মার্কিন শিক্ষার্থীরা লাইভ জেনোসাইড দেখে জেগে উঠেছে

ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের আন্তর্জাতিক সম্পর্ক বিভাগের অধ্যাপক ড. ইমতিয়াজ আহমেদ। ফিলিস্তিনে প্রায় সাত দশক ধরে চলমান ইসরায়েলি আগ্রাসনে পশ্চিমা ভূমিকা সম্প্রতি প্রশ্নের মুখে পড়েছে। বিশেষ করে আমেরিকার শিক্ষার্থীরা মার্কিন নীতিকে প্রশ্নবিদ্ধ করেছে। এর প্রভাব পড়েছে ইউরোপের বিভিন্ন দেশে। এসব বিষয় নিয়ে তিনি কথা বলেছেন দেশ রূপান্তরের সঙ্গে। সাক্ষাৎকার নিয়েছেন সম্পাদকীয় বিভাগের সাঈদ জুবেরী

দেশ রূপান্তর : মার্কিন বিশ্ববিদ্যালয়গুলোতে শিক্ষার্থীদের ফিলিস্তিনপন্থি অবস্থান নিয়ে আপনার পর্যবেক্ষণটা কী?

ইমতিয়াজ আহমেদ : আমেরিকার বিশ্ববিদ্যালয়ে আন্দোলন শুরু হতেই তো ৬ মাস লেগে গেল, ইতিমধ্যে ৩৪ হাজারের বেশি ফিলিস্তিনি ইসরায়েলি হামলায় নিহত হয়েছে। এটা যদি ৭ অক্টোবর থেকেও ধরি...।

দেশ রূপান্তর : সেভাবে ধরলে তো প্রায় ৭০ বছর লাগল এভাবেও বলা যায় এ জন্যই তো এবারের ঘটনাকে নজিরবিহীন বলছেন অনেকে...। কারণটা কী?

ইমতিয়াজ আহমেদ : একটা কারণ হলো, এই প্রথমবার মানুষ একটা লাইভ জেনোসাইড দেখতে পেরেছে। সময় লাগার পেছনে বড় একটা কারণ হলো যে এত বছর ধরে যে দমননীতি চলে আসছে বা জেনোসাইড, হিউম্যান রাইট এবিউস এগুলো আমেরিকার মূল মিডিয়া কখনো তুলে ধরেনি এবং তাদের ন্যারেটিভগুলোতে যেন তারা বিশ্বাস করছিল না এসব ঘটছে, ইত্যাদি ইত্যাদি। এবারের পরিস্থিতিও পশ্চিমা মিডিয়ার ন্যারেটিভ দেখলে মনে হতে পারে সবকিছু ৭ অক্টোবর থেকে শুরু হয়েছে। কিন্তু, সেই ১৯৪৮ এর কনফারেন্সের কথা ধরলেও দেখা যাচ্ছে যে দশকের পর দশক ধরে প্রতিদিনই গাজাতে বা প্যালেস্টাইনিদের ওপর অন্যায় হয়ে আসছে। ওয়েস্টার্ন মিডিয়া তো বটেই, এমনকি আমি মনে করি আমাদের মেইনস্ট্রিম মিডিয়াও বড় আকারে কিন্তু ৭ অক্টোবরের ইস্যুটাকেই দেখছে।

দেশ রূপান্তর : সেটা বুঝতে পেরেছি, কিন্তু ৭ অক্টোবরের পরে যা ঘটেছে সেটা তো সবার নজরে পড়েছে...

