গাজায় ইসরায়েলের নির্মম হামলা বন্ধে বিক্ষোভ করছে পশ্চিমা বিশ্বের শিক্ষার্থীরা। সে তুলনায় অনেকটা নীরব আরব অঞ্চল। বিভিন্ন সূত্র অবলম্বনে কারণ জানাচ্ছেন সালাহ উদ্দিন শুভ্র
সাত মাস আগে ফিলিস্তিনের গাজায় ইসরায়েল যে হামলা শুরু করেছিল, বিশ্ব জুড়ে তার বিরুদ্ধে তীব্র প্রতিবাদ জানাচ্ছে শিক্ষার্থীরা। যুক্তরাষ্ট্রের কলম্বিয়া বিশ্ববিদ্যালয়ে এপ্রিলের মাঝামাঝি সময়ে প্রথম বিক্ষোভ করে সেখানকার শিক্ষার্থীরা। পরে তা ছড়িয়ে পড়েছে পশ্চিমা বিশ্বের অন্যান্য দেশেও। এসব বিক্ষোভে ধরপাকড়, বহিষ্কার, সংঘর্ষ সবই হচ্ছে। তবু থামানো যাচ্ছে না। বরং যুক্তরাষ্ট্রের বাইরে এ বিক্ষোভ ছড়িয়ে পড়েছে। তুলনায় নীরব আরব দুনিয়া। সেখানকার কিছু কিছু বিশ্ববিদ্যালয় ক্যাম্পাসে নামে মাত্র বিক্ষোভ হয়েছে। অথচ ফিলিস্তিন ইস্যুতে তাদেরই বেশি বিক্ষুব্ধ হওয়ার কথা। কেন এ ধরনের চিত্র, তা নিয়ে অনুসন্ধানী প্রতিবেদন প্রকাশ করে বার্তা সংস্থা রয়টার্সসহ কিছু আন্তর্জাতিক সংবাদমাধ্যম। তারা লিখেছে, আরব বিশ্বের কর্র্তৃত্ববাদী সরকার, অনিশ্চিত অর্থনীতি ও জটিল রাজনীতির কারণে ওই অঞ্চলে বিক্ষোভের দেখা পাওয়া যাচ্ছে না। আমেরিকান বিশ্ববিদ্যালয় ক্যাম্পাসে ক্ষোভ দেখে ফিলিস্তিনিরা সন্তুষ্ট হলেও আরব দেশগুলোর নীরবতায় তাদের মনে কষ্টও রয়েছে।
ভিন্ন চিত্র
আরব বিশ্বে প্রতিবাদ না হওয়ার বিষয়ে রাফাহয় আশ্রয় নেওয়া আহমেদ রেহিক রয়টার্সকে বলেন, আমরা প্রতিদিন সোশ্যাল মিডিয়ায় যুক্তরাষ্ট্রে হওয়া প্রতিবাদগুলো দেখি, প্রশংসা করি। তবে দুঃখও আছে যে, আরব এবং মুসলিম দেশগুলোতেও প্রতিবাদ হচ্ছে না। গাজার সঙ্গে একাত্মতা প্রকাশের জন্য শিক্ষার্থীদের ধন্যবাদ। তাদের বার্তা আমাদের কাছে পৌঁছেছে। কলম্বিয়ার শিক্ষার্থীদের ধন্যবাদ, ধন্যবাদ ছাত্রদের। রয়টার্স জানাচ্ছে, মধ্যপ্রাচ্য বা আরব দেশগুলোর বিশ্ববিদ্যালয় ক্যাম্পাস এবং রাস্তায় তুলনামূলক নীরব, এর কারণ দেশগুলোতে কর্র্তৃত্ববাদী সরকার শাসন করছে। যে কোনো ধরনের বিক্ষোভ এসব দেশের সরকারকে ক্ষুব্ধ করবে। পাশাপাশি হামাস এবং ইরান সমর্থক বিভিন্ন গোষ্ঠী এসব দেশে সক্রিয়। যে কোনো ধরনের বিক্ষোভ বা অচলাবস্থার সুযোগ তারা নিতে পারে। এমন সন্দেহও বিক্ষোভ তৈরিতে নিরুৎসাহিত করছে শিক্ষার্থীদের।
