মূল প্রতিষ্ঠান, নিয়োগকারী কর্মকর্তা, চাকরির যোগ্যতা এক হওয়া সত্ত্বেও সুযোগ-সুবিধা বিবেচনায় বাংলাদেশ পল্লী বিদ্যুতায়ন বোর্ডের (আরইবি) কর্মকর্তা-কর্মচারীদের সঙ্গে পল্লীবিদ্যুৎ সমিতির কর্মকর্তা-কর্মচারীদের মধ্যে রয়েছে ব্যাপক বৈষম্য। আরইবির কিছু কর্মকর্তা নিজেদের সুবিধার জন্য বছরের পর বছর ধরে এ বৈষম্য জিইয়ে রেখেছেন বলে অভিযোগ ভুক্তভোগীদের।
নিজেদের ন্যায্য দাবি জানিয়ে নিয়মতান্ত্রিকভাবে আরইবিকে একাধিকবার জানানো হলেও সমিতির নিয়ন্ত্রকের ভূমিকায় থাকা আরইবি কোনো সমাধান না করে উল্টো পল্লীবিদ্যুৎ সমিতির একাধিক কর্মকর্তার বিরুদ্ধে শাস্তিমূলক ব্যবস্থা নেওয়া হয়েছে। এ ছাড়া বিভিন্ন কৌশলে নানারকম হুমকি অব্যাহত রয়েছে বলে অভিযোগ উঠেছে।
গত ২৯ এপ্রিল আরইবির পরিচালক মাহফুজুল হক স্বাক্ষরিত এক চিঠিতে ভোলা পল্লীবিদ্যুৎ সমিতির সহকারী মহাব্যবস্থাপক (আইটি) এস কে সাকিল আহমেদ ও সহকারী মহাব্যবস্থাপক (অর্থ) সুকদেব বাড়ৈকে সাময়িক বরখাস্ত করা হয়।
কর্তৃপক্ষের অনুমতি ছাড়া ডেটা এন্ট্রি অপারেটরকে চাপ প্রয়োগ করে অফিশিয়াল মেইল থেকে গত ২৮ জানুয়ারি পল্লীবিদ্যুৎ সমিতির কর্মকর্তা-কর্মচারীদের দাবিদাওয়া সংবলিত স্মারকলিপি আরইবির চেয়ারম্যান এবং ৭৯টি পল্লীবিদ্যুৎ সমিতিতে পাঠানোর অভিযোগ তোলা হয়েছে তাদের বিরুদ্ধে।
তবে দেশ রূপান্তরের অনুসন্ধানে ডেটা এন্ট্রি অপারেটরকে চাপ প্রয়োগের কোনো ঘটনার সত্যতা পাওয়া যায়নি। বিষয়টি জানতে ভোলা পল্লীবিদ্যুৎ সমিতির একাধিক কর্মকর্তা-কর্মচারীর সঙ্গে আলাপকালে তারা জানান, এ ধরনের কোনো ঘটনা ঘটেনি। বরং নিয়ম মেনে তাদের দাবি জানানো হয়েছে। এ সংক্রান্ত তথ্য-প্রমাণ দেশ রূপান্তরের হাতে আছে। কিন্তু কর্মীদের চাকরির নিরাপত্তার কথা ভেবে তাদের পরিচয় প্রকাশ করা যাচ্ছে না।
এসব বিষয়ে বক্তব্য জানতে গত বৃহস্পতিবার দুপুরে ঢাকায় আরইবির প্রধান কার্যালয়ে গিয়ে পরিচালক মাহফুজুল হকের দপ্তরে গেলে তাকে পাওয়া যায়নি। এর আগে ও পরে একাধিকবার তাকে ফোন করে এবং তার মোবাইলে খুদেবার্তা পাঠিয়েও তার সাড়া মেলেনি।
