সুবিধা পেতে দরকার বিপুল বিনিয়োগ

মানব সভ্যতার ইতিহাসে প্রযুক্তিগত উদ্ভাবনের মাধ্যমে যে অভাবনীয় পরিবর্তন সাধিত হয়েছে তাকে শিল্পবিপ্লবের নানা পর্যায়ে বিভক্ত করা হয়। একবিংশ শতাব্দীর পূর্ব পর্যন্ত মানব ইতিহাসে তিনটি শিল্পবিপ্লব সাধিত হওয়ার প্রমাণ মেলে। এগুলো মানবজাতির ইতিহাসের একেকটি বাঁক বদলের গল্প হিসেবে বিবেচিত হয়। তবে মানুষের ইতিহাসে সবচেয়ে বড় বৈপ্লবিক পরিবর্তন নিয়ে আসতে চলেছে চতুর্থ শিল্পবিপ্লব বা ৪আইআর। পৃথিবীতে প্রথম যে তিনটি শিল্পবিপ্লব সাধিত হয় সেগুলো ছিল মূলত যন্ত্রের বিকাশ। প্রথম শিল্পবিপ্লবে স্টিম ইঞ্জিন আবিষ্কারের মাধ্যমে মানুষ দ্রুত এক স্থান থেকে অন্য স্থানে যাতায়াত ও পণ্য স্থানান্তরের সক্ষমতা অর্জন করে। দ্বিতীয় শিল্পবিপ্লব ছিল বিদ্যুতের আবিষ্কার সংশ্লিষ্ট। বৈদ্যুতিক বাতি আবিষ্কারের মাধ্যমে অন্ধকারকে জয় এবং যন্ত্রনির্ভর শিল্প-কারখানার বিকাশ ঘটাতে বিদ্যুতের আবিষ্কার তথা দ্বিতীয় শিল্পবিপ্লবের ভূমিকা ছিল অনস্বীকার্য। কম্পিউটার ও ইন্টারনেট আবিষ্কারের মাধ্যমে মানব ইতিহাসে যে আরেকটি দিক বদলের হাওয়া বইতে শুরু করে সেটি তৃতীয় শিল্পবিপ্লব বলে পরিচিত। বর্তমান চতুর্থ শিল্পবিপ্লব মানবজাতির ইতিহাসে আগের প্রত্যেকটি বাঁক বদলের গল্পের থেকে সম্পূর্ণ আলাদা এবং বৈশিষ্ট্যের দিক বিবেচনায় স্বতন্ত্র। বর্তমান সময়ে মানুষ কম্পিউটার ও ইন্টারনেট টেকনোলজি ব্যবহার করে গড়ে তুলেছে আর্টিফিশিয়াল ইন্টেলিজেন্স বা কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা।

এই মুহূর্তে গুরুত্বপূর্ণ আলোচনার বিষয় হলো চতুর্থ শিল্পবিপ্লবের পূর্ণাঙ্গ সুবিধা কি সমগ্র বিশ্ববাসী একইভাবে ভোগ করতে সক্ষম হবে? আমরা দেখেছি পৃথিবীর উন্নত দেশগুলোর নাগরিকরা পূর্ববর্তী তিনটি শিল্পবিপ্লবের সম্পূর্ণ সুবিধা ভোগ করতে পেরেছে। অন্যদিকে পৃথিবীর অপেক্ষাকৃত দরিদ্র দেশগুলো বিজ্ঞানকে পুরোপুরি গ্রহণ এবং প্রাযুক্তিক সুবিধা নিতে সক্ষম হয়নি। বিশেষজ্ঞরা বলছেন, চতুর্থ শিল্পবিপ্লব মানুষকে এক লাফে ১০০ বছর সামনে নিয়ে যাবে। পৃথিবীর সামগ্রিক যোগাযোগ ব্যবস্থায় বিপ্লব আসবে। আন্তর্জাতিক বাণিজ্য অনেক সহজ হয়ে যাবে। মানুষের হস্তক্ষেপ ছাড়াই জটিল নানা সমস্যা নির্ণয়, সেগুলোর বিশ্লেষণ, সমস্যার সমাধান, মেশিন টু মেশিন যোগাযোগ, ইন্টারনেট অব থিংস ইত্যাদির সমন্বয়ে গড়ে ওঠা টেক-ইকোসিস্টেমকে মূলত ৪আইআর বলা হচ্ছে। পৃথিবীতে সংঘটিত আগের তিনটি শিল্পবিপ্লবের থেকে চতুর্থ শিল্পবিপ্লবের সবচেয়ে বড় পার্থক্য হলো এটি মানুষকে শুধুমাত্র কায়িক পরিশ্রম থেকে মুক্তি দিচ্ছে না বরং মানুষের মানসিক ও বুদ্ধিবৃত্তিক শ্রমকেও আরও গতিশীল এবং নিখুঁত করে তুলছে। বলা যায় নিজেদের অজান্তেই আমরা এখন চতুর্থ শিল্পবিপ্লবের অংশ। যদি শিক্ষা ও প্রযুক্তির প্রকৃত বিকাশ ঘটানো সম্ভব হয়, তবে এই পরিবর্তনের যাত্রাপথে আমরা সুযোগ্য যাত্রী হয়ে উঠতে পারব।

