ন্যূনতম মজুরি কাঠামোতে বর্তমানে ৪২টি শিল্প রয়েছে। এরমধ্যে ২১ খাতের শ্রমিকদের ন্যূনতম মাসিক মজুরি ৫ হাজার টাকার কম ও দৈনিক মজুরি ১৬৭ টাকার কম।
এসব খাত হচ্ছে পেট্রোল পাম্প, টাইপ ফাউন্ড্রি, আয়ুর্বেদ কারখানা, ইঞ্জিনিয়ারিং ওয়ার্কশপ, কোল্ডস্টোর, সিনেমা হল, ম্যাচ ইন্ডাস্ট্রি, হোটেল-রেস্তোরাঁ, হোমিওপ্যাথ কারখানা, রাবার ইন্ডাস্ট্রিজ, মৎস্য শিকারী ট্রলার ইন্ডাস্ট্রিজ, স মিলস, নির্মাণ ও কাঠ, রি রোলিং মিল্স, ট্যানারী, দর্জি কারখানা, জাহাজ ভাংগা, হোসিয়ারী, জুট প্রেস এন্ড বেলিং, ব্যাক্তি মালিকানাধীন শিল্প প্রতিষ্ঠানে নিয়োজিত অদক্ষ প্রাপ্তবয়স্ক শ্রমিক এবং কিশোর শ্রমিক, ওয়েল মিলস এন্ড ভেজিটেবল প্রোডাক্টস।
দ্রব্যমূল্যের ঊর্ধ্বগতির এই বাজারে যেখানে ১ কেজি চাল কিনতেই খরচ হয় ৬০ টাকা সেখানে মুদ্রণ শিল্পের সঙ্গে জড়িত টাইপ ফাউন্ড্রি শিল্পের একজন শ্রমিকের পুরো মাসের বেতন মাত্র ৫২১ টাকা এবং পেট্রোল পাম্প পেশার শ্রমিকের বেতন ৭৯২ টাকা। কেবল এই দুই পেশাই নয় একইভাবে আরও ১৯ টি খাতের শ্রমিকদের প্রতি মাসের বেতন ৫ হাজার টাকার কম। এমন পরিস্থিতিতে দেশে পালিত হচ্ছে মহান মে দিবস।
সরকার নির্ধারিত মজুরি কম থাকার কারণে এসব খাতে নিয়োজিত শ্রমিকরা হাড় ভাঙা পরিশ্রম করলেও পর্যাপ্ত বেতন পাচ্ছেন না। মজুরি বোর্ডের অজুহাত দিয়ে এই শ্রমিকদের দিনের পর দিন কম বেতন দিয়ে যাচ্ছেন মালিকরা। এসব খাতের শ্রমিকরা ওভারটাইম কাজ করে কোনোমতে টিকে আছেন। তারা হয়তো দেন দরবার করে ন্যূনতম মজুরির চেয়ে সামান্য বেশি মজুরি পান কিন্তু এরপরও যা পান তা দিয়ে তাদের সংসার চলে না।
চা শ্রমিক ও পোশাক শ্রমিকরা দিনের পর দিন আন্দোলন করে পুলিশের মাইর খেয়ে তাদের ন্যূনতম বেতন বাড়াতে পারলেও অন্য খাতের শ্রমিকরা তা পারছেন না। চা শ্রমিকদের আন্দোলনের আগে তারা যে এত কম টাকা মজুরি পেতেন তা অনেকের ধারণার মধ্যেই ছিল না। তাদের আন্দোলনের পর নিম্ন মজুরি পাওয়ার বিষয়টি সবার সামনে এসেছে। দেশি বিদেশি চাপের কারণে পোশাক খাতের শ্রমিকরা তাদের বেতন নিয়ে সরকার ও মালিকদের সঙ্গে আন্দোলনের মাধ্যমে আলোচনা করতে পারলেও অন্যান্য খাতের শ্রমিকরা সেই সুযোগ ও পাচ্ছেন না।