ইমতিয়াজ আহমেদ : হ্যাঁ, হামাসের হামলার পর ইসরায়েলের যে আক্রমণটা, যা এখনো চলছে স্পষ্টতই জেনোসাইড। আইসিজে বলেছে যে হ্যাঁ, জেনোসাইড দেখা যাচ্ছে এবং যার জন্য তারা কেসটা চালিয়ে যাচ্ছে। সব মিলে বিষয়টা সামনে আসাতে ছাত্ররাও চুপ থাকতে পারেনি। এখানে শুধু ছাত্র না, এখানে ফ্যাকাল্টি মেম্বাররাও আছেন। কিন্তু সেটাও মেইনস্ট্রিম প্রকাশ করছে না, তাদের ধরন দেখে মনে হয় যে ছাত্ররাই কেবল আন্দোলন করছে। অথচ এখানে কলম্বিয়ার একাধিক প্রফেসর জড়িত। আমরা অনলাইনে দেখেছি কীভাবে এক প্রফেসরকে হেনস্তা করা হলো ওই এক মহিলা প্রফেসরকে পুলিশ চেপে ধরে মাটিতে ফেলে দিল।

দেশ রূপান্তর : মুভমেন্টের ফলে কি মিডিয়া ন্যারেটিভ চেঞ্জ হয়েছে বলে মনে করেন?

ইমতিয়াজ আহমেদ : না। পশ্চিমা মেইনস্ট্রিম মিডিয়ার ন্যারেটিভ একই ধরনের আছে। কিন্তু এবার যেটা হয়েছে অনলাইন টেকনোলজির মাধ্যমে মার্কিন ইয়াং ফোর্স লাইভ দেখতে পেরেছে যে একটা জেনোসাইড সংঘটিত হচ্ছে। সেটা মানুষের জন্য হজম করা খুব ডিফিকাল্ট। মানুষ তো সে, হতে পারে সে খ্রিস্টান বা মুসলিম বা ইহুদি কিন্তু সবার ওপরে তো সে মানুষ। এবং সেটাই হয়েছে। সেখানকার তরুণরা মেইনস্ট্রিম নিউজের ওপরে আর ভরসা রাখেনি বরং সরাসরিভাবে তারা এই লাইভ জেনোসাইডটা দেখেছে সোশ্যাল মিডিয়াসহ নানা টেকনোলজির মাধ্যমে।

দেশ রূপান্তর : পশ্চিমা মেইনস্ট্রিম মিডিয়া কি তাহলে ফেইল করেছে?

ইমতিয়াজ আহমেদ : মেইনস্ট্রিম মিডিয়া ফেইল করেছে; আমাদের মেইনস্ট্রিম মিডিয়াও ফেইল করেছে। আমরা যারা গবেষণা করি, আমরা তো আর মেইনস্ট্রিম মিডিয়ার ওপর ডিপেন্ড করি না। বিভিন্ন অল্টারনেটিভ মিডিয়া, সোশ্যাল মিডিয়া থেকে পাচ্ছি। এই যে ইউক্রেনে যা কিছু হচ্ছে এগুলোর সব ইনফরমেশন পাচ্ছি আমরা অল্টারনেটিভ মিডিয়া থেকে। মেইনস্ট্রিম মিডিয়া একচুয়েলি করপোরেট ইন্ডাস্ট্রির মধ্যে পড়ে গেছে, তার দ্বারা আর সম্ভব না, তার আর কিছু করারও নেই। মেইনস্ট্রিম এখনো কাজ চালিয়ে যাচ্ছে যেহেতু তাদের পয়সা টয়সা আছে। যেকোনো ঘটনার লাইভ দেখাটা এটা বড় আকারের পরিবর্তন করে দিয়েছে।

দেশ রূপান্তর : মার্কিন বিশ্ববিদ্যালয়গুলোতে যে মুভমেন্ট হচ্ছে...

