রবি অস্ত যায় না

আকাশজুড়ে রবীন্দ্রনাথ

স্বাধীন বাংলায় রবীন্দ্রবিচারের প্রচ্ছদ উন্মোচিত হওয়া উচিত স্বায়ত্তশাসিত মনোভূমি ও দেশভূমির অগ্রগামী চেতনা-চরিত্র অনুসারে। অকারণ মুগ্ধতা নয়, অবিশ্বাসী গ্রহণ নয়, বরং কাল নামক চরম কষ্টিপাথরে যাচাই করে নিতে হবে রবীন্দ্রনাথ কী।
পঁচিশে বৈশাখে রবীন্দ্রনাথের প্রতি যথাযথ শ্রদ্ধাজ্ঞাপনের উপায় বোধ করি, আগামীকালের জন্য রবীন্দ্রনাথকে আত্মীয় করার সূত্রসমূহ আবিষ্কার করা।

আজ বাংলাদেশের রবীন্দ্রপ্রীতির উচ্ছ্বাস বহমান; তাতে বিচারের ছন্দ নেই, আছে মোহান্ধের হই-চই। কিন্তু হই-চই ক্লান্তি আনে, মূল্যায়ন ইতিহাসের কণ্ঠে শ্রদ্ধামাল্য অর্পণ করে। বাংলাদেশের জাতীয়তাবাদী চেতনাপ্রবাহে রবীন্দ্রনাথকে ঋষির আসন দেওয়া হয়েছে। বহুমুখী কার্যকারণ এর প্রেক্ষাপটে সক্রিয়; তার মধ্যে একটি হলো রবীন্দ্রসাহিত্যে বাংলার চিত্রময় রূপের ঐশ্বর্য। স্মরণ রাখা দরকার, সেটা রবীন্দ্রনাথের একান্তই ভাববাদী আত্মভুবন। কারণ রবীন্দ্রনাথের বাংলাদেশ ভাববাদী কল্পনায় চিত্ররূপময় সোনার বাংলা। সেখানে প্রাচীন ভারতের স্বপ্নময়তার সুর প্রতিনিয়ত প্রতিধ্বনিত হয়। সে বাংলাদেশে ঘূর্ণিঝড়, প্লাবন, মহামারী, দুর্ভিক্ষ, ক্ষুদ্রতা, অশিক্ষা, স্বার্থপরতা কিছুই নেই। আছে বিশুদ্ধ প্রশান্তির আনন্দ, আছে চলমান সৌন্দর্যসম্ভার। যেটুকু বেদনা আছে তা বড় স্নিগ্ধ, অলস, মন্থর, তা যেন সুখের মতো ব্যথা। যুদ্ধরত বাঙালি, নিপীড়িত বাঙালি, প্রতিবাদী বাঙালি কেমন করে ‘সেই পরীর দেশ’ কল্পনাময় বাংলা নিয়ে মুগ্ধ হলো?

এতে বিস্ময়ের কিছু নেই, বরং যা স্বাভাবিক তাই ঘটেছে। কারণ পাকসেনা-তাড়িত বাঙালি, শরণার্থী বাঙালি, স্বদেশে পরবাসী বাঙালি, যুদ্ধরত বাঙালি, শৃঙ্খলিত বাঙালি এক স্বপ্নময় বাংলাদেশের প্রত্যাশায় অত্যাচারের ঊর্ধ্বে উঠে হয়েছিল সূর্যমুখী। সান্ত্বনা পেয়েছিল কল্পনার স্নিগ্ধ বাংলাদেশে পদচারণার আকাক্সক্ষায়। বাঙালি জাতিটাই আবেগে কল্পনার বিন্দুতে হয়েছিল মিলিত এক স্বর্গ বাংলাদেশের প্রার্থনায়। সুতরাং বাঙালির সোনার বাংলার স্বপ্ন আর রবীন্দ্রনাথের স্বপ্নিল বাংলায় ঘটেছিল ঐতিহাসিক সম্মিলন। রবীন্দ্রনাথ সেই স্বপ্নরাজ্যের পথপ্রদর্শক হিসেবেই আমাদের কাছে মুগ্ধকর, প্রীতিভাজন এবং নির্বিচারী অনুষঙ্গ। আমাদের আবেগ-কল্পনা স্বপ্নের আকাশজুড়ে তাই রবীন্দ্রনাথ।

