আজ আন্তর্জাতিক শ্রমিক দিবস। পরিবর্তিত জলবায়ু পরিস্থিতিতে কর্মক্ষেত্রে নিরাপত্তা এবং স্বাস্থ্য নিশ্চিত করার প্রত্যয়ে বিশ্বব্যাপী দিনটি উদযাপিত হচ্ছে। ১৮৮৬ সালে পহেলা মে মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের শিকাগো শহরে অনুষ্ঠিত শ্রমিক আন্দোলন থেকে উদ্ভূত এই দিবসটি ঐতিহাসিকভাবে গভীর তাৎপর্য বহন করে চলেছে। শ্রমিকদের অধিকার আদায়ের সংগ্রাম এবং সামাজিক ন্যায়বিচারের জন্য চলমান লড়াইয়ের স্মারক হিসেবে দিনটি প্রতিষ্ঠা লাভ করেছে। দিবসটি উদযাপন করার সময় বিশ্বব্যাপী শ্রমশক্তির অগ্রগতি সাধনে আসন্ন চ্যালেঞ্জগুলির মোকাবেলা করা অপরিহার্য।
দিবসটির শেকড় সন্ধান করলে দেখা যাবে ১৮৫৬ সালের ২১ এপ্রিল ভিক্টোরিয়ায় অস্ট্রেলিয়ান স্টোনমাসনরা ৮ ঘন্টা কর্মদিবসের আন্দোলনের অংশ হিসাবে একটি গণ কর্মবিরতি পালন করে। প্রাথমিকভাবে এটি শ্রম আন্দোলনের একটি বার্ষিক স্মারক হয়ে ওঠে এবং আমেরিকান শ্রমিক আন্দোলনের ক্ষেত্রে ব্যাপকভাবে অনুপ্রাণিত করে।
উনিশ শতকের শেষের দিকে বিভিন্ন ট্রেড ইউনিয়ন এবং শ্রমিক আন্দোলন বৃদ্ধির সাথে সাথে ট্রেড ইউনিয়নবাদীদের বিভিন্ন দল শ্রম দিবস উদযাপনের জন্য বিভিন্ন দিন বেছে নেয়। যদিও মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রে ১৮৮০ সালের প্রথম দিকে শ্রম দিবস নামে সেপ্টেম্বরে একটি ছুটির প্রস্তাব করা হয়েছিল। পরবর্তীতে ১৮৮২ সালের সেপ্টেম্বরে নিউইয়র্ক সিটিতে শ্রমিকদের একটি নাইট সমাবেশ অনুষ্ঠিত হয়। এই গোপনীয় নাইট সমাবেশের সাথে যুক্ত নিউ ইয়র্কের সেন্ট্রাল লেবার ইউনিয়ন (সিএলইউ) এর পৃষ্ঠপোষকতায় ৫ সেপ্টেম্বর বিভিন্ন শ্রমিক সংগঠনের একটি পাবলিক প্যারেড অনুষ্ঠিত হয়।
এর কয়েক বছর পর ১৮৮৬ সালের পহেলা মে শ্রমিকদের দির্ঘদিনের পুঞ্জিভুত ক্ষোভের বহিঃপ্রকাশ ঘটে যায়। এই দিন থেকে মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের শিকাগো শহরে শ্রমিকরা ৮ ঘণ্টা কাজের দাবিতে রাস্তায় আন্দোলন শুরু করে। ৪ মে পুলিশ হরতালের সমর্থনে আয়োজিত একটি জনসভাকে ছত্রভঙ্গ করার জন্য আইনি তৎপরতা শুরু করলে একজন অজ্ঞাত ব্যক্তি একটি বোমা নিক্ষেপ করে। পুলিশও তখন শ্রমিকদের ওপর পাল্টা গুলি চালায়। এই ঘটনার ফলে অন্তত সাতজন পুলিশ কর্মকর্তা এবং অন্তত চারজন বেসামরিক নাগরিক নিহত হয়। কয়জনের মর্মান্তিক মৃত্যু ছাড়াও শ্রমিক-পুলিশ দাঙ্গায় প্রায় ষাটজন পুলিশ কর্মকর্তা আহত হন ও ১১৫ জন বেসামরিক নাগরিক আহত হয়েছিলেন। এরপর আরো শত শত শ্রমিক নেতাসহ সংহতিপ্রকাশকারী অনেককে গ্রেপ্তার করা হয় যাদের মধ্যে চারজনকে ফাঁসিতে ঝুলিয়ে নির্মমভাবে মৃত্যুদন্ড কার্যকর করা হয়।