ইমতিয়াজ আহমেদ : এ ক্ষেত্রে উল্লেখযোগ্য হচ্ছে বড় বড় যে ৮টি বিশ্ববিদ্যালয় আছে সেখানে, যাদের আইভি লিগ (ওাু খবধমঁব) বলা হয় এইসব বিশ্ববিদ্যালয়ের মধ্যেই আন্দোলন শুরু হয়েছে। আইভি লিগের বাইরের বিশ্ববিদ্যালয়ও আছে, কোনো সন্দেহ নেই কলম্বিয়ায় এমনকি হার্ভার্ডেও আমরা দেখলাম। এর একটা বড় কারণ হলো শিক্ষার্থীরা জেনোসাইড নিজেরা প্রত্যক্ষ করে এখন জানতে চাচ্ছে কার কার বিশ্ববিদ্যালয় এই গণহত্যার সঙ্গে জটিলভাবে জড়িত। জটিলভাবে, কারণ বিশ্ববিদ্যালয় তো আর সরাসরি সেখানে বোমা ফেলছে না বা তেমন কিছু। তাহলে প্রশ্ন যে কেমন করে বিশ্ববিদ্যালয় এতে জড়িত? যেহেতু এগুলো প্রাইভেট ইউনিভার্সিটি, এরা যে এনডাউমেন্ট ফান্ড পায় সেটা তারা ব্যবসায় লাগায়, তারা শেয়ার কিনে। আইভি লিগসহ বেশিরভাগ বিশ্ববিদ্যালয়গুলো, শেয়ার কেনে এবং দেখা যাচ্ছে যে তারা ওই ধরনের কোম্পানির শেয়ারই কিনছে যেখানে প্রোফিট মার্জিন বেশি আর জানা যাচ্ছে যে ওই কোম্পানিগুলো নানাভাবে ইসরায়েলের সঙ্গে ইনভেস্টমেন্টে জড়িত। সেখানে আমরা দেখছি যে আর্মস উৎপাদন ও সরবরাহকারী নামি-দামি সব কোম্পানি আছে, যাদের অস্ত্র ও টাকা স্যাটেলার কলোনিয়ালিজম থেকে শুরু করে আন ল-ফুল কাজে ব্যবহার হয়, তাদের ব্যাংকও আছে। এ কারণে মার্কিন ছাত্ররা বলছে, আমি যেখানে পড়ি, জ্ঞানচর্চা করি সেই বিশ্ববিদ্যালয় যদি  জেনোসাইডের সঙ্গে জড়িত থাকে তাহলে তুমি আমাকে কী শিক্ষা দিচ্ছো? এই জায়গায় হলো তাদের প্রতিবাদ।

দেশ রূপান্তর : আমাদের দেশের ইউনিভার্সিটিগুলোর ক্ষেত্রে শিক্ষার্থীদের আন্দোলন-সংগ্রামে পুলিশি হস্তক্ষেপের বিষয়ে পশ্চিমা উদাহরণ টানা হতো। কিন্তু এবার আমেরিকার শিক্ষার্থীদের আন্দোলনও পুলিশ দিয়ে দমন করতে দেখলাম, শিক্ষকরাও রেহাই পাচ্ছেন না...?

ইমতিয়াজ আহমেদ : আমাদের ছাত্ররা যেকোনো ঘটনা হলে কিন্তু রাস্তায় নেমে পড়ে এবং তারা প্রচুর রোড মার্চ করে। কিছু না হলেও তারা অন্তত মানববন্ধন করে। কিন্তু আমরা তো হার্ভার্ড বা অন্যান্য বিশ্ববিদ্যালয়তে মানববন্ধনও দেখি না। নিকট অতীতে ব্ল্যাক কমিউনিটি নিয়ে মাঝে মধ্যে তাদের সরব হতে দেখেছি, সেটাও বিশ্ববিদ্যালয় নয়, কমিউনিটি করেছে। কিন্তু এবারের বিষয়টা সমস্যা হয়ে দাঁড়িয়েছে, কারণ শিক্ষক-শিক্ষার্থীরা নেমে এসেছে। এবং মনে রাখতে হবে এইসব বিশ্ববিদ্যালয়ে কিন্তু নন আমেরিকানরাও পড়ান এবং পড়েন। তারা পৃথিবীর বিভিন্ন দেশ থেকে আসেন। তাদের কাছেও এটা অস্বস্তিকর যে নামটাম শুনে ভালো হিসেবে যেখানে তারা জ্ঞানচর্চা করতে এসেছেন, সেই বিশ্ববিদ্যালয় জড়িত জেনোসাইডের সঙ্গে। সেই জায়গায় প্রতিবাদটা শুরু হয়েছে, তারা ডিজইনভেস্ট করাতে চাচ্ছে। এটা হলো বড় একটা বিষয়। আর বাংলাদেশের সমস্যা, বাংলাদেশের জনগণই কিন্তু হয় আন্দোলনের মাধ্যমে বা রাজনীতির মাধ্যমে পরিবর্তন করেছে এবং পরিবর্তন যদি না করতে চায় করেনি। সে হিসেবেই এখানে আন্দোলন-সংগ্রাম দমনে পুলিশি হয়রানি যদি হয় সেসব আমাদের জনগণকেই থামাতে হবে, তাদেরই জেগে উঠতে হবে।

দেশ রূপান্তর : এই মুভমেন্ট কি মার্কিন এস্টাবলিশমেন্টে কোনো প্রভাব ফেলবে?