রয়টার্স জানাচ্ছে, রাষ্ট্রীয় অনুমোদন ছাড়া আরব নাগরিকদের প্রতিবাদ কঠোর পরিণতি বরণ করতে পারে। তবে এখানে একটি পরিষ্কার কারণ রয়েছে। সেটি হলো, যুক্তরাষ্ট্র গাজায় হামলার জন্য সরাসরি ইসরায়েলকে সমর্থন এবং অস্ত্র দিচ্ছে। এমন একটি গণহত্যায় সমর্থন, সহযোগিতা দেওয়ার কারণে দেশটির শিক্ষার্থীরা বিক্ষুব্ধ হয়ে উঠেছে। আর আরব দেশগুলো ইসরায়েলের এ নৃশংস হামলার কূটনৈতিক বিরোধিতা করে আসছে। তারা ইসরায়েলের অভিযানের কঠোর সমালোচনা করছে। মরক্কো থেকে ইরাক পর্যন্ত আরব দেশগুলো ধারাবাহিকভাবে ইসরায়েলের কর্মকাণ্ডে ক্ষোভ প্রকাশ করেছে। এসব দেশের সরকার গাজার বিপর্যস্ত বাসিন্দাদের সঙ্গে একাত্মতা প্রকাশ করেছে। গত মাসে এ অঞ্চল জুড়ে রমজান উদযাপনে তারা জাঁকজমক বর্জন করে। এ ছাড়া ফিলিস্তিনিদের সমর্থনে কিছু সমাবেশ করেছে। কোথাও কোথাও পাল্টা হামলা এবং প্রতিরোধ গড়ে তোলা হয়েছে। যেমন ইরান গত মাসে ইসরায়েলে ড্রোন হামলা চালিয়েছে, হুতিরা লোহিত সাগরে পণ্যবাহী জাহাজ চলাচল বন্ধ করে দিয়েছে। তাদের সঙ্গেও ইসরায়েল সমর্থিত দেশগুলোর কিছু মাত্রায় সংঘর্ষ হয়েছে। সামাজিক মাধ্যমে গাজাকে সমর্থন ছাড়াও যুদ্ধের ভয়াবহতা তুলে ধরতে আরববাসী সক্রিয় ছিল। যে কারণে রাস্তায় নেমে লাগাতার বিক্ষোভের উদ্দীপনা তারা হয়তো খুঁজে পাচ্ছে না। তবে অনেকে মনে করছে, পশ্চিমের সঙ্গে যদি এখন আরব বিশ্বও রাস্তায় নামে, তাহলে গাজায় ইসরায়েলি হামলা বন্ধে কার্যকর ভূমিকা রাখতে পারত। গাজা থেকে বাস্তুচ্যুত সুহা আল-কাফারনা রয়টার্সকে যেমনটি বলেছেন, আমি আরব ছাত্রদের বলব, আমেরিকানরা যা করেছে তাই করতে। আমেরিকানদের চেয়ে আমাদের জন্য তাদের আরও বেশি কিছু করা উচিত ছিল।
জটিল রাজনীতি
রয়টার্স জানাচ্ছে, যেমন মিসরে জনগণের সব ধরনের বিক্ষোভ নিষিদ্ধ করে রেখেছে দেশটির প্রেসিডেন্ট আবদেল ফাত্তাহ আল সিসি। কারণ তার ভয়, যে কোনো বিক্ষোভ সরকারবিরোধী রূপ নিতে পারে। গত বছর অক্টোবরের শুরুতে ইসরায়েলের হামলার বিরুদ্ধে রাষ্ট্র অনুমোদিত বিক্ষোভ হয়। তখন বিক্ষোভকারীদের কেউ কেউ সরকারবিরোধী স্লোগান দেয়। তবে কায়রোর আমেরিকান ইউনিভার্সিটিতে নিরাপত্তা বাহিনী হস্তক্ষেপের সম্ভাবনা কম। সেই ক্যাম্পাসে কিছু বিক্ষোভ হয়েছেও। সেখানকার একজন ছাত্র কর্মী নাম প্রকাশ না করার অনুরোধে রয়টার্সকে বলেন, বিক্ষোভের জন্য যে কোনো পরিণতি ভোগ করার আশঙ্কায় তারা রয়েছে। তার মন্তব্য, এখানে গ্রেপ্তার হওয়া আর যুক্তরাষ্ট্রে গ্রেপ্তার হওয়া এক নয়। মিসরের গ্রেপ্তার সম্পূর্ণ আলাদা, অনেক ভয়ের; যা অনেককে রাস্তায় নামতে বাধা দেয়।
