দুর্বল ব্যাংকগুলোর ঋণ প্রদানের ক্ষমতা নিয়ন্ত্রণের পরামর্শ দিয়েছেন অর্থনীতিবিদ ড. সাদিক আহমেদ। তিনি বলেন, প্রয়োজনে দুর্বল রাষ্ট্রায়ত্ত ব্যাংকগুলোকে বাণিজ্যিকীকরণ করতে হবে।
বৃহস্পতিবার (৯ মে) বাংলাদেশ উন্নয়ন গবেষণা প্রতিষ্ঠানের (বিআইডিএস) এক বই আলোচনায় তিনি এসব কথা বলেন। ‘বাংলাদেশের সামষ্টিক অর্থনীতির স্থিতিশীলতা’ শীর্ষক বইয়ের প্রকাশনা অনুষ্ঠানে দেশের বিশিষ্ট অর্থনীতিবিদেরা উপস্থিত ছিলেন। বইটি লিখেছেন কেন্দ্রীয় ব্যাংকের মুদ্রানীতি প্রণয়ন (মনিটারি পলিসি) কমিটির সদস্য ও পলিসি রিসার্চ ইনস্টিটিউট অব বাংলাদেশের (পিআরআই) ভাইস চেয়ারম্যান ড.সাদিক আহমেদ। অনুষ্ঠানে প্রধান অতিথি ছিলেন প্রধানমন্ত্রীর অর্থনৈতিক উপদেষ্টা মসিউর রহমান।
আলোচনায় অংশ নিয়ে ড. সাদিক আহমেদ বলেন, খেলাপি ঋণের কারণে সবচেয়ে বেশি ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে সরকারি ব্যাংকগুলো। এটি কোনো দুর্ঘটনা নয়, বরং এতে রাজনৈতিক হস্তক্ষেপ ছিল। তাই খেলাপি ঋণের প্রবাহ নিয়ন্ত্রণ করতে না পারলে কোনো সমাধানই কাজে আসবে না। এজন্য দুর্বল ব্যাংকগুলোর ঋণ প্রদানের ক্ষমতা নিয়ন্ত্রণ করতে হবে। প্রয়োজনে দুর্বল রাষ্ট্রায়ত্ত ব্যাংকগুলোকে বাণিজ্যিকীকরণ করতে হবে।
সংস্কার পদক্ষেপের কথা তুলে ধরে এ অর্থনীতিবিদ বলেন, ২০০০ থেকে ২০১২ সাল পর্যন্ত ব্যাংক খাতে অনেক সংস্কার হয়েছে। কিন্তু এর পরবর্তী সময়ে সংস্কার কার্যক্রম থেমে যায়। গত এক যুগে দেশে ১ লাখ কোটি টাকার ঋণ খেলাপী বেড়েছে। এটা অনেক বড় একটি সংখ্যা। কোনো ম্যাজিক দিয়ে ব্যাংকের সমস্যার সমাধান হবে না। মৌলিক পদক্ষেপগুলো গ্রহণ করতে হবে।
মূল্যস্ফীতি নিয়ে পিআরআই ভাইস চেয়ারম্যান বলেন, আমদানির কারণে আমাদের দেশে মূল্যস্ফীতি বাড়েনি। এর প্রধান কারণ ছিল করোনাকালীন সময়ে সরকারের পক্ষ থেকে প্রদানকৃত বিভিন্ন প্যাকেজ। এসব প্যাকেজের কারণে বাজারে ৩৪ শতাংশ পর্যন্ত তারল্যপ্রবাহ বেড়ে গিয়েছিল। এসব অতিরিক্ত তারল্য সাসটেইনেবল না। আর এখন মূল্যস্ফীতি কমাতে কিছু সময়ের জন্য হলেও খাদ্যপণের আমদানি শুল্ক কমানো উচিত।
আলোচনায় অংশ নিয়ে বাংলাদেশ ব্যাংকের সাবেক প্রধান অর্থনীতিবিদ ও বিআইডিএসের সাবেক মহাপরিচালক ড. মুস্তফা কে মুজেরী বলেন, নীতি গ্রহণের ক্ষেত্রে নরম সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়। এডহক ভিত্তিতে সমাধান খোঁজা হয়। ফলে ব্যাংক খাতে মনিটারি পলিসি কাজ করছে না। ব্যাংকগুলো আরো দুর্বল হচ্ছে। তাই এখন শক্তিশালী গ্রুপের স্বার্থ উপেক্ষা কর কিছু কঠিন সিদ্ধান্ত নিতে হবে। উন্নয়নরে জন্য রাষ্ট্র বাজারে পদক্ষেপ নিতে পারে। তবে মূল বিষয়গুলো ঠিক রেখে পদক্ষেপ নিতে হবে। কিন্তু দেখা যায় সরকারের কিছু পদেক্ষপে উল্টো অস্থিরতা তৈরি হয়েছে। যেমন মরজানে ২৮ পণ্যের দাম বেধে দেয়া হলো। বাজার অর্থনীতিতে এসব কাজ করে না। সরকারের হস্তক্ষেপ গুরুত্বপূর্ণ, কিন্তা তা যেন অস্থিরতা তৈরি না করে।
বিআইডিএসের মহাপরিচালক ড.বিনায়ক সেন বলেন, একবারে মার্কিন ডলারের দাম ১১০ টাকা থেকে বাড়িয়ে ১১৭ টাকা করেছে বাংলাদেশ ব্যাংক। ডলারের এমন দাম বাড়ার পর রপ্তানি খাতে আর প্রণোদনা দেওয়ার কোনো যৌক্তিকতা নেই। দেশের এই দুর্যোগ মুহূর্তে সামাজিক সুরক্ষার আওতা বাড়ানো প্রয়োজন। ফলে রপ্তানি প্রণোদনা বন্ধ করা হলে সেই অর্থ সামাজিক সুরক্ষাসহ বিভিন্ন অত্যাবশ্যক খাতে ব্যবহার করা যাবে।
প্রধানমন্ত্রীর অর্থনৈতিক উপদেষ্টা ড. মসিউর রহমান বলেন, রপ্তানি প্রণোদনা বন্ধ করা হবে কি না, সেটা সরকার ভেবে দেখতে পারে। যদি এ প্রণোদনা বহাল রাখা হয়, সে ক্ষেত্রে রপ্তানি খাতে ওই পণ্যের অবদান (পারফরমেন্স) যাচাইয়ের ভিত্তিতে তা দেওয়া যেতে পারে। সরকারের উচ্চপর্যায়ে যথাযথ মূল্যায়নের মাধ্যমে সম্ভাবনাময় রপ্তানি খাত চিহ্নিত করে তারপর এ প্রণোদনা দেওয়া উচিত।
তিনি আরও বলেন, দীর্ঘ সময় মুদ্রার বিনিময় হার বাজারভিত্তিক না করায় এ ক্ষেত্রে অসামঞ্জস্যতা তৈরি হয়েছে। এখন এটিকে বাজারভিত্তিক করার উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে। আমি মনে করি এখন থেকে বাজারের সঙ্গে মিল রেখে নিয়মিতভাবে মুদ্রার বিনিময়হার সমন্বয় হওয়া প্রয়োজন।