ইমতিয়াজ আহমেদ : এখন পলিটিশিয়ানরা কী করবেন সেটা দেখার বিষয়। কারণ ডেমোক্র্যাট বা রিপাবলিকান দুজনই তো এসবের সঙ্গে জড়িত এবং তারা চলে ইসরায়েলি লবি দ্বারা। তারা ইসরায়েলের পৃষ্ঠপোষকতায় পলিটিশিয়ান হয়েছে। এখানেই হলো সমস্যা। এখন এটাকে কতখানি পরিবর্তন করতে পারবে সেটা দেখার বিষয়। তবে কোনো সন্দেহ নেই যে এটা একটা বড় আন্দোলন এবং আমি মনে করি সাম্প্রতিক ৩৪ হাজার মানুষ মরার আগেই সেটা শুরু হওয়া উচিত ছিল। তবে দেরিতে হলেও শুরু হয়েছে, এখন দেখা যাক এই ইয়াং ফোর্স কীভাবে এটাকে মোবিলাইজ করতে পারে।

দেশ রূপান্তর : অনেকে বলছেন আন্দোলনকারীরা ওই অর্থে লিবারেল র‌্যাডিকেল ফোর্স না, তারা আসলে আরব অভিবাসী। আপনার কী অবজারভেশন?

ইমতিয়াজ আহমেদ : না, ওটা ঠিক হবে না। এখানে বড় আকারে জিউস ছাত্র আছে, বিশাল আকারে। এটাও কিন্তু মেইনস্ট্রিম মিডিয়ার ফলে ছড়াচ্ছে। মেইনস্ট্রিম এটা বলবে কারণ তারা তো ইসরায়েলি লবির পকেটে। মানে এবার কিন্তু পশ্চিমা মিডিয়ার মুখোশটা খুলে গেছে।

দেশ রূপান্তর : আসলে পশ্চিম বা ওয়েস্টার্ন ন্যারেশন যেভাবে তৈরি। ধরেন, হাইডেগারের নাৎসিবাদ থেকে শুরু করে এখন যে ইহুদিবাদের কথা বলা হচ্ছে এই বিষয়ে আপনার মন্তব্য কী?

ইমতিয়াজ আহমেদ : অ্যাবসলিউটলি, এটা সমস্যা। জার্মানিতে নাৎসিবাদের সময় জার্মান জনগণ কিন্তু হিটলারের সঙ্গে ছিল মনে রাখতে হবে, সেটা বড় আকারেই ছিল। যখন হিটলার যুদ্ধে হেরে গেল বা হারা শুরু করল তখন আমরা কিছু কিছু ভিন্নতা  দেখলাম। কিন্তু বড় আকারে হিটলারের পেছনে ছিল বিশাল জনগণ। এখনো কিন্তু ইসরায়েলে জরিপ অনুযায়ী, সেখানে নেতানিয়াহুর পক্ষে বড় আকারের জনসমর্থন আছে। এটাও খেয়াল রাখতে হবে। এবং এগুলো ইন্টারেস্টিং।

দেশ রূপান্তর : আসলে ইউরোপের দার্শনিক চিন্তাভাবনাতে গোড়াতেই একটা বর্ণবাদী সমস্যা রয়ে গেছে কি না, তেমন আলাপ উঠছে জোরেশোরে।