আরইবির চেয়ারম্যান অজয় কুমার চক্রবর্তীকেও একাধিকবার ফোন দিলেও তিনি ধরেননি। সর্বশেষ গতকাল তার মোবাইলে ফোনে খুদেবার্তা পাঠিয়ে এবং কয়েকবার ফোন দিয়েও তার বক্তব্য জানা সম্ভব হয়নি।
প্রতিষ্ঠানটির জনসংযোগ কর্মকর্তা ও পরিচালক (প্রশাসন) মো. শফিকুর রহমানের সঙ্গে যোগাযোগ করা হলে তিনি কোনো বক্তব্য দিতে রাজি হননি। ওই দুই কর্মকর্তা ছাড়াও আরও অন্তত চারজন কর্মকর্তাকে তাৎক্ষণিক বদলিসহ বিভিন্ন ধরনের শাস্তিমূলক ব্যবস্থা নেওয়া হয়েছে বলে ভুক্তভোগীরা জানিয়েছেন।
মুন্সীগঞ্জ জেলা পল্লীবিদ্যুৎ সমিতির সহকারী মহাব্যবস্থাপক প্রকৌশলী রাজন কুমার দাস দেশ রূপান্তরকে বলেন, ‘আরইবির কারণে নানাভাবে আমরা বৈষম্যের শিকার হচ্ছি। বিভিন্ন সময়ে গণস্বাক্ষর সংগ্রহ, আরইবির চেয়ারম্যানের কাছে স্মারকলিপি দেওয়াসহ নিয়মতান্ত্রিকভাবেই দাবি আদায়ের চেষ্টা করে আসছি। কিন্তু তারা দাবি না মেনে উল্টো আমাদের সহকর্মীদের বরখাস্ত করাসহ নানা ধরনের হয়রানি করছেন। শনিবার আমার অফিসে এসে জোর করে আরইবির ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তারা কম্পিউটার নিয়ে যান।’
ওই ঘটনায় গত শনিবার মুন্সীগঞ্জ থানায় একটি সাধারণ ডায়েরি করেছেন রাজন কুমার দাস। এতে অভিযোগ করা হয়, ওইদিন বেলা আড়াইটার দিকে কয়েকজন অপরিচিত লোক নিয়ে আরইবির পরিচালক (প্রশাসন) একেএম এসকান্দার আলী তার কক্ষে ঢুকে তার কম্পিউটার নিয়ে যান এবং অসৌজন্যমূলক আচরণ করেন। সমিতির কর্মকর্তা-কর্মচারীদের দাবি আদায়ে আন্দোলন করার কারণে তাকে নানারকম হুমকিও দেওয়া হয়।
এ ব্যাপারে একেএম এসকান্দার আলী গতকাল রাতে দেশ রূপান্তরকে বলেন, ‘জোর করে কোনো কম্পিউটার নেওয়া হয়নি। দাপ্তরিকভাবেই নেওয়া হয়েছে এবং সেখানকার দায়িত্বপ্রাপ্ত মহাব্যবস্থাপক এ ব্যাপারে লিখিতও দিয়েছেন। কারও সঙ্গে খারাপ আচরণ করা হয়নি।’
হঠাৎ কী কারণে তার কম্পিউটার জব্দ করা হয়েছে, জানতে চাইলে তিনি বলেন, ‘কর্তৃপক্ষের নির্দেশ রয়েছে।’
ভুক্তভোগীরা বলছেন, আরইবির কর্মকর্তা-কর্মচারীদের ক্ষেত্রে সরকারি পদমর্যাদা অনুযায়ী বিভিন্ন ধরনের গ্রেড থাকলেও পল্লীবিদ্যুৎ সমিতির ক্ষেত্রে তা নেই। ফলে জেলা-উপজেলার সমন্বয় সভাসহ সরকারের বিভিন্ন অনুষ্ঠানে অংশ নেওয়া এবং প্রশাসনিক ও দাপ্তরিক কাজে নানারকম জটিলতার সৃষ্টি হচ্ছে।
