পরিবেশগত বিপর্যয় রোধে গণমাধ্যমের বিশাল ভূমিকা থাকলেও প্রভাবশালীদের তৎপরতায় গুরুত্বপূর্ণ এ ইস্যুতে গণমাধ্যমকর্মীদের নানা নীপিড়নের শিকার হতে হয়। অন্যদিকে যাদের কারণে এই বিপর্যয় তাদের বিষয়ে ব্যবস্থা নেওয়ার ক্ষেত্রেও রয়েছে সরকারের উদাসীনতা ও দুর্বলতা। এমন পরিস্থিতিতে গ্রহের বিপর্যয় রোধে পরিবেশের পাশাপাশি পরিবেশ সাংবাদিকতাকে সুরক্ষা দেওয়া এবং দখল ও দূষণকারীদের বিরুদ্ধে দৃষ্টান্তমূলক ব্যবস্থা নেওয়ার দাবি জানিয়েছেন জ্যেষ্ঠ সাংবাদিক, সম্পাদক, প্রকাশক ও পরিবেশবাদী ব্যক্তিরা।
‘গ্রহের জন্য গণমাধ্যম: পরিবেশগত সংকট মোকাবেলায় সাংবাদিকতা’ শীর্ষক আলোচনাসভায় এমন অভিমত উঠে এসেছে। দীর্ঘদিন ধরে পরিবেশগত বিপর্যয় ও এর পরিপ্রেক্ষিতে করণীয় নিয়ে আলোচনাসভার আয়োজন করে সম্পাদক পরিষদ (এডিটরস কাউন্সিল)।
আজ শনিবার জাতীয় প্রেস ক্লাবের তফাজ্জল হোসেন মানিক মিয়া মিলনায়তনে এ আলোচনাসভা অনুষ্ঠিত হয়। এতে পরিবেশ, জলবায়ুর নেতিবাচক প্রভাবের পাশাপাশি সাংবাদিকতার বিভিন্ন প্রতিবন্ধকতা ও সমস্যার বিষয়গুলো উঠে আসে। একইসঙ্গে বাংলাদেশ ব্যাংকে সাংবাদিকদের প্রবেশে নিষেধাজ্ঞার বিষয়টিতে কঠোর সমালোচনা করেন বক্তারা।
সম্পাদক পরিষদের সভাপতি, ডেইলি স্টার সম্পাদক মাহফুজ আনাম বলেন, ‘একটা আইন না হোক সরকারিভাবে একটা বিবৃতি হয়ে যাক যে, বস্তুনিষ্ঠ সাংবাদিকতা, তথ্যভিত্তিক যে ধরনের প্রতিবেদন হবে সেই সাংবাদিককে কেউ আঘাত করতে পারবে না। কেননা যারা অবৈধ বালু ব্যবসা, নদী দখল করে পরিবেশকে খেয়ে নিচ্ছে, এরা সুপ্রিতিষ্টিত ব্যক্তি। এখন তাদের বিরুদ্ধে যদি পরিবেশ সাংবাদিকতা করি তাহলে আমার বিরুদ্ধে অনেক ক্ষমতাধর ব্যক্তি দাঁড়িয়ে যাবে। আমাকে প্রতিহত করবে। আমি যদি একটা দ্ব্যর্থহীন সমর্থন সরকারের কাছ থেকে পাই তাহলে অন্য ইস্যু বাদই দেন, শুধু পরিবেশ সাংবাদিকতা করে আমরা দেশের পরিবেশের একটা বিরাট উন্নয়নের সহায়ক হিসেবে কাজ করতে পারব।’
তিনি বলেন, ‘ডিজিটাল নিরাপত্তা আইন চলে গেছে। কিন্তু এ আইনের ভুক্তভোগীরা এখনো জেলে। একটা আইন চলে গেল কিন্তু আইনের ভুক্তভোগীরা জেল খাটছে, আমি মনে করি এটা সামঞ্জস্যপূর্ণ নয়। আর সাইবার নিরাপত্তা আইন নিয়ে এখনো ভীতিকর অনেক কিছু আছে। এটা নিয়েও আলোচনার প্রয়োজন রয়েছে।