ইমতিয়াজ আহমেদ : ইউরোপেরই একাধিক দার্শনিক এই জিনিসটা তুলে ধরেছেন। কিন্তু রাজনীতির মধ্যে এটা বড় প্রভাব ফেলেনি এবং আমেরিকার রাষ্ট্রের মধ্যে তো আরও পড়েনি। কারণ ইসরায়েল হলো এই লাস্ট কলোনিয়াল সেটেলারদের তৈরি একটা রাষ্ট্র। সাউথ আফ্রিকায় চেষ্টা করেছিল কিন্তু ওটা পারেনি। ইসরায়েলে সবাই আসলে ইউরোপিয়ান, চেহারা দেখলেই তো বোঝা যায়। জিউস নাম দিয়ে এখানে একটা কাঠামো তৈরি করছে। জো বাইডেন একবার বলেছিলেন যে, ইসরায়েল না থাকলেও আমাদের ইনভেন্ট করতে হতো মিডলইস্টে আমাদের স্বার্থ রাখার জন্য। তো এটাই হলো তাদের মানসিকতা।

দেশ রূপান্তর : এই অবস্থায় মার্কিন বিশ্ববিদ্যালয়কেন্দ্রিক আন্দোলন তো ইউরোপের বিভিন্ন দেশের শিক্ষার্থীদের মধ্যে ছড়িয়ে পড়ছে। এর ফল কী হবে মনে করেন?

ইমতিয়াজ আহমেদ : এটা কতদিন তারা অ্যালাউ করবে নাকি অন্যদিকে মোড় নেবে সেটাই দেখার বিষয়। প্রতিপক্ষ কিন্তু একটা না। ডেমোক্র্যাটরা গিয়ে রিপাবলিকানরা এলে যে সমস্যার সমাধান হবে তা নয়। কারণ তারা উভয়েই ইক্যুয়ালি ইসরায়েলের এবং জেনোসাইডের পক্ষে। সেই জায়গায় এই আন্দোলন কতখানি বাড়বে সেটাই বড় কথা। কারণ প্রতিপক্ষ কিন্তু বিশাল এবং শক্তিমান।

দেশ রূপান্তর : গাজা ইস্যুতে আমেরিকায় আন্দোলন শুরুর পর থেকে বিশেষ করে পোস্ট এডিটরিয়াল যা কিছু ছাপছি, সবই অনুবাদ এবং সেসব ওয়েস্টার্ন মিডিয়া ও সম্প্রতি কিছু কিছু মধ্যপ্রাচ্য নির্ভর। কিন্তু গত ৫৩ বছরে ওয়ার্কার ছাড়াও বড় সংখ্যায় শিক্ষার্থীরা যেমন আমেরিকায় গিয়েছেন, অনেকে সেখানে পড়াতেও গিয়েছেন, পড়াচ্ছেন। কিন্তু এই ইস্যুতে তাদের মতামত, ব্যাখ্যা, পর্যবেক্ষণ আমরা সেভাবে পাচ্ছি না। কেন?

