চট্টগ্রামের বিভিন্ন উপজেলায় ভোটের লড়াইয়ে সরাসরি মুখোমুখি এখন আওয়ামী লীগ বনাম আওয়ামী লীগ। বিশেষ করে চেয়ারম্যান পদের মূল প্রতিদ্বন্দ্বীদের কেউ আওয়ামী লীগের বড় নেতা হলে তো কেউ মাঝারি নেতা। আবার কেউ আওয়ামী লীগ নেতা হলে, অন্য কেউ যুবলীগ নেতা। কেউ বর্তমান নেতা হলে, কেউ সাবেক নেতা। এ নিয়ে সব জায়গায় দ্বিধাবিভক্ত হয়ে পড়েছেন ক্ষমতাসীন দলের নেতাকর্মীরা। পাল্টাপাল্টি বক্তব্য আর প্রচারণায় সরগরম এখন গ্রাম-ওয়ার্ড, ইউনিয়ন সর্বত্র। এ পরিস্থিতিতে ভোটের দিনের নির্বাচনী পরিবেশ নিয়ে শঙ্কা প্রকাশ করছেন অনেকে।
তবে প্রশাসনের কর্মকর্তারা বলছেন, সরকারের চাওয়া হচ্ছে সুষ্ঠু ও শান্তিপূর্ণ নির্বাচন। তাই নির্বাচনে কাউকে কোনো ধরনের বিশৃঙ্খলা সৃষ্টি কিংবা জোর খাটানোর সুযোগ দেওয়া হবে না। এ ব্যাপারে আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীকে প্রয়োজনীয় দিকনির্দেশনাও দেওয়া হয়েছে।
বিভিন্ন এলাকা ঘুরে দেখা গেছে, ষষ্ঠ উপজেলা নির্বাচন ঘিরে ভোটের রাজনীতি এখন পুরোপুরি গ্রামমুখী। শহরে মিছিল-মিটিং না থাকলেও নির্বাচন সামনে রেখে দেশের অন্যান্য স্থানের মতো চট্টগ্রামের উপজেলাগুলোতেও এখন জমজমাট অবস্থা। রাস্তাঘাট, দোকানপাট, হাটবাজার সব জায়গায় আলোচনার মূলকেন্দ্রে উপজেলা নির্বাচন। বিশেষ করে প্রথম ধাপে যেসব উপজেলা নির্বাচন হচ্ছে সেখানে চলছে প্রার্থীদের ব্যাপক সংযোগ ও প্রচারণা। ভোটের জন্য উপজেলার একপ্রান্ত থেকে অন্যপ্রান্তে ছুটে চলছেন বিভিন্ন পদের প্রার্থী ও তাদের কর্মী-সমর্থকরা। প্রতীক বরাদ্দ পেয়ে দ্বিতীয় ধাপের উপজেলা নির্বাচনের প্রার্থীরাও প্রচারণা শুরু করে দিয়েছেন। তৃতীয় ধাপের প্রার্থীরাও ইতিমধ্যে মনোনয়নপত্র জমা দিয়েছেন।
চট্টগ্রাম আঞ্চলিক নির্বাচন অফিস সূত্র জাানায়, চট্টগ্রামের ১৫ উপজেলার মধ্যে ইতিমধ্যে চার ধাপে ১৩ উপজেলার নির্বাচনী তফসিল ঘোষণা করেছে নির্বাচন কমিশন। এর মধ্যে প্রথম ধাপে ৮ মে অনুষ্ঠিত হবে মিরসরাই, সীতাকু- ও সন্দ্বীপ উপজেলায় নির্বাচন। তিন উপজেলায় চেয়ারম্যান, ভাইস চেয়ারম্যান ও মহিলা ভাইস চেয়ারম্যান পদে ২৬ প্রার্থী প্রতিদ্বন্দ্বিতায় রয়েছেন। সন্দ্বীপ উপজেলায় ভাইস চেয়ারম্যান পদে একক প্রার্থী হওয়ায় ওই পদে নির্বাচন হচ্ছে না।