শ্রমিকদের জীবন উৎসর্গ করার মাধ্যমে অর্জিত মে দিবস সারা বিশ্বে শ্রমিক আন্দোলনগুলোকে উন্নত কর্মপরিবেশ তৈরি করতে, সামাজিক ন্যায়বিচার প্রতিষ্ঠায়, ন্যায্য মজুরি আদায়ের ক্ষেত্রে এবং স্বল্প শ্রমঘন্টা বিশেষ করে ৮ ঘন্টা কাজের জন্য লড়াই করতে উৎসাহ যোগায়। এই প্রারম্ভিক শ্রম কর্মীদের আত্মত্যাগই আধুনিক শ্রম অধিকার আন্দোলন এবং আন্তর্জাতিক শ্রমিক দিবস প্রতিষ্ঠার ভিত্তি স্থাপন করেছিল। ফলে মে দিবসকে অনেক দেশ এখন সরকারি ছুটির দিন হিসেবে পালন করছে। শ্রমিকদের অবদানকে সম্মান জানাতে এবং শ্রম অধিকারের জন্য চলমান সংগ্রামকে স্বীকার করে নেওয়ার অঙ্গীকার হিসবে পৃথিবীর প্রায় ৬০টি দেশ আন্তর্জাতিক শ্রমিক দিবস পালন করছে। বিভিন্ন ট্রেড ইউনিয়ন থেকে শুরু করে তৃণমূল আন্দোলন পর্যন্ত মে দিবস আরও ন্যায়সঙ্গত সমাজ প্রতিষ্ঠার পক্ষে অধিপরামর্শ করার জন্য সর্বস্তরের মানুষকে একত্রিত করার জন্য শক্তিশালী একটি প্লাটফর্ম।
যদিও স্থানীয়, জাতীয় ও আন্তর্জাতিক সম্প্রদায়ের কঠোর তৎতপরতা, বেশকিছু সরকার প্রধানগণের সার্বিক সদিচ্ছা, রাজনৈতিক ও সামাজিক মতৈক্যের ফলে বিগত কয়েক বছর ধরে শ্রম অধিকার রক্ষা, কর্মপরিবেশ তৈরি ও কর্মঘন্টা নির্দিষ্টকরণের ক্ষেত্রে উল্লেখযোগ্য অগ্রগতি সাধিত হয়েছে, তবুও এখনো অনেক চ্যালেঞ্জ রয়ে গেছে। শ্রমিকদের অর্থনৈতিক বৈষম্য, অনিশ্চিত কর্মসংস্থান, কাজের ক্ষেত্রে জীবনের পর্যাপ্ত নিরাপত্তার অভাব এবং কিছু কিছু ক্ষেত্রে শ্রম অধিকারের অবক্ষয় মাঝে মাঝে বিশ্ব সম্প্রদায়কে ভাবনায় ফেলে দেয়। অধিকন্তু, কোভিড-১৯ মহামারি পরবর্তী সময়ে এই চ্যালেঞ্জগুলিকে আরও বাড়িয়ে তুলেছে। পরিচালনা ব্যয় কমানোর নামে তুলনামূলক দূর্বল ও অদক্ষ কর্মীদেরকে প্রয়োজনীয় ও দক্ষ কর্মীদের মুখোমুখি করেছে যা বেকারত্বের সংখ্যা আরো বাড়িয়ে দিয়েছে।
২০২৩ সালের বৈশ্বিক বেকারত্বের হার ৫.১ শতাংশে দাঁড়িয়েছে যা ২০২২ সালের ৫.৩ শতাংশের থেক সামান্য উন্নতি বলে মনে হতে পারে। কিন্তু ২০২৩ সালে বিশ্বব্যাপী শ্রমবাজারে অংশগ্রহণের উন্নত হলেও চাকরিসমূহের মধ্যে ব্যবধান বেড়েছে। একটি প্রতিবেদনে দেখা গেছে যে, আগামী দিনগুলোত দৃষ্টিভঙ্গিগত কারণে বিশ্বব্যাপী শ্রম বাজার ও বেকারত্ব উভয়ই খারাপ হবে। ২০২৪ সালে অতিরিক্ত দুই মিলিয়ন কর্মী চাকরি খুঁজবে বলে আশা করা হচ্ছে এমনকি বেকারত্বের হার ২০২৩ সালের ৫.১ শতাংশ থেকে ২০২৪ সালে ৫.