কিন্তু জীবন স্বপ্ন নয়, বাংলাদেশও স্বর্গ হয়ে উঠছে না। উঠলেও ‘সে অনেক শতাব্দীর মনীষার কাজ’। তাহলে আজ যখন আমরা জীবনের উত্তাপে দগ্ধ, জীবিকার প্রয়োজনে ঘর্মাক্ত, শ্রেণি-শোষণের পীড়নে বিক্ষত, রিরংসায় বিকৃত, অহংকারে উত্তেজিত, Passion বা রক্তিমতায় ভারসাম্যহীন; পুনরায় রাষ্ট্রিক প্রতিবাদের শব্দাবলি উচ্চারণে দ্রুত ব্যস্ত তখন বিশুদ্ধ স্বপ্নময়, ভাববাদী, অধ্যাত্মবাদী, সর্বমীমাংসিত হৃদয়ের অলস-মন্থর রবীন্দ্রনাথ কী অব্যর্থ, অনিবার্য? শুধু অব্যর্থেই নয় জাতিকে স্বপ্নের হাতে শৃঙ্খলিত করেছে যে-রবীন্দ্রসাহিত্য তাকে কি মাল্যভূষিত করতে আন্তরিক উৎসাহ পাব? বাংলার জাতীয়তাবাদী আন্দোলনের সূত্রপাত নানাভাবে সংঘটিত হলেও তাকে রূপদান করেন রবীন্দ্রনাথ ১৯০৪-এ। ‘মারাঠির সঙ্গে আজি হে বাঙালি এককণ্ঠে বলো জয়তু শিবাজী’ পঙ্ক্তিদ্বয়ের মধ্যে এ বোধের উদ্বোধন। এই জাতীয়তাবাদী চেতনার গান ‘বাংলার মাটি বাংলার জল’, প্রভৃতি শত শত কণ্ঠে উচ্চারিত হতো। কিন্তু সমকালেই স্বয়ং রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর জাতীয়তাবাদের সংকীর্ণতা এবং ধ্বংসের অনিবার্যতাকে ব্যাখ্যা করে ফিরেছেন আমেরিকা এবং জাপানে। তার ‘ন্যাশনালইজম’ গ্রন্থে বারবার সতর্কবাণী উচ্চারণ করেছেন যে জাতীয়তাবাদ থেকেই শাসকের প্রয়োজনে উগ্রজাতীয়তার জন্ম এবং তা আজ বিশ্বসভ্যতাকে ধ্বংসের মুখে ঠেলে দিচ্ছে। রবীন্দ্রনাথ তার এই জাতীয়তাবাদবিরোধী বক্তব্যের জন্য তার স্বকালে ধীকৃত হয়েছিলেন। রবীন্দ্রনাথ আন্তর্জাতিকতাবাদী, তা নিঃসন্দেহে স্বাদেশিকতাকে স্বীকার করেই।
রবীন্দ্রনাথ কোনো অবস্থাতেই মোহ-মুগ্ধ হয়ে বলপ্রয়োগ করে কোনো কিছু করাকে সমর্থন করেননি। এ কারণে উগ্র স্বদেশি আন্দোলনকে, সন্ত্রাসবাদী আন্দোলনকে সমালোচনা করেছেন নানা নিবন্ধে।

অথচ একই রবীন্দ্রনাথ ‘রাজকুটুম্ব’ প্রবন্ধে লিখলেন, ‘একটা অবস্থা আছে যখন ফলাফল বিবেচনা করা অসংগত এবং অন্যায়। ইংরাজ যখন অন্যায় করিয়া আমাকে অপমান করে, তখন যতটুকু আমার সামর্থ্য আছে তৎক্ষণাৎ তার প্রতিবাদ করিয়া জেলে যাওয়া এবং মরাও উচিত।’