লেবাননের চিত্র আবার ভিন্ন। সেখানে বছরের পর বছর রাজনৈতিক ও অর্থনৈতিক সংকট চলছে। একজন তরুণের কাছে পড়াশোনায় সাফল্য ব্যক্তিগতভাবে গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠেছে। তাদের পক্ষে বিক্ষোভ করা আরও কঠিন। বৈরুতের ক্যাম্পাসে ফিলিস্তিনের পক্ষে বিক্ষোভ বিষয়ে রয়টার্স বেশ কয়েকজন শিক্ষার্থীর মন্তব্য নিতে চাইলে কারা অস্বীকার করে। তাদের আশঙ্কা, বিশ্ববিদ্যালয় কর্র্তৃপক্ষ এ ধরনের কথা বলার জন্য ব্যবস্থা নিতে পারে। এমন নানা কারণে লেবানন এবং জর্দানের মতো আরব রাষ্ট্রের জটিল ইতিহাস ফিলিস্তিনের পক্ষে জনগণের প্রতিবাদের সুযোগ অনেক সংকুচিত করে রেখেছে।
লেবাননে যেমন অনেকে ১৯৭৫-৯০ সালের গৃহযুদ্ধের জন্য ফিলিস্তিনিদের দায়ী করে। আবার অন্যদের আশঙ্কা, ফিলিস্তিনিদের প্রতি প্রকাশ্যে কোনো সমর্থনের সুযোগ নিতে পারে ইরান সমর্থিত হিজবুল্লাহ। তারা এ ধরনের আন্দোলন হাইজ্যাক করতে পারে। আমেরিকান ইউনিভার্সিটি অব বৈরুতের ইতিহাসের অধ্যাপক মাকরম রাবাহ রয়টার্সকে বলেন, আরব বিশ্ব কলম্বিয়া বা ব্রাউন বিশ্ববিদ্যালয়ের মতো প্রতিক্রিয়া দেখাচ্ছে না, কারণ তাদের কাছে এসব করার মতো ‘বিলাসিতা’ নেই। এ ছাড়া তিনি বলেন, জনমত ইতিমধ্যেই মূলত ফিলিস্তিনিকে সমর্থন করছে, তবে তাদের কাছে এটা স্পষ্ট নয় যে, প্রতিবাদ থেকে কীভাবে কিছু অর্জন করা সম্ভব।
বিক্ষোভ যেখানে দুঃস্বপ্ন
দ্য ইকোনমিস্ট এক প্রতিবেদনে জানায়, গাজায় ইসরায়েলি হামলার বিরুদ্ধে ব্যাপক বিক্ষোভ আমেরিকার বিশ্ববিদ্যালয়গুলোকে কাঁপিয়ে দিলেও আরব অঞ্চলে হয়েছে সীমিত পরিসরে। এ প্রসঙ্গে লেবাননের আমেরিকান ইউনিভার্সিটি অব বৈরুতের এক শিক্ষার্থীর মন্তব্য প্রকাশ করে তারা। ওই শিক্ষার্থীও নাম প্রকাশ করেননি। তিনি ইকোনমিস্টকে বলেন, যুক্তরাষ্ট্রের কলম্বিয়া থেকে শুরু করে শিকাগো বিশ্ববিদ্যালয় পর্যন্ত হওয়া বিক্ষোভের সমর্থনে ৩০ এপ্রিল তাদের ক্যাম্পাসে একশরও বেশি ছাত্রের একটি বিক্ষোভ হয়। তারা যুক্তরাষ্ট্রের শিক্ষার্থীদের অনুপ্রেরণায় এ বিক্ষোভ করে। মিসর, জর্দান, কুয়েত ও তিউনিসিয়ার ছাত্ররাও সীমিত বিক্ষোভ দেখায়। বৈরুতের ওই বিক্ষোভ ছিল সুশৃঙ্খল ও সংযত। শিক্ষার্থীরা ফিলিস্তিনি পতাকা উঁচু করে নির্ধারিত পথ ধরে হেঁটে প্রতিবাদ জানায়। তাদের সঙ্গে বিশ্ববিদ্যালয়ের নিরাপত্তারক্ষীরাও ছিল। সামান্য প্রতিবাদের পর সাংবাদিকদের সঙ্গে কথা বলে শিক্ষার্থীরা ক্লাসে ফিরে যায়। তবে নাম প্রকাশ করেনি অনেকে। যদিও ওই বিশ্ববিদ্যালয়ের ছাত্র সংগঠক আলী তাইয়ারের নাম উল্লেখ করে ওয়াশিংটন পোস্ট জানায়, বিক্ষোভে অংশ নিয়ে তিনি বলেন, ‘প্যালেস্টাইন প্রথমত তাদের (মার্কিন শিক্ষার্থী) বিষয় ছিল না, কিন্তু এখন তারা আমাদের চেয়ে বেশি করছে এবং আমরা লজ্জিত বোধ করছি, আমাদের আরও কিছু করা উচিত। আমাদের অন্তত মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রে আমাদের বন্ধুদের জন্য কিছু সমর্থন দেখানো দরকার ছিল।’