দেশের বিভিন্ন পেশা খাতের শ্রমিকদের নিম্নতম মজুরি নির্ধারণে সরকারের একটি বিশেষ বোর্ড রয়েছে। এই বোর্ড নিয়মিতভাবে মজুরি পর্যালোচনা করে নিম্নতম মজুরি নির্ধারণ করে দেয়া এবং প্রতি ৫ বছর পরপর তা পুন:মূল্যায়নের কথা।
তবে এসব নিয়ম কেবল কাগজ কলমেই সীমাবদ্ধ। ‘নিম্নতম মজুরি বোর্ড’এর তথ্য বিশ্লেষণ করলে দেখা যায় পেট্রোল পাম্পে কাজ করা একজন শ্রমিক প্রতিমাসে মজুরি পান ৭৯২ টাকা। সরকারের শ্রম মন্ত্রণালয়ের ‘নিম্নতম মজুরি বোর্ড’ ১৯৮৭ সালে তাদের এই মজুরি নির্ধারণ করে দেয়। এরপর গত ৩৭ বছর পেরিয়ে গেলেও এই মজুরি বাড়ানোর কোনো উদ্যোগ নেওয়া হয়নি।
তবে পেট্রোল পাম্পের শ্রমিকদের চেয়েও মাসে কম টাকা মজুরি পান মুদ্রণ শিল্পের সঙ্গে জড়িত টাইপ ফাউন্ড্রি শিল্পের শ্রমিকরা। ১৯৮২ সালে সরকার এই পেশার শ্রমিকদের মাসে মজুরি নির্ধারণ করে ৫২১ টাকা। এরপর ৪২ বছর পেরিয়ে গেলেও এই পেশার শ্রমিকদের মজুরি আর বাড়ানো হয়নি।
আয়ুর্বেদ কারখানায় শ্রমিকরা প্রতিমাসে বেতন পান ৪৩৫০ টাকা এবং কর্মচারীরা ৪৫০০ টাকা। সর্বশেষ এই মজুরি নির্ধারণ হয় ২০০৯ সালে। একইভাবে ইঞ্জিনিয়ারিং ওয়ার্কশপের মজুরি নির্ধারণ করা হয় ২০১০ সালে। এই খাতের একজন শ্রমিক সারামাস কাজ করে বেতন পান মাত্র ৪৮০০ টাকা। একইভাবে সিনেমা হলের শ্রমিকরা ২ হাজার ৬১০ এবং হোটেল-রেস্তোরাঁয় ৩ হাজার ৭১০ টাকা মাসে বেতন পান।
রাজধানীর বেইলী রোডের একটা হোটেলে খাবার পরিবেশনের কাজ করেন রফিকুল ইসলাম। তিনি দেশ রূপান্তরকে বলেন, আমি প্রতিদিন ১২ ঘণ্টা কাজ করি। এই সময়ে হোটেল থেকে আমাকে খাবার দেওয়া হয়, এর বাইরে মাসে বেতন দেওয়া হয় ৮ হাজার ৫০০ টাকা। এই টাকার মধ্যে আমার বাসা ভাড়াতেই খরচ হয় ১৭০০ টাকা, এছাড়া নিজের আরও প্রতিমাসে ২০০০ টাকা খরচ হয়। বাকী যে টাকা থাকে তা গ্রামে মা বাবাকে পাঠিয়ে দেই।
তিনি বলেন, বাসা থেকে আমার বিয়ের আলাপ চলতেছে। কিন্তু যে টাকা বেতন পাই তা দিয়ে সংসার চালানোর মতো টাকা আমার নেই। হোটেলে খাবার পরিবেশন করে কিছু মানুষের কাছ থেকে বকশিশ পাই কিন্তু যা পাই তা দিয়েও এই বাজারে বিয়ে করে বউ চালানো যাবে না।