বঙ্গদর্শনের সূচনাকালে রবীন্দ্রনাথ ব্রাহ্মবাদের স্বপ্ন দেখেছিলেন। পরবর্তীকালে রবীন্দ্রনাথকে ঐকান্তিক হিন্দু-মনোভাব থেকে বেরিয়ে এসে বলতে শুনি : ‘আমি স্বভাবতই সর্বাস্তিবাদী আমাকে ডাকে সকলে মিলে আমি সমগ্রকেই মানি, গাছ যেমন আকাশের আলো থেকে আরম্ভ করে মাটির তলা পর্যন্ত সমস্ত কিছু থেকে ঋতু-পর্যায়ের বিচিত্র প্রেরণাদ্বারা রস ও তেজ গ্রহণ করে তবেই সফল হয়ে ওঠে আমি মনে করি আমারও ধর্ম তেমনি সমস্তের মধ্যে সহজে সঞ্চরণ করে সমস্তের ভেতর থেকে আমার আত্মা সত্যের স্পর্শ লাভ করে সার্থক হতে পারবে।’

সোৎসুক বিশ্লেষণের শুভকল্যাণে আবাল্য জানতে শিখেছি, রবীন্দ্রনাথ উপনিষদের পদাঙ্কচারী; জীবনাগ্রহে বৈদেহী; এবং প্রকরণ ও সাহিত্যবীক্ষায় কলাকৈবল্যবাদ-প্রয়োগে প্রামাণিক। পক্ষান্তরে, রবীন্দ্রশিল্পদৃষ্টি অনেকান্ত বিশ্লেষণে বৈপরীত্যে বিদ্ধ, এ-কথাও উচ্চার্যমান। অবশ্যই আমরা বিশ্বাসী যে মানসিক দ্বৈধ শিল্পকর্মে সতত দোষাবহ নয়। দ্বান্দ্বিক সমাজপ্রবাহে এবং মানসপ্রবাহে মানসিক দ্বৈধ সাহজিক; নির্দ্ধন্দ মানসক্রিয়া সমূলক নয় বরং অমূলক। রবীন্দ্রনাথের মানসদ্বন্দ্ব স্বাবলম্ব; দৈশিক ও কালিক সমাজস্রোতে শোধিত; এবং তা শুভদ ‘বাদ’ সংকরে সাবয়ব। ইউরোপীয় রোমান্টিক কবি ও কোবিদবৃন্দের সৌগন্ধ্য রবীন্দ্রভাবনায় বর্তমান বটে, তবে রবীন্দ্রনাথ স্বয়ংকৃত ও স্বভাবজ বোধে এবং সংবেগে লোকোত্তর ও নির্বিকল্প। রবীন্দ্রনাথ মনুষ্যবাদমুখী এবং তার মনঃস্থ শুভবাদের প্রতিষ্ঠাকল্পে তিনি মননমন্ত মহাতপাঃ।

রবীন্দ্রনাথের প্রোক্ত বৈপরীত্য দোষাবহ নয়; অকপট। আত্মবৈপরীত্যের অন্তঃপাতী সত্যসন্ধ প্রতিবেশী উপাদানেই রবীন্দ্র-সৃষ্টিক্ষমপ্রজ্ঞায় বর্ধিঞ্চু শক্তি। সর্বাস্তিবাদী রবীন্দ্রনাথের জীবনদর্শন হলো বিশ্বমানবমুখিতা; এই বৃহৎ মানবকল্যাণকর তথ্যে প্রবুদ্ধ রবীন্দ্রনাথ স্বভাবজ অশূন্যচারী। সত্যাসত্য বিচারে যেখানে রবীন্দ্রনাথ নিছক তত্ত্বানুগ, সেখানেই তিনি বিভ্রান্ত এবং অপচিত। বস্তুত, অপচিত এককালীন গৃহীত সিদ্ধান্তের সংশোধনই রবীন্দ্রপ্রতিভার গৌরব। জাতীয় জীবনের অসংখ্যেয় বাতাবর্তে তাকে আমরা বিবিক্ত দেখি, তবে বিশিখ নয়। জীবনের চলিষ্ণুতা সম্পর্কিত নিরুক্তবোধই তাকে করেছে অধুনাতনী।