গত বছর প্রধানমন্ত্রীর ঘোষিত ৫ শতাংশ বিশেষ প্রণোদনা ভাতা ওই বছরের জুলাই থেকে কার্যকর করার নির্দেশনা আরইবি নিজেদের কর্মকর্তা-কর্মচারীদের ক্ষেত্রে বাস্তবায়ন করেছে। অথচ পল্লীবিদ্যুৎ সমিতিতে তা আরও ছয় মাস পর অর্থাৎ চলতি বছরের জানুয়ারি থেকে কার্যকর করা হয়েছে।
একইভাবে ২০১৫ সালের নতুন জাতীয় বেতন স্কেল অনুযায়ী ওই বছরের জুলাই থেকে আরইবি তাদের নিজেদের বেতন-ভাতা নেওয়া শুরু করলেও পল্লীবিদ্যুৎ সমিতিতে তা কার্যকর হয়েছে আরও ছয় মাস পর।
আরইবিতে একজন উপসহকারী প্রকৌশলী ও অন্যান্য সমমান পদ থেকে পদোন্নতি পেতে সময় লাগে সাধারণত ছয় বছর। একই যোগ্যতায় সমিতিতে যারা চাকরি করেন তাদের পরের ধাপে যেতে সর্বনিম্ন ১৪ থেকে ২২ বছর পর্যন্ত সময় লাগে। সহকারী প্রকৌশলী বা সহকারী পরিচালক থেকে নির্বাহী প্রকৌশলী বা উপপরিচালক কিংবা সমমান পদে পদোন্নতি পেতে পাঁচ বছর সময় লাগলেও সমিতিতে কর্মরত সহকারী মহাব্যবস্থাপক থেকে উপমহাব্যবস্থাপক পদে যেতে সময় লাগে ১০ থেকে ১২ বছর। মাত্র তিন বছরে আরইবির নির্বাহী পরিচালক বা সমমান পদের একজন পরবর্তী ধাপে পদোন্নতি পেয়ে যান। আর একই যোগ্যতা থাকা সত্ত্বেও পল্লীবিদ্যুৎ সমিতির উপমহাব্যবস্থাপক থেকে মহাব্যবস্থাপক পদে যেতে অপেক্ষা করতে হয় ১২ থেকে ১৪ বছর।
তত্ত্বাবধায়ক প্রকৌশলী বা পরিচালক থেকে অতিরিক্ত প্রধান প্রকৌশলী হতে আরইবিতে তিন বছর লাগে। অন্যদিকে সমিতিতে অতিরিক্ত মহাব্যবস্থাপক পদ থাকলেও বাস্তবে ওই পদে কাউকে পদায়ন করা হয় না। তাছাড়া মহাব্যবস্থাপক থেকে জ্যেষ্ঠ মহাব্যবস্থাপক পদে পদোন্নতি পেতে সময় লাগে অন্তত তিন বছর। এরপর আর কোনো পদ নেই।
পল্লীবিদ্যুৎ সমিতিতে সহকারী মহাব্যবস্থাপক (এজিএম) হিসেবে চাকরিতে যোগদান করে এর পরের দুই ধাপে (মহাব্যবস্থাপক) যেতে সময় লাগে ২২-২৪ বছর। মাত্র দুটি পদোন্নতি নিয়েই শেষ হয় বেশিরভাগ প্রকৌশলীর চাকরিজীবন। কারও কারও ভাগ্যে তাও জোটে না।
আরইবিতে একজন ডেটা এন্ট্রি অপারেটর পদোন্নতি পেয়ে উপপরিচালক, লাইন পরিদর্শক থেকে নির্বাহী প্রকৌশলী হওয়ার সুযোগ পেলেও পল্লীবিদ্যুৎ সমিতিতে কর্মরত প্রায় একই যোগ্যতা ও পদমর্যাদার কর্মচারীদের কোনো ধরনের পদোন্নতি দেওয়া হয় না।
