বিয়ে করে বউ নিয়ে বাড়িতে গিয়ে ছেলেটি দেখে বউটি তার নয়। ঘোমটায় মুখ ঢেকে রাখা মেয়েটি অন্য কেউ। ছেলেটির মাথায় হাত তার বউ গেল কই? তার সঙ্গে আসা একই রঙের বিয়ের শাড়ি পরা এই মেয়েটিইবা কে? গল্পটি বলিউডের ‘লাপাতা লেডিস’ সিনেমার। এটির সবচেয়ে বড় সম্পদ এর গল্প। সম্প্রতি নেটফ্লিক্সে মুক্তি পেয়েছে। ভারতের বাঙালি পরিচালক ও গল্পকার বিপ্লব গোস্বামীর গল্পে কিরণ রাও তৈরি করেছেন এটি আর প্রযোজনা করেছেন আমির খান। আলোচিত এই সিনেমাটির গল্পকার বা স্ক্রিপ্ট রাইটার বিপ্লব গোস্বামীর সঙ্গে কথা বলেছেন দেশ রূপান্তরের অনলাইন ইনচার্জ আনিসুর বুলবুল
‘লাপাতা লেডিস’ নিয়ে ভাবনাটা শুরু হয় কখন থেকে?
ছোটবেলা থেকেই আমার ইচ্ছে ছিল সিনেমা শিল্প নিয়ে পড়াশোনা করব এবং সিনেমার ডিরেক্টর ও রাইটার হব। সেভাবেই নিজেকে তৈরি করছিলাম। তৈরি করতে গিয়ে আমি দেখলাম, আমাদের চারপাশে নারী-পুরুষের মধ্যে একটা বৈষম্য রয়েছে। নারীদের অগ্রগতির ক্ষেত্রে অনেক রকম বাধা দেখতে পাই। এরপর যখন কলকাতার সত্যজিৎ রায় ফিল্ম অ্যান্ড টেলিভিশন ইনস্টিটিউটে পড়ার সুযোগ হয়; এই ভাবনাগুলোকে আরও বেশি গোছাতে শুরু করি। মাথায় কাজ করতে শুরু করে এই বিষয়ের ওপর আমি কাজ করব। সিনেমা বানাব। তারপর আমি লেখা শুরু করি। প্রায় দশ বছর আগের কথা বলছি।
তাহলে লাপাতা লেডিস লিখেছিলেন দশ বছর আগে?
হ্যাঁ! ওই সময়ই এই কনসেপ্টটি মাথায় আসে এবং একটা সিনোপসিস লিখে ফেলি। যার নাম দিয়েছিলাম ‘টু ব্রাইডস’। বিশ্বাস করবেন কি না জানি না, এটি লেখার পরই আমার মনে হয়েছে, এই বিষয় নিয়ে ছবি করলে সেটা একটা আলোড়ন তুলবে। দশ বছর আগেই এটা আমার মনে হয়েছিল। তখন আমি ইংলিশে নামটা দিয়েছিলাম ‘টু ব্রাইডস’। যার অর্থ দুই বধূ।
তার মানে ‘টু ব্রাইডস’ থেকে ‘লাপাতা লেডিস’?
আমি যখন লিখেছিলাম তখন এটির নাম ‘টু ব্রাইডস’ই দিয়েছিলাম। যখন যেখানে গিয়েছি, বিভিন্ন প্রদেশে, রাজস্থানে গিয়েছি, ইউপি গিয়েছি সেখানকার সংস্কৃতি, মানুষের জীবনযাত্রা এবং তাদের জীবনের প্রথাগুলো খেয়াল করেছি। তারপর আস্তে আস্তে কিছু গল্পটা লিখি। লেখার পর আমি এটা কনটেস্টেও এই নামেই জমা দিয়েছিলাম।
কোন কনটেস্টে?
২০১৮ সালের শেষের দিকটায় ‘সিনেস্তান স্ক্রিপ্ট কনটেস্ট’ নামে ভারতের সবচেয়ে বড় স্ক্রিপ্ট রাইটিং কম্পিটিশন হয় মুম্বাইতে। এটার ট্যাগ লাইন ছিল ‘গ্লোবাল সার্চ ফর ইন্ডিয়ান স্ক্রিপ্ট রাইটারস’। এখানে আমি আমার স্ক্রিপ্টটি পাঠাই। প্রায় চার হাজার প্রতিযোগীর মধ্য থেকে আমার টু ব্রাইডসটি সেকেন্ড হয়। টপ ফাইভ স্ক্রিপ্ট রাইটারদের অ্যাওয়ার্ডও দেওয়া হয়। এখানের জুরি মেম্বার ছিলেন রাজকুমার হিরানি, আনজুম রাজাবালি, জুহি চতুর্বেদী এবং আমির খান।
‘মিস্টার পারফেকশনিস্ট’ আমির খান ছিলেন?
হ্যাঁ। তিনিসহ জুরি বোর্ডের সবাই আমার স্ক্রিপ্টটির খুবই প্রশংসা করেন। তারপর একদিন আমির খান আমাকে তার বাড়িতে ডেকেছিলেন। বাড়িতে গেলাম। তিনি আমার দিকে তাকিয়ে হাসলেন। তারপর বললেন, বিপ্লব, আপনার স্ক্রিপ্টটি অনেক সুন্দর হয়েছে। আমি এটি প্রডিউস করতে চাই। আর এটি কিরণ রাও পরিচালনা করবেন। তারপর ধাপে ধাপে সব হলো। সবাই চাইছিলেন সিনেমাটির নাম হিন্দিতে হোক। এরপর সবার সম্মতিক্রমে নামটা হয়ে দাঁড়াল ‘লাপাতা লেডিস’।
লাপাতা লেডিসে কি আমির খানের অভিনয়ের কথা ছিল?
আমির খান অসাধারণ একজন অভিনেতা। তারপরও এটা তার নিজের প্রোডাকশন। উনি করতে চাইলে করতেই পারতেন। বিষয়টা হচ্ছে কি, উনি ক্রিয়েটিভ দিক থেকে নিরপেক্ষতা চিন্তা করেন। কিরণ রাও-আমির খান যখন সিদ্ধান্তটা নেন। তার আগে আমির খান পুলিশের পোশাক পরে অডিশনটা দিয়েছিলেন এটা ঠিক। রবি কিষাণও অডিশন দিয়েছিলেন। সবার মনে হলো যে, রবি কিষাণই এখানে যায়।
আপনার লেখা স্ক্রিপ্টে কোনো পরিবর্তন করতে হয়েছে?
যখন সিদ্ধান্ত নেওয়া হয় আমির খান প্রোডাকশন থেকে করতে হবে। তখন কিছু সংলাপ ও অল্প কিছু দৃশ্য যোগ করা হয়েছে। কিন্তু গল্পটা একই রকম আছে। দিভ্যনিধি শর্মা ও স্নেহা দেশাই কিছু সংলাপ ও দৃশ্য লিখেছেন। তবে প্রত্যেকবারই আমার অনুমতি নিয়েই করা হয়েছে।
আচ্ছা, গল্পে এই এক হাত ঘোমটা টানার ভাবনা এলো কীভাবে?
আসলে টু ব্রাইডসের ওই সিনোপসিস লেখার পরপরই রাজস্থানে একটা কাজে গিয়েছিলাম। রাস্তা দিয়ে যাওয়ার সময় দূরে অনেক বড় একটা মাঠ দেখলাম। জনমানবহীন একটা মাঠ। তার মাঝখানের একটা ছোট্ট মেঠোপথ দিয়ে হেঁটে যাচ্ছে একটা মেয়ে। কমবয়সী মেয়ে। দেখুন, চারদিকে কোনো মানুষজন কেউ ছিল না, কিন্তু তার ঘোমটাটা একদম পেট পর্যন্ত টানা। বিষয়টা আমাকে নাড়া দিয়েছিল।
এটি কি সিনেমার জন্যই লিখেছিলেন?
হ্যাঁ! আমার খুব ছোটবেলা থেকেই ইচ্ছে ছিল ফিল্ম ডিরেক্টর ও রাইটার হব। এই পরিকল্পনাটা করে ফেলেছিলাম। সেই দিক থেকে দেখতে গেলে সবকিছু লেখালেখি, বেশিরভাগ ক্রিয়েটিভ চিন্তা-ভাবনা আমার সিনেমাকেই ঘিরে, সিনেমাকে কেন্দ্র করেই।
বলিউডে এটাই কি আপনার প্রথম কাজ?
এর আগে আমি দুটি হিন্দি সিনেমা এডিট করেছি। সিনেমাগুলো হলো ‘জো ডুবা সো পার’ ও ‘এক্স : পাস্ট ইজ প্রেজেন্ট’।
সিনেমার জন্য গল্প কতটা গুরুত্বপূর্ণ?
গল্প সিনেমার জন্য খুবই গুরুত্বপূর্ণ। পৃথিবীর বিভিন্ন দেশে বিভিন্ন রকমের সিনেমা হয়, বিভিন্ন স্টাইলের হয়। সিনেমা কনসেপ্টের ওপরেও হয় আবার গল্পনির্ভর সিনেমাও হয়। সারা পৃথিবী জুড়ে যে গল্পনির্ভর সিনেমা হয় বেশিরভাগ মানুষ এই ধরনের সিনেমা দেখতেই পছন্দ করে। যার ভেতরে গল্প আছে, প্লট আছে।
বলিউড থেকে আরও কোনো কাজের প্রস্তাব পেয়েছেন?
হ্যাঁ! বলিউড বা টলিউড সব জায়গা থেকেই কাজের প্রস্তাব পেয়েছি। এবার শুধু চিত্রনাট্যকার বা গল্পকার নয়, পরিচালক হিসেবেও কাজ করব।
এখন কী করছেন?
এখন আমি পরপর কয়েকটা হিন্দি ও বাংলা ফিল্ম রাইটার-ডিরেক্টর হিসেবে কাজ করতে চলেছি। পাশাপাশি ফিল্ম রাইটার হিসেবেও কাজ করে চলেছি।
বাংলাদেশের নাটক-সিনেমা দেখেন কি না?
বাঙালি হিসেবে যেখানে বাঙালি আছে সেখানে মন ছুটবেই। বাংলাদেশকে আমার খুবই ভালো লাগে। তারেক মাসুদের ‘মাটির ময়না’ ভালো লেগেছে। অনেকবার দেখেছি। মাটির ময়নার তো ডিভিডি পর্যন্ত কিনেছি। দীপঙ্কর দীপনের 'অপারেশন সুন্দরবন' ও 'অন্তর্জাল'ও দেখেছি। খুব ভালো লেগেছে। মোস্তফা সরয়ার ফারুকীর ‘টেলিভিশন’ দেখেছি। এটি দেখে মনে হয়েছে, এই মানুষটা তো অন্যরকমভাবে সিনেমা বানায়। আমি অনেক মানুষকে এটি দেখতেও বলেছি। তারপর ফারুকীর ‘ডুব’ দেখেছি; তার ‘লেডিস অ্যান্ড জেন্টলম্যানটা’ ও ভালো লেগেছে। কয়েক বছর আগে বাংলাদেশে গিয়েছিলাম, তখন বেশ কয়েকটি নাটকও দেখেছি। ‘শিমু’ দেখেছিলাম ওটাও ভালো লেগেছে। ‘তাকদির’ ও প্রচণ্ড ভালো লেগেছে। এ ছাড়াও বাংলাদেশের প্রচুর সিনেমা-নাটক দেখেছি।
দেশ রূপান্তরকে সময় দেওয়ার জন্য আপনাকে অসংখ্য ধন্যবাদ।
আপনাকেও ধন্যবাদ।