বিক্ষোভের এ ভীতি তৈরির কারণ পাওয়া যায় মিডল ইস্ট মনিটরে ফেরাস প্রকাশিত আবু হেলালের কলামে। তার লেখা থেকে জানা যায়, ‘আরব বসন্ত’ ব্যুমেরাং হয়ে ফিরে এসেছে সেখানকার জনগণের কাছে। ওই ব্যর্থ বিপ্লবের পর আরবের শাসকরা তাদের জনগণের ওপর নৃশংস আচরণ করছে। আরব বিশ্বের শাসকরা আর ওই বসন্তের প্রত্যাবর্তন চায় না। তাই যে কোনো জনপ্রিয় প্রতিবাদকে দমন করে তারা। যা প্রতিবাদকারীদের জন্য বিপর্যয় ডেকে আনে। অনেক আরব দেশে বিক্ষোভকারীরা যদি পুলিশ এবং সেনাবাহিনীর মারধরের হাত থেকে বেঁচেও যায়, তাহলে তাদের ছলনামূলক বিচারের সম্মুখীন হতে হয়। আদালতে দীর্ঘ কারাবাস এমনকি মৃত্যুদণ্ডও দেওয়া হয়। যা-ই ঘটুক না কেন তরুণরা যদি বিক্ষোভে অংশ নেন বা সংগঠিত করেন, তাহলে তারা অজানায় হারিয়ে যাবেন।
যে আগুন ছড়িয়ে গেল
কলম্বিয়া বিশ্ববিদ্যালয়ে শুরু হওয়া বিক্ষোভের আগুন ছড়িয়ে পড়েছে। বিবিসি জানাচ্ছে, মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রে ১৩০-এরও বেশি কলেজ এবং বিশ্ববিদ্যালয়ে তারা খোঁজ নিয়ে দেখেছে গত কয়েক সপ্তাহে বিক্ষোভ হয়েছে, তাঁবু স্থাপন করেছেন শিক্ষার্থীরা। এ ছাড়া দেশটির ৪৫টি রাজ্য এবং ওয়াশিংটন ডিসিতে বিক্ষোভ হয়েছে। যা ক্রমে অস্ট্রেলিয়া, কানাডা, ফ্রান্স, ইতালি এবং যুক্তরাজ্যের বিশ্ববিদ্যালয় ক্যাম্পাসে ছড়িয়ে পড়ে। গত সপ্তাহে শুরু হওয়া এ বিক্ষোভ এখনো চলছে।
অ্যাসোসিয়েটেড প্রেস (এপি) জানাচ্ছে, মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র জুড়ে বিক্ষোভে দুই হাজারের বেশি লোককে গ্রেপ্তার করা হয়েছে। শুধু মে মাসের প্রথম দুদিনে ইয়েল, ডার্টমাউথ, স্টনি ব্রুক, পোর্টল্যান্ড স্টেট, ইউনিভার্সিটি অব উইসকনসিন এবং ডালাসের ইউনিভার্সিটি অব টেক্সাসসহ বিভিন্ন ক্যাম্পাস থেকে কয়েকশ জনকে গ্রেপ্তার করা হয়েছিল। মে মাসের শুরু থেকে সবচেয়ে বেশি বিক্ষোভ হচ্ছে ইউসিএলএতে। সেখান থেকে গত শুক্রবার পর্যন্ত ২১০ জনকে হেফাজতে নেয় পুলিশ। নিউ ইয়র্ক পুলিশ গত সপ্তাহের শুরুতে কলম্বিয়া বিশ্ববিদ্যালয় থেকে ২৮২ জনকে গ্রেপ্তার করে।
পাশাপাশি বিশ্ববিদ্যালয় কর্র্তৃপক্ষও অনেক শিক্ষার্থীর বিরুদ্ধে বিভিন্ন মেয়াদে ব্যবস্থা নিয়েছে। তবে এরপরও শিক্ষার্থীরা দমেনি। তারা কেউ কেউ পুলিশের হাতে গ্রেপ্তার হওয়ার সময় সহপাঠীদের বলেছে বিক্ষোভ চালিয়ে যেতে। আবার কেউ পুলিশ হেফাজত থেকে ছাড়া পেয়ে ফিরে আসছে আন্দোলনে।