স্তরে ক্যালরি কমলে প্রাণী শারীরিক চাপ মোকাবিলা করতে শেখে। সান আন্তোনিওর টেক্সাস স্বাস্থ্যবিজ্ঞান কেন্দ্রের বিশেষজ্ঞ জেমস নেলসন বলেছেন, উদাহরণস্বরূপ ক্যালরি কম গ্রহণ করা ইঁদুরের বিষাক্ত পদার্থের প্রতিরোধ ক্ষমতা বেশি থাকে এবং আঘাত থেকে দ্রুত সেরে ওঠে। আরেকটি ব্যাখ্যাও পাওয়া যায় যে, মানুষ এবং প্রাণী কম ক্যালরি গ্রহণ করলে তাদের বিপাক ক্রিয়াধীর হয়। এ প্রসঙ্গে ডিউক ইউনিভার্সিটি স্কুল অব মেডিসিনের মেডিসিনের সহযোগী অধ্যাপক ড. কিম হাফম্যান বলেছেন, শরীর যত কম খাবার হজমে কাজ করবে তত বেশি দিন বাঁচতে পারবে। যেমন আমরা জানি, চাকার গতি কমিয়ে দিলে টায়ার দীর্ঘস্থায়ী হয়। বিশেষজ্ঞরা বলছেন, ক্যালরি কম গ্রহণ করলে শরীর শর্করা ছাড়া অন্য উৎসের ওপর নির্ভরে বাধ্য হয়। বার্ধক্য বিশেষজ্ঞরা মনে করেন, এটি বিপাকীয় স্বাস্থ্যের জন্য উপকারী এবং শেষ পর্যন্ত আয়ু বাড়ায়। বেশ কয়েকজন গবেষক ‘অটোফ্যাজি’ নামে পরিচিত একটি প্রক্রিয়ার দিকে ইঙ্গিত করেছেন। যেখানে শরীর কোষের ত্রুটিপূর্ণ অংশগুলো খেয়ে ফেলে এবং শক্তি উৎপাদনে তাদের ব্যবহার করে। এটি কোষগুলোকে আরও ভালোভাবে কাজ করতে সহায়তা করে এবং বিভিন্ন বয়স-সম্পর্কিত রোগের ঝুঁকি কমায়। মিশিগান বিশ্ববিদ্যালয়ের প্যাথলজির অধ্যাপক ড. রিচার্ড মিলার বলেন, প্রকৃতপক্ষে, বিজ্ঞানীরা মনে করেন যে, কম ক্যালরি ইঁদুরকে তাড়াতাড়ি অসুস্থ হতে দেয় না, ফলে তারা দীর্ঘজীবী হয়। তবে একটি ভিন্ন গবেষণাও আছে। যেটি জেমস নেলসন ২০১০ সালে ইঁদুরের ওপর প্রকাশিত একটি গবেষণায় দেখিয়েছিন। জিনগতভাবে বৈচিত্র্যপূর্ণ কিছু ইঁদুর কম খেয়ে বেশি সময় বাঁচলেও একটি বড় অংশের আয়ু কম ছিল।
ভিন্ন বক্তব্য
প্রতিবেদনে বলা হয়, অন্যান্য গবেষকরা ডা. নেলসনের ফলাফলের তাৎপর্য নিয়ে বিতর্ক করেছেন। যেমন- ড. মিলার বলেন, লোকে এ গবেষণাকে উদ্ধৃত করে একটি প্রচলিত প্রমাণ হিসেবে যে কম ক্যালরি শুধু অল্প কিছু প্রাণী বা সময়ের কাজ করে। কিন্তু আপনি এমন উপসংহারে পৌঁছাতে হলে ৫০ বছরের শক্তিশালী প্রকাশিত প্রমাণ উপেক্ষা করতে হয়।
যদিও ডা. নেলসনের ফলাফলের সঙ্গে মিল পাওয়া গেছে আরও দুটি গবেষণার। ২০ বছরেরও বেশি সময় ধরে বানরদের ওপর পরিচালিত এ দুটি গবেষণা ২০০৯ এবং ২০২১ সালে প্রকাশিত হয়। দুই পরীক্ষায় প্রাণীরা কম ক্যালরি গ্রহণের ফলে কিছু স্বাস্থ্য সুবিধা পেয়েছিল। তবে শুধু একটি দল বেশি দিন বেঁচে ছিল এবং তাদের হৃদযন্ত্র ও ডায়াবেটিসের মতো রোগের হার কম ছিল।
