রীতির কান যাত্রার গল্প

১৪ থেকে ২৫ মে অনুষ্ঠিত হতে যাচ্ছে ৭৭তম কান চলচ্চিত্র উৎসব। বিশ্বের মর্যাদাপূর্ণ এই চলচ্চিত্র উৎসবে দ্বিতীয় দফায় বাংলাদেশ থেকে জুরি বোর্ডের সদস্য হিসেবে আমন্ত্রিত হয়েছেন সাদিয়া খালিদ রীতি। ইন্টারন্যাশনাল ফেডারেশন অব ক্রিটিকসের জুরি হিসেবে যোগ দেবেন তিনি। ফ্রান্স যাত্রার আগে রীতির মুখোমুখি হয়েছেন মাহতাব হোসেন

ভুলে নিশিতা বড়ুয়া

রাস্তাঘাটে আমাকে অনেকেই নিশিতা বড়ুয়া মনে করে ছবি তুলতে আসে। গত দুই বছর ধরে এটা বেশি হচ্ছে। জানি না ওর কোনো গান ভাইরাল হয়েছে কি না। ছবি তুলতে গিয়েছিলাম ভিসার জন্য, আমাকে জিজ্ঞেস করছে আপনি কি চট্টগ্রামেই থাকেন? ছবিটা সেভ করার সময় আমাকে জিজ্ঞেস করল না, নিশিতা বড়ুয়া নামে সেভ করল। মানুষজন রাস্তায় দেখলে বলে আপনার ওই গানটা সুন্দর হয়েছে। চট্টগ্রামে গিয়েছিলাম হাজবেন্ডের সঙ্গে। সেখানে হোটেলে ওরা ধরেই নিয়েছে যে নিশিতা বড়ুয়া কারও সঙ্গে এসেছে। আমার হাজবেন্ড একটি টিভিতে অনুষ্ঠান করেন। সেখানে নিশিতা এসেছে একবার। আমার হাজবেন্ডও নিশিতাকেই আমি মনে করে ফেলেছে। কদিন আগে চিত্রনায়িকা শাবনূর একটি রেস্তোরাঁয় দেখা পেয়ে বললেন, তোমার গান আমার ভালো লাগে...

কান যাত্রা

আমি এবার কান চলচ্চিত্র উৎসবে জুড়ি হিসেবে দ্বিতীয়বারের মতো যাচ্ছি। ২০১৯ সালে প্রথমবার গিয়েছিলাম, ওটা ছিল প্যারালাল সেকশনে। এবার যাচ্ছি আঁ সেরতাঁ র‌্যাগার বিভাগে জুড়ি হিসেবে। সেবারের চেয়ে এবার ৩ ভাগের এক ভাগ কম সিনেমা দেখতে হবে। প্রতিদিন তিন থেকে চারটা সিনেমা দেখতে হতো। আর একটা থিয়েটার থেকে আরেকটা থিয়েটারে যেতে হয় হেঁটে হেঁটে। কখনো একটা থিয়েটার থেকে আরেকটায় যেতে সময় লাগে আধঘণ্টা। ট্রান্সপোর্ট নেই। এবার তাই আনন্দ লাগছে, কম হাঁটতে হবে। আমার জুড়ি হিসেবে যাত্রা শুরু হয়েছিল ঢাকা আন্তর্জাতিক চলচ্চিত্র উৎসব দিয়ে। ২০১৮ সালে জুড়ি হয়েছিলাম। এরপর বিভিন্ন দেশ থেকে ডাক আসতে থাকে।

যেভাবে কানে

পেশাদারভাবে আমি চলচ্চিত্র সমালোচনা করছি ২০১২ সাল থেকে। চলচ্চিত্র সমালোচনা বলতে মুভি নিয়ে লেখা, মুভির রিভিউ করা, মুভি সংক্রান্ত ইভেন্টগুলোতে যাওয়া। সেখানে বিশ্লেষণধর্মী বক্তব্য পেশ করা। চলচ্চিত্র উৎসবগুলোতে যাওয়ার জন্য এসব প্রয়োজনীয়। বাংলাদেশের চলচ্চিত্র সমালোচকদের সংগঠন ইফক্যাড। সেখান থেকে আমাকে পাঠানো হচ্ছে কানে। কানে যাওয়ার পেছনে আরেকটি বিষয় আমাকে সহায়তা করেছে আমার পড়াশোনা। কেননা আমি পড়াশোনা করেছি ইউনিভার্সিটি অব ক্যালিফোর্নিয়া লস অ্যাঞ্জেলেসে, স্ক্রিন রাইটিং বিষয়ে। ফলে চিত্রনাট্য বিষয়ে হলিউডে কাজও করেছি দুই বছর। ইউরোপেও চলচ্চিত্র চিত্রনাট্যে কাজ করেছি।

কাজ হলিউডের চিত্রনাট্যে

যেহেতু আমি চিত্রনাট্য নিয়ে পড়াশোনা করেছি। সেহেতু ওরা আমাকে চিত্রনাট্যের কাজই দিত। চিত্রনাট্য পড়ে কোথাও কোন বিষয়টির সংযুক্তি দিতে হবে, কোনো সংশোধন করতে হবে কি না সেসব করে দিই। এটাকে ডক্টরিং বলে। ডক্টরিং বলেন, শ্যাডো রাইটার বলেন, এসবের কোনো ক্রেডিট ওরা কোথাও উল্লেখ করত না। এটা জটিল একটা বিষয়, ৩৩ ভাগ কন্ট্রিবিউশন যদি না থাকে তাহলে কোথাও ক্রেডিট দেওয়া হয় না। আমার হাতে প্রথম যে চিত্রনাট্য আসে সেটা হলো, কিয়ানু রিভস অভিনীত ‘টু দ্য বোন’ ‘সাইবেরিয়া’ রিজ আহমেদ অভিনীত ‘দ্য সিস্টার্স ব্রাদার্স’ এমন প্রচুর চিত্রনাট্যে কাজ করেছি।

প্রতিবন্ধকতার কারণ নারী

এখনো অনেক জায়গায় নারী বলে আমার অভিমতকে মূল্যায়ন দেওয়া হয় না। এমন অনেক প্রতিবন্ধকতার মুখোমুখি হয়েছি। আমাদের ইন্ডাস্ট্রিতে এটা হচ্ছেই, আমি তো নাম ধরে বলতে পারব না। শুধু নারী বলে আমার চিন্তাকে দমন করার চেষ্টা- এটা মোটেও সমীচীন নয়। আমার খুব কাছের মানুষ, মানে প্রফেশনালি কাছের। আমি শুনেছি সে আমাকে অবজ্ঞা করে বলে ও তো মেয়ে আবার কেমন ফিল্ম ক্রিটিকস! এই যে একটা মেয়ের অভিমত নিতে পারছে না, এটা আমাদের কিন্তু হাজার বছরের চর্চা। মায়েদের মতের কোনো দাম দেওয়া হতো না। স্বাভাবিকভাবেই এটা হবে। তবে এখন যেহেতু অনেক মেয়েই আসছে নির্মাণে, চলচ্চিত্রের বিভিন্ন শাখায়, সামনের প্রজন্ম হয়তো এই প্রতিবন্ধকতা ফেইস করবে না।