বাংলাদেশের ইতিহাসে বর্তমান সময় সবচেয়ে সম্ভাবনার কাল। আমরা এখন পপুলেশন ডিভিডেন্ডের সুবিধা গ্রহণ করতে চলেছি। আমাদের মোট জনসংখ্যার প্রায় ৪ কোটি ৭৬ লাখ বা প্রায় ৩০ শতাংশ তরুণ ও কর্মক্ষম। এই বিপুল কর্মক্ষম জনগোষ্ঠী আগামী ২৫-৩০ বছর ধরে শ্রম দিতে পারবে। আমাদের কৃষি ও মাঝারি শিল্পনির্ভর অর্থনীতিকে সেবানির্ভর অর্থনীতিতে রূপান্তরিত করতে এই তরুণ জনগোষ্ঠীকে প্রশিক্ষিত ও প্রযুক্তিগতভাবে দক্ষ করে গড়ে তোলার বিকল্প নেই। ইন্টারনেট অব থিংস, কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা ইত্যাদির সঙ্গে নতুন প্রজন্মকে ইতিবাচকভাবে পরিচিত করিয়ে দিতে পারলে তা আমাদের চতুর্থ শিল্পবিপ্লবের যাত্রাপথকে আরও মসৃণ করে তুলবে।

বাংলাদেশ সরকার সামগ্রিকভাবে ডিজিটালাইজেশনের মাধ্যমে স্মার্ট বাংলাদেশের যে রূপকল্প ঘোষণা করেছে তা অর্জনের জন্য ৪আইআর-এর সঙ্গে তাল মিলিয়ে চলতে হবে। সে জন্য বায়োটেকনোলজি, ন্যানো-টেকনোলজি, ডিজিটাল ডেভেলপমেন্ট, রোবোটিক্স, আইটি, ক্লাউড কম্পিউটিং, ভিএলএসআই (ভেরি-লার্জ-স্কেল-ইন্টিগ্রেশন), হার্ডওয়্যার অ্যান্ড সফটওয়্যার নেভিগেশন, সাইবার সিকিউরিটি, ই-বর্জ্য ব্যবস্থাপনা ইত্যাদি ক্ষেত্রে দক্ষতা বৃদ্ধিতে কার্যকরী ব্যবস্থা গ্রহণ করার বিকল্প নেই। জাতীয় স্বার্থে সরকারি-বেসরকারি সম্মিলিত উদ্যোগের মাধ্যমে এগুলো বাস্তবায়ন করা জরুরি।