বানর নিয়ে দুটি গবেষণার একটির প্রতিবেদন প্রকাশ পায় ২০০৯ সালে। উইসকনসিন বিশ্ববিদ্যালয়ে পরিচালিত গবেষণায় দেখা গেছে, বানররা দিনের শুরুতে একবার খাবার পেত। আবার শেষ বিকালে খাবার দেওয়া হতো তাদের। এতে ১৬ ঘণ্টা না খেয়ে থাকতে হতো তাদের। আবার যুক্তরাষ্ট্রের ন্যাশনাল ইনস্টিটিউট অন এজিং পরিচালিত ২০১২ সালের গবেষণায় দেখা যায়, বানরদের দিনের বেলা দুবার খাবার দেওয়া হয় এবং রাতে খাবার দেওয়া হতো না। উইসকনসিনের বানররা বেশি দিন বেঁচে ছিল। ইঁদুরের ওপর পরিচালিত আরও একটি সাম্প্রতিক গবেষণায় দেখা গেছে, কম ক্যালরি এবং কম খাবার গ্রহণ করা ইঁদুররা বেশি দিন বাঁচে। বিজ্ঞানীরা ইঁদুরদের একই ধরনের কম ক্যালরিযুক্ত খাবার দিয়েছিলেন। তবে এক দল ইঁদুরকে মাত্র দুই ঘণ্টার জন্য খাবার দেওয়া হয়, অন্যদের ১২ এবং আরেকটি দলকে ২৪ ঘণ্টা। ফলাফলে দেখা গেছে, কম ক্যালরিসমৃদ্ধ খাবার গ্রহণের সুযোগ যেসব ইঁদুর ২৪ ঘণ্টা পেয়েছে, তাদের ১০ শতাংশ এবং নির্দিষ্ট সময়ের জন্য একই খাবার পেয়েছে যারা, তাদের আয়ু ৩৫ শতাংশ পর্যন্ত বৃদ্ধি পেয়েছে।
গবেষক রাফায়েল ডি কাবো মনে করেন, কম ক্যালরি শরীরে নেওয়া দীর্ঘায়ুর জন্য গুরুত্বপূর্ণ, তবে কতটা সময় নিয়ে খাওয়া হবে এবং কতক্ষণ না খেয়ে থাকবে, সেগুলোও গুরুত্বপূর্ণ; শুধু প্রাণীদের ক্ষেত্রে নয়, মানুষের ক্ষেত্রেও।
নিশ্চিত উত্তরের খোঁজে
ডানা জানাচ্ছেন, এত গবেষণার পরও বলতে হচ্ছে, উপবাস, ক্যালরি কমানো বা এই দুইয়ের সংমিশ্রণে মানুষ দীর্ঘজীবী হতে পারে কিনা, নিশ্চিতভাবে এর উত্তর দেওয়া কঠিন। ডা. নেলসন বলেন, আমি মনে করি না যে, আমাদের কাছে এমন কোনো প্রমাণ আছে এর ফলে মানুষের আয়ু বাড়ে। আবার এর অর্থ এ নয় যে, এটি কাজ করতে পারে না। বলতে হয় যে, এর জন্য প্রমাণ আশা করা খুব কঠিন, কারণ এ সংক্রান্ত তথ্য পেতে সারাজীবন সময় লাগে।
‘ক্যালরি স্টাডি’ নামে এক গবেষণায় দেখা গেছে, এক শরও বেশি প্রাপ্তবয়স্ক সুস্থ ব্যক্তিকে ২৫ শতাংশ ক্যালরি কম গ্রহণের পরামর্শ দেওয়া হয়েছিল। লক্ষ্যে পৌঁছাতে সহায়তার জন্য নিয়মিত তাদের কাউন্সেলিং করা হয়। কিন্তু ক্যালরি কমানো খুব কঠিন। অংশগ্রহণকারীরা শেষ পর্যন্ত যা গ্রহণের পরিমাণ প্রায় ১১ শতাংশ কমাতে সক্ষম হয়েছিল। গবেষণায় ‘জৈবিক