নিউজ পেপার্স ওনার্স অ্যাসোসিয়েশনের (নোয়াব) সভাপতি ও দৈনিক সমকালের প্রকাশক এ কে আজাদ প্রতিবেদক ও প্রকাশকদের বিভিন্ন সমস্যা, প্রতিবন্ধকতা ও সেলফ সেন্সরশিপের বিষয়টি তুলে ধরেন। তিনি বলেন, ‘পাঠক যে তথ্য চায় সেই সংবাদ প্রকাশ করতে পারি না। কেন লিখতে পারি না? যার জন্য পত্রিকায় বিজ্ঞাপন আসে না। আর বিজ্ঞাপন না আসলে কর্মীদের বেতন-বোনাস দেব কিভাবে। কোনো কোনো প্রতিবেদন লিখতে গেলে অনেক বড় জায়গা থেকে ফোন আসে।’
ভোরের কাগজ সম্পাদক ও জাতীয় প্রেস ক্লাবের সাধারণ সম্পাদক শ্যামল দত্ত বলেন, ‘পৃথিবীর অনেক সঙ্কটের মধ্যে পরিবেশগত বিপর্যয় এখন সামনে এসে দাঁড়িয়েছে। নিউইয়র্কে এখন প্রচণ্ড শীত থাকার কথা নয়। তেমনি লস এঞ্জেলসে মেঘাচ্ছন্ন আকাশ। অথচ থাকার কথা নির্মল আকাশ। দুবাইতে প্রচণ্ড ঝড়-তুফান। আর বাংলাদেশে ৪৮ ডিগ্রি তাপমাত্রা। এসবই মানবসৃষ্ট বিপর্যয়ের কারণ।’
তিনি বলেন, ‘পরিবেশগত সাংবাদিকতার সঙ্কটটা আসলে অন্য জায়গায়। ঢাকার চারপাশে জমি দখল কারা করছে, বুড়িগঙ্গা কারা দূষণ করছে তা আমরা জানি। যারা পরিবেশ ধ্বংস করছে তাদের অনেকেই আইন প্রণেতা। তারা অনেকেই প্রভাবশালী ব্যবসায়ী। আমরা লিখলেও এর প্রতিকার পাওয়া কঠিন। অনেকেই বলেন- আমাদের পরিবেশ দরকার নেই। উন্নয়ন দরকার। এই জায়গাটিতে আমাদের মতো উদীয়মান দেশগুলো কোনটা অগ্রাধিকার পাবে, এটি খুবই গুপুত্বপূর্ণ। আর উন্নত দেশগুলোর মধ্যে চীন এবং আমেরিকাকে যদি সংযত করা যায় তাহলে পৃথিবীর অর্ধেকই ঠিক হয়ে যাবে। কিন্ত সেটি পারা যাবে না। আসলে ফোকাস যেখানে দেওয়ার কথা সেখানে আমরা দিতে পারছি না।’
বাংলাদেশ পরিবেশ আইনবিদ সমিতির (বেলা) সভাপতি সৈয়দা রিজওয়ানা হাসান পরিবেশগত বিপর্যয় নিয়ে অনেক উদাহরণের মধ্যে সোমেশ্বরী নদীর বিষয়টি উল্লেখ করে বলেন, এই নদী একসময় খুব সুন্দর ও স্বচ্ছ একটা নদী ছিল। এটি ইজারা নেওয়া হয় ৮০ থেকে ৯০ কোটি টাকায়। এই নদী থেকে প্রতিদিন সাড়ে চার হাজার ট্রাক বালু তোলা হয়। তাহলে এই নদীর আর কি অবশিষ্ট থাকে। এখন এটা আমরা কিভাবে বলব। কারণ সরকার তো বলবে যে অনেক উন্নয়ন হচ্ছে এবং এর জন্য বালু লাগবে।’