সরকারের বার্ষিক কর্মসম্পাদন চুক্তি (এপিএ) অনুযায়ী কাজের লক্ষ্যমাত্রা পূরণের জন্য আরইবির কর্মকর্তা-কর্মচারীরা শতভাগ এপিএ বোনাস সুবিধা ভোগ করেন। অথচ এ সংক্রান্ত কোনো কাজ তারা করেন না। মূলত এ কাজটি যারা করেন সেই পল্লীবিদ্যুৎ সমিতির কর্মকর্তা-কর্মচারীদেরই বঞ্চিত করেন কাজ না করা আরইবির কর্মকর্তারা। সরকারের এপিএ বোনাস সব সমিতিতে সমানভাবে বণ্টন করা হয় না বলে অভিযোগ করেছেন ভুক্তভোগীরা।
মানুষকে বিদ্যুৎ সুবিধা দিতে মূল কাজ করেন পল্লীবিদ্যুৎ সমিতির কর্মকর্তা-কর্মচারীরা। এ ক্ষেত্রে মাঠপর্যায়ে কোনো কাজ না করেও পর্যায়ক্রমে আরইবির কর্মকর্তারা সবাই বিদেশে প্রশিক্ষণ নিতে পারেন। অথচ সমিতির সর্বোচ্চ ১০ শতাংশ কর্মকর্তাকে বিদেশে প্রশিক্ষণের সুযোগ দেওয়া হয়। আরইবি এবং অন্যান্য বিদ্যুৎ বিতরণকারী সংস্থার কর্মীদের সাপ্তাহিক ছুটি দুদিন হলেও পল্লীবিদ্যুৎ সমিতিতে এ ছুটি এক দিন।
এমন নানা বৈষম্যের পাশাপাশি বার্ষিক বেতন প্রবৃদ্ধি, চিকিৎসা ভাতা, প্রশিক্ষণ সম্মানী, অবসরকালীন সুবিধাসহ অন্যান্য ক্ষেত্রে পল্লীবিদ্যুৎ সমিতির কর্মীদের বঞ্চিত করা হচ্ছে বলে সমিতির কর্মকর্তা-কর্মচারীরা অভিযোগ তুলেছেন।
দাবি আদায়ে অনির্দিষ্টকালের কর্মবিরতি : আরইবি ও পল্লীবিদ্যুৎ সমিতির মধ্যে থাকা বৈষম্যগুলো দূর করাসহ অভিন্ন চাকরিবিধি বাস্তবায়নের দাবিতে গতকাল থেকে সমিতির কর্মকর্তা-কর্মচারীরা অনির্দিষ্টকালের জন্য কর্মবিরতি শুরু করেছেন।
আন্দোলনকারীরা বলছেন, তারা দাপ্তরিক কিছু কাজ বন্ধ রেখেছেন। বিদ্যুৎ সরবরাহে কোনো সমস্যা হবে না।
এর আগে গত ২৮ জানুয়ারি ৮০টি পল্লীবিদ্যুৎ সমিতির মহাব্যবস্থাপকদের মাধ্যমে আরইবির চেয়ারম্যানকে স্মারকলিপি দিয়েছিলেন প্রায় দেড় হাজার কর্মকর্তা।
এক সংবাদ বিজ্ঞপ্তিতে জানানো হয়, আরইবির দ্বৈতনীতির কারণে বিভিন্ন সুযোগ-সুবিধা থেকে বঞ্চিত হচ্ছেন সমিতির প্রায় ৪০ হাজার কর্মকর্তা-কর্মচারী।
আন্দোলনকারীরা জানান, কর্মসূচি চললেও জরুরি বিদ্যুৎ সরবরাহ স্বাভাবিক রাখতে প্রতিটি উপকেন্দ্রে একজন করে লোক দায়িত্বে রয়েছেন। তবে সব ধরনের গ্রাহকসেবা নিশ্চিত করা হবে।