২ শতাংশে উন্নীত হতে পারে। কোভিড-১৯ মহামারি পরবর্তী সময়েও চাকরি ক্ষেত্রে উচ্চ এবং নিম্ন আয়ের দেশগুলির মধ্যে গুরুত্বপূর্ণ পার্থক্য বজায় রয়েছে। যদিও ২০২৩ সালে চাকরির ব্যবধানের হার ছিল উচ্চ-আয়ের দেশগুলিতে ৮.২ শতাংশ যেখানে নিম্ন-আয়ের দেশগুলিতে এটি ২০.৫ শতাংশ। একইভাবে, ২০২৩ সালের বেকারত্বের হার উচ্চ-আয়ের দেশগুলিতে ৪.৫ শতাংশে বজায় থাকলেও নিম্ন-আয়ের দেশগুলিতে এটি ছিল ৫.৭ শতাংশ। অন্যদিকে ২০২০ সালের পরে চরম দারিদ্র্যের মধ্যে বসবাসকারী কর্মীদের সংখ্যা (ব্যক্তি প্রতি ২.১৫ মার্কিন ডলারের কম আয়) দ্রুত হ্রাস পাওয়া সত্ত্বেও ২০২৩ সালে আরো প্রায় ১০ লক্ষ বৃদ্ধি পেয়েছে।
আমরা যেহেতু একটি পরিবর্তিত পরিস্থিতে ও অগ্রসরমান পৃথিবীর বাসিন্দা হিসেবে ২০২৪ সালে মে দিবস পালন করছি সেহেতু আমাদের পারস্পারিক সংহতি, সমতা এবং ন্যায়বিচারের নীতির প্রতি আমাদের অঙ্গীকার পুনর্ব্যক্ত করা অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। সরকার, নিয়োগকর্তা এবং সুশীল সমাজকে অবশ্যই কর্মক্ষেত্রের অন্যায়গুলোকে স্থায়ী করে এমন পদ্ধতিগত সমস্যাগুলি মোকাবেলা করতে একসঙ্গে কাজ করতে হবে। বিশেষ করে শ্রমের ন্যায্য মজুরি নিশ্চিত করা, নিরাপদ কাজের পরিবেশ প্রদান, শ্রমিকদের অধিকার রক্ষা এবং বিভিন্ন ক্ষেত্রে শ্রমশক্তির যথাযথ অন্তর্ভুক্তিকরণ ও তাদের কর্মবৈচিত্র্যের প্রচার প্রচারণা অব্যাহত রাখতে হবে।
পাশাপাশি ক্রমবর্ধমান ডিজিটালাইজড বিশ্বে কাজের ভবিষ্যত গঠনে প্রযুক্তির ভূমিকাকে উপেক্ষা করা যাবে না। কারণ যুতসই প্রযুক্তিগত অগ্রগতিগুলিকে কাজে লাগিয়ে কর্মীদের দক্ষতা বৃদ্ধি করতে না পারলে উৎপাদনশীলতাকে উন্নত করা সম্ভব হবে না। প্রযুক্তিকে এমনভাবে কাজে লাগাতে হবে যাতে শ্রমিকদের উপকার হয় এবং অন্তর্ভুক্তিমূলক অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধি অর্জিত হয়। মে দিবসকে আমরা শুধুমাত্র শ্রমিকদের অধিকার এবং সামাজিক ন্যায়বিচারের জন্য চলমান সংগ্রামের একটি অনুস্মারক হিসেবে স্মরণ করবো না। আসুন এই দিনে আমরা সবার জন্য একটি ন্যায্য, আরও ন্যায়সঙ্গত বিশ্ব গড়ে তোলার প্রতিশ্রুতি পুনর্ব্যক্ত করি। সর্বত্র শ্রমিকদের সাথে একাত্মতা ঘোষণা করে পাশে দাঁড়ানোর মাধ্যমে এবং অর্থপূর্ণ পরিবর্তনের পক্ষে কথা বলার মাধ্যমে শ্রমিক দিবস উদযাপন করি। আমরা এমন একটি উন্নত ও মানবিক ভবিষ্যৎ গঠনের প্রচেষ্টা চালাতে পারি যেখানে প্রতিটি ব্যক্তি কর্মক্ষেত্রের বাইরেও মূল্যবান, সম্মানিত এবং ক্ষমতাপ্রাপ্ত হন।
লেখক: এম এম মাহবুব হাসান, ব্যাংকার ও উন্নয়ন গবেষক।