ইমতিয়াজ আহমেদ : পাচ্ছি না, তারা জানে যে কথা বললে চাকরি চলে যাবে। এটা না বোঝার কী আছে! আমাদের যেসব বিপ্লবী লেখক আছে, এবং আমাদের এই মেইনস্ট্রিম নিউজ পেপারও তাদের বিশাল স্পেস দেয় তারা তো সবাই চুপ এখন। কেউ বলছেও না যে তোমরা চুপ কেন? চুপ কেন না বোঝার কী আছে? তারা হয়তো ঘুরেফিরে বলবে যে, আমি তো বাংলাদেশ নিয়ে কাজ করি। আরে, তুমি থাকছ আমেরিকায়; পড়ছ বা পড়াও আমেরিকায়। তুমি তাহলে কাদের পড়াচ্ছো এতদিন ধরে? তারা একটা ডাবল স্ট্যান্ডার্ড রোল প্লে করছে। এদের সিরিয়াসলি কেন যে নেয় আমি জানি না। এখানে অনেকেই তো আমারই বন্ধু, অনেককে আমি চিনি। এরা সবসময়ই একটা অ্যাটেনশন চাওয়ার ব্যাপার নিয়ে থাকে। স্কলার হিসেবে যতখানি সিরিয়াসনেস থাকার কথা তা আছে বলে আমার মনে হয় না। এখন তো সবাই চুপ। কোনো লেখা দেখেছেন? তাদের ফেসবুকেও দেখবেন কোনো পোস্ট নেই এই বিষয়ে। আমি আরও বলতে পারি, আমি তো এসব আন্দোলন, ভায়োলেন্স ম্যাপিং করি সেখানে প্রথম দুই সপ্তাহ এই বাংলাদেশের সিভিল সোসাইটির নামিদামি যারা আছে একেবারে চুপ ছিল। মানে একদম চুপ ফর ফার্স্ট টু উইকস। তারপর একজন দুজন পাওয়া গেল, যখন লন্ডনে বিশাল মাত্রায় ডেমোনেস্ট্রেশন হলো তখন তারা ফেসবুকে ছবিটবি দেওয়া শুরু করল। এখন আবার কেউ কেউ ফিলিস্তিনি কেফিয়া পরেও ছবিটবি দিচ্ছে ইদানীং। আমি তো মনে করি, আমাদের প্রধানমন্ত্রী এক্ষেত্রে অনেক এগিয়ে আছেন, বিলিভ ইট অর নট। প্রধানমন্ত্রী এমনকি বিদেশে যখন যান স্পষ্টই বলেন, ‘এটা জেনোসাইড’। এখন পর্যন্ত বিশ্ববিদ্যালয়ের কোনো টিচারের ভালো একটা লেখা দেখেছেন? শিক্ষক সমিতিও এটা নিয়ে বিবৃতি দিচ্ছে না। এরা সবাই প্রধানমন্ত্রীর ওপরে ছেড়ে দিয়েছে যে প্রধানমন্ত্রীর ওপর দিয়ে যাক! চিন্তা করেন একবার। ভেরি আনফরচুনেট। কারণ এদের বেশিরভাগ ছেলেমেয়ে বিদেশে থাকে।

দেশ রূপান্তর : বাম ও সেকুলারদের মধ্যে ইসলামিস্ট হয়ে যাওয়ার একটা ভয় আছে মনে হয়, আবার হামাস নিয়ে তাদের একটা দ্বিধা দেখতে পাই।

ইমতিয়াজ আহমেদ : কিন্তু জেনোসাইড তো জেনোসাইডই। আর হামাস না হওয়ার  পেছনে তো কোনো কারণ নেই পঞ্চাশ, ষাট বছর ধরে যদি অত্যাচার চলতে থাকে। আজ যদি পাকিস্তান ৫০ বছর ধরে বাংলাদেশে অত্যাচার করত তবে কি এখানে হামাস হতো না? হামাস তো আর আকাশ থেকে আসেনি। হামাস ৭ অক্টোবর যেখানে যেখানে হামলা করেছে, মনে রাখতে হবে সে সবই কিন্তু ফিলিস্তিনিদের জমি, ইসরায়েল যেটা দখল করে আছে। এইটা কিন্তু কেউ বলে না। বুঝতে পারছি হয়তো সেখানে সিভিলিয়ান মারা গেছে। আজ বাংলাদেশের ভূমি যদি দখল হতো আমি কি মুক্তিযোদ্ধা হয়ে খালি গোলাপ ফুল নিয়ে বসে থাকব? আমার কথা হচ্ছে তারা এতদিন ওয়েট করল কেমন করে?

দেশ রূপান্তর : সার্বিকভাবে ফিলিস্তিন-ইসরায়েলের সাম্প্রতিক ফেজটাকে কীভাবে দেখছেন? টু-স্টেট সমাধানের কি কোনো সম্ভাবনা আছে?