প্রকৃত প্রস্তাবে, ভারতবর্ষীয় রাজনীতিকরা যে সময় শ্রেণিস্বার্থ রক্ষণে সংকীর্ণ সদাব্যস্ত, রবীন্দ্রনাথ তদ্কালে রাশিয়ার কৃষক-শ্রমিকের অর্থনৈতিক ও রাষ্ট্রিক অধিকারে উচ্চকণ্ঠ। রাশিয়ার চিঠি ও সভ্যতার সংকটে কেবল রাবীন্দ্রিক বক্তব্য প্রতিভাসিত নয় বরং অন্যান্য সাহিত্যকর্ম প্রাগুক্ত বোধ ও চিন্তায় সমুজ্জ্বল।

উত্তর-সামরিক রবীন্দ্রমানসের পরিবর্তন অনন্বিত, অনাবিষ্ট ও আপতিক নয়, বরং কালাহত, স্বোপলব্ধ এবং স্বোপার্জিত। রবীন্দ্রনাথের মনন ও শিল্পকর্ম হয়তো  নয়, তবে তিনি অনৃতচারী নন বরং সত্যাসন্ধ, অকপট।

রবীন্দ্রনাথ হিমালয়সদৃশ, জনৈক আধুনিক কবি-সমালোচকের সমীক্ষায়; এবং সুধীন্দ্রনাথ দত্তের দৃষ্টিতে সারূপ্য উপমাসদৃশ নয়, উৎপ্রেক্ষাস্বরূপ। সুউচ্চ, উত্তুঙ্গ ও বিস্মৃতকায় হিমালয়সদৃশ রবীন্দ্র-প্রতিভার প্রতিটি প্রান্ত ও প্রান্তর হয়তো আজ অনাদন্ত্য ও অনির্ণীত নয়; তবুও বিবেকী এবং অজাত্যন্ধ ব্যক্তি কবুল করতে বাধ্য, রবীন্দ্রসাহিত্যকর্মে একাধিক গুহা ও গূঢ়পথ আজও নির্লক্ষ; হয়তো-বা নির্লক্ষ নয় তবে নির্বিরোধে তাও উজ্জ্বল স্বল্পালোকিত। নিরাগ্রহের আগাছায় এবং দ্রুততার শষ্পে সমাচ্ছন্ন গুহা ও গূঢ়পথ যত না অপ্রমিতকর, তার চেয়েও বিভ্রান্তিবহ তার অনুজ্জ্বলতা। কারণ, অস্বচ্ছতাক্রান্ত প্রতিবেশে হীরকও হয় পরকলা; পরকলাও হয় হীরকসদৃশ। অথচ এ-সত্য প্রজ্ঞাত ও তর্কাতীত যে সাহিত্য-বিচারে ইন্দ্রজাল নয় বরং প্রমা ও প্রমিতি শাশ্বতিক।

একবিংশ শতাব্দীতে আমাদের অহংকার প্রযুক্তি বিপ্লব। সেই অহংকারী বিশ্ব আজ মারণাস্ত্র ব্যবসায়ে উন্মত্ত। মানব জীবনকে, জীব পরিণত করছে। আমাদের গ্রহ পুঁজির প্রলয় নৃত্যে কম্পিত; রবীন্দ্রনাথের বিশ্বাস : মেধাচর্চা ও চিত্তচর্চার সমন্বয়ের অভাবেই দানবের উত্থান। তার অভিমত : চিত্তচর্চা অর্থাৎ মনুষ্যত্বচর্চা, সংবেদন-শীলতার চর্চা, মানবধর্মের চর্চা আজ মুক্তির একমাত্র পথ। নইলে সভ্যতার এই দানবীয় সংকট মানুষকে পুঁজিনিয়ন্ত্রিত রোবটে পরিণত করবে। রবীন্দ্রনাথের আমাদের প্রয়োজন নেই, আমাদের প্রয়োজন আছে, রবীন্দ্রনাথের।

তার বিশ্ব-জাতিভাবনা আজও আমাদের মুক্তির পথ।

অনুলিখন : শিমুল সালাহ্উদ্দিন

রবীন্দ্রতত্ত্বাচার্য, প্রাক্তন অধ্যাপক

বাংলা বিভাগ, ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়

(দেশ রূপান্তরে পূর্বে প্রকাশিত)