স্ক্যান্ডিনেভিয়ান দেশগুলো চতুর্থ শিল্পবিপ্লবের সুবিধা গ্রহণের জন্য শুরু থেকেই সচেষ্ট ছিল এবং সে অনুযায়ী ব্যবস্থা গ্রহণ করে। ফলে ঐ সুইডেন, নরওয়ে, ফিনল্যান্ডের মতো দেশগুলোতে মানুষের জীবনযাত্রা অনেক বেশি প্রযুক্তিনির্ভর। সেখানে ই-টিকেটিং, ই-ডাইরেক্টরি, আইআর/ভিআর জীবনযাত্রার অংশ হয়ে উঠেছে। সুইডেন, ফিনল্যান্ডের বিশ্ববিদ্যালয়গুলোর সঙ্গে হাইটেক পার্ক, ইআরপি সল্যুশন, ইনোভেশন ইকোপার্কের বিজনেস পার্টনারশিপ গড়ে উঠেছে। ফলে পড়ুয়ারা সহজে তাত্ত্বিক জ্ঞানকে ব্যবহারিক পর্যায়ে কাজে লাগানোর সুযোগ পায়। এটি তাদের কেবল দক্ষ করে তুলছে না বরং শ্রমবাজারের চাহিদার সঙ্গেও পরিচিত করে তুলছে। বাংলাদেশের প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয় ও কারিগরি প্রশিক্ষণ কেন্দ্রগুলোকেও এই ধরনের সুবিধা নিশ্চিত করা দরকার।

অনলাইন শ্রমবাজারে বাংলাদেশের তরুণ শ্রমশক্তির একটা বড় অংশ ফ্রি-ল্যান্সার হিসেবে কাজ করেন। শতাংশের হিসাবে যেটি পৃথিবীর মোট ফ্রি-ল্যান্স শ্রম জোগানের ১৬ শতাংশ। এদেশের প্রায় ৭ লাখ ফ্রি-ল্যান্সার বিশ্বব্যাপী নানা কাজ করছেন। বাংলাদেশে বসে কম্পিউটার ও ইন্টারনেট টেকনোলজি ব্যবহার করে তারা বছরে প্রায় ১০ কোটি ইউএস ডলার আয় করে থাকেন। সরকারি ও বেসরকারিভাবে ফ্রি-ল্যান্সারদের আরও উন্নত ট্রেনিংয়ের ব্যবস্থা করলে তাদের কর্মদক্ষতা আরও বৃদ্ধি পাবে। এতে বাংলাদেশ অর্থনৈতিকভাবে লাভবান হবে। বেকারত্ব সমস্যার সমাধান হবে এবং ফলাফল হিসেবে দারিদ্র্য ও সন্ত্রাস কমে আসবে। পাশাপাশি তাদের আয়কৃত বৈদেশিক মুদ্রা সহজে দেশে নিয়ে আসার সুবিধার্থে পেইপাল কিংবা রেভলুটের মতো ইন্টারনেট-ভিত্তিক ব্যাংকিং সুবিধার দ্বার উন্মুক্ত করে দেওয়া অত্যন্ত জরুরি।

আমাদের স্মরণে রাখা উচিত যে, মেশিন মানুষের কাজে সহকারীর ভূমিকা রাখতে পারলেও কখনো মানুষের পারফেক্ট রিপ্লেসমেন্ট হয়ে উঠতে পারবে না। আগামী পৃথিবীর মানুষের অন্যতম প্রধান কর্মক্ষেত্র হবে কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা সম্পন্ন যন্ত্রের সীমাবদ্ধতার ঊর্ধ্বে থাকা সৃজনশীল কাজ। এজন্য চতুর্থ শিল্পবিপ্লব সম্পর্কিত বিষয়ে গবেষণা ও বিনিয়োগ জরুরি। দ্রুত পরিবর্তনশীল এই বিশ্বের সঙ্গে তাল মিলিয়ে চলতে উন্নত শিক্ষা ও সৃজনশীল গবেষণার কোনো বিকল্প নেই। জাতি হিসেবে উন্নতি করতে হলে এবং চতুর্থ শিল্পবিপ্লবের সুবিধা গ্রহণ করতে আমাদের এই ক্ষেত্রে বিপুল বিনিয়োগ করতেই হবে।

লেখক : শিক্ষার্থী ও গবেষক, নোভা ইউনিভার্সিটি অব লিসবন, পর্তুগাল

kaisulkhan@pm.me