পরিবেশগত বিপর্যয় রোধে গণমাধ্যমের প্রশংসা করে তিনি বলেন, ‘গণমাধ্যমে না এলে আমরা কিন্তু জানতেও পারতাম না কোথায় কি হচ্ছে। গণমাধ্যম কিন্তু সরকারেরও একটা সহযোগী সংগঠন। কিন্তু আমাদের সাংবাদিকরা, এমনকি পরিবেশ নিয়ে রিপোর্ট করেও ডিজিটাল নিরাপত্তা আইনে মামলা খেয়েছে।’
দৈনিক দেশ রূপান্তরের ভারপ্রাপ্ত সম্পাদক মোস্তফা মামুন বলেন, ‘পরিবেশগত সাংবাদিকতার বিষয়টি আমার মনে হয় খুব বেশি করে গণমাধ্যমে আসছে না। এর একটা বড় কারণ হচ্ছে এ নিয়ে আমাদের মধ্যে সচেতনতা কিছুটা কম। পরিবেশ নিয়ে সাংবাদিকতায়ও আগ্রহ অনেকের কম। এটাকে প্রধান বিট হিসেবে ধরে কাজ করতে এখনো কোনো গণমাধ্যমকে দেখিনি।’
তিনি বলেন, ‘একটি ভবন বা অন্য কিছু দখল করতে গেলে বাধাগ্রস্ত হওয়া বা সুরক্ষা আসে। কিন্তু নদী বা পরিবেশগত কিছু দখল হলে সেভাবে সুরক্ষা হয় না। কারণ এগুলোর মালিক কে? সবাই। সবাই মানে কেউ না। যে কারণে দায়িত্বশীলতার বিষয়টি আর সামনে আসে না। যার কারণে এ বিষয়টি সেকেন্ডারি হিসেবে গণ্য হয় এবং পরিবেশ এখন প্রতিশোধ নেওয়া শুরু করেছে।’
অনুষ্ঠানে প্রধান অতিথির বক্তব্যে তথ্য ও সম্প্রচার প্রতিমন্ত্রী মোহাম্মদ আলী আরাফাত বলেন, ‘বাংলাদেশে নদী দখল হয়েছে। এখনো যে দেশের আনাচে-কানাচে হয় না, এমন নয়। কিন্তু বর্তমান সরকারের আমলে আমরা নদী দখলমুক্ত করেছি। তবে, সবকিছু একেবারে শুদ্ধভাবে করে ফেলেছি এমন নয়। যতটুকু হয়েছে আমরা আশা করব অন্তত ততটুকু স্বীকৃতি দেবেন।’
তিনি আরো বলেন, ‘উন্নয়নের প্রয়োজন আছে। কিন্তু পরিবেশ ও প্রতিবেশকে সুরক্ষা দিয়েই সেই উন্নয়ন করতে হবে। উন্নয়ন মানে শুধু দালানকোঠা নয়। প্রতিটি উন্নয়নেই একটা ইতিবাচক প্রভাব আছে। উন্নয়ন করতে গিয়ে গাছ কাটা হলেও নতুন করে গাছ লাগিয়ে সেটার মধ্যে একটা ভারসাম্য রাখতে হবে। পরিবেশগত বিপর্যয় নিয়ে প্রতিবেদনরে জন্য প্রয়োজনীয় সব সমর্থন দেওয়া হবে।’
মাহফুজ আনামের সভাপতিত্বে, সম্পাদক পরিষদের সাধারণ সম্পাদক ও দৈনিক বনিক বার্তার সম্পাদক দেওয়ান হানিফ মাহমুদের সঞ্চালনায় অনুষ্ঠানে আরও উপস্থিত ছিলেন দৈনিক প্রথম আলো সম্পাদক মতিউর রহমান, ঢাকা ট্রিবিউনের সম্পাদক জাফর সোবহান, ইনকিলাব সম্পাদক এম এম বাহাউদ্দিন। আলোচনাসভায় প্রতিপাদ্যের ওপর সূচনা বক্তব্য দেন ডেইলি স্টারের প্রধান প্রতিবেদক পিনাকী রায়।