ইমতিয়াজ আহমেদ : জিনিসটা হলো, একটা জাতিকে বা একটা গোষ্ঠীকে জেনোসাইড করে ফেলা এই শতাব্দীতে কঠিন। এটা আগের শতাব্দীতে, বহু আগের শতাব্দীতে হয়েছে; ন্যাটিভ ইন্ডিয়ানদের, কানাডিয়ান ইন্ডিয়ানদের তো সব জেনোসাইড করেই ভূমি দখল করা হয়েছিল, তাই না? ওই একই কাঠামোর মধ্যেই তো ফিলিস্তিনিদের জাতিগতভাবে নির্মূলের মাধ্যমে ইসরায়েল এই কলোনিয়াল সেটেলমেন্ট করতে চাচ্ছে। কিন্তু এটা এই শতাব্দীতে এসে সম্ভব না। আমাদের একটু ওয়েট করতে হবে, কেননা এবার জিউসরাও জেগে উঠেছে এটাই হলো সবচেয়ে বড় বিষয়।

আর এই সমস্যার সমাধান কিন্তু ইউরোপের জনগণ, আমেরিকার জনগণ, কানাডিয়ান, অস্ট্রেলিয়ান এদের ওপরেই নির্ভর করছে। তাদের ওপরেই সবচেয়ে বড় রেসপনসিবিলিটি। আরবরা যদি পারত তাহলে তো আগেই পারত। কিন্তু আরব রাষ্ট্রগুলোর ক্ষমতাসীনরা আমাদের এলিটদের মতোই এক পা বাইরে। ওখানের এলিট আর আমাদের এলিটের মৌলিক পার্থক্য নেই। তাদের ছেলেমেয়েরা সব সুখ-সুবিধা নিচ্ছে, ব্যবসা-বাণিজ্য করছে। বরং আরব জনগণ রাস্তায় নেমেছে। আমার কথা হচ্ছে, বড় আকারে যারা আসলেই পরিবর্তন করতে পারবে সেটা হলো আমেরিকার জনগণ এবং ইউরোপের জনগণ। সেই জায়গায় একটা পরিবর্তন এই ইয়াং ফোর্স শুরু করেছে। এখন তারা এটাকে কতখানি এগিয়ে নিতে পারবে, এইটা দেখার বিষয়। ভরসা হলো এই যে, তারা জেগে উঠেছে।

দেশ রূপান্তর : ভিয়েতনাম যুদ্ধের সময় আমেরিকায় যে যুদ্ধবিরোধী সমাবেশগুলো হয়েছিল তার নস্টালজিয়ায় ভুগছেন অনেকে। কিন্তু ওই ষাটের দশকের যুদ্ধবিরোধীদের স্পেস দেওয়ার মতো লিবারেল গণমাধ্যম ছিল, রাজনীতিও ছিল অন্যরকম। এখন তো মিডিয়া ও বিশ্বরাজনীতি সে রকম নেই। এইক্ষেত্রে আসলে কী ভবিষ্যৎ, চেঞ্জটা তাহলে আসবে কীভাবে?

ইমতিয়াজ আহমেদ : এখানে ভিয়েতনামের সঙ্গে বড় একটা পার্থক্য হলো এই যে, ওই আমেরিকানরা জেগে উঠেছিল যখন মার্কিন সৈন্যদের ডেডবডিগুলো দেশে আসা শুরু করল। কিন্তু গাজা থেকে তো কোনো আমেরিকানের ডেডবডি আসছে না, তাই না? এটা খেয়াল রাখতে হবে। এবার মানুষ লাইভে দেখছে যে সেখানে মানুষকে নির্বিচারে মেরে ফেলা হচ্ছে এইটা মানুষকে মানে ইয়াং ফোর্সদের প্রচ-ভাবে নাড়া দিয়েছে। হার্ভার্ডের বাজেট তো বাংলাদেশের বাজেটের চেয়েও বেশি। এখান থেকেই তারা ফেলোশিপ দেয়, যারা পড়ান তাদের বেতন দেয়। তাদের ওই পয়সাটা আসে কোথা থেকে? ছাত্ররা এবার তাদের মুখোশ খুলে দিয়েছে। কিন্তু এর প্রতিপক্ষ বিশাল। ফলে কতখানি কী করা যাবে বা হবে- সেটা দেখার বিষয়। কিন্তু মুখোশটা খুলল, আশা করি আস্তে আস্তে হয়তো আরও খুলবে। 

দেশ রূপান্তর : সময় দেওয়ার জন্য আপনাকে অনেক ধন্যবাদ।

ইমতিয়াজ আহমেদ : আপনাকেও ধন্যবাদ।