বয়স’র তিনটি পরিমাপও অন্তর্ভুক্ত করা হয়। যার জন্য দুই বছরের গবেষণার শুরুতে এবং শেষে রক্ত পরীক্ষার তুলনা করা হয়। পরীক্ষাগুলোর মধ্যে দুটিতে উন্নতি পাওয়া যায়নি। তবে মানুষের বয়স কমানোর হারের ক্ষেত্রে উন্নতি দেখা যায়। গবেষণায় অংশ নেওয়া ডা. হাফম্যান বলেন, ক্যালরি কমালে মানুষের বয়স বৃদ্ধি পায় কিনা জানা যায়নি, তবে এটি অংশগ্রহণকারীদের জৈবিক বয়স বাড়ার হারকে ধীর করে দেয়।
মিলারের মতে, ২৫ থেকে ৪০ শতাংশ ক্যালরি কমাতে পারলে মানুষসহ অন্যান্য প্রাণী উপকার পায়। ডি কাবোর একটি গবেষণার কথা উল্লেখ করে জানান, মাত্র ১১ শতাংশ ক্যালরি গ্রহণ কমাতে পারলে শারীরিক সুবিধা পাওয়া সম্ভব। গবেষকরা আলোচনা করেছেন বডি মাস ইনডেক্স বা শরীরে ভর নিয়ে। তাদের মতে, যাদের ওজন বেশি তাদের স্বাভাবিক বা কম ওজনের লোকদের তুলনায় মৃত্যুর ঝুঁকি কম। তাদের অনুমান, শরীরের ভর কম এমন লোকেরা পাতলা হতে পারে, কারণ তারা বয়স্ক বা তাদের দীর্ঘস্থায়ী অসুস্থতা রয়েছে। ডা. হাফম্যান বলেন, আবার যাদের ভর বেশি তাদের হয়তো পেশির মাংসের চেয়ে চর্বি বেশি। তবে শরীরের ভর বেশি থাকলে বয়সকালে প্রতিরক্ষা ব্যবস্থা ভালো থাকে।
সর্বোপরি, বিভিন্ন প্রাণীর ওপর পরিচালিত গবেষণার ফলাফল মানুষের ক্ষেত্রে প্রয়োগ করা যাবে কি না তা নিয়ে নিশ্চিত নন বিজ্ঞানীরা। তারা বলছেন, ক্যালরি কম গ্রহণ বা মাঝে মাঝে উপবাস থাকা শরীরের সাময়িক উপকার করে থাকে। তবে কম খাওয়া মানে ক্ষুধার্থ থাকা ভাবলে ভুল হবে।
দীর্ঘ বছর বেঁচে থাকার স্বপ্ন দেখে না এমন মানুষ পাওয়া ভার। তবে আজও এমন কিছু আবিষ্কার সম্ভব হয়নি, যা মানুষকে অনেক দিন নিশ্চিতভাবে বাঁচিয়ে রাখতে পারে। তারপরও গবেষকরা বিভিন্নভাবে বিষয়টি জানার ও বোঝার চেষ্টা করছেন। এর একটি হলো কম খাওয়া বা কম ক্যালরি গ্রহণ। অনেকে এ পদ্ধতিকে বেছে নেন। কম খেতে গিয়ে আবার পুষ্টিগত সমস্যায় পড়ে গেলে হবে না। সে জন্য নিয়মিত পরীক্ষা, চিকিৎসকের পরামর্শ প্রয়োজন। শরীরের ওজনও নিয়ন্ত্রণে রাখা জরুরি। খাওয়ার ক্ষেত্রে প্রাকৃতিক খাবারের ওপর নির্ভরশীলতা বাড়ানোর দিকেও মনোযোগ বেড়েছে। পাশাপাশি কায়িক শ্রম বা ব্যায়ামকে গুরুত্ব দেওয়া হচ্ছে। শরীরে যা প্রবেশ করবে তার যেন যথাযথ বিপাক হয়, সে দিকে লক্ষ্য রাখা প্রয়োজন। সে জন্য হাঁটা, দৌড়ানো, শ্রমে নিয়োজিত থাকার কথা বলছেন গবেষকরা।