মাঠপর্যায়ে খোঁজখবর নিয়ে জানা যায়, মিরসরাই উপজেলায় চেয়ারম্যান পদে পাঁচজন প্রতিদ্বন্দ্বিতা করছেন। সবাই আওয়ামী লীগের বিভিন্ন পর্যায়ের নেতা। তবে তাদের মধ্যে মূল প্রতিদ্বন্দ্বী হিসেবে আলোচনায় রয়েছেন এনায়েত হোসেন নয়ন (কাপ-পিরিচ) ও শেখ মো. আতাউর রহমান (ঘোড়া)। তাদের মধ্যে এনায়েত হোসেন নয়ন আওয়ামী লীগের প্রেসিডিয়াম সদস্য ইঞ্জিনিয়ার মোশাররফ হোসেন ও তার ছেলে বর্তমান সংসদ সদস্য মাহবুবুর রহমান রুহেলের আস্থাভাজন হিসেবে এলাকায় পরিচিত। অন্যদিকে তার মূল প্রতিদ্বন্দ্বী শেখ মো. আতাউর রহমান চট্টগ্রাম উত্তর জেলা আওয়ামী লীগের সাধারণ সম্পাদক। এলাকার আওয়ামী লীগ নেতাকর্মী ও সমর্থকদের বেশিরভাগই এ দুজনের পক্ষে মাঠে রয়েছেন। এ উপজেলায় ভাইস চেয়ারম্যান পদে প্রার্থী রয়েছেন চারজন ও মহিলা ভাইস চেয়ারম্যান পদে তিনজন প্রতিদ্বন্দ্বিতা করছেন। তাদের সবাই আওয়ামী লীগ ঘরানার প্রার্থী হিসেবে এলাকায় পরিচিত।
সীতাকু- উপজেলায় পদে প্রতিদ্বন্দ্বিতায় রয়েছেন চট্টগ্রাম উত্তর জেলা আওয়ামী লীগের সদস্য মহিউদ্দিন আহমেদ রঞ্জু (দোয়াত কলম) ও বাঁশবাড়িয়া ইউনিয়ন আওয়ামী লীগের সভাপতি আরিফুল আলম চৌধুরী (আনারস)। ভাইস চেয়ারম্যান পদে নির্বাচন করছেন সলিমপুর ইউনিয়ন আওয়ামী লীগের সভাপতি গোলাম মহিউদ্দিন (উড়োজাহাজ) ও উপজেলা আওয়ামী লীগের সাংগঠনিক সম্পাদক জালাল আহমদ (টিউবওয়েল)। মহিলা ভাইস চেয়ারম্যান পদে প্রতিদ্বন্দ্বিতা করছেন সীতাকুন্ড মহিলা আওয়ামী লীগের সাধারণ সম্পাদক শাহীনুর আকতার (পদ্মফুল), উপজেলা শ্রমিক লীগের মহিলা সম্পাদক শামীমা আকতার ও মহিলা আওয়ামী লীগ নেত্রী হামিদা আকতার। চেয়ারম্যান পদে উভয় প্রার্থীর পক্ষে আওয়ামী লীগ নেতাকর্মীরা প্রচার প্রচারণায় অংশ নিলেও আরিফুল আলম চৌধুরী স্থানীয় সংসদ সদস্য এসএম আল মামুনের সমর্থন পাচ্ছেন বলে স্থানীয় লোকজনের সঙ্গে কথা বলে জানা গেছে।
সন্দ্বীপে ভাইস চেয়ারম্যান পদে একক প্রার্থী হওয়ার কারণে সেখানে শুধু চেয়ারম্যান ও মহিলা ভাইস চেয়ারম্যান পদে ভোট হচ্ছে। সেখানে চেয়ারম্যান পদে বর্তমান উপজেলা চেয়ারম্যান মো. মাঈন উদ্দিন (কাপ-পিরিচ)। তার সঙ্গে মূল প্রতিদ্বন্দ্বিতায় রয়েছেন সন্দ্বীপ উপজেলা আওয়ামী লীগের সাংগঠনিক সম্পাদক এসএম আনোয়ার হোসেন (আনারস)। এ ছাড়া আরও তিন প্রার্থী ফোরকান উদ্দিন (দোয়াত-কলম), শেখ মো. জুয়েল (হেলিকপ্টার) ও অ্যাডভোকেট নাজিম উদ্দিন (মোটরসাইকেল) রয়েছেন প্রতিদ্বন্দ্বিতায়। মহিলা ভাইস চেয়ারম্যান প্রার্থী হিসেবে রয়েছেন হালিমা বেগম শান্তা (ফুটবল) ও নাহিদা তানমী (কলস)।
প্রথম ধাপের পাশাপাশি দ্বিতীয় ধাপের উপজেলাগুলোতেও প্রতিদ্বন্দ্বী প্রার্থীদের আনুষ্ঠানিক প্রচার শুরু হয়ে গেছে ২ মে থেকে। এ ধাপে চট্টগ্রামের রাউজান, রাঙ্গুনিয়া, হাটহাজারী ও ফটিকছড়ি উপজেলায় ২১ মে ভোট হওয়ার কথা রয়েছে। এর মধ্যে রাউজানে সবকটি পদে একক প্রার্থী হওয়ার কারণে সেখানে নির্বাচন হচ্ছে না। রাঙ্গুনিয়ায় চেয়ারম্যান ও মহিলা ভাইস চেয়ারম্যান পদে একক প্রার্থী হওয়ার কারণে সেখানে শুধু ভাইস চেয়ারম্যান পদে নির্বাচন হচ্ছে। হাটহাজারী উপজেলায় চেয়ারম্যান পদে প্রতিদ্বন্দ্বিতা করছেন উপজেলা আওয়ামী লীগের সাধারণ সম্পাদক সোহরাব হোসেন চৌধুরী নোমান (ঘোড়া), উত্তর জেলা আওয়ামী লীগের যুগ্ম সম্পাদক ইউনুস গণি চৌধুরী (আনারস) ও উত্তর জেলা যুবলীগের সভাপতি এসএম রাশেদুল আলম (মোটরসাইকেল)।
ফটিকছড়ি উপজেলায় চেয়ারম্যান পদে সরাসরি প্রতিদ্বন্দ্বিতায় রয়েছেন উপজেলা আওয়ামী লীগের সাধারণ সম্পাদক নাজিম উদ্দিন মুহুরী (মোটরসাইকেল) ও উত্তর জেলা আওয়ামী লীগের সদস্য বখতেয়ার সাঈদ ইরান (আনারস)।
রাঙ্গুনিয়া উপজেলা ভাইস চেয়ারম্যান পদে প্রতিদ্বন্দ্বিতা করছেন উপজেলা যুবলীগের সাবেক সাধারণ সম্পাদক শেখর বিশ্বাস (উড়োজাহাজ) ও সাবেক যুগ্ম সম্পাদক ওমর ফারুক (তালা)।
চট্টগ্রাম উত্তর জেলা আওয়ামী লীগের সভাপতি এমএ সালাম দেশ রূপান্তরকে বলেন, এবারের উপজেলা নির্বাচনে আমাদের কোনো দলীয় প্রার্থী নেই। তাই যে যার ইচ্ছেমতো প্রার্থী হয়েছে, দলীয় নেতাকর্মীরাও যে যার পছন্দের প্রার্থীকে সমর্থন দিচ্ছে। সুষ্ঠু ও শান্তিপূর্ণ নির্বাচনের মধ্য দিয়ে ভোটারদের ভোটে জনপ্রিয় প্রার্থীরা নির্বাচিত হয়ে আসুক